প্রয়াণ শতবর্ষে জন রীড : যোদ্ধা ও প্রেমিকের স্মরণে

দুনিয়া কেঁপে উঠেছিল। সে ১৯১৭ সাল। দুনিয়া কাঁপানো দশদিন। ‘টেন ডেজ় দ্যাট শুক দ্য ওয়ার্ল্ড’। ১৯১৭র সতেরোই নভেম্বর, সেই দুনিয়া কাঁপিয়ে দেবার শেষ দিন।
জন রীড। জন জ্যাক সিলাস রীড। আমেরিকান সাংবাদিক, কবি, আর সাম্যবাদী কর্মী। কি ভাবছেন? আমেরিকান অথচ সাম্যবাদী?
জন রীডের বাবা চার্লস জেরোম রীড ছিলেন সাধারণ মানুষ। ১৮৮৬ সালে তাঁর সঙ্গে ধনী শিল্পপতির দুলালী মার্গারেট গ্রীনের বিয়ে হয়। মার্গারেট ছিলেন শিল্পপতি হেনরি ডজ গ্রীনের কন্যা। রীড পরিবারের বিষয় আশয় আর্থিক মজবুতি, সবটুকুই গ্রীনদের অবদান।
১৮৮৭ সালের ২২ অক্টোবরে আমেরিকায় জন রীডের জন্ম। আর যৌবন না ফুরোতেই ১৯২০র অক্টোবরের ১৭ তারিখে মৃত্যু। টাইফয়েডে ভুগে মৃত্যু। মস্কোয়। তখন মোটে বত্রিশ বছর বয়স। এই ২০২০তে জন রীডের প্রয়াণ শতবার্ষিকী।
মায়ের বাপের বাড়িতে জন্মেছেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই রোগভোগ সাথের সাথি। তাঁকে সদা সর্বদা ঘিরে রাখত নার্স আর চাকরবাকরের দল। মা চাইতেন ছেলে বেছে বেছে বড়লোকের ছেলেদের সাথেই মিশুক। আর সদ্য যৌবনে জন রীড হয়ে উঠলেন গরিব মানুষের আপনজন, হয়ে উঠলেন কমিউনিস্ট।
জন রীড ছোটবেলায় মেধাবী ছাত্র হলেও স্কুলে যেতে তাঁর ভাল লাগত না। পরিবেশটাই পছন্দসই ছিল না। তাই রেজাল্ট দেখনসই হয় নি। অথচ বাবা চার্লস জেরোম চাইতেন ছেলে হার্ভার্ডে পড়বে। চার্লসের নিজের কলেজী লেখাপড়া জোটেনি বলে, ছেলের মধ্যে সেই আশা সফল হোক, এই চেয়েছিলেন। কিন্তু হার্ভার্ডে প্রবেশিকা পরীক্ষাতেই জোরালো ধাক্কা খেলেন জন রীড। ব্যর্থতা। পরবর্তীকালে ঢোকার দরজা খুলল। হার্ভার্ডে গিয়ে কবিসত্তা মাথা তুলল জন রীডের ভিতরে। আর নাটক গান ও থিয়েটারে আগ্রহ। কলেজের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি জুটে গেল সহজেই। আর সোশিয়ালিস্ট ক্লাব। গরিব মানুষের মুক্তির স্বপ্ন। সাহিত্য আর গরিব মানুষের মুক্তির দিশা। বিপ্লব। জন রীডের জীবনের গতিপথ নির্দিষ্ট হয়ে গেল।
১৯১০ সালে হার্ভার্ড থেকে স্নাতক হলেন তিনি। এবার স্বাধীন জীবিকা। চেয়েছিলেন ফ্রিল্যান্স জার্ণালিস্ট হয়ে রুটি যোগাড় করবেন। যোগ দিলেন দি আমেরিকান ম্যাগাজিনে। নিচতলার কর্মী হিসেবে। কাজ নির্দিষ্ট হল পাণ্ডুলিপি পড়ে দেখা আর প্রুফ দেখা। কিন্তু স্বাধীন ইচ্ছেয় লিখতে আগ্রহ। এখানে ওখানে প্রবন্ধ নিবন্ধ গল্প লিখে পাঠিয়ে দেন। কোথাও চট করে সুযোগ মেলেনা। কলেজের ম্যাগাজিনের পর বাণিজ্যিক কাগজ হিসেবে জন রীডের লেখা প্রথম ছাপল দি স্যাটারডে ইভনিং। এরপর লেখা বেরোতে লাগল বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। কোলিয়ার্স, দি ফোরাম, দি