অনসূয়া চাপা গলায় শ্যামলীকে বলেন কী যে জব্বর আড্ডায় আমরা মেতেছি, ও কি বুঝবে?
আচ্ছা শ্যামলী, তুই কি জানিস্ না, সংবিধানের প্রাণসত্ত্বাকে রক্ষা করার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া আছে? আর্টিকেল থার্টি টু আর আর্টিকেল টু টোয়েন্টিসিক্স পড়িস নি?
শ্যামলী বলল, দিদি, দায়িত্ব দেওয়া, আর দায়িত্ব পালন করা, দুটো যে কত দূরের জিনিস! আমাকে দাদা যেদিন গোবিন্দ কাকার সামনে পিঠে দমাস করে কিল বসিয়ে দিল, আমার যেন দম আটকে যাচ্ছিল, তার চাইতে বেশি হচ্ছিল লজ্জা। মরমে মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। মা আর বাবা কিন্তু দাদাকে কিছু বলল না। আরেক দিন দাদা কিল মারতে এসেছে, ওই যেদিন ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা হল, একত্রিশে অক্টোবরে, জামাইবাবু সামনে ছিল, বলল কি জানেন! বলল, দাদা নাকি আমায় বড্ড বেশি রকম ভালবাসে। আমার ফিরতে দেরি হচ্ছিল, তাই আবেগে উৎকণ্ঠায় এ রকম করে ফেলেছে।
অনসূয়া বললেন, তোর দাদা রেগুলার তোকে মারধর করছে?
শ্যামলী বলল, আমি ভারতীয় বিচার ব্যবস্থা নিয়ে বলতে গিয়ে ওই উদাহরণটা দিলাম।
শ্যামলী বলল, খোঁজ নিয়ে দেখুন ভারতে এক বিরাট সংখ্যক মেয়ে প্রতি রাত্রে বাড়ির পুরুষের হাতে মারধর খায়। এমনকি ধর্ষিত হয়।
অনসূয়া বললেন, তবুও তুই বলবি না, তোর দাদা তোকে মারে কি না।
শ্যামলী বলল, ভারতে মেয়েদের সমানাধিকার শুধুমাত্র সংবিধানের পাতায় লেখা আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেয়েদের বাবা দাদা কাকারা এই জিনিসে বিশ্বাস করে না। মেয়েদের মা কাকিমা মাসিমা পিসিমা এটাকে আলোচনার যোগ্য বলেই মনে করে না।
আর কি জানেন, আমি আমার স্বামীকে শরীর দেব, ভালবাসা থেকে দেব। ভালবাসতে বাসতে শরীরে শরীর মিলবে। কিন্তু এই স্বাভাবিক জিনিসটা ভারতীয় নারীর যৌনজীবনে ব্যতিক্রমী ঘটনা। অর্গাজম বলে একটা কথা আছে। নারীপুরুষ পরস্পরকে ভালবাসতে বাসতে সেক্স করলে ওটা হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ কান মুচড়ে যৌনতা আদায় করে। এমনকি মাসিক চলার সময়ে পর্যন্ত ছাড় দেয় না। নিজের প্রয়োজনটা মিটে গেলে বৌয়ের কি হল না হল, সে খবর রাখার দরকার বোঝে না। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো সে বৌয়ের শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভালবাসার মানুষটিকে কি করে আদর করতে করতে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে হয়, সে জানতে চায় না। এই একতরফা ব্যাপারটাই হল ম্যারিটাল রেপ। দুনিয়ার সভ্যভব্য দেশগুলো ম্যারিটাল রেপকে অপরাধ বলে জানলেও ভারতীয় আইন তা নিয়ে আলোচনার দরকারই বোধ করে নি।
নইলে আপনি বলুন তো দেখি কেন জামাইবাবু হয়ে শালীর প্রতি ছোঁক ছোঁক করবে? আপনি খুঁজে দেখুন যে দেশে মেয়েদের দেবী বলা হয়, সেদেশে নিজের বাড়ির লোকজনের হাতে বেশিরভাগ সময় মেয়েরা ধর্ষিত হয়।
একটানা বলে হাঁফাতে থাকে শ্যামলী। তার পাশে এসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অনসূয়া বলেন আমি তোর কষ্টটা বুঝতে পারছি রে!
