পর্ব – ২৩০
শ্যামলী বলল, জানেন অরিন্দমবাবু, রমানাথ নন্দী মশায়ের মা, আমি তাঁকে জ্যেঠাইমা বলতাম, তিনি আমাকে ডাইনি বলেছেন। এর আগে প্রথম দিনেও ওই বাড়ির আত্মীয়রা আমাকে ডাইনি বলেছেন। শুধুমাত্র এক আধজন বিচ্ছিন্ন ভাবে নয়, একসাথে অনেকে মিলে। আপনি জানেন, রমানাথবাবুর বিশেষ অনুরোধেই আমি তাঁর সঙ্গে ছাতে গিয়েছিলাম। গল্পও করেছিলাম।
অনসূয়া বললেন, কি গল্প রে?
শ্যামলী বলল, ওইদিন আকাশ দেখতে দেখতে কত কথা মনে এল। নিকোলাস কোপার্নিকাস, টাইকো ব্রাহে, গ্যালিলিও, কত কিছু। সেই সব বলে যাচ্ছিলাম। আর রমানাথ ধৈর্য ধরে শুনছিলেন। কিন্তু সেটা ওই বাড়ির বয়স্কদের খুব অপছন্দ হয়েছিল। আমি আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। রমানাথের অনুরোধ রক্ষা করতে আমি ছাতে গিয়েছিলাম। অথচ সেটাকে ওঁরা একটা কুৎসিত বিষয় বলে দেখাতে চাইলেন। মানুষ হিসেবে আমার যে একটা সম্মান থাকার কথা এটা ওঁদের মনেই এল না। আমার চিন্তা ভাবনার গড়ন ওঁদের পরিচিত ছাঁচে নয় বলেই এমন করা হল। অথচ আমি কিন্তু বিয়ের প্রস্তাব দিই নি। দিয়েছেন ওঁরা। বারবার যোগাযোগ করতে এসেছেন। আমি বলেছি, আমি বিয়ে করছি না। রমানাথকে করছি না তো বটেই, তবে রমানাথের বিরুদ্ধে আমার বিশেষ কোনো বক্তব্য নেই, বিয়ে এই ব্যবস্থাটাতেই আমার আপত্তি। আমি যে বিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে, এটা সামনে এসে যেতে আমাকে এত জঘন্যভাবে আক্রমণ করা হল। আপনাদের হয়তো অদ্ভুত মনে হবে, তবুও কেন যেন নাৎসিদের ইহুদি বিরোধিতার সঙ্গে আমার ঘটনাটার মিল পাই। ইউরোপের দেশে দেশে ইহুদিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, বহুদিন ধরে। খুব যে শান্তিতে ছিল তা নয়, তবে ছিল। হিটলার আর তার নাৎসিদল একটা ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে। আমার উপর রমানাথের মায়ের দুর্ব্যবহারের ঘটনায় আমার সেই সব ইহুদি নির্যাতনের ঘটনাগুলো মনে এসে যাচ্ছে। যদিও এসবই আপনার জানা কথা।
অরিন্দম বললেন, বলো শ্যামলী, তোমার মুখ থেকে শুনতে ভাল লাগে।
শ্যামলী বলল, ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে অ্যাডলফ হিটলারের পরিকল্পনায় নাৎসি জার্মানি আর জার্মান অধিকৃত ইউরোপ আর সাঙ্গোপাঙ্গ দেশগুলিতে প্রায় ছয় মিলিয়ন ইহুদিকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়। মিলিয়ন মানে দশলক্ষ। এই যে ষাট লাখ ইহুদিকে হিটলারি শয়তানিতে মরতে হল, এটা গোটা ইউরোপের ইহুদি জনগোষ্ঠীর তিনভাগের দুই ভাগ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইহুদি জনগোষ্ঠী ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এরমধ্যে পোল্যাণ্ডে প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ, হাঙ্গেরিতে লাখ আষ্টেক, জার্মানিতে সোয়া পাঁচ লাখ, ফ্রান্সে সাড়ে তিন লাখ, চেকোশ্লোভাকিয়াতেও সাড়ে তিন লাখ, অষ্ট্রিয়ায় দু লাখের সামান্য একটু কম, নেদারল্যান্ডসে লাখ দেড়েকের একটু কম ইহুদি ছিল। রুমানিয়ায় ছিল আট লক্ষ ইহুদি সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিল ত্রিশ লাখ ইহুদি।
