বাংলা সাহিত্যে বৈধব্যের যন্ত্রণা ও মুক্তি।
বিধবা বিবাহ প্রচলন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম। বলেছেন প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ বিদ্যাসাগর।
নিজের চোখে বাল্যবিধবার উপর আচারের নামে নির্যাতন সেকালে অনেকেই দেখেছেন। নির্জলা একাদশীর উপরে নিত্য নানাবিধ বারব্রত এবং অন্তর্বাসহীন থান কাপড় পরাবার ব্যবস্থা করে আসলে ওই বালিকা, কিশোরী বা তরুণীর চলাফেরা করার অধিকারকে দমন করত সমাজ। আর শুভ অনুষ্ঠানে ব্রাত্য করে রেখে অল্পবয়সী মেয়েদের মনটাকে মেরে ফেলতে চাইত সমাজ।
কিন্তু নিজের ঔরসজাত কন্যা সন্তানকে নির্জলা উপবাসে রেখে শিক্ষিত ভদ্রলোক বাপ দু বেলা নিজের জন্য চর্ব্য চোষ্যের আয়োজন করাচ্ছেন ওই উপবাসী মেয়ে মঞ্জুলিকাকে দিয়ে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় এ কথা পড়ে হাত যেন নিশপিশ করে উঠেছিল। চোখের বালির বিনোদিনী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বিধবা হলেই একটা সুস্থ সবল বুদ্ধিমান তরুণী মেয়ের স্বাভাবিক শরীরী আকুতি শেষ হয়ে যায় না। চতুরঙ্গের দামিনী দেখিয়ে দিল যুবতী বউটা স্বামীর কাছে নেহাতই একটা সম্পত্তি। দর দালান খাট আলমারির সাথে একটা রক্ত মাংসের বউকেও লীলানন্দ স্বামীর মতো গুরুর ভোগের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিল নিষ্ঠাবান হিন্দু শিবতোষ।
শরৎচন্দ্র এসে দেখিয়ে দিলেন পরিবারের ভিতরে থেকে শুধু ভাত কাপড়ের কষ্টে ভুগত না একটা তরুণী বিধবা। দিনের বেলা যে মেয়েটিকে থান পরিয়ে উপবাসী রেখে বার ব্রত করিয়ে দেবী বানাত সনাতনী হিন্দু সমাজ, রাতে তাকেই শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে পেতে চাইত পরিবারের সমর্থ পুরুষেরা।
মেয়েদের শরীর যে আসলে ভোগের বস্তু, সনাতনী হিন্দু পুরুষ তা মুখে স্বীকার না করলেও ঘরের ঘেরাটোপে তা করে দেখাতে অভ্যস্ত ছিল। সেই গোপন যৌনমিলনে বাড়ির সমর্থ বিধবা গর্ভবতী হয়ে পড়লে গর্ভপাতের ব্যবস্থা করতে হত। লুকিয়ে চুরিয়ে অশিক্ষিত দাইয়ের হাতে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে গর্ভপাত করাতে গিয়ে মারা পড়ত অনেক হিন্দু বিধবা। অথবা ভয়াবহ সংক্রমণ হয়ে সারা জীবন কষ্ট পেত। শরৎসাহিত্য খুঁটিয়ে পড়লে এইসব টের পেয়েছি।
অনেক পরে জানলাম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তারুণ্যের দিনগুলিতে সনাতনী হিন্দু ভদ্রলোকের বাড়িতে যৌনশোষণ, যৌন নির্যাতনের ঘটনা এড়াতে অনেক তরুণী যুবতী বিধবা মেয়ে গৃহত্যাগ করে যৌনকর্মীর জীবন বেছে নিত। বিদ্যাসাগর মশায় সার্ভে করে দেখিয়ে দিলেন শুধুমাত্র কলকাতা শহরেই যৌনপল্লীতে আশ্রয় নিয়েছিল সাড়ে বারো হাজার হিন্দু বিধবা।
বিদ্যাসাগর মহাশয় দেখিয়েছিলেন যে বাল্যকালে বিধবা হয়ে বহু তরুণী মেয়ে নিজের শ্বশুর বাড়ির আপনজনদের হাতে নিয়মিত যৌন লাঞ্ছিত হচ্ছে। তাদের লোভের গ্রাস থেকে বাঁচতে বহু মেয়ে যৌন কর্মীর জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বিদ্যাসাগর শুধু মুখে একথা বলেন নি। তিনি সার্ভে বা ক্ষেত্রসমীক্ষা করে দেখিয়ে ছিলেন সে দিনের কলকাতা শহরে প্রায় সাড়ে বারোহাজার মেয়ে, যারা উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিবারের বিধবা, তারা যৌন পেশায় আসতে বাধ্য হয়েছে, নেহাত শ্বশুর ভাশুরের কুৎসিত সম্পর্ক এড়াতে।
সার্ভে। অর্থাৎ ক্ষেত্রসমীক্ষা। ঘরে ঘরে গিয়ে সংগ্রহ করে আনা পাথুরে তথ্য। বাস্তববাদী, বিজ্ঞানমনস্ক ব্রিটিশ সরকার তরুণ তেজস্বী পণ্ডিতের সার্ভেজাত তথ্যকে অগ্রাহ্য করতে সাহস করে নি।
