ক্যাফে ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৭)

অ্যাটমের গহন কথা

নিলস হেনরিক ডেভিড বোর (৭ অক্টোবর ১৮৮৫ – ১৮ নভেম্বর ১৯৬২) ছিলেন ডেনমার্কের নাগরিক। পরমাণুর গঠন ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব বুঝতে বোঝাতে তিনি বিপুল অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। নিলস বোর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ক‍্যাভেন্ডিশ ল‍্যাবরেটরিতে গিয়ে জেমস জোসেফ টমসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং জেমস জীনস ও জোসেফ লারমর এর বক্তৃতা শুনেছিলেন। ১৯১২ তে তিনি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে ছাত্রদের কাছে তাপগতিবিদ‍্যা বা থার্মোডিনামিক্স নিয়ে আলোচনা করতেন ও বক্তৃতা দিতেন। তাঁর তিন তিনটি গবেষণাপত্র ১৯১৩ র জুলাই, সেপ্টেম্বর ও নভেম্বর মাসে ফিলজফিক‍্যাল ম‍্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। নিলস বোর তাঁর উৎসাহদাতা আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের পরমাণুর গঠন সম্পর্কে ধারণার সঙ্গে ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বের ধারণার মেলবন্ধন করে তাকে বিকশিত করে পরমাণুর নতুন মডেল বিজ্ঞানী সমাজে পেশ করলেন।
 নিলস বোরের পরমাণু মডেল গড়ে উঠতে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের প্রথম সলভে কংগ্রেসে আলোচিত বিকিরণ এবং কোয়ান্টা সম্পর্কিত কার্যবিবরণী বা প্রসিডিংস কাজে লেগেছিল। সলভে কনফারেন্সে পদার্থবিজ্ঞান সংক্রান্ত নানা সমস্যার সমাধান বের করতে বরেণ‍্য পদার্থবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদদের সমাবেশ করা হত। সলভে কনফারেন্সের উদ্গাতা তথা আহ্বায়ক আর্নেস্ট গ‍্যাসটন জোসেফ সলভে ( ১৬ এপ্রিল ১৮৩৮ – ২৬ মে ১৯২২) ছিলেন একজন বেলজিয়ামবাসী শিক্ষানুরাগী বিজ্ঞানপ্রেমী শিল্পপতি। স্বশিক্ষিত রসায়নবিদ ছিলেন তিনি। তাঁর বদান‍্যতায় সলভে কনফারেন্স করত ইন্টারন‍্যাশনাল সলভে ইনস্টিটিউট ফর ফিজিক্স অ্যাণ্ড কেমিস্ট্রি। প্রথম সলভে কনফারেন্স  বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ত্রিশ অক্টোবর থেকে তিন নভেম্বর অবধি অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রথম সভাটিতে শুধুমাত্র ফিজিক্স নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল। আলোচনার নির্দিষ্ট বিষয় ছিল রেডিয়েশন এবং কোয়ান্টা। এই প্রথম সলভে কনফারেন্সে চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯০২ এর নোবেলজয়ী ডাচ পদার্থবিজ্ঞানী হেনড্রিক আনতুন লোরেঞ্জ ( ১৮ জুলাই ১৮৫৩ – ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮)। গণ‍্যমান‍্য বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের মধ‍্যে উপস্থিত ছিলেন ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্ক, মেরি কুরি, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, হেনরি পঁয়কেয়ার, এ সমারফেল্ড, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং পল ল‍্যাঙ্গেভিন প্রমুখ।
জার্মান তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্কের কোয়ান্টা সংক্রান্ত গবেষণায় আকৃষ্ট হয়েছিলেন নিলস বোর। আর কোয়ান্টা নিয়ে আইনস্টাইনের উপলব্ধিও বোরকে আগ্রহী করে তুলেছিল। প্রথম সলভে কনফারেন্সে ম‍্যাক্স প্ল‍্যাঙ্ক তাঁর বক্তৃতার শেষে বলেছিলেন, অ্যাটম বা পরমাণু এবং ইলেকট্রনকে কোয়ান্টাম তত্ত্ব মেনে চলতে হয়। প্ল‍্যাঙ্কের বক্তৃতার উপর আলোচনা করতে গিয়ে প্রথম সলভে কনফারেন্সের চেয়ারম্যান হেনড্রিক লোরেঞ্জ পরমাণুর উপাদান ও বিন‍্যাস বিষয়ে বললেন। ওই কথা বলতে গিয়ে লোরেঞ্জ অস্ট্রীয় পদার্থবিদ আর্থার এরিক হাস ( ১৮৮৪ – ১৯৪১) এর দেওয়া পারমাণবিক মডেলের প্রসঙ্গ আনলেন। লোরেঞ্জ পরমাণুর সাইজ বা চেহারা নিয়ে বলতে গিয়ে প্ল‍্যাঙ্ক কনস্ট‍্যান্ট  এর উল্লেখ করলেন।   এই প্ল‍্যাঙ্ক কনস্ট‍্যান্ট নিয়ে প্ল‍্যাঙ্ক যা যা যেমন যেমন বলেছেন, নিলস বোর তাঁর প্রথম গবেষণা পত্রে সেইভাবেই পা ফেলেছেন। বোরের গবেষণা পত্রের তন্নিষ্ঠ পাঠে পরিষ্কার বোঝা যায় যে তিনি তাঁর পরমাণু মডেল তৈরি করতে প্ল‍্যাঙ্ক, লোরেঞ্জ এর মতের সঙ্গে আর্থার হাস‌ এর মডেলকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এছাড়াও ইংরেজ গণিতবিদ ও পদার্থবিদ জন উইলিয়াম নিকলসন ( ১৮৮১ – ১৯৫৫) পরমাণুর মডেলের যে তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন, সেটাও বোরের তত্ত্ব গড়ে তুলতে ভূমিকা পালন করেছে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।