আজ বিশ্ব নৃত্য দিবস
নাচ। সে যেন একটা অপূর্ব সুন্দর জিনিস। আমি ময়ূরের নাচ দেখেছি। ডলফিনের কায়দাকেতা জানি। মণিপুরি হরিণছানার নাচও দেখেছি। কিন্তু মানুষের নাচ? সে যেন অন্য মাত্রার জিনিস। হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্সের দেহছন্দে, সৌষম্যে এমনকিছু আছে যা নাচের মধ্য দিয়ে একটা ভাষার মতো বিকশিত হয়েছে। আর এ ভাষার চারিত্র্য আন্তর্জাতিক।
আমাদের হিন্দু পুরাণে নটরাজের কথা আছে। তাঁর এক পায়ের ধাক্কায় জগৎজীবন উছলে ওঠে, আরেকটি পায়ের ধাক্কায় সকলি লুপ্ত হয়। সারা পৃথিবীর কোণায় কোণায় নাচ স্থানীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিকশিত হয়েছে, তবুও তার মধ্যে আন্তর্জাতিক সুরটি ধরা আছে, কেননা আসলে তা হোমো সেপিয়েন্সের সৃষ্টি। সারা পৃথিবীর নানা জায়গায় নাচ নিয়ে উৎসব হয়। বা উৎসবের প্রধান অঙ্গ হয় নাচ। সালসা, হুলা হুলা, সাম্বা, ট্যাঙ্গো নাচে পৃথিবী মেতে ওঠে।
বয়স যখন পাঁচ
উদয় দাদার মতো আমি
ফেলব শিখে নাচ।
উদয়শঙ্কর ছিলেন প্রতিভাবান নৃত্যগুরু। শুধু নৃত্যশিল্পী বললে যথেষ্ট কম বলা হয়। নাচে ভারতীয়দের প্রতিভা ছিল। ভারতের ধ্রুপদী নৃত্যের পাশাপাশি লোকায়ত নৃত্যের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু উদয়শঙ্কর সমস্ত ধারাকে আত্মস্থ করে নিজের ঘরাণার জন্ম দিয়েছেন। তাঁর পর তাঁর স্ত্রী অমলাশঙ্কর, পুত্রবধূ তনুশ্রী শঙ্কর ও কন্যা মমতা শঙ্কর তাঁর নৃত্যভাবনাকে সঞ্জীবিত রেখেছেন। সিমকিকেও ভুলব না।
আমাদের কলেজের ছাত্র সংসদের অনুষ্ঠানে তনুশ্রী শঙ্কর এসেছিলেন। কলেজের ছাত্রদের তরফে শিল্পীর সহযোগিতা করার টিমের একজন ছিলাম আমি। আর আগন্তুক ফিল্ম দেখে আদিবাসী মেয়েদের সাথে মমতা শঙ্করের সমবেত নৃত্য আমার ভাল লেগেছিল।
উপরের ছড়াটা মা জ্যেঠিমার মুখে শুনেছিলাম। বয়স তখনো পাঁচ পূরণ হয়নি নিশ্চয়ই। শিশুর আসল শিক্ষা হয় বাড়িতে, মা জ্যেঠিমার কাছে।
কত্থক, ভরত নাট্যম, ওড়িশি, কুচিপুড়ি, কথাকলি, মণিপুরী এইসব ধ্রুপদী নৃত্যকলার পাশাপাশি বিহু, গরবা, ভাঙড়া, ছৌ, সরাইকেলা, বাউল নৃত্য ও রায়বেঁশে, ইত্যাদি নানাবিধ নৃত্যভাবনার সাথে পরিচয় ঘটে ছিল কৈশোরেই। নাচের মুদ্রাগুলির প্রতিটির যে নাম আছে তা শিখলাম এনসাইক্লোপিডিয়া ঘেঁটে। অভয় মুদ্রা, বরদান মুদ্রা জানলাম। নৃত্য থেকে দুটি শব্দ তৈরি হয়েছে। নাচ আর নাট। আমাদের ভারতীয় নৃত্যভাবনার সেরা শিল্পী শিবঠাকুর। তিনি নটরাজ। তাঁর নৃত্যরত পায়ের নিচে অশুভের বিনাশ। তাঁর পদছন্দে বিশ্ব গড়ে ওঠে ও বিনষ্ট হয়। দেবতার সুরলোকে ইন্দ্রের সভায় উর্বশী ঘৃতাচীর নাচ দেখতেন সকলে। নাচের ছন্দে ভুল হলে অভিশপ্ত হতেন শিল্পীরা। জন্মাতেন মর্ত্যলোকে। পুরাণে ঊষা অনিরুদ্ধের গল্প ছিল। মঙ্গলকাব্যে লখীন্দর ও বেহুলার কথা ছিল। চর্যাগাথায় দেবী নাচছেন, বজ্রসত্ত্ব গাইছেন, এই ছবি পেয়েছি। নাচকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের মাটিতে মর্যাদার আসনে বসালেন। তার আগে নাচ ছিল পতিতা দেহোপজীবিনীর পেশা। বাংলা নাটক ও সিনেমার আদিপর্বে এঁরাই মনোরঞ্জনের দায়িত্ব নিতেন। নটী শব্দে বাঙালি তাঁদের চিনেছে। এঁদের অন্য পেশাকে ভুলতে পারে নি ভদ্রলোক বাঙালি। শরৎসাহিত্যে পল্লী সমাজে নটী খানকী শব্দযুগ্ম পেয়েছি। বাউলের নাচকে কবিতায় সম্মান দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসের মেয়েটি নাচতে নাচতে অগ্নিতে পোশাক সমর্পণ করে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে বাজিগরের ঘরের মেয়ে পুলিশের শখ মেটাতে নগ্ননৃত্য পরিবেশন করে পুলিশের গোপন খবর আদায় করে জায়গামতো পৌঁছে দেয়। মাতাহারিকে মনে পড়িয়ে দেয়। আর জীবনানন্দের কবিতায় বাংলাদেশের নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুর হয়ে কেঁদে ওঠে স্বামীহারা বেহুলার পায়ে। ছিন্ন খঞ্জনার সাথে অপূর্ব তুলনা সেই নৃত্যরতা কান্না সুন্দরীর।