দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২০৫)

পর্ব – ২০৫

জোয়ানের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল রুয়েঁতে। ফ্রান্সের যে অংশটা ইংল‍্যাণ্ড দখল করে নিয়েছিল, সেই অংশের শাসনকেন্দ্র ছিল রুয়েঁ। ১৪৩১ সালের জানুয়ারির নয় তারিখে বিচার শুরু হল। সে যুগে ছিল ইনকুইজিশন। সে ছিল চার্চের পরিচালনায় আদালত। জোয়ানের বিরুদ্ধে হেরেসির অভিযোগ আনা হয়েছিল। হেরেসি মানে সংখ‍্যাগরিষ্ঠের ধর্মভাবনার পদ্ধতিতে আস্থা না রাখা। তুমি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে না হলে, যদি তোমার একটা নিজস্ব জীবনভাবনা র‌ইল, তো বুঝবে ঠেলা। গাঁয়ের মেয়ে জোয়ানের সেই দশা হল। ফ্রান্সের ডমরেমি গাঁয়ের চাষার বেটি জোয়ান। চাষার ঘরে পড়াশুনার চল চিরকালই কম। উইলিয়াম ফেরেলের পরিবার তাকে পড়তে উৎসাহ দিত না। বলত, বেটা, চাষের কাজ কর্।  বেটা কথার মানেটাই হল বিনা মাইনের মজুর! ফেরেলের বাপ মা তাকে  বলতেন, যখন প্রচণ্ড শীত পড়বে, বাইরে বেরোনোর গতিক থাকবে না, তখন পড়বি। আইজ‍্যাক নিউটনের মা চেয়েছিলেন, তাঁর ছেলেটা চাষবাস নিয়ে থাকুক। ছেলেদের‌ই যখন এই, তখন মেয়েদের আর কি হবে?
 তবু মাঝে মাঝে কারো কারো মাথায় উৎপটাং ভাবনা চেপে বসে। দুষ্ট সরস্বতী ভর করে। দিদিকে মাঝে মাঝেই পাত্রের বাড়ি থেকে দেখতে আসত। দিদি মায়ের কাছে রাগ করত। আমি পড়ব, না সেজেগুজে ইন্টারভিউ দিতে বসব! মা গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে বোঝাত। বাবা দিদিকে দেখতে আসার দিনে রকমারি খাবার আনাতেন। কতরকম যে ফল! গরমের দিনে লিচু, গোলাপজাম। তরমুজ নিংড়ে শরবৎ। শীতের দিনে ভাল কমলালেবু কোয়া ছাড়িয়ে ফুলের মতো করে সাজিয়ে দিত পিসি। আর কতরকম মিষ্টি। দিদি রাগ করত। এত এত খাওয়ানোর কোনো মানে হয়? আগে দুপক্ষের পছন্দ হোক, তারপর না হয় পেট পুরে খাইও।
মা বলত, তা কি হয় রে মা? তোর বাপের মান সম্মান আছে না?