বিধবার বিবাহ দেওয়াই ছিল হিন্দু ভদ্রলোকের যৌনপল্লীতে গিয়ে যৌনতা কেনার অ্যান্টিডোট। সেটা বাস্তবমনস্ক ব্রিটিশ সরকারের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শ্লোক নয়, সার্ভে। এই সার্ভে ব্রিটিশের চোখ খুলে দেয়।
যদিও রক্ষণশীলেরা যথারীতি লাগাতার বিরোধিতায় ব্যস্ত ছিলেন। যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক বিদ্যাসাগর সার্ভের ফলাফল দেখিয়ে সরকারকে আইন প্রণয়নে বাধ্য করেন। ১৮৫৬ সালে ২৬ জুলাই তারিখে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রবল আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার বিধবা বিবাহ আইন চালু করেন।
সেই সময় লর্ড ক্যানিং ছিলেন ভারতের ব্রিটিশ গভর্নর।
বিদ্যাসাগর উপাধিটি ওঁর ঊনিশ বছর বয়সে পড়াশুনা করে পাওয়া। ঊনিশ মানে কৈশোর পুরো পার করেন নি তখনো। পরে যখন বিধবা বিবাহ নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলছেন, তখন গ্রন্থকীট পণ্ডিতদের বাগ মানাতে “পরাশর সংহিতা” থেকে এই শ্লোকটি উদ্ধৃত করে দেখালেন –
“নষ্টে মৃতে প্রবজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ
পঞ্চস্বাপৎসু নারীণাং পতিরন্য বিধীয়তে।”
কিন্তু পণ্ডিতরা কি এতই বোকা যে বীরসিংহ গ্রামের লোকটা বইয়ের পাতা খুলে দেখাবেন, আর বুঝে যাবেন? দেশাচার বলে একটা ব্যাপার আছে না?
পণ্ডিতরা পুঁথি পড়েছেন রুটি রুজির দায়ে। শিক্ষার আলোয় স্নাত শুদ্ধ মালিন্যমুক্ত হতে নয়।
পণ্ডিতদের পুঁথি দেখিয়েও সামাজিক সমর্থন সে ভাবে না পাওয়ায়, তিনি যুক্তি আর হৃদয়বত্তার কাছেও আবেদন করেন। তিনি বলেন বিধবা হওয়া মাত্র নারীরা দেবী হয়ে যান না, তাঁরা রক্তমাংসের মানুষই থাকেন। অর্থাৎ ঈশ্বর বলতে চাইছেন, স্বাভাবিক মানবিক যৌন আগ্রহ তাঁদের থেকে যায়। এই যে জৈবিক চাহিদাকে গণনার মধ্যে আনা, এটা যুক্তির কাছে তাঁর আবেদন।
মনে রাখা দরকার যে ইংরেজ শাসক নিজের দেশে যথেষ্ট প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করলেও, ভারতে ইংরেজ প্রশাসনের ভূমিকা ছিল রক্ষণশীলতার সমর্থন করা। যে সকল পদক্ষেপ মানবচিত্তের উন্মেষ ঘটায়, সেই গুণগুলি যাতে ভারতীয়দের মধ্যে কোনোমতে বিকশিত হতে না পারে, সে ব্যাপারে ইংরেজ প্রশাসন শ্রেণীগত ভাবে সতর্ক ছিলেন।
সেই কারণে প্রগতির বিপক্ষের শক্তিকে নানা ভাবে রসদ যুগিয়ে গিয়েছিল ইংরেজ। সতীদাহ, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ এগুলির বিরুদ্ধে জনমত গড়তে গিয়ে রামমোহন বিদ্যাসাগরকে প্রাণের ঝুঁকিও নিতে হয়েছিল।
প্রশাসনের কাছে তাঁরা “রত্ন” বলে বিবেচিত হন নি। তাঁরা সে ব্যাপারে লালায়িতও ছিলেন না।
দেবী চৌধুরাণী হয়ে ওঠা প্রফুল্লর বিধবা মাকে খুব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে বিনোদিনী, আর দামিনীকে। সোহিনীকেও।
একটু উঁকি দিয়েই টুক করে চলে গেল সোহিনী, বাঙালিবাবুর পঞ্জাবি বউ। প্রয়াত স্বামীর বন্ধু অধ্যাপকটিকে সে চুমু খাবে। যাতে তিনি তার স্বামীর বড়ো সাধের ল্যাবরেটরিটিকে বাঁচিয়ে রাখেন।
ওদিকে আরেকটা মেয়ে, কাদম্বিনী, ‘মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’। তার আগে তাকে কপাল ফাটিয়ে রক্ত বের করে দেখাতে হয়েছিল যে সেও একটা মানুষ। কদিন আগে ২৩ জুন তারিখটা ছিল “ইন্টারন্যাশনাল উইডো ডে”। ইউনাইটেড নেশনস ২০১০ থেকে এই দিন এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এক যে ছিল মা আর মেয়ে। ভারি গরিব। দিন যেন চলে না। মেয়ের নামটি প্রফুল্ল। মা ভালবেসে বলে পিপি। মা যখন মেয়েকে ডাকে, আর সাড়া পায় না, তখন বলে পিপি, ও পিপি, ও পোড়ার মুখী…