১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হলেন। নাৎসিরা জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করল। জার্মান নেতারা বললেন, জার্মানিতে জনতার শক্তি জেগেছে। একে তাঁরা বললেন “ভোল্কজেমিইনশ্যাফট” । নাৎসিরা মানুষকে দুভাগে ভাগ করল। যারা তাদের পছন্দের, তাদের নাম দেওয়া হল “ভোল্কজেনোসেন” বা জাতীয় সহযোদ্ধা। আর অপছন্দের লোকদের শত্রু বলে দাগিয়ে দিয়ে নাম দেওয়া হল “জেমিইনশ্যাফটফ্রেমদি”। মানে শত্তুর।
নাৎসি পার্টি জাতিবিদ্বেষ ছড়ালো ভয়ঙ্কর ভাবে। তারা ইহুদি আর রোমাদের শত্রু বলল। আর মার্কসবাদী, উদারপন্থী এমন কি খৃস্টানদের পর্যন্ত শত্রু বলে দিন। শত্রু মানে জাতশত্রু। হাড়ে হাড়ে শত্রুতা।
গোটা মধ্যযুগ ধরে খৃস্টীয় ধর্মতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ইহুদিদের উপর অত্যাচার হয়েছে। খৃস্টীয় ধর্মতত্ত্ব বলে ইহুদিরা যিশুকে খুন করেছে। রিফর্মেশনের পরেও ক্যাথলিক আর লুথেরান খৃস্টানরা ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে গিয়েছে। এমনকি অনেকেই বলেন, ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’ নাটকে উইলিয়াম শেক্সপিয়র যে “শাইলক” চরিত্রটি দেখিয়েছেন, তা ইহুদি জনগোষ্ঠীকে হেয় করে। এই যে ইহুদিদের প্রতি ঘৃণার মনোভাব, এটা চাগিয়ে তোলেন দার্শনিক হাউসটন স্টুয়ার্ট চেম্বারলেন আর পল ডি ল্যাগার্ড। বিজ্ঞানের ফোঁটা তিলক পরিয়ে একটা অপবিজ্ঞানকে বাজারে হাজির করেছিলেন ওঁরা। আর্য জাতি সব জাতির সেরা এবং কারা আর্য, তাও তাঁরা স্থির করে দিয়েছিলেন। ইহুদিদের জঘন্যতম পর্যায়ের জীব বলে গণ্য করতে বলা হল। গোটা জার্মানি জুড়ে এই ধারণাটা খুব জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু হিটলারের আমলে এই জাতিবিদ্বেষ একটা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে ফেলল।
অনসূয়া বললেন, হ্যাঁ, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, গ্যাসচেম্বার।
অরিন্দম বললেন, মানুষের চর্বি দিয়ে সাবান বানানো, উদ্ভট সব মেডিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট, ভাবলেই মনখারাপ হয়।
শ্যামলী বলল, উগ্র দক্ষিণপন্থী নাৎসি পার্টির সূচনা আন্তন ড্রেক্সলারের হাতে। তারিখটা ছিল ১৯২০ সালের চব্বিশে ফেব্রুয়ারি। তবে সূচনার আগেও একটা সূচনা ছিল। এই আন্তন ড্রেক্সলার লোকটা আসলে একটা ছোটখাটো তালা মিস্ত্রি ছিল। আর “ফাদারল্যাণ্ড পার্টি” নামে একটা দক্ষিণপন্থী পার্টি করত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ১৯১৮ সালের ৭ মার্চ একটা ছোট পলিটিক্যাল গ্রুপ গড়ে ওঠে। ওর একটা খটোমটো জার্মান নাম আছে। ওর নামটা ইংরেজি ভাষায় বলতে হলে ‘ফ্রি ওয়ার্কার্স কমিটি ফর এ গুড পিস’ বলতে হবে। মিউনিখ শহরে ড্রেক্সলার এই সংগঠনের একটা শাখা খোলেন।
