দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২০৩)

পর্ব – ২০৩

শ‍্যামলী দৌড়ে রমানাথের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। তার মনে হচ্ছিল রমানাথ কাতর হয়ে তাকে অনুরোধ করবেন, অন্তত রাতটুকু থেকে যাও। পরদিন সকালে আমরা কোনো ঘর খুঁজে নিয়ে একসাথে থাকা শুরু করব। কিন্তু রমানাথের মায়ের ওই ভয়ার্ত দৃষ্টি, আর ওই যে তিনি বললেন,  এই বিধবার বাছার দিকে দৃষ্টি দিও না, এই কথাটা শ‍্যামলীর মনে বড়ো বেজেছিল। সে সত‍্যি সত‍্যি চাইছিল না, তাকে নিয়ে মা ছেলের মধ‍্যে বিচ্ছেদ ঘটে যাক। তাই দৌড়াতে দৌড়াতে আসলে নিজের কাছ থেকে নিজে আড়াল খুঁজছিল। শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের দিনেও সন্ধ্যার দিকে রমানাথের ডাকে ছাতে উঠে গল্প করেছিল বলে তাকে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করে এই ধরণের কথা বলা হয়েছিল। ছেলের মাথা চিবিয়ে দিয়েছে, দৃষ্টিটা কি রকম ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল, এমন ধরণের কথা। মেয়েদের মধ্যেই কি এই ধরণের ভাষায় অন‍্য কোনো মেয়েকে আক্রমণের রেওয়াজ আছে? না কি, মেয়েরা নিজেরাই নিজের প্রতি এমন কুৎসিত ইঙ্গিত করতে অভ‍্যস্ত হয়ে পড়েছে? তার মনে পড়ে নিজের বৈধব‍্য নিয়ে নিজেকেই দায়ী করত সবিতা পিসি। কিছুতেই বুঝতে পারত না যে, মৃত‍্যু একটা জাগতিক ঘটনা মাত্র। কিছুমাত্র অলৌকিকতার ছোঁয়া তাতে নেই। হিন্দু রক্ষণশীল সমাজ পাকে প্রকারে বৈধব‍্যকে অপরাধ বলে দাগিয়ে দিয়ে নানাভাবে তাদের জীবনীশক্তি হ্রাস করার উদ‍্যোগ নিত। মাছ মাংস তো বটেই, এমনকি মুসুর ডাল আহারে পর্যন্ত বাধা সৃষ্টি করে বিধবা মেয়েকে পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত করে মৃত‍্যুর মুখে ঠেলে দিতে সক্রিয় থাকত সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়। এই পরিবেশে বিধবা মেয়েরা নিজেরাও নিজেদের অপবিত্র ও মূল‍্যহীন ভাবতে অভ‍্যস্ত হয়ে পড়ত। সবচেয়ে খারাপ লাগত একাদশীর দিন। ওইদিন পিসি খুব মনমরা হয়ে থাকত। সামান‍্য একটু খই খেত। আর মাকে নাকি ওইদিন আমিষ খেতেই হত। আশ্চর্য ব‍্যাপার বটে! আর অম্বুবাচী তিথির ব‍্যাপারটা? ওই সময় নাকি পৃথিবী রজস্বলা হন। কি হাস‍্যকর! পৃথিবী কি একটা তরুণী মেয়ে, যে রজস্বলা হবেন! আর যদি ধরে নিতে হয়, যে এটা একটা বিশ্বাস, তাহলে শুধু বিধবাদের উপর অম্বুবাচী পালনের দায়ভার ন‍্যস্ত করা হল কেন? সধবা ও অবিবাহিত মেয়েদের অম্বুবাচী পালন করানো হয় না কেন? একটু তলিয়ে ভাবলেই বোঝা যায় বিধবা মেয়েদের উপর এটা একটা সংগঠিত সামাজিক আক্রমণ।
সবিতাপিসি কিছুতেই তনুশ্রীর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় জুটতে চায় নি। খুব জোর করে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। ফুলশয্যার দিন বাবা মা বার বার করে বলার পরও গোঁ ধরে নিজেকে অলুক্ষুণে বলে বাড়িতে আটকে রাখল।
শ‍্যামলী ভাবে, কালীপূজার সন্ধ্যা নামার মুহূর্তে লক্ষ্মীপূজার আগে অলক্ষ্মী বিদায়ের একটা কৃত‍্য মা পালন করেন। গোবর দিয়ে একটা মানবীমূর্তি গড়ে বাড়ির বাইরে তাকে বিসর্জন করে এসে তারপর লক্ষ্মীপূজা। পাটকাঠিতে আগুন ধরিয়ে ওই অলক্ষ্মীকে কুলোর বাতাস দিয়ে দূর করতে হত। এই কৃত‍্যটার নাম আঁজিপুঁজি। এই মানবীমূর্তিকে আগুন লাগানোর সূত্রে তার আবার মনে পড়ল হাইপেশিয়ার খণ্ডবিচ্ছিন্ন নগ্ন মৃতশরীরটাকে দূরে ছু্ঁড়ে ফেলে আগুনে পোড়ানো হয়েছিল। যথেষ্ট পরিমাণে মিল পাচ্ছে সে। কোনো মেয়েকে শেষ করতে চাইলে আগে তাকে বদনাম দাও। বলো, তাকে রাবণ কামস্পর্শ করেছে বলে সন্দেহ আছে। তাহলে আগুন জ্বালো। মেয়ে তুমি আগুনের ভিতরে ঢুকে নিজের নিষ্পাপ ইমেজ রক্ষা করো। আর বলো, সে মেয়ে পঞ্চস্বামীর প্রত‍্যেককে নিক্তি ধরে সমান মাপে ভাল না বেসে মধ‍্যম পাণ্ডবকে বেশি ভালবাসত, আর সেই অপরাধে তার পতন। সমাজ তা মেনে নেবে।
অলক্ষ্মী আর আগুনের কথায় তার মনে উঁকি দিয়ে গেল বছর ঊনিশের একটা মেয়ে। তাকে জ‍্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। তার দোষ, সে স্বদেশ ব্রতের মহাদীক্ষাধারী ছিল। ইংলণ্ডের সঙ্গে ফ্রান্সের শতবর্ষ ব‍্যাপী যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সে স্বদেশ ভূমি ফ্রান্সের পক্ষে দাঁড়িয়ে যুদ্ধপরিচালনা করেছিল। আজ সে মেয়ে দেবী। সন্ত। কিন্তু মৃত‍্যুর সময় তাকে পাষণ্ড সাব‍্যস্ত করে পোশাক খুলে নেওয়া হয়েছিল। সাড়ে পাঁচশো বছর আগে ধর্মপ্রতিষ্ঠানের অন‍্যায় বিচারের ফলে মেয়েটির মৃত‍্যুদণ্ড হয়েছিল। তার কথা ভেবে চোখের কোলে জল ভরে এল শ‍্যামলীর।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।