সেঞ্চুরি ম্যাগাজিন। ১৯১৩তে জড়িয়ে পড়েন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী পত্রিকা গোষ্ঠী দি মাসেস এর সঙ্গে। এই সম্পর্ক দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে। এই পত্রিকায় তিনি প্রায় পঞ্চাশটি আর্টিকেল লেখেন। এই ১৯১৩তে রেশম মিলের শ্রমিকরা ধর্মঘট করছিলেন। শ্রমিকদের দাবির পাশে দাঁড়িয়ে গেলেন হার্ভার্ড থেকে পাশ করা জন রীড। আর তাই কারারুদ্ধ হলেন তিনি। জীবনে বহুবার কারারুদ্ধ হয়েছেন। এই তার শুরু। ন্যায্য দাবি তোলায় জেলের ভিতর নির্যাতন ও অসম্মান তাঁকে শ্রমিকদের অধিকার অর্জনের সপক্ষে অনেক কট্টর ও জেদি করে তোলে। এই সময় প্রতিষ্ঠা হল শিল্পশ্রমিকদের সংগঠন দি ইণ্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। জন রীড এই সংগঠনের পাশে দাঁড়ালেন। এই সময় মেক্সিকোয় বিপ্লব চলছে।
১৯১৩ তেই মেট্রোপলিটন ম্যাগাজিনের হয়ে তিনি সেই বিপ্লবের সংবাদদাতার দায়িত্ব নিয়ে মেক্সিকো পাড়ি দিলেন। এই মেক্সিকো বিপ্লব সংবাদ আলেখ্য জন রীডকে জাতীয়স্তরে দায়িত্বশীল সংবাদ ভাষ্যকার হিসেবে পরিচিত করে তুলল।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা দেশে দেশে ঘটনাচক্র নিজের অনুকূলে প্রভাবিত করতে চাইত। দুনিয়াজোড়া কূটনৈতিক দাদাগিরি আমেরিকার বহুদিনের বদভ্যাস। মেক্সিকোর পরিস্থিতিতে আমেরিকা যাতে তার জঘন্য নাকটি না গলায় সে বাবদে জন রীড হুঁশিয়ারি দিলেন। তাঁর এই সমস্ত লেখালেখি এক মলাটে বন্দি করে ১৯১৪তে বই বেরোলো ‘ইনসারজেন্ট মেক্সিকো’।
এই ১৯১৪ সালের এপ্রিলে কলোরাডোতে ঘনিয়ে উঠল একটা সমস্যা। কলোরাডো ফুয়েল অ্যাণ্ড আয়রণ কোম্পানির সঙ্গে খনিশ্রমিক সংগঠনের দ্বন্দ্ব বাধল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রদেশটির অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল খনিজ সম্পদ। লোহা ও কয়লা তার অন্যতম। এই খনি এলাকার শ্রমিকদের উপর জঘন্য ধরণের শোষণ হত। শ্রমিকরা এই নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে শিল্পপতি জন ডি রকফেলার জুনিয়র সাংঘাতিকভাবে আক্রমণ করলেন। তারিখটা ছিল ত্রিশ এপ্রিল, ১৯১৪। এটাই কলোরাডো যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই বিষয় নিয়ে জন রীড কলোরাডোর খনি এলাকায় গিয়ে, সেখানে থেকে, বিস্তর অনুসন্ধান করে দেখলেন, এই সমস্যার গভীরে রয়েছে শ্রেণীদ্বন্দ্ব। নিজের উপলব্ধির কথা স্পষ্ট ভাষায় বললেন জন রীড। এ নিয়ে একটি আর্টিকেল লিখে ফেললেন তিনি। জুলাই মাসে তা প্রকাশিত হল।
১৯১৪তেই জার্মানির সঙ্গে ফ্রান্সের যুদ্ধ বেধে গেল।
