বাসন্তীবালা বললেন, ঠিক বলেছিস্ মা, এঁরা দেবীতুল্য। সমস্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে।
শ্যামলী বলল, মা, পঞ্চকন্যার নাম তো জানো, পঞ্চকন্যা হলেন অহল্যা, কুন্তী, তারা, মন্দোদরী, অহল্যা ও দ্রৌপদী।
বাসন্তীবালা বললেন, হুঁ। গলাটা শুনে বোঝাই গেল যে, মেয়ে সতীদের নাম বলে দিতে তাঁর বেশ একটু সুবিধেই হল।
শ্যামলী বলল, মা, তোমার মতে তাহলে এঁরা সব সতী, যাঁদের নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অর্থই নেই।
বাসন্তীবালা এবার শক্ত মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকলেও, যেহেতু নিজের মেয়েকে তিনি ভাল মতোই চেনেন, তাই গলায় তাঁর আত্মবিশ্বাস ফুটছিল না। তিনি শ্যামলীকে বললেন, তা তুই জোর করে ওঁদের খারাপ বললে আমার কি করার আছে!
শ্যামলী বলল, না মা, প্রশ্ন তো আমি তুলি নি। প্রশ্ন তুলেছিলেন পৌরাণিক ব্যক্তিত্বরা।
বাসন্তীবালা বেশ অসহায় বোধ করতে থাকেন। শ্যামলী কোন্ দিক দিয়ে কি কথা তুলবে, সেটা তিনি আন্দাজ করতেই পারছেন না। তাই তিনি অরিন্দমকে বললেন, বাবা অরিন্দম, এই কালা পাহাড়কে তুমি সামলাও।
অরিন্দম শ্যামলীকে বললেন, একটা তো চেনা জানা শ্লোক বলা হল। তো তুমি আবার তার ছিদ্র খুঁজতে বসলে কেন? এটাকে আপ্তবাক্য স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নিচ্ছ না কেন?
শ্যামলী বলল, আপ্তবাক্য আর সত্যবাক্য দুটো কিন্তু ভিন্ন গোত্রের জিনিস। এই শ্লোকটার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রথমতঃ যুধিষ্ঠির, দ্বিতীয়তঃ ঋষি গৌতম, তৃতীয়তঃ রামচন্দ্রের সেনাবাহিনীর কর্তৃপক্ষ, চতুর্থতঃ তারার স্বামী বালী, আর শেষতঃ ও পঞ্চমতঃ কুন্তী নিজেই।
শশাঙ্ক পাল বললেন, অহল্যার ব্যাপারে তুই আগেই বলেছিস। ওর ওপর ওর পালনকর্তা রক্ষাকর্তা যে আচরণ করল, তা দুঃখজনক।
অরিন্দম বললেন, অহল্যার উপর কি আচরণ হয়েছিল?
শ্যামলী বলল, অভিযোগকারী সমস্ত আইনি ব্যবস্থা নস্যাৎ করে বিচারপতি সেজে অহল্যাকে প্রাণদণ্ড দেয়। আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগটুকু দেন নি। অভিযোগ কারী এবং বিচারপতি এক অভিন্ন অস্তিত্ব হলে বিচারের বদলে অবিচার হবার সম্ভাবনা ষোলো আনার উপর আঠারো আনা।
সবিতা ফুঁসে উঠে বললেন, এই তো একটু আগেই বললি, ওকে অভিশপ্ত হয়ে পাথর হয়ে থাকতে হয়েছিল, রামচন্দ্র যখন এল, তখন পা ঠেকাতে বেঁচে উঠেছিল না?
শ্যামলী বলল, মিস্টার দাশগুপ্ত, শুনে রাখুন, পঞ্চস্বামীর প্রতি দ্রৌপদীর ভালবাসা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ছিলেন স্বয়ং ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির। মহাপ্রস্থানের পথে। পাঁচ স্বামীর অনুগামিনী হয়েছিলেন দ্রৌপদী। তিনি পড়ে গেলে ভীমসেন জ্যেষ্ঠ পাণ্ডবকে প্রশ্ন করেছিলেন, মহারাজ, কোন্ পাপে যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদী সশরীরে স্বর্গলাভ হতে বঞ্চিত হলেন?
নির্বিকার মুখে কৌন্তেয় দ্য সিনিয়র বললেন, শোনো মধ্যম পাণ্ডব, দ্রৌপদী তোমাকে বেশি ভালবাসত। সেই পাপে কৃষ্ণার এই অধঃপতন।
এখন, মিস্টার দাশগুপ্ত, একজন জুরি হিসেবে আপনি বলুন তো, দ্রৌপদীর গর্ভে যুধিষ্ঠিরের ঔরসে পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছিল। যে নারী তাঁর বীর্যধারণ করে দশমাস দশদিন গর্ভে লালন করে জননী হলেন, তাঁর সততা নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সতীত্বের ধারণার কোন্ মূল্যায়ন করলেন যুধিষ্ঠির?