এই সংগঠনের লোকজন বিশ্বাস করত জার্মানরা প্রকৃত আর্যজাতি। আর ইহুদি লোকগুলো নরকের কীট। এইজন্য ইহুদিদের সভ্যজগৎ থেকে বিতাড়িত করা দরকার বলে মনে করত জার্মানরা। এই যে নিজেদেরকে আর্যজাতি বলে আখ্যা দিল জার্মানরা, এই সূত্রে নিজেদেরকে বলল “হেরেনভোল্ক”।
ডায়াট্রিশ এককার্ট, ফেলিক্স গ্রাফ ভন বোথমার আর কার্ল হ্যারার প্রমুখের সহযোগিতা নিয়ে আন্তন ড্রেক্সলার একটা পলিটিক্যাল ওয়ার্কার্স সার্কেল গড়ে তোলেন। তারপর ১৯১৯ সালের ০৫ জানুয়ারি তারিখে ওই ফ্রি ওয়ার্কার্স কমিটি ফর এ গুড পিস আর পলিটিক্যাল ওয়ার্কার্স সার্কেল একসাথে জোড়াতাড়া দিয়ে ড্রেক্সলার জার্মান সোশিয়ালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি গড়ে তোলেন। ক’দিন বাদে পার্টির নামে “সোশিয়ালিস্ট” শব্দটা নিয়ে বাদপ্রতিবাদ করেন কার্ল হ্যারার। তখন পার্টির নাম থেকে সোশিয়ালিস্ট শব্দটা ছেঁটে ফেলে জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি দাঁড়ায়। এটাই কদিন বাদে ১৯২০ সালে নাৎসিদল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নাৎসি শব্দটা হিটলারের বিপক্ষের লোকজন ঘৃণাভরে তৈরি করেছে।
অনসূয়া বললেন, হ্যাঁঁ, আসল নামটা ছিল এন এস ডি এ পি, ন্যাশনাল সোশিয়ালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি।
শ্যামলী বলল, অ্যাডলফ হিটলারের জন্ম ১৮৮৯ সালের এপ্রিলে। কুড়ি তারিখে। অতি সাধারণ অস্ট্রিয়ান জার্মান পরিবারের সন্তান হিটলার সিকসটিনথ ব্যাভেরিয়ান রেজিমেন্টে নিচতলার সৈনিক ছিলেন। জার্মান ভাষায় বলতে হবে, গেফ্রেইটার। এই সাদামাটা সৈনিক লোকটা একটা অভ্যুত্থান ঘটাবার চেষ্টা করে ধরা পড়েন, আর ১৯২৩ সালে জেলে যান।
জেলে বসে বসে ডিকটেশন দিয়ে হিটলার একটা বই লেখান। অনসূয়া হেসে বললেন, মেইন ক্যাম্পফ। আমাদের লাইব্রেরিতে আছে। আমার পড়ে দেখা হয় নি। শুনেছি খুব নামকরা বই।
শ্যামলী বলল, বইটার নাম আসলে মেইন ক্যাম্পফ ছিল না। ওটা প্রকাশকের উর্বর মস্তিষ্কের অবদান। হিটলার তাঁর বইটার নাম দিয়েছিলেন ‘ফোর অ্যাণ্ড হাফ ইয়ার্স অফ স্ট্রাগল এগেইনস্ট লাইজ় স্টুপিডিটি অ্যাণ্ড কাওয়ার্ডিস।’ প্রকাশন সংস্থার কর্তা ম্যাক্স আমান ওই নামকে কেটে ছেঁটে ‘মেইন ক্যাম্পফ’ করে দিলেন। ও কথাটার মানে হল আমার সংগ্রাম। বইটা প্রথম বের হয় ১৯২৫ সালের ১৮ জুলাই। সেটা জার্মান ভাষায়। তার পর বৎসর ১৯২৬ সালে দ্বিতীয় খণ্ড বের হয়। ১৯৩৩ সালের অক্টোবরের তের তারিখে এই বইটার একটা সংক্ষিপ্ত ইংরেজি সংস্করণ বের হয়। ১৯৩৯ সালে, যখন হিটলার তাঁর ক্ষমতার মধ্যগগনে তখন ইংরেজিতে বইটার পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ বেরোয়।
সহায়িকা এসে বলল, রাত দশটা বেজেছে স্যার। আপনার ড্রাইভার বাড়ি যাবে বলে ছটফট করছে।
অনসূয়া বললেন, অরিন্দম, আজ তুই থেকেই যা। সারা রাত গল্প করব। ড্রাইভারকে বাড়ি পাঠিয়ে দে।
সহায়িকা বলল, আপনারা দয়া করে খেতে আসুন। খেতে খেতে গল্প করুন।