সেটা আঠাশে জুলাই। এটাই হয়ে দাঁড়ায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধ বেধে যাবার কয়েক দিনের মধ্যে আগস্ট মাসের ১৪ তারিখে জন রীড মেট্রোপলিটন কাগজের হয়ে যুদ্ধ সাংবাদিকতা করবেন বলে ইউরোপ গেলেন। প্রথমেই গেলেন ইতালি। কেননা তখনো অবধি ইতালি যুদ্ধে জড়ায় নি । এখানে ছিলেন মাবেল ডজ। এই ভদ্রমহিলার সাথে কিছু দিন আগেই রীডের হৃদ্যতা হয়েছিল এবং ‘ইনসারজেন্ট মেক্সিকো’ পুস্তকটি সংকলন ও সম্পাদনায় মাবেল রীডকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। ইতালির নেপলস এ গিয়ে মাবেল এর সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ হলেন রীড। মাবেল ডজকে নিয়ে রীড পারী গেলেন। পারীতে সুবিধা হল না। ওঁরা গেলেন লণ্ডন। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে উঠতে মাবেল নিউইয়র্কে ফিরে গেলেন। অবশ্য মাবেল তাঁর জীবনে নানা পুরুষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে সংবাদ সংগ্রাহকদের যাওয়ার ব্যাপারে বাধা নিষেধ আরোপ করায় রীড মনের মতো করে কাজ করতে পারছিলেন না।
এই সময়ে জন রীড বেশ টের পেয়ে গিয়েছেন যে যুদ্ধ আসলে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা। এই সময়ে রীড ফ্রান্সের গণিকাপল্লীতে ঘুরে ঘুরে আলাপ পরিচয় করে ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদ কি করে নারীর জীবনটাকে বেশ্যাবৃত্তির দিকে ঠেলে দেয়, সেই বিষয়ে ধারণা গড়ে তুললেন।
এই সময় এক জার্মান মহিলার সাথে জন রীডের একটু হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। জার্মান শ্রমিক নেতা কার্ল লিবনেক্ট এর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন।
গভীর বেদনা ও হতাশার সাথে রীড লক্ষ্য করলেন যে, সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ বাধিয়ে দেবার অপচেষ্টার মোকাবিলা করতে শ্রমিক নেতৃত্ব সংহত হয়ে উঠতে পারল না। জন রীড প্রচণ্ডভাবে হতাশ হলেন। যুদ্ধদীর্ণ ইউরোপের কোণে কোণে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে জন রীড অ্যারেস্টেড হয়েছিলেন। তারপর গুলিবিদ্ধ হবার মুহূর্তে এক আমেরিকান রাষ্ট্রদূত তাঁর জীবনরক্ষা করেন। ছন্নছাড়া একটা জীবনে ধ্রুবতারার মতো একটি অদ্বিতীয় লক্ষ্য গড়ে তুলেছিলেন জন রীড। তা হল শ্রমজীবী মানুষের সচেতন সক্রিয় ঐক্য ও সংহতি। তিনি বেশ বুঝতে পেরেছিলেন শ্রমিকদের সচেতন ঐক্যই যুদ্ধ রুখে দেবার গ্যারান্টি। তাঁর ইউরোপের দেশে দেশে ছুটে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লেখেন ‘দি ওয়ার ইন ইস্টার্ন ইউরোপ’। সেটা ১৯১৬র এপ্রিল।
১৯১৬র জানুয়ারিতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয় লুইসি ব্রায়ান্ট নামে ভদ্রমহিলার।