গরিবানার বড় জ্বালা। প্রফুল্লর মা কষ্ট হলেও বড় ঘরে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিধবা মানুষ। সব দিক সামলে উঠতে পারে নি। বরযাত্রীদের লুচি মণ্ডা হলেও প্রতিবেশীদের খাওন দাওন খুব ভালো হয় নি। চিঁড়া দইতে সারা হয়েছে। তো কুঁদুলে বাঙালি বামুনের দল একাকিনী অসহায়া বিধবার সেই অক্ষমতা ও অপারগতাকে অবহেলা বলে ধরে নিয়ে জাতের খোঁটা দিল। জাত নিয়ে সন্দেহ উঠলে কি আর হিঁদুর ঘরে ঠাঁই হয়? শ্বশুরবাড়ির ভাত খাওয়া বন্ধ হল সোমত্ত প্রফুল্লর। বাপের বাড়িতে ভারি অনটন। কোনোদিন নুন ভাত জোটে, কোনোদিন তাও না।
তারপর একদিন নিরুপায় হয়ে মাকে নিয়ে মেয়ে গেল শ্বশুরবাড়ি। নিজের ভাত কাপড়ের অধিকার অর্জন করবে। শ্বশুরের তরফে বাড়ির ত্যাজ্য বধূকে বলা হল ডাকাতি করে খেতে।
একা মেয়ে পড়ল ডাকাতের খপ্পরে। ভবানী পাঠকের কাছে গ্রাম্য মেয়ে প্রফুল্লর দেবী চৌধুরাণী হয়ে ওঠার গল্প বলেন বঙ্কিমচন্দ্র।
আমি মনে মনে ভাবি, প্রফুল্ল ও প্রফুল্ল, ক্যারাটে শেখো।
বিধবার সামাজিক অবস্থান বুঝতে বঙ্কিমের কথা বার বার মনে পড়ে। “চন্দ্রশেখর” উপন্যাসে সেই বিধবাটিকে মনে আছে। সে বলেছিল ” আমি আজাদের পক্ষে।”
আজাদের ? হ্যাঁ, ‘আজাদের’ মানে রাজাদের। রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুর। কলকাতার মান্যগণ্য রক্ষণশীল নেতৃত্ব। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর শিরোমণি।
গরিব অসহায় বিধবাও ভালো মতো জানে যে বাঙালি হিন্দু সমাজে বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টা হালে পানি পাবে না। জয় হবে সেই রক্ষণশীল গোষ্ঠীর। রাজা রাধাকান্ত দেব বাহাদুরদের। প্রশাসন স্থিতাবস্থার পক্ষে। স্থিতাবস্থা আসলে প্রতিক্রিয়াশীলতাকে সমর্থন করে। তাই প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে নবীন চিন্তাকে প্রতিষ্ঠা করতে বিস্তর রক্ত অশ্রু ও ঘাম ঝরাতে হয়। কে আর সাধ করে পরাজিতের পক্ষে গ্লানি হজম করে থাকতে চায়? জয়ের স্বাদ সকলেরই ভাল লাগে। তাই বিধবা মেয়েও বলেছে ” আমি আজাদের পক্ষে।” যুক্তি বুদ্ধি মানবিকতা দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখার মতো মানসিক কাঠামো ও মনন সম্পদ তার নেই। সেই বিধবা শুধু জানে কে জিতবে। সে এটুকু জানে, সর্বদা রাজারা জেতে। সেই ব্যক্তিজীবনে বঞ্চিত নিপীড়িত মেয়েও মনে মনে জয়ী দলের পক্ষে থেকে রক্তের স্বাদ নিতে চায়। তাই বৈধব্য সত্ত্বেও ও মেয়েটি বলে “আমি আজাদের পক্ষে”।
বিধবা নারীর দুঃখ কষ্ট নিয়ে এরপরেও কেউ লিখেছেন। কারো কারো মনে হয়েছে বিধবার বিয়েটি দিয়ে দিতে পারলেই খুব ভাল। দয়ার সাগর লক্ষ্য করেছিলেন বিধবা হওয়া মাত্রই একটি মেয়ে দেবীত্বে উপনীত হয় না। রক্ত মাংসের মানুষের খিদে ঘুমের মতো যৌনতার চাহিদা তার থমকে যায় না। সেই উপলব্ধি অতি বাস্তব। মেয়েটির যেমন যৌন চাহিদা থাকে, তার শরীরকে ভোগ করেছে অনেক পুরুষ, ছলে বলে, কৌশলে। প্রকৃতির অপার মহিমায় যৌন সংযোগের ফলে শুধুমাত্র মেয়েরাই গর্ভবতী হয়, পুরুষের যে কি হয়, বাইরে থেকে টেরটি পাবার জো নেই। বিদ্যাসাগরের যুগে মেয়েরা অবাঞ্ছিত গর্ভ এড়াতে অনেক সময়েই প্রাণ হারিয়েছে। শরৎচন্দ্র তাঁর উপন্যাসে এ নিয়ে আলোকপাত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিনোদিনী, দামিনী আর সোহিনী চরিত্রের মধ্য দিয়ে বিধবা নারীর যৌন টানাপোড়েনকে মানব মনস্তত্ত্বের অনেক গভীরে গিয়ে দেখেছেন।
