খাওয়ার পর অনসূয়া প্রস্তাব করলেন, শ্যামলী চ, লাইব্রেরি রুমে গিয়ে একটু গল্প করি।
শ্যামলী বলল, এই তো এখানেই জমে উঠেছি।
কাজের সহায়িকা ঠেলে ঠুলে তাদের সরালো। বলল, কাল সকালে উঠেই আমার অনেক কাজ আছে না? যাও শুয়ে পড়ো সবাই।
অনসূয়া শ্যামলীর দিকে চেয়ে বলল, ওও বলল, আর আমিও শুনলাম। ও নিজের ঘরে শুতে যাবার আগে আমাকে মশারির ভিতর ঢুকিয়ে, নাইট ল্যাম্প জ্বেলে চলে যায়। আমি মটকা মেরে পড়ে থাকি। তার পর উঠে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে পড়তে বসি।
শ্যামলী বলল, কি বই পড়েন দিদি?
অনসূয়া বললেন এআইআর পড়ি। সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলো যত্ন করে পড়তে হয়। সুপ্রিম কোর্টের রায় মানে জানিস তো, আইন। ভারতের সমস্ত কোর্টকে সুপ্রিম কোর্টের রায় মানতেই হবে।
শ্যামলী বলল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের প্রশ্ন কবিতায় ওই যে বললেন, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে, ওই নিয়ে আপনার বক্তব্য কি?
শ্যামলী মগ্ন স্বরে বলল, হ্যাঁ। মন দিয়ে পড়েছি। আচ্ছা দিদি, বঙ্কিমচন্দ্র নিজে সেকালের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে দেশের আদালতী ব্যবস্থাকে সার্কাসের সঙ্গে তুল্যমূল্য করে দেখিয়েছেন।
অনসূয়া বললেন, বঙ্কিমচন্দ্রের যুগে কিন্তু ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটদের সিআরপিসি আইপিসিতে বিশাল ভূমিকা। এখন কার মতো একজিকিউটিভ আর জুডিশিয়াল এইসব কমপার্টমেন্টালাইজেশন তখনো হয় নি। সেইসব দিনে উনি ওইরকম একটা কথা বললেন।
শ্যামলী বলল, দিদি, আমার প্রশ্নটা কিন্তু খুব সোজা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যা বলছেন, সেটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন।
অনসূয়া বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পিরিলি বামুন। আর বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের মতো চাটগাঁইয়া। আমি কোন্ দিকে যাব, সেটা কি এর পরেও বলে দিতে হবে?
শ্যামলী মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলল, না দিদি, কথার জাগলারি নয়, ভিতরকথা কিছু বলুন।
অনসূয়া বললেন, নিজে আদালতে করে খাই। বাবা জ্যাঠা দাদাদের অনেকেই জজ আর উকিল। ভিতরের কথা বলি কোন্ মুখে?
শ্যামলী বলল, আচ্ছা, ওই যে দুই বিঘা জমি কবিতায় উপেনের জবানিতে রবিঠাকুর বলছেন, “করিল ডিক্রি, সকলি বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে”, কিংবা একটা গল্পে মোহিতচন্দ্র নামে একজন বিচারপতিকে দেখান, এক অল্পবয়সী বিধবা মেয়েকে তিনি কি করেছেন, যেন বলতে চান, বিচারপতি তোমার নিজের বিচার করো, এ নিয়ে আপনার কি বক্তব্য?
অনসূয়া বললেন, তুই এই যে প্রশ্নগুলো করছিস, এগুলোকে বলে লিডিং কোশ্চেন। এই প্রশ্নের মধ্যেই চড়াদাগে উত্তর বলে দিতে চাওয়া হয়েছে। উত্তর দাতার জন্য বিশেষ কোনো স্পেস রাখা নেই। তাই এই প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না।
শ্যামলী বলল, ইংরেজ যে চলে গেল, সেই স্মরণে পনেরোই আগস্ট আমরা যে অনুষ্ঠানটা করে থাকি, তাকে বলি ইণ্ডিপেণ্ডেন্স ডে। লিবার্টি ডে বা ডে অফ ফ্রীডম তো বলি না। বাঙালি আবেগপ্রবণ জাত বলে স্বাধীনতা দিবস বলে। হিন্দি অনেক সমৃদ্ধ ভাষা। ওরা বলে স্বতন্ত্রতা দিবস। আমাদের শাসকের জামা বদলেছে, রঙ ঢঙ বদলেছে, চরিত্রের দিকটা একই আছে। রুনু গুহনিয়োগীদের আদর আজও অমলিন।
অনসূয়া বললেন, আমি দায়িত্বশীল আইনজীবী হিসেবে একটা কথাই বলব, সেটা হল, আমাদের দেশে একটা লিখিত সংবিধান রয়েছে, এবং সেটা
শ্যামলী জুড়ে দিল, সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংবিধান,
অনসূয়া বললেন, সেখানে একনায়কতন্ত্র রুখতে ক্ষমতার সুনিপুণ বিন্যাস করা আছে,
শ্যামলী জুড়ে দিল, পৃথিবীর নানা দেশের সংবিধান থেকে খুশি মতো পালক কুড়িয়ে আমাদের সংবিধানে সেঁটে তাকে কিম্ভুত কিমাকার বানিয়ে রেখেছি,
তারপর দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল। শ্যামলীর পিঠে আলতোভাবে একটা চাপড় মেরে অনসূয়া বললেন, আড্ডাটা জমেছে ভাল। দাঁড়া ছোট্ট একটা নেচার্স কল সেরেই আসছি।