আমার মা যখন ভাইবোনের সাথে আমাকে এক টেবিলে খেতে দেন, তখন আমি মাছের টুকরোর সাইজ নিয়ে প্রশ্ন তুলি না। যদিও জানি সূক্ষ্ম তূলাযন্ত্রে মাপ করলে দু দশ গ্রামের এদিক ওদিক হওয়া খুবই সম্ভব। সত্যি কথা বলতে, বাস্তব জীবনে ওটা হবার পসিবিলিটি খুবই বেশি। মাছের প্রতিটি টুকরো ভরের নিরিখে সমান হওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রোবাবিলিটির অঙ্কে সম্ভাবনা নগণ্য। তবুও আমি মনে করি, মা সব সন্তানকে মাছের টুকরো সমানভাবে ভাগ করে দেন। এটা মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার ন্যূনতম শর্ত।
অমনি সবিতা হেসে উঠে বললেন, ছোটো খোকা প্রায়ই ওরকম করে।
বাসন্তীবালা সবিতাকে ঝামরে উঠে বললেন, কী কথায় কী কথা! অন্তু এখনো ছেলেমানুষের পর্যায়ে পড়ে। তা ছাড়া ও একটু পেট পাগলা।
শ্যামলী বলল, দ্রৌপদী বেদিজা, যজ্ঞসম্ভবা, যোজনগন্ধা পদ্মিনী নারী। সত্য যুগের বেদবতী ত্রেতা যুগে সীতা হয়ে দ্বাপরে দ্রুপদনন্দিনী। মিস্টার দাশগুপ্ত, আপনি বলুন, এই মহিলার সঙ্গে যখন শয্যাসম্পর্কে লিপ্ত হতেন মহারাজ, এই কূটচিন্তা কি তাঁকে অশান্ত করে তুলত? এই দাম্পত্য কি আদৌ রুচিপূর্ণ?
অরিন্দম বললেন, অ্যাই শ্যামলী, তুমি আমাকে মিস্টার দাশগুপ্ত বললে কেমন পর পর মনে হয়।
শ্যামলী বলল, আপনার অতো বড়ো অফিস, অতো লোক কাজ করে, কতো বোলবোলাও, আপনাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি কি করে?
অরিন্দম বললেন, এই তো রমানাথকে তুমি নাম ধরে ডাকো..
সঙ্গে সঙ্গে বাসন্তীবালা বললেন, সেটা মোটেও ভালো কথা নয়, আজ বাদে কাল একটা সম্পর্ক হতে যাচ্ছে, অরিন্দম তুমিই বলো, এখনও ওভাবে ডাকা ভাল?
সহসা অরিন্দমের মুখটা কালো হয়ে গেল। আমতা আমতা করে শশাঙ্ক পালকে জিজ্ঞাসা করলেন, কথাবার্তা সব ফাইনাল হয়ে গেছে?
এমন সময়ে খাটের পাশে রাখা ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরলেন শশাঙ্ক। ওপারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তাঁর। চাপা স্বরে শ্যামলীকে বললেন, ওবাড়ি থেকে বৌদি কথা বলতে চাইছেন।
বাসন্তীবালা তাঁর স্বামীকে বললেন, কে রমানাথের মা? দিদিকে দাও না, আমি একটু কথা বলি।
শশাঙ্ক পাল তাঁকে ইঙ্গিতে চুপ করতে বলে শ্যামলীর হাতে রিসিভার ধরিয়ে দিলেন। ওপার থেকে উত্তপ্ত বাক্যস্রোত ভেসে আসছে। শ্যামলী ঠোঁট কামড়ে রয়েছে। একসময় তার চোখ থেকে বড় বড় ফোঁটায় জল পড়তে লাগল।
তা লক্ষ্য করে অরিন্দম অস্থির হয়ে উঠলেন। কি হয়েছে আমায় বলো শ্যামলী!
বাসন্তীবালা ডুকরে উঠে বললেন, কি হয়েছে বল্ না মা?
শ্যামলী চোখ মোছার কোনো চেষ্টা না করে বাবাকে বলল, আমি এখন একটু ওবাড়ি যাব বাবা।
অরিন্দম বললেন, আমি তোমার সাথে যাই?
শ্যামলী ঘাড় নাড়ল। সে ফোন করল রামনারায়ণ বাবুকে। একটা গাড়ি পাঠিয়ে দিন। আপনি নয়। ড্রাইভার পাঠাবেন।
অরিন্দম বললেন, আরে, আমার সাথে গাড়ি আছে তো..
শ্যামলী ঘোষণা করল, আমি একাই যাব। স্যরি অরিন্দম বাবু, প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। আই’ল ক্ল্যারিফাই এভরিথিং টু ইউ সাম ডে .. . বলে নিজের ঘরে গিয়ে দোর দিল।