একটা রক্ত মাংসের মানুষের বৈধব্য আর যৌনতার প্রশ্নকে নিয়ে ভাবিয়ে তোলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চোখের বালিতে হাজির করেন বিনোদিনীকে। সে একটি বিধবা মেয়ে। বিনোদিনীর কথা ভাবছিলাম, আর মনে পড়ছিল, আশা নামে বালিকাবধূর হয়ে মহেন্দ্রকে চিঠি লিখতে লিখতে বিনোদিনী তার উপোসি নারীসত্ত্বা আর নিজেকে সংগোপনে রাখতে পারে নি। আশার হয়ে লিখতে লিখতে সে নিজের নারীমনের সম্ভার তুলে ধরে একজন শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত পুরুষের কাছে। নিজের সামাজিক পরিচয়ে তো বিনোদিনী এই সুযোগটা পেতো না।
যুবক রবীন্দ্রনাথ পরম মমতায় আঁকেন বিনোদিনীকে। চোখের বালিতে। আশালতা নামে বালিকাটি স্বামী মহেন্দ্রকে চিঠি লিখতে চেয়ে বিনোদিনীর শরণাপন্ন হত। বিধবা মেয়েটি সেই ছলে নিজের রসবতী হৃদয়কে উন্মুক্ত করেছিল। বালিকা আশা যৌবনসমৃদ্ধ বিনোদিনীর মেধাবী ভাষার মারপ্যাঁচ বুঝতো না। কিন্তু মহেন্দ্র জানতো আশার চিঠির পিছনে মগজটি কার।
আশা তাকে লিখতে দিল চিঠি, আশা চাইলো দাম্পত্যের প্রেমমাখা শব্দসম্ভার, ঠাস বুনোট প্রণয় কথামালা। কিন্তু বিনোদিনীর কালি কলমের পিছনে তৃষ্ণার্ত মনটি নিজেকে আর বাক্সবন্দী করে রাখতে পারল না। আশার সাথে যখন তার হৃদ্যতা হয় নি, তখন স্বামীহারা বিনোদিনী ছিল এক রকম। সে সংসার কাজে পটু, সে হিসেবি, সে পরিচালনায় দক্ষ। এগুলোই ছিল বিধবা বিনোদিনীর সামাজিক পরিচয়। কিন্তু সে যে আসলে একটা রক্তমাংসের মানুষ, অকালবৈধব্য এর পর তারও যে যৌনতার খিদে থাকা খুব সম্ভব, সেটা বিনোদিনী যেন নিজেও আবিষ্কার করলো। আর আবিষ্কার করার পর বিনোদিনী মরিয়া। কেন সে পাবে না উপযুক্ত পুরুষসঙ্গ ? কেন, কোন অপরাধে সে পাবে না দাম্পত্যের স্বাদ? যদি সামাজিক পথে নাও হয়, তাহলেও সে আদায় করে নেবে সে স্বাদ। এমনই তীব্র খিদে প্রকাশ হতে থাকে সে মেয়ের নিজের কাছে। আশা তখন তার কাছে কেউ নয়। আশার দাম্পত্যের কি হবে, ভাবার দায় বিনোদিনী ভাবতে চায় না। একমুখী চেষ্টায় অন্ধভাবে ছুঁতে চায় একটি পুরুষ হৃদয়।
বিদ্যাসাগর মশায় যে ভেবেছিলেন, বিধবা হওয়া মাত্র একটি মেয়ে দেবী হয়ে ওঠে না, জীব বৈজ্ঞানিক প্রশ্নে, নৃতাত্বিক বৈশিষ্ট্য বিচারে সে গভীর সত্যের সাহিত্য রূপ আঁকলেন রবীন্দ্রনাথ, বিনোদিনীর ছবিতে।
একটি সমর্থ পুরুষ আর একটি রূপসী বিধবা, আর তাকে ঘিরে গসিপ নিয়ে গল্প করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চতুরঙ্গ উপন্যাসের কেন্দ্রে সেই যে দামিনী মেয়েটি। লীলানন্দ বৃত্তের মানসিক অত্যাচার থেকে যে প্রতিদিন নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে চলতো। লীলানন্দ এই দামিনী মেয়েটির স্বামী শিবতোষের ফেলে যাওয়া বাড়ি ঘর দোর আসবাব সহ স্থাবর অস্থাবর সব কিছুই দখল করেছিলেন। শুধু পারছিলেন না দামিনীকে হজম করে ফেলতে। না, হিন্দু সাধুজী ও গুরু মহারাজদের নারীলিপ্সা কোনোকালেই খুব কম ছিল না। এমন কি শিশুদের উপরেও যৌন নির্যাতনে তাদের ক্লান্তি নেই। দামিনীর সঙ্গে তার স্বামীর গুরু লীলানন্দের বাঘবন্দী খেলা চলছিল। বাড়ির মধ্যে থেকেও তারস্বরে হতে থাকা সংকীর্তনে দামিনী যোগ দিত না। প্রয়াত স্বামীর গুরুকে উপেক্ষা করবে বলেই তার এই চেষ্টা। শচীশ ও শ্রীবিলাস এই দুই উচ্চ শিক্ষিত যুবককে দেখে দামিনীর উপোসী নারীত্ব উচ্ছল হয়ে ওঠে। নারীহৃদয়ের কোন নিগূঢ় ইঙ্গিতে সে নানাতর খেলায় মেতে উঠে এই দুই যুবকের নৈকট্য পেতে চায়। দামিনী ভালো করে জানে, হিন্দু বিধবার পক্ষে পুরুষসঙ্গ অমার্জনীয় অপরাধ। কিন্তু দামিনীর অঙ্ক বলে যে শচীশ ও শ্রীবিলাসের সাথে মন দেওয়া নেওয়ার খেলায় মেতে উঠলে লীলানন্দ কিছু বলে উঠতে পারবেন না। শ্রীবিলাস বেশ সহজেই রসিকা রমণীর নানা শখ পূরণে এক পায়ে খাড়া। আর শচীশ এসে মাঝে মাঝে শুকনো মুখে দেখে যেতে চাইত – কি চলছে কাণ্ডটা !