একটু জল খেয়ে শ্যামলী বলল, দিদি, আমি শুধু আমার কথাটা বলছি না। আমি গোটা দেশের গরিব আর অল্পশিক্ষিতের হয়ে আপনার কাছে বিচার চাইছি। দেখুন, পণপ্রথার বিরুদ্ধে আইন আছে। কিন্তু কেউ পাত্তা দেয়? পণের দাবি তোলা মাত্র বরের ঘেঁটি ধরে থানায় নিয়ে যাবার কথা ভাবতে পারে মেয়ের বাবা, কাকা? এমনকি মেয়েটা নিজে? অথচ আইনের পাতায় ঘটাপটা করে লিখে রেখেছে, পণ চাওয়া অন্যায়, পণ দেওয়া অন্যায়, পণের কথাবার্তায় থাকা পর্যন্ত অন্যায়। এই যে আমার বাবার কারখানায় বাচ্চা ছেলে কাজ করে, দেশের আইনের চোখে ওটা গুরুতর অন্যায়। কিন্তু আমার বাবা ভাবেই না ওটা অন্যায়। বাচ্চার বাড়ির লোকজন ও সেটা নিয়ে ভাবে না। কারখানায় আর পাঁচটা লেবার পর্যন্ত একথা জানে না। ট্রেড ইউনিয়ন এ নিয়ে কথাটি কয় না। পুলিশ এই নিয়ে রেইড করে না।
আইনের আসল অস্তিত্ব মানুষের সচেতন সক্রিয়তায়। মানুষ যদি না জানল, বুঝল, ভাবল, তাহলে আইনের পাতায় ওইসব লেখাজোখা সব ফালতু, এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল।
জানেন, নবান্ন নাটকে বিজন ভট্টাচার্য একটা দামি কথা বলেছেন। ওই নাটকের একটা ক্যারেকটার বলছে, কালোবাজারি মজুতদারদের বিরুদ্ধে বিচারকরা ব্যবস্থা নেবেন কি, তারা জজ ম্যাজিস্ট্রেটকে ট্যাঁকে পুরে রেখেছে। জহরলাল নেহেরু বলেছিলেন কালোবাজারিদের নিকটতম ল্যাম্প পোস্টে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হবে। হয়েছে একটাও? আসলে ভারতের বিচার ব্যবস্থাটা ওই নবান্ন নাটকের কথামতোই বড়োলোকের ট্যাঁকে পোরা আছে। গরিব এদেশে সুবিচার পাবে না। মেয়েরাও সুবিচার পাবে না।
অনসূয়া উঠে যান। দুকাপ কালো কফি নিয়ে ফিরে আসেন। বলেন, বাদ দে। তুই না বড্ড মনখারাপ করিয়ে দিস্।
শ্যামলী হাসতে থাকে। বলে, ছোটবেলায় মাসিমণিরা আসত। মায়ের অনেকগুলো বোন ছিল কি না। তারা এলে মা মেঝেতে ঢালা বিছানা পাতত। বাবা শুত খাটে। বোনেদের নিয়ে মা নিচে। বোনেরা এলে মায়ের যে কত্ত গল্প। গল্প আর ফুরোয় না। বাবা রেগে যেতেন। সারারাত গল্প করেই কাটিয়ে দেবে না কি?
অনসূয়া বললেন, হ্যাঁ রে শ্যামলী, একটা কথা বলব? তুই নাকি আজকাল বলছিস ম্যারেজ ইজ লিগালাইজড প্রসটিটিউশন? এটা কিন্তু বড্ড বাজে শোনাচ্ছে।
শ্যামলী বলল, অরিন্দমবাবু একথাটা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আকারে করবী ম্যামের কাছেও বলেছেন।
অনসূয়া বললেন, অরিন্দমকে এই সিনে টানিস না। ও আমাকে কাউকে এ নিয়ে কিছু বলতেই বারণ করেছে। তুই থিওরিটিক্যালি এটা পুরোপুরি ভুল বলছিস।
শ্যামলী বলল, তাহলে আমাকে বলতেই হচ্ছে, কথাটা বার্ট্রাণ্ড রাসেলের, যিনি আজ থেকে চৌত্রিশ বছর আগে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন।
অনসূয়া বললেন, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বলেছেন বলেই আমি তো কথাটা মেনে নেব না। আমি উক্তি চাই না। যুক্তি চাই। বিয়ের মাধ্যমে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে এক প্রাণ এক মন এক সত্তায় পরিণত হয়ে আগামী দিনের সুনাগরিকের জন্ম দেয়। তুমি তাকে প্রসটিটিউশনের লেবেল দিলে তো আমি ছেড়ে কথা বলব না!
শ্যামলী বলল, ওইজন্য আপনাকে কোভারচার তত্ত্বটা মনে করতে হবে। একদম আপনার সুরে সুরে মিলিয়ে বাইবেল বলেছেন দম্পতি, জায়া ও পতি, স্ত্রী এবং স্বামী, দুজন পৃথক পৃথক সত্তা নয়। তারা দুজন আলাদা মানুষ নয়। তারা রক্ত মাংসে এক অভিন্ন অবিচ্ছিন্ন সত্তা। একজন কুমারী বিয়ের পর যখনই পত্নী হিসেবে গৃহীত হলেন, অমনি তার কি কি সুবিধা হল? না, প্রথমতঃ, তিনি আর সম্পত্তির মালিক হতে পারেন না। দ্বিতীয়তঃ, তিনি কোনো দলিল স্বাক্ষর করতে পারেন না। কারো সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে পারেন না। স্বামীর ইচ্ছার বিপরীতে গিয়ে পড়াশুনা পর্যন্ত করতে পারেন না। নিজের নামে কোনো বেতন নিতে পারেন না। উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোনের লেখায় পড়েছি বিবাহ জারি থাকাকালীন মহিলার ব্যক্তি অস্তিত্ব ও আইনি সত্তা নিষ্ক্রিয় থাকে। বা বলতে পারেন, মহিলার তেমন সত্তা স্বামীতে অঙ্গীভূত হয়।
বুঝতে পারলেন?
