১
বামুনের ছেলে। বেশবাস, বহিরঙ্গে বামনাই পুরোপুরি। অন্তরঙ্গে এক আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী বিবেকী সত্ত্বা।
সংস্কৃতের পণ্ডিত। ঊনিশ বছর বয়সে সংস্কৃত কলেজ থেকে বিদ্যাসাগর উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব। বাংলা ভাষাকে অন্তরের গভীর অন্তঃস্থল থেকে ভালবাসতেন। কিশোর বালকটি যেভাবে নবীনা কিশোরীকে ভালবাসে, বুঝি তার সাথেই তুলনা চলে। বাংলাকে হিন্দিসাহিত্য থেকে এনে দিলেন বেতাল পঞ্চবিংশতি। মেয়েদের ঘরোয়া আসরেও জনপ্রিয় হল সে অনুবাদ। উইলিয়ম শেক্সপিয়রের নাটক কমেডি অফ এররস এর আখ্যানভাগকে অবলম্বন করে উপন্যাসের আকার দিলেন। ভ্রান্তিবিলাস। আর সংস্কৃত থেকে শকুন্তলা ও সীতার বনবাস। বাঙালি মায়ের বুকভরা স্নেহ ঢেলে দিলেন তাতে।
আজ আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস।
২
এমন কি ইংরেজি ভাষায় স্বপ্ন পর্যন্ত দেখবেন। মধুসূদন দত্তের ইচ্ছেটা ছিল এই রকম। তখন বাঙালির ছেলের ইংরেজি ভাষায় পড়াশুনার সুযোগ সবে সবে বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু হিব্রু ল্যাটিন গ্রীক এসব ভাষার সাহিত্যপাঠের সুযোগ নেই বললেই চলে। মধুসূদন দত্ত চাইলেন পাশ্চাত্যের ধ্রুপদী সাহিত্য, পাশ্চাত্যের পুরাণকথা তাঁদের ভাষায় পড়বেন। সেই সাথে পেত্রার্কা, দান্তে, ভার্জিল, মিল্টন, প্রমুখ বিখ্যাত কবিদের কবিতার ভিতরকোঠায় প্রবেশ করবেন। সে সুযোগ সেকালের বাংলাভূমিতে ছিল না। তাই সাহিত্য সাধনা করবেন বলে, কবিধর্মের আহ্বানে পিতৃপুরুষের ধর্মকে ছুঁড়ে ফেললেন মধু। খ্রিস্টান পাদ্রিদের কাছে বসে পড়ার সুযোগ নিলেন। সংস্কৃত নাটকে ট্রাজেডি ছিল না। ধীরোদাত্ত নায়ক ও মিলনান্তক বৃত্তই সংস্কৃত নাটকের বৈশিষ্ট্য। মধু বাংলা সাহিত্যে আনলেন গ্রীক ট্রাজেডির হাহাকার। স্বাধীনতার বোধ যখনো সেভাবে গড়ে ওঠে নি, তখন মধু উপহার দিলেন মেঘনাদবধ কাব্য, যেখানে রাম আর তার অনুচরবৃন্দ স্বাধীন লঙ্কাপুরীতে অনুপ্রবেশ করছে। লঙ্কাবাসী সাধারণ মানুষ রাবণের নেতৃত্বে স্বদেশভূমি রক্ষা করতে যত্নবান। দেখার আঙ্গিকটাকেই বদলে দিলেন দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন।
কবি জন মিল্টনের খ্যাতি ছিল ওজস্বিতাপূর্ণ ক্লাসিক ইংরেজি ভাষায় লেখার। মিল্টনের অ্যারিওপ্যাগিটিকা সর্বকালের স্বাধীনতা পিপাসুর মহাগ্রন্থ। তেমনটি করে বাংলা ভাষায় লিখতে চেয়ে মিল্টনের ব্ল্যাঙ্ক ভার্স আয়ত্ত্ব করলেন মধুকবি। তারপর জন্ম দিলেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ।
সংস্কৃত নাটকে সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা সাবালক হয়ে হৃদয়বিনিময় করতে জানত। কিন্তু বঙ্গভূমিতে মেয়েরা কেবলি অবলা ললনা। বাঙালির মেয়ে একটুতেই হাপুসনয়নে কেঁদে বুক ভাসায়। তার বুক ফাটে, তবু মুখ ফোটে না। সে অবরোধবাসিনী। নিজের পরিচয় দেয় দাসী বলে। স্বামীকে বলে নাথ।
এই পরিবেশে যখন বিদ্যাসাগর মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর বন্দোবস্ত করছেন, মধুসূদন দত্ত উপহার দিয়েছেন বীরাঙ্গনা পত্রকাব্য। এরা অনেকেই ভারতীয় নারী। কিন্তু মনে মেজাজে নবজাগরণের পতাকাবাহিনী। মাইকেল মধুসূদন সাহিত্য অনুবাদ করেন নি, কিন্তু পাশ্চাত্য রেনেসাঁর মন মেজাজ মর্জি অনুবাদ করে বাংলাভাষাকে সাবালক করে দিয়েছিলেন।
৩