পাত্রপক্ষের তরফে যাঁরা আসতেন, তাঁদের সাথে মেয়েরা থাকলে, তাঁরা বাড়ি ঘরদোর ঘুরে দেখতেন। মেয়ের বাপের বাড়ির রান্নাঘর কেমন, বাসনকোসন কেমন, আলনায় জামাকাপড় কেমন করে রাখা থাকে, বিছানাপত্র কেমন! যেদিন মেয়ে দেখতে আসার কথা থাকত,  মা তটস্থ হয়ে থাকতেন। বাবা হাসতেন। তনুশ্রীর চেহারা যা, কেউ অরাজি হবার কথা ভাবতেই পারবে না। বরং আমি ভাবব, তাদের ঘরে মেয়ে দেব কি না। মা বাবাকে ঝাঁজিয়ে উঠত, মেয়ের বাপের অত গরমাই ভাল নয়। একটু নিনু হয়ে থাকতে হয়। দিদি রাগে গরগর করত। মা, তোমার গেঁয়ো ভাষা এবার বাদ দাও দেখি! ভাল বাসনে খেতে দিতে শিখলেই হয় না। মুখের ভাষাটাকেও পালিশ করতে হয়। বাবা হাসত। বলত, তোর মাকে যখন বিয়ে করেছিলাম, আমিও গেঁয়ো ভূত ছিলাম। বিয়ের পরেও একসাথে সিনেমা দেখার সাহস পর্যন্ত করতে পারি নি। হাসতে হাসতে আরো বলত, বিয়ের পর পরই বাচ্চা। ফ‍্যামিলি প্ল‍্যানিং কি জিনিস সেটাও আমরা জানতাম না। ওরে বড়মণি, মায়ের কাছে এসব জেনে নিস্ কিন্তু। মা বাবাকে দাঁত খিঁচোতেন। মেয়েদের সাথে কি করে কথা বলতে হয় শিখলে না এখনো। মুখের একটা লাগাম নেই তোমার। বাবা আরো হাসতেন। বলতেন একটা সংস্কৃত শ্লোক আছে, ষোলো বছরেরটি হলে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বন্ধুর মতো করে মিশতে হয়। দিদি বলত, প্রাপ্তে তু ষোড়শবর্ষে পুত্রমিত্রবদাচরেৎ।
শ‍্যামলীর সেই চাণক‍্য শ্লোকটি মনে পড়ে। লালয়েৎ পঞ্চবর্ষাণি/ দশবর্ষাণি তাড়য়েৎ/ প্রাপ্তেতু ষোড়শেবর্ষে/পুত্রং মিত্রবদাচরেৎ।
বাবা বলতেন, ছেলে আর মেয়ে এক‌ই জিনিস। সামান্য এদিক ওদিক। মা বলত, না, মেয়েরা অন‍্যের ঘরে চলে যাবে। তাদের আদর বেশি। বাবা শুনে হাসতেন। কিন্তু বাবা তাকে কোনোদিন মারেন নি। তাই পরশু সকালে যখন সবিতা পিসি চলে যাবার সময় বাবা রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞানশূন‍্য হয়ে তাকে বলে বসলেন, জুতোর বাড়ি মেরে মুখ ভেঙে দেব, ভীষণ কান্না পেয়েছিল তার। বাবা যদি ছোটবেলায় দুচারবার মারধোর করে থাকত, তাহলে এত কষ্ট হত না শ‍্যামলীর। যে বাবা কোনোদিন মারে নি, যে বাবা শেখাত, এই দ‍্যাখ্ একে বলে ফিক্সড ডিপোজিট সার্টিফিকেট। আর এটা রেকারিং ডিপোজিট। ডিপোজিট মানে… বাবার কোলের কাছে বসে সে বলত, জমা দেওয়া। বাবা বলতেন ফিক্সড মানে.. শ‍্যামলী বলত স্থায়ী।  অন্তু বাবার কথায় কান দিত না। কেবল ক‍্যারমের ঘুঁটি দিয়ে কলাগাছ বানাত। বাবা তাকে একটু আদর করে, অন্তুর দিকে তাকিয়ে বলতেন, এই বাঁদরটার কিচ্ছু হবে না। মা রাগ করতেন বলতেন, বাঁদর বলতে নেই। তাতে বাচ্চাদের বাড় কমে যায়। বাবা বলতেন, তোমার কথায় কোনো যুক্তি নেই।  বাঁদর বললেই বাড় কমে যাবে কেন? শ‍্যামলী তখন ভাবত, যা কিছু বলতে হবে, যুক্তি দিয়ে বুঝে তারপর বলতে হবে।
জোয়ানকে বিচারশালায় তোলা হলে সে ওই যুক্তির কথা তুলল। সে বলল, আপনারা ধর্মীয় বিচারকগণ দেখছি কেবল ইংল‍্যাণ্ড আর বার্গাণ্ডির লোকজন। ফ্রান্সের কোনো ধর্মনেতা আপনাদের মধ‍্যে নেই কেন? তেমন লোকেদের ডেকে পাঠান! বিচারকদের একটা ভারসাম‍্যপূর্ণ বেঞ্চ হোক!