অনসূয়া বললেন, এর সাথে লিগালাইজড প্রসটিটিউশন কথাটার সম্বন্ধ কি?
শ্যামলী বলল, আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতোই সামাজিক সচেতনতা, দায়বদ্ধতা আর শিক্ষা অধিকারের নানা দিক নিয়ে মিল্টন বিস্তর কলম চালিয়েছেন। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে পৌঁছে ১৬৪৪ সালে তিনি অ্যারিওপ্যাগিটিকা লিখলেন। ওটা মিল্টনের ভারি নামকরা রচনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও খুব প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু এর গোড়ায় আছে একটা কণ্ঠরোধের ইতিহাস। জীবনে মোট তিনটি বিয়ে করেছেন জন মিল্টন সাহেব। পঞ্চান্ন বছর বয়সে পৌঁছে জীবনের শেষ বিয়েটা করেছেন মিল্টন। বৌয়ের নাম এলিজাবেথ মিনশুল। এর আগের বৌ ছিল ক্যাথারিণ উডকক, ১৬৫৬ তে বিয়ে, আর ১৬৫৮তে বৌটা মারা যায়। মিল্টনের প্রথম বৌ ছিল ম্যারি পাওয়েল। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের মিল্টন, ভারি ভারি চিন্তা ভাবনা করা স্কলার মিল্টন ষোলো বছরের ম্যারিকে বিয়ে করলেন। সেটা ১৬৪২ সাল। ম্যারির খুব একটা পছন্দ হয় নি বরকে। সে বাপের বাড়ি চলে যায় আর আসেনা। তখন মিল্টন বিবাহ বিচ্ছেদ চাইলেন। কিন্তু তখনকার দিনি বিবাহবিচ্ছেদের কথা উচ্চারণ করা, এমনকি মনে স্থান দেওয়া পর্যন্ত পাপ। আইনের অধিকার তো নেইই।
এমন সময় মিল্টন বিবিহ বিচ্ছেদের প্রয়োজনীয় তা তুলে ধরে একটা প্যামফ্লেট লেখেন। সেই সময় ইংল্যান্ডে চার্চের শাসন। চার্চের শাসন নিয়ে মিল্টনের সমালোচনা ছিল। ১৬৪১ সালে তা নিয়ে লেখালেখি করেছেন। তারপর বিবাহবিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে উঠলে তার অধিকার এর সপক্ষে তিনি একটা প্যামফ্লেট লেখেন। এটাকেই রাষ্ট্রীয় আইন সেন্সর করে। আইন বের করে লেখক কি লিখছেন, সেটা আগেভাগেই সরকারকে দেখিয়ে নিতে হবে। সরকার অনুমতি দিলে তবেই ছাপা যাবে।
অনসূয়া বললেন, বাপ্ রে, এ যে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা!
শ্যামলী বলল, সেই কণ্ঠরোধের সরকারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি কথা বললেন অ্যারিওপ্যাগিটিকা বইতে। চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ে অসামান্য একটা বই। মিল্টনের প্রতিবাদের চাপে সীমিত ক্ষেত্রে ডিভোর্স করার অধিকার চার্চ দিল।
অনসূয়া বললেন, বুঝলাম। ডিভোর্স করার অধিকার এল। কিন্তু এর সাথে প্রসটিটিউশনের যোগাযোগ কোথায়?
শ্যামলী বলল, দিদি, আমাদের দেশে একটা কথা চলে, বিয়ে মানে জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক।
অনসূয়া বললেন, একান্ত পবিত্র সম্পর্ক।
শ্যামলী বলল, অথচ, কোভারচার তত্ত্ব অনুযায়ী একটা মেয়ের কোনো রকম আইনি অস্তিত্ব টুকুই নেই। সে পরিপূর্ণ অবরোধবাসিনী, অন্তরালবর্তিনী। তার সমস্ত ইচ্ছা চলা ফেরা স্বামীর কর্তৃত্বের অধীন। পৈতৃক পদবীটা পর্যন্ত লুপ্ত। স্বামীর ইচ্ছায় একটির পর একটি গর্ভধারণে সে অঙ্গীকারবদ্ধ। অ্যাবরশনের কোনো অধিকার নেই। ডিভোর্স পাবার অধিকার নেই। কেননা ম্যারেজেস আর মেড ইন হেভেন। এই ধারণাটাকে একটু আঘাত করলেন কবি মিল্টন। ম্যারেজেস আর মেড ইন হেভেন রইল না। স্বর্গ হইতে বিদায়। প্যারাডাইস লস্ট।
বাইরে তখন আবছা আলো ফুটে উঠছে। ঊষার ও আগে। দু একটা কাক আধোস্বরে ডেকে উঠল।