সাহিত্যের উদ্দেশ্য যদি হয় জনজাগরণ ঘটানো, তাহলে নীলদর্পণ কার দীনবন্ধু মিত্র একজন সার্থক নাট্যকার। বাংলায় নাটক লিখে সকলের মন কেড়ে নিলেন দীনবন্ধু মিত্র। তাঁর “নীলদর্পণ” সাড়া ফেলে দিল। নিপীড়িত মানুষের মনের কথা পড়তে পেরেছিলেন নীলদর্পণকার আর নির্ভয়ে নিঃসঙ্কোচে কলমের মুখে রূপ দিয়েছিলেন শাসকের অকথ্য অত্যাচারের। অসামান্য জনপ্রিয়তা দেখে নাটকটিকে নিষিদ্ধ করে তদানীন্তন শাসক।
নাট্যামোদী মহল নীলদর্পণ এর ইংরেজি অনুবাদ করান। শোনা যায় অদ্বিতীয় প্রতিভাধর মধুকবি ওই ভাষান্তরণের কাজটি করেছিলেন। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু থেকে মহাকবিকে আড়াল করতে পাদ্রী জেমস লং সাহেব নিজের নাম সামনে রেখে ইংরেজি ভাষায় নীলদর্পণ পেশ করলেন। ইংরেজ শাসকের বিচার লং সাহেবকে ছাড়ে নি। তাঁর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হয়েছিল। একটি ছড়ায় তা ধরা পড়েছে।
নীল বাঁদরে সোনার বাংলা করলে এবার ছারেখার
অসময়ে হরিশ মোলো লঙের হল কারাগার
প্রজার প্রাণ বাঁচানো ভার।
লং সাহেবের হয়ে জরিমানার টাকাটা গুণে দিয়েছিলেন আর এক বঙ্গ সুসন্তান কালীপ্রসন্ন সিংহ ওরফে হুতোম পেঁচা।
বাংলায় নীলদর্পণ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। এই আপাদমস্তক জনদরদী সমাজসেবী মানুষটি বাংলা সাহিত্যের উন্নতিতে প্রাণপাত করতেন। কিন্তু তাঁর আসল লক্ষ্য ছিল জনমানসের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি। নীলদর্পণ নাটকে বাংলার চাষির উপর শাসকের সীমাহীন অত্যাচার দেখে বিদ্যাসাগর মহাশয় স্থান কাল পাত্র ভুলে নিজের চটি ছুঁড়ে দেন মঞ্চে নীলকর সাহেববেশী নট অর্ধেন্দু মুস্তাফির দিকে। তখনই বিদ্যাসাগর প্রবাদ পুরুষ। তাঁর ছুঁড়ে দেওয়া চটি নাট্যচর্চার প্রতি অভিজ্ঞান হিসেবে মাথায় নিয়ে অভিনেতা বর্ণপরিচয়কারকে প্রণাম করেন।
৪
করে দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। গীতাঞ্জলি লিখেছিলেন। তারপর নিজের লেখা কবিতার বাছাই করা কয়েকটির ইংরেজি অনুবাদ তিনি করেছিলেন নিজেই। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ “song offerings” সৃষ্টি করেন । গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া, অচলায়তন, শিশু, স্মরণ, কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ এই দশটি কাব্য থেকে পছন্দ করে করে কবিতা খুঁজে নিয়ে অনুবাদ করে ফেললেন। তারপর লণ্ডন। সাথে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও বধূমাতা প্রতিমা। মনভোলা রথী লণ্ডনের মেট্রো রেলে কবির অনুবাদের পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেছিলেন। ভাগ্যিস ওটা লণ্ডন। কিছু ভদ্রলোক ও দায়িত্বশীল লোক পাওয়া যায়। পাণ্ডুলিপি ফিরে এল কবির কাছে।
১৯১২ সালের জুন মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই পাণ্ডুলিপির প্রথমটিটি উইলিয়াম রোটেনস্টাইনের হাতে তুলে দিলেন।
রোটেনস্টাইন এই খাতার তিনটি টাইপ কপি তৎকালীন তিন বিখ্যাত মনীষী ডব্লিউ বি ইয়েটস, স্টপফোর্ড ব্রুক ও এন্ডরু ব্র্যাডলিকে পাঠালেন। তিনজনেই রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলি পড়ে তাঁদের উচ্ছ্বাস ব্যক্ত করেন। ব্র্যাডলি রোটেনস্টাইনকে পত্রযোগে জানান “It looks as though we have at last a great poet among us again”. ব্রুক লেখেন “I wish I were worthy of them”.