লুইসি ছিলেন একজন আমেরিকান নারীবাদী মহিলা। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। একই সাথে তিনি ছিলেন সাংবাদিক। ইতিহাসের স্নাতক মেয়েটি ১৯১৫ তে বিবাহবিচ্ছেদের পর ১৯১৬র জানুয়ারিতে রীডের সাথে পরিচিত হন। অবশ্য ‘দি মাসেস’ কাগজের সাথে যুক্ত নারীবাদী নেতৃত্বকারিণী মহিলাদের সাথে তাঁর আগে থেকেই আলাপ পরিচয় ছিল। যাই হোক, ১৯১৬র গোড়ায় লুইসির সঙ্গে প্রেম জমে ওঠে রীডের। বয়সে প্রায় বছর দুয়েক বড় মেয়েটির প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেন রীড। এই সময় রীড কবিতাও লিখছেন। এই ১৯১৬ তেই কবিতার বই লিখলেন ট্যাম্বারলাইন অ্যাণ্ড আদার ভার্সেস। গাঁটের পয়সা খরচ করে বের করলেন বইটি।
নভেম্বরে দুজনে বিয়ে করলেন। এই বছরই শরীর খারাপ হয়ে একটি কিডনি বাদ দিতে হল। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার বুকে বিপ্লব। লুইসি এবং রীড দূজনেই এই বিপ্লব চলাকালীন রাশিয়াকে খুঁটিয়ে দেখেছেন। দেখেছেন শ্রমজীবী মানুষের প্রতি অগাধ ভালবাসা মাখা চোখে।
লুইসি তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন রাশিয়ার বুকে ছয়টি লাল টুকটুকে মাস। সিক্স রেড মান্থস ইন রাশিয়া। আর জন রীড লিখলেন টেন ডেজ় দ্যাট শুক দ্য ওয়ার্ল্ড। দুনিয়া কাঁপানো দশদিন।
লুইসির সঙ্গে ঘরোয়া জীবন খুব একটা ছিল না তাঁর। বিপ্লব হচ্ছে রাশিয়ায়, আর বিপ্লবের ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে সাংবাদিকের কাজ করে চলেছেন। ১৯১৯এ আমেরিকায় গেলেন লুইসি। সেখানে মেয়েদের ভোটাধিকারের দাবিতে গলা ছাড়লেষ। এজন্য দিন তিনেকের জেল ভোগও হল তাঁর। সাংবাদিক তার কাজ করতে গিয়ে নিজের দেশেও কম হেনস্থা হয় নি লুইসির। তবে জন রীডের উপর আমেরিকার নির্যাতন ছিল মাত্রাছাড়া। রীড আর বেশি দিন বাঁচেন নি। ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবরে টাইফয়েড রোগ ছিনিয়ে নিয়েছিল তাঁকে।
আমেরিকার বুকে জন্মে বত্রিশ বছর বয়সে জীবনদীপ নিভল রীডের। চিরশান্তি মিলল রাশিয়ার মস্কো শহরে।
বছর সাতেক বাদে, ১৯২৭ সালে বিখ্যাত সোভিয়েত সিনে পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইন রীডের বিখ্যাত বই টেন ডেজ় দ্যাট শুক দি ওয়ার্ল্ড নামে ফিল্ম করলেন। ১৯৫৮তে আরেক সোভিয়েত চিত্র পরিচালক সের্গেই ভাসিলিয়েভ রীডের জীবন নিয়ে সিনেমা তৈরি করলেন। সেই ফিল্ম তিন তিনটি অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল।
মোটে বত্রিশ বছরের জীবন রীডের। তবুও তা শ্রমিক সংহতির সপক্ষে এমনভাবে যাপন করলেন, যাতে চিরকালের জন্য শ্রমজীবী মানুষের বন্ধু হয়ে রইলেন। যাঁরাই দুনিয়া কাঁপানো দশদিনের কথা ভাববেন, সোভিয়েত বিপ্লবের চর্চা করবেন, তাঁরাই এই আমেরিকান প্রেমিক যোদ্ধাকে মনে করবেন।