শচীশকেই চেয়েছিল দামিনী। চেয়েছিল তার সমস্ত নারীসত্তা দিয়ে। পায় নি। দামিনী পাশে পেল শ্রীবিলাসকে। শ্রীবিলাস কি তার সাথে দাম্পত্যে বৃত হল?
এক নতুন ধরণের সম্পর্কের মাত্রা উন্মোচন করেন রবীন্দ্রনাথ। বাঁধা ধরা সম্পর্কের চেয়ে অনেক অন্য ধরণের সম্পর্ক।
খবরের কাগজে ঢি ঢি পড়েছিল। এক ছাদের নিচে এক অন্নে একটি সমর্থ পুরুষ আর একটি রূপসী বিধবা, গসিপ ছাড়বে কেন থার্ড পেজ?
শচীশ ও মাঝে মাঝে আসতো। নোট বই লিখে সংসার চালানোর বন্দোবস্ত করেছিল শ্রীবিলাস – এক কালের প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কলার। এক বিধবা কি করে জীবন খুঁজে পায় মরমিয়া ভাষায় সে গল্প করতে থাকেন রবীন্দ্র ঠাকুর I
শিবতোষের মৃত্যুর পর দামিনী বিধবা। শিবতোষের সন্তান হয় নি। অন্যান্য জ্ঞাতি কুটুম্ব আত্মীয়ের সাথেও যোগাযোগ না থাকার মতো। এই অবস্থায় ঘর দুয়োর আসবাব সমেত সে নিজের তরুণী স্ত্রী কে উৎসর্গ করে যায় লীলানন্দ স্বামীর কাছে। লীলানন্দ স্বামী ধর্ম ব্যবসায়ী। ব্রিটিশ শাসনে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত অনেক যুবক নিজের মনের ভেতর নানা প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে নানা পথে নিজের উচ্ছ্বাস কে অপচয় করেছে। এ দেশে ধর্মের নানা আড়ম্বর সর্বদাই গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমুখী চিন্তা চেতনা এদেশে শিকড় ছড়াতে পারে নি। পুরোনো ধাঁচের ধর্মীয় সংগঠন নবীন যৌবনকে আশ্রয় না দিতে পারলে, অতি সামান্য সময়ের জন্যে হয়তো বাঙালি যুবক যুক্তি ও জ্ঞান বিজ্ঞানের মুখোমুখি হতে চেয়েছে। কিন্তু সে সামান্য সময়। বেশিরভাগ যুবক ধর্মের চোলাইতে মেতে গিয়েছেন। শচীশ তেমন একজন। পড়াশোনায় দিগগজ হবার পরেও, জ্যাঠামশাই এর মতো যুক্তিবাদী মানুষের সঙ্গ পাবার পরেও লীলানন্দ কি করে শচীশকে নিজের দলে ভিড়িয়ে নিতে পারেন, সে এক আশ্চর্য প্রহেলিকা। শচীশের ছায়াসঙ্গী শ্রীবিলাস। পড়াশুনায় মজবুত হয়েও সে শচীশের টানে লীলানন্দ বৃত্তে। কিন্তু বৃত্তের পরিধিতে না থেকে দুই বন্ধুই ক্রমশঃ সে সংগঠনের কেন্দ্রে। তাদের উন্নত মেধা মগজ তাদের ওই ধর্মীয় সংগঠনের কেন্দ্রে এনে দেয়। দামিনী নামে তরুণী বিধবাটিও মেধাপূর্ণ যৌবনের দিকে তাকায় আগ্রহে। শচীশের প্রেমের পূর্ব ইতিহাস ছিল। তার দাদা পুরন্দর ননিবালা নামে এক বিধবার ধর্মনষ্ট করে। পুরন্দর এ কাজ করেও নিজের পিতা হরিমোহনের কাছে ভর্ৎসনা পায় নি। শচীশের যুক্তিবাদী মানবতাবাদী জ্যাঠামশাই ননিবালাকে কন্যাজ্ঞানে পিতৃস্নেহে আশ্রয় দিতে চেয়েছিলেন। শচীশ তার জ্যাঠামশাই এর প্রতি আনুগত্যে ননিবালার গর্ভস্থ সন্তানের পিতৃ পরিচয় এর দায়িত্ব নিতে চায়। কিন্তু ননিবালা আত্মহত্যা করে। এর পর জ্যাঠামশাই বেশিদিন বাঁচেন নি। সে যাই হোক শচীশ বুঝতে পারতো বিধবা দামিনী তাকে বিশেষ পছন্দ করে। কিন্তু সে সম্পর্কের গতি প্রকৃতি কি হবে সে নিয়ে শচীশ প্রবল দোলাচলে থাকতো। শচীশ আর দামিনীর ফাঁকের জায়গাটাতে দামিনী টেনে আনত শ্রীবিলাসকে। শ্রীবিলাসও পড়াশুনা করা সুদেহী পুরুষ। তরুণী দামিনীর প্রতি তারও এক রকম টান ছিলই। এই তিনটে মানুষের পরস্পরের টানের গল্প গড়ে উঠেছে দামিনীর চারপাশে।