সেই ইংরেজি অনুবাদের সঙ্কলনের একটি মুখবন্ধ লিখে দেন আইরিশ কবি ইয়েটস ( ১৮৬৫ – ১৯৩৯) । ইয়েটস এর জন্ম দিন এই জুন মাসের ১৩ তারিখ । আর জুন মাসেরই শেষাশেষি কোনো সময়ে লণ্ডনে রবীন্দ্রনাথ এই অনূদিত কবিতাগুলি পড়ে শুনিয়েছিলেন।
ইয়েটস, ১০ জুলাইয়ের এক প্রশস্তি ভাষণে বলেন “I know of no man in my time who has done anything in the English language to equal these lyrics.”
মনে করা হয়, ৩০শে জুন, রোটেনস্টাইনের গৃহে, এক বিশিষ্ট শ্রোতৃমণ্ডলীর সামনে ইয়েটস এই কবিতাগুলির কয়েকটি পাঠ করে শোনান। ইংলণ্ডের বিদ্বৎ সমাজে রবীন্দ্রনাথের সেই প্রথম আত্মপ্রকাশ। বিভিন্ন সূত্র থেকে শ্রোতাদের আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও বিস্ময়ের কথা আমরা জানতে পারি। শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদান, সংবর্ধনা ও অভিনন্দন চলতে থাকে।
পরবর্তী উত্থান ধূমকেতুর চেয়েও দ্রুত। ১লা নভেম্বর, ১৯১২, ইংরেজি গীতাঞ্জলির – Gitanjali, (Song Offerings) – সীমিত সংস্করণ প্রকাশ করে লণ্ডনের ইণ্ডিয়া সোসাইটি। ১ মার্চ, ১৯১৩, ম্যাকমিলান বার করে ইংরেজি গীতাঞ্জলির সুলভ সংস্করণ। ১২ নভেম্বর, ১৯১৩, স্টকহম থেকে আসে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি সংবাদ।
তারপর বাকিটা ইতিহাস। বাংলা সাহিত্যের বিশ্বজয়।
আজ আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস।
৫
Journey of the Magi নামে তেতাল্লিশ লাইনের একটি কবিতা লিখেছিলেন ব্রিটিশ কবি টমাস স্টার্নস এলিয়ট (১৮৮৮ – ১৯৬৫)। সেই কবিতা ১৯২৭ সালে প্রকাশ পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “পুনশ্চ” কাব্যগ্রন্থে এই কবিতাটির একটি অনুবাদ সংকলন করেন।
এই অনুবাদ সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুজ বাংলা আধুনিক কবিরা একটু যুক্ত রয়েছেন।
ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক বিষ্ণু দে ছিলেন কল্লোল যুগের অগ্রণী কবি। বাংলাভাষার আধুনিক কবিদের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বন্দ্ব মধুর সম্পর্ক ছিল। কবিতা কী, কেন, কবিতায় আধুনিকতা ঠিক কী, তা নিয়ে অনেক আলাপ ও বিতর্ক হত। কিন্তু অনুজদের তরফে সম্পর্কের মূল সুরটা ছিল গভীর শ্রদ্ধার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুনশ্চ ও লিপিকা আর তার গদ্যবুনোট দেখে বিষ্ণু দে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
তিনি “পুনশ্চ” গ্রন্থের কবিতার গদ্য ধাঁচটা আয়ত্ত করতে চেয়ে এলিয়টের “Journey of the Magi” কবিতাটির স্বকৃত অনুবাদ কবির কাছে পাঠিয়ে দেন। ওঁর প্রার্থনা ছিল ওঁর অনুবাদের সাথে পুনশ্চের গদ্যবুনোটের একটা মেলবন্ধন করে দেখিয়ে দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথ বিষ্ণু দে কৃত সেই এলিয়টীয় কবিতার অনুবাদ আত্মস্থ করে “তীর্থযাত্রী” শীর্ষক একটি কবিতা লেখেন। বিষ্ণু দে তাঁর স্বকৃত অনুবাদের নাম দিয়েছিলেন “রাজর্ষিদের যাত্রা”।
৬
শরৎসাহিত্য মোটেও ছুঁয়ে দেখেননি, এমন সাহিত্যপ্রেমী বাঙালি মেয়ে আছেন বলে জানি না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায় সাধারণ একটি মেয়ের জবানিতে বলেন, একটা গল্প লেখো শরৎবাবু… সাধারণ ঘরোয়া নারী থেকে বিদ্রোহিণী, সব রকম মেয়ের আঁতের কথাই লিখতে চেয়েছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তবে অতি সাধারণের কথাই যেন তাঁর কলমে হীরকপ্রভ হয়ে উঠেছে। বাংলাভূমে তো বটেই, বিপুল সংখ্যক হিন্দিভাষীর কাছেও শরৎসাহিত্য আদরণীয় হয়েছে। দেবদাস শব্দটি যেন প্রবাদপ্রতিম হয়ে উঠেছে। শরৎসাহিত্য বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। তা বৃথা যায় নি। আজ আন্তর্জাতিক অনুবাদ দিবস।