বিচারের মধ‍্যে আরো গোলমাল ছিল। প্রথমতঃ চার্চের আইন, যাকে এক্লাসিয়াসটিক‍্যাল ল বলা হত, তাতে প্রধান বিচারকদের এলাকা ভাগ করা থাকত। জোয়ানের ক্ষেত্রে যিনি বিশপ অর্থাৎ প্রধান বিচারকের কাজ করলেন, ওই এলাকাটি তাঁর বিচারের আওতাতেই পড়ে না। জোয়ানের বিরুদ্ধে বিচারের নামে যে যাত্রাপালা সাজানো হয়েছিল, তাতে পয়সা ঢেলেছিল ইংরেজরা।  আর ইংরেজরা নিজেদের তাঁবেদার এক বিশপকে বিচার প্রক্রিয়ার মাথায় বসিয়ে নিয়েছিল।
জোয়ানের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়ার গোড়ায় আরো একটা গুরুতর গলদ ছিল। কারো বিরুদ্ধে ইনকুইজিশনের মামলা আনতে গেলে তার কাজ যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, বা সংখ‍্যাগরিষ্ঠের  ধর্মীয় ভাবধারার পরিপন্থী, তা যথেষ্ট প্রমাণ সহকারে দেখাতে হয়। চার্চের তরফে যে ধর্মীয় আইনজীবীর উপরে এই মামলা দাঁড় করাবার জন‍্য প্রাথমিক প্রমাণ খুঁজে বের করার দায়িত্ব ছিল, সেই নিকোলাস বেইলি জোয়ানের বিরুদ্ধে বলার মতো কোনো প্রমাণ খুঁজে পান নি।
 কোনো প্রাথমিক প্রমাণ ছাড়াই স্রেফ গায়ের জোরে, ন‍্যক্কারজনক ভাবে নিজেদের গড়া  এক্লাসিয়াসটিক‍্যাল আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জোয়ানের বিরুদ্ধে মামলা চালু করে দিল চার্চ।
চার্চের আর‌ও একটা জঘন‍্য ত্রুটি ছিল। আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন‍্য জোয়ানকে কোনো আইনজীবীর সাহায্য নিতে অনুমতি দেয় নি চার্চ।
অথচ জোয়ান, মাত্র ঊনিশ বছর বয়সের চাষির বেটি জোয়ান, নিজে নিজে মাথা খাটিয়ে একটা ভয়ঙ্কর একচোখো গুণ্ডামির বিরুদ্ধে কথা বলে গিয়েছে। ভয়ে কুঁকড়ে যায় নি। মনের স্থৈর্য হারায় নি। সে দেশকে বাঁচাতে চেয়েছিল। বিচারশালায় অন‍্যায় আক্রমণের হাত থেকেও বাঁচতে চেয়েছিল। এই বাঁচতে চেষ্টা করাটা একটা বড় সদগুণ।
অন‍্যায়ের বিরুদ্ধে শ‍্যামলী কথা বলতে শিখেছিল বাবার কাছে। দিদিকে একদিন একজনেরা দেখতে এসেছে। মা দিদিকে পিটিয়ে চোখের জল বের করে দিয়ে সিল্কের ভারি শাড়ি পরতে বাধ‍্য করেছেন। ভারি শাড়ি সামলাতে জবুথবু হয়ে বসে দিদি ইন্টারভিউ দিচ্ছে। তারপর সে বাড়ির লোকেরা পালবাড়ির ঘরদোর ঘুরে ঘুরে দেখছেন। বাবা বলছেন, খেটেখুটে নিজের হাতে বাড়ি বানিয়েছি। সবকিছু আগে থেকে প্ল‍্যান করে ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে বাড়ি বানাইনি। নিজেই ইঞ্জিনিয়ার, নিজেই