নর নারীর শাস্ত্রবিরোধী আকর্ষণকে আরেক রকম করে খুঁজে পাই রবীন্দ্রনাথের ল্যাবরেটরি গল্পে। পঞ্জাবি মেয়ে সোহিনী জড়িয়ে পড়েছিল এক বাঙালি বাবুর সাথে। যেভাবে জড়িয়েছিল, সেটা খুব আধ্যাত্মিক রীতি সম্মত নয়। বরং একটু স্থূল ধরণের। শাস্ত্র ভাল মেয়ের লক্ষণ যা যা বেঁধে দিয়েছেন, সোহিনী ঠিক তার ধার পাশ দিয়ে যেত না। বাঙালি বাবুটিও খুব নিখুঁত অর্থে ধার্মিক ছিলেন না। চাকরিতে নানা অবৈধ পথেও তাঁর আয় হত, এ ইঙ্গিত গল্পে আছে। কিন্তু বাঙালি বাবুটির বিজ্ঞানের প্রতি টান ছিল প্রবল, আর নিখুঁত বিজ্ঞান চর্চার জন্যে বাবুটি গড়ে তুলেছিলেন ভাল মানের এক ল্যাবরেটরি। নিজের বৈধ অবৈধ আয়ের একটা বিপুল অংশ ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি সংগ্রহে ব্যয় করেছিলেন বাঙালি বাবু। তাঁর মৃত্যুর পর কি করে ল্যাবরেটরি সুপরিচালিত হবে, কার হাত ধরে সেখানে গবেষণা হবে তাই নিয়ে চিন্তিত ছিল প্রায় নিরক্ষর সোহিনী। ল্যাবরেটরি বাঁচাতে প্রয়াত স্বামীর বন্ধু স্থানীয় এক প্রৌঢ় অধ্যাপককে দেহের বাঁধনে বাঁধল সোহিনী। মানব সম্পর্কের এক ভিন্নতর মাত্রা ক্রমেই উন্মোচিত করেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর প্রবীণ বয়সে।
সোহিনী পঞ্জাবি মেয়ে। আচার বিচারে ভদ্র গেরস্ত বলতে আমরা পাঁচটা বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত যে রকম মেয়ে বুঝি, সোহিনী সেই গোত্রের নয়। সে তার বাঙালি বাবুটিকে বশ করেছিল দেহের বাঁধনে। কিন্তু বিজ্ঞানপিপাসু লোকটির সাহচর্যে সোহিনীর মনের কয়েকটি দরজা খুলে যেতে থাকে। বাঙালি বাবুটিকে শতকরা একশভাগ সৎ বলার উপায় রাখেন নি রবীন্দ্রনাথ। না, নানা ঘোরালো উপায়ে টাকা কামানোর পথের পথিক হিসেবে দেখিয়েছিলেন বাঙালি বাবুটিকে। সরকারি কর্তাব্যক্তিরা প্রায়শঃ যে হাতছানি উপেক্ষা করতে পারেন না, সেই রজত রসের প্রতি দুর্বলতা ওঁর ছিল। কিন্তু বাবুটির বিজ্ঞান গবেষণায় আগ্রহে কোনো মেকিত্ব ছিল না। ডিসিপ্লিনসহ বিজ্ঞানচর্চা করতে করতে অবৈধ আয়ের অর্থে বেশ একটা সমৃদ্ধ ল্যাবরেটরি গড়ে তোলেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর প্যাশনের ল্যাবরেটরিকে রক্ষা ও দেশের বিজ্ঞানচর্চার কাজে লাগানোর চেষ্টা হয়ে ওঠে বিধবা সোহিনীর স্বপ্ন। মেয়ে নীলিমা তো নয়ই, তার সম্ভাব্য প্রেমিকের কাছেও যখন ক্লান্তিহীন ডিসিপ্লিনড বিজ্ঞানচর্চার প্রবণতা দেখা গেল না, তখন স্বামীর অনুরাগী এক প্রৌঢ় অধ্যাপককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে চলে বিধবা সোহিনী। হ্যাঁ, অধ্যাপকের বয়স এগিয়ে গেলে কি হবে বিজ্ঞানচর্চায় যে ধৈর্যশীল নিষ্ঠা প্রয়োজন হয়, সেই দৃঢ় কাঠামোর নৈর্ব্যক্তিক মনটি জাগ্রত ছিল তাঁর। সোহিনী নিরালায় তাঁকে চুমু দিল। আভাস দিল নিয়মনিষ্ঠ বিজ্ঞানচর্চায় গা ঢেলে দিলে, এমন উপহার মাঝে মধ্যে জুটবে প্রৌঢ় মানুষটির। এখানে দেহকামনা এক অপূর্বলোকে উত্তীর্ণ হয়ে যায়। পার্থিব মানবতাবোধ এক অনুপম চেহারা নিয়ে দেখা দেয়। বিধবা সোহিনী ভালবাসার এক মহৎ আকাশ খুঁজে পায়। কোনো আঁশটে গন্ধ সেখানে পৌঁছতে পারে না।
সোহিনী তার স্বামীর নিষ্ঠাবান বিজ্ঞানচর্চাকে শ্রদ্ধা করতো। প্রয়াত স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও ভালবাসায় সোহিনী ল্যাবরেটরিটি চালু রাখতে চেয়েছে। সেখানে গবেষণা হোক, এমন চেয়েছে। ল্যাবরেটরিটি প্রকৃত অর্থেই সমৃদ্ধ ছিল। যথার্থ বিজ্ঞান গবেষক সেখানে সাধনা করে তার স্বামীর স্বপ্নপূরণ করুন, এই ছিল সোহিনীর বাসনা।
সোহিনী নামে পঞ্জাবি তরুণীর দেহের মোহে পড়েছিলেন বাঙালি লোকটি। সেটা শুরুর কথা হলেও সোহিনীর শক্ত মন নিজেকে স্বামীর মৃত্যুর পর ভেসে যেতে দেয় নি। সে শুধু নিজের মেয়ে নীলিমাকে বড় করেই তোলে নি, উপযুক্ত অভিভাবকের মতোই নীলিমার দুর্বলতাগুলিও জানত। সোহিনী নিরপেক্ষ নৈর্ব্যক্তিক বিজ্ঞানচর্চার তাৎপর্য বুঝতো। স্বামীর রেখে যাওয়া সমৃদ্ধ ল্যাবরেটরিটি উপযুক্ত হাতে পড়ুক, এই ছিল সোহিনীর মনোগত ইচ্ছে। এই কারণেই দুর্বলচেতা আপনজনের হাতে মূল্যবান সরঞ্জাম তুলে না দিয়ে সে দক্ষ ও যোগ্য লোকের খোঁজ করেছিল। অধ্যাপকের মধ্যে নিষ্ঠাবান নৈর্ব্যক্তিক বিজ্ঞানচর্চার উপযুক্ত মন খুঁজে পেয়ে আহ্লাদিত সোহিনী এ কাজ করেছে, আমি এটুকু ভাবি নি। জাত বিচারে পঞ্জাবি মেয়ে সোহিনী গড় বাঙালির লেগে থাকতে পারার অক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল। সে বেশ হিসেব কষে পাকা মাথায় চুমু বিনিয়োগ করেছে। করেছে বিজ্ঞান গবেষণার স্বার্থে।
সেই যে মেয়েটি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পল্লীসমাজ উপন্যাসের রমা। রমার সাথে ছোটোবেলায় ভাব ছিল রমেশের। রমা আর রমেশ। নামের ভেতর লুকিয়ে থাকে অনেক কথা। নামেই বোঝা যায় রমা রমেশকে ভালবাসবে। দুই পরিবারের যে অনেক দিনের বোঝাপড়া। দুজনের পূর্ব পুরুষ সমনামী ছিলেন। রমা মুখোপাধ্যায় এর পূর্বপুরুষ বলরাম, রমেশ ঘোষালের পূর্বপুরুষ বলরামকে সাথে নিয়ে গল্প সময়ের শতবর্ষ পূর্বে বিক্রমপুর থেকে কুঁয়াপুর এসেছিলেন। মুখুয্যে ছিলেন মহাকুলীন। তিনি রাজ সরকারে চাকরি করে, তার আগে বিবাহ করে এবং আরো নানা কিছু করে জমিদারি বাগিয়েছিলেন। ঘোষাল তত প্রতিভাধর ছিলেন না। কোনো গতিকে তিনি পিতৃঋণ শোধ করেন। ঘোষালের দিন কাটত দুঃখে কষ্টে। মুখুয্যে মশায়ের বিবাহ উপলক্ষে দুই মিতার মনোমালিন্য, এবং সেটাই গিয়ে দাঁড়ায় মুখদর্শন না করার সম্পর্কে। তা কুড়ি বৎসর ধরে চলে। মুখুয্যে যেদিন মারা গেলেন, সেদিনও ঘোষালের রাগ কমে নি। ঘোষাল মুখুয্যে মশায়ের সৎকার ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে যোগদান করেন নি। কিন্তু মুখুয্যে নিজের সম্পত্তি নিজের পুত্রগণ ও মিতার পুত্রগণকে সমহারে বণ্টন করে গিয়েছিলেন।
ছোটোবেলা থেকেই জানতাম রমা আর রমেশ দুজনে দুজনার। রমেশ তাকে ডাকে রাণী। সে রাণী শব্দের নিগূঢ় অর্থ আমি টের পেতাম।
কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারতাম না, কেন, কোন্ রহস্যজনক কারণে বেণী ঘোষালের ইঙ্গিতে রমা তার প্রাণপ্রিয় রমেশের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে থাকত।
বিধবা মেয়েমানুষকে কি করে টাইট দিতে হয় বেণী ঘোষাল ভালো জানতো। সেদিনের রক্ষণশীল পশ্চাৎমুখী হিন্দু সমাজে মেয়েদের চরিত্রের অখ্যাতি আর যৌনকুৎসা ও অপবাদ রটানো ছিল খুব সহজ। তেমন অখ্যাতিকে বিধবা মেয়েরা ভয়ও পেত খুব। বেণীর সেই বিষাক্ত চক্রান্তের জ্বালায় রমাকে কেবলই রমেশের বিরুদ্ধে লড়ে যেতে হয়েছে। গ্রাম্য হিন্দু সমাজ বিধবা নারীকে কিভাবে নিষ্পেষণ করেছে লক্ষ্য করলে নির্বাক হতে হয়।
পল্লীসমাজ পড়ে রমার উপর খুব রাগ হত। কেন যে সে বোঝে না রমেশ তাকে ভালোবাসে! যদি সে রমেশকে ভালো নাই বাসে, তাহলে রমেশকে এটা কোরো না ওটা কোরো না বলেই বা কেন? আর বেণী ঘোষালের মত লোকের সঙ্গে কিসের অত ভাব রমার?