আর্কিটেক্ট! বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হাসছেন। শ‍্যামলী অবধারিত ভাবে জানত, তাদের পড়ার ঘরেও অভ‍্যাগতরা ঢুকে পড়বেন। সে নিজেকে আড়ালে লুকিয়ে রাখার জন্য খাটের পায়ার কাছে খাতা নিয়ে অঙ্ক কষছিল। তাকে দেখে সেই বাড়ির লোকজনের পছন্দ হয়ে যায়। তারা বাবাকে সে কথা বললে, বাবা বলেছিল, ও এখনো বাচ্চা মেয়ে। এখনো আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দেয়। আগে বড়ো হোক। তারপর।
তাঁরা বলেছিলেন, মেয়ে কিন্তু হাতে পায়ে বেশ লম্বা হয়ে গেছে।
বাবা বললেন, ওর কথা থাক। ওকে তো আমি দেখাইনি।
বাবার গলায় একটু বিরক্তির আভাস তাঁরা টের পেয়ে চলে যান। মা তখন বাবাকে ঝামরে উঠে বলেছিলেন, তুমি একটা মেয়ের বাবা সেটা মনে রেখো। অতো দেমাকি কথাবার্তা ভাল নয়। মেয়ের বিয়ে দিতে হবে না তোমাকে?
বাবা বলেছিলেন, মেয়ের বাপ ফ‍্যালনা জীব বলে আমি মনে করি না। ছোটমণি পড়াশুনায় অত ভাল। মাধ‍্যমিকের রেজাল্ট দেখলে লোকের চোখ টেরিয়ে যাবে। ও মেয়ে তো আমার বোঝা নয়, যে যার তার হাতে উচ্ছুগ‍্যু করে দিতে হবে! ও মেয়ে নিজেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে নেবে।
তখন মা বলেছিলেন, মেয়ে তোমাকে কবে না কবে জড়িয়ে আদর করেছে, সেই কথাটা হাটের মাঝখানে ঢাক পিটিয়ে না বললে চলছিল না তোমার? মেয়ে হয়ে ছোটমণি এখনো বাবাকে জড়িয়ে ধরে আদর খায়, একথাটা লোকে কিভাবে নেবে তুমি জান?
বাবা বলেছিলেন, আমি শশাঙ্ক পাল। সেল্ফ মেড ম‍্যান। কারো ধার ধারি না। ছোটো একটা মেয়ে বাপকে আদর করে, এটা শুনে যাদের মাথায় নোংরামি খেলে, তাদের ঘরে আমি মেয়ে দেব‌ই না।
বাসন্তীবালা বললেন তারা তোমার মেয়েকে পছন্দ করলে, তুমি কি করে বাধা দেবে?
তড়পে উঠে বাবা বলেছিলেন, বাপ মেয়ের মধ‍্যে নোংরা সম্পর্ক যারা সন্দেহ করে, তেমন ছোটলোকের ঘরে আমি মেয়েদের বিয়ে দেব না।
দুই বোন অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল, সত‍্যিই তো, মা যদি ছেলেদের পরীক্ষা দিতে যাবার সময় চুমু খেয়ে আদর করে পাঠাতে পারেন, বাবারা কি দোষ করলেন!
বাসন্তীবালা বলেছিলেন, তবুও সমাজ বলে একটা জিনিস আছে।
বাবা আর কথা বাড়াতে চাননি।
শ‍্যামলী ভাবে, আমার সেই আপরাইট বাবা কেমন ন‍্যাতাজোবড়া হয়ে গেল! হু হু করে কান্না এসে গেল তার। বাবা তুমি তো আমায় বন্ধুর মতো করে খুলে বলতে পারতে সবকিছু! এত বোকামি কেউ করে?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।