বেণী যে ভিতরে ভিতরে বাল বিধবাটিকে যৌন কুখ্যাতির মিথ্যে কলঙ্কের বোঝা চাপিয়ে দেবার ভয় দেখাত, সেটা বুঝতে দেরি হয়েছে।
বিধবা মেয়ের কাছে যৌন কুখ্যাতির মিথ্যে কলঙ্কও কি সাংঘাতিক অপরাধ !
আমাদের বালুরঘাটের কবি বিশ্বনাথ লাহা তাঁর একটি কবিতায় “কাঁচ কাপড়” কথাটি ব্যবহার করেছেন। যাঁরা অতুলবাবুর স্নানরতা সিরিজের ছবিগুলি দেখেছেন, তাঁরা মনশ্চক্ষে ধরতে পারবেন ‘কাঁচ কাপড়’ কি।
রমার কথায় কাঁচ কাপড় কথাটা মনে পড়ে গেল।
সে সব দিনে বাড়ির অভ্যন্তরে স্নানের সুযোগ থাকতো না। পুস্করিণীতেই স্নান সারতেন মেয়েরা। স্নান সেরে গাগরি কাঁখে ঘরে ফিরতেন পল্লীবালা।
বাঙালি মেয়ের অন্তর্বাস এই সেদিনের অভিজ্ঞান। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল থেকে রবীন্দ্রনাথের মেজবৌদি জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর উদ্যোগ। তার আগে সায়া শেমিজ কই? চালু হবার পরেও বহুদিন সেই সায়া শেমিজ গুটিকয় শিক্ষিত আলোকপ্রাপ্ত ব্রাহ্ম পরিবারে আটকে থেকেছে। গ্রামবাংলায় মান্যতা পেতে ঢের সময় গিয়েছে। এই বস্তুর ধারণাই ছিলোনা পল্লীসমাজে। ভেবে দেখুন, সায়া শব্দটি পর্তুগিজ উৎস থেকে এসেছে। ফিতা শব্দটাও। এমন কি বালতি পর্যন্ত। আমাদের পল্লী সমাজে ঘেরাটোপে স্নান ছিল না। ছিল পুকুরে নদীতে অবগাহন স্নান। মেয়ে পুরুষের আলাদা আলাদা ঘাট থাকত। স্নানের আলাদা আলাদা সময়ও থাকত কোথাও কোথাও। আব্রু রক্ষা করতে সামাজিক শাসনকেই দেয়াল বলে গণ্য করতে অভ্যস্ত ছিল পল্লীসমাজ।
তো গ্রামের পুকুরে স্নান করে পল্লীসমাজের রমাও ফিরতো ভিজে পোশাকে। বালবিধবা রমার তখন যৌবনপুষ্ট শরীর। অপরিতৃপ্ত যৌন আকুতি। রমেশ নামেই আছেন, থেকেও না থাকার সামিল। এইবার কাঁচ কাপড় কথাটা খেয়াল করুন।
গ্রাম্য বৃদ্ধার চোখে পড়ে কাঁচ কাপড়ে ঢাকা রমার উদ্ধত যৌবন। বৃদ্ধা অন্য বৃদ্ধার কাছে রমার প্রদর্শনবাদের বিরুদ্ধে মুখরিত হন। রমার যৌবনের অস্তিত্ব স্বাভাবিক। যৌবনের আসল অধিষ্ঠান তো মনে। শরীরে মনে রমার যে যৌবন, তার সুসংহত ব্যবস্থা পল্লীসমাজে হবার জো ছিল না। প্রবীণা শুধুমাত্র রমার উছলে ওঠা যৌবন লক্ষ্য করলেন, কিছুতেই ভাবলেন না কোন্ কাতরতায় এমনি হয়ে ওঠে।
বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্রের উত্তরাধিকার আমাদের মধ্যে বর্তেছে তো?