রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস।
(দ্বিতীয়ার্ধ)
গরিব মানুষের বিরুদ্ধে নানা রকম অত্যাচারের একটা ধরণ হল উচ্ছেদ। সভ্যতার গোড়াপত্তনের আগে, মানবসমাজের ঊষালগ্নে ভূসম্পত্তিতে প্রকৃতি সকলকে সমানাধিকার দিয়েছিল। কিন্তু সভ্য হয়ে উঠতে থাকা মানুষ সেখানে মালিকানা আর দখলের ধারণা আনল। দুর্বল মানুষ গোষ্ঠীপতির আনুগত্য স্বীকার করত। ক্রমে ভূপতি মহীপতি গণপতি ও নৃপতির আবির্ভাব ঘটে। দুর্বল মানুষ রাজাকে খাজনা দিত। রাজারাও বিস্তৃত এলাকায় খাজনা আদায়ের জন্য মধ্যবর্তী স্তরের লোক রাখত। এই সূত্রেই সামন্তরাজা আর জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি। নিজে জমিদার হয়েও, ভূমিস্বত্বের উপর নির্ভরশীল হয়েও রবীন্দ্রনাথ এই রাজা এবং জমিদারদের অবস্থানের অনৈতিক জায়গাটা দেখাতে থাকেন। ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থে ২৫ আশ্বিন, ১৩০৬ বঙ্গাব্দে ‘দিব্যাবদানমালা’ থেকে উপাদান নিয়ে কাশীর মহিষী করুণার উপাখ্যান বলেন তিনি। কবিতার নাম ‘সামান্য ক্ষতি’। গল্পাংশটি এরকম, কাশীর মহিষী করুণা একদিন শখ করে শীতকালে মাঘমাসে, রাজধানী থেকে দূরে নির্জন গ্রাম্য এলাকায় বরুণা নদীতে স্নান বিলাসে যাবেন। সঙ্গে রয়েছে তাঁর একশ সখী ও দাসী। যেহেতু রাণী উন্মুক্ত নদীতীরে স্নান করবেন, তাঁর আব্রু সুনিশ্চিত করতে রাজার শাসনে সে দিনের জন্য ওই নদীতীরে গ্রাম্য এলাকায় কার্ফ্যু জারি করে দেওয়া হয়েছে। রাণী নদী থেকে মাঘের শীতে স্নান করে উঠে গা হাত পা সেঁকে নেবার জন্য দাসীদের আগুন জ্বালতে বললেন। কাছে কোনো কাঠের যোগাড় ছিল না। আশেপাশের গাছ থেকেও উপযুক্ত কাঠ না পেতে, হঠাৎ রাণীর মাথায় বুদ্ধি জাগল, একটি দরিদ্রের কুটিরে আগুন লাগিয়ে গা হাত পা সেঁকে নেবেন। তখন তাঁর সঙ্গিনীদের মধ্যে একজন মহিলা, মালতী, রাণীর এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে কথা বলেন, আপত্তি করেন এবং রাণী করুণা তাতে মালতীর উপর রুষ্ট হয়ে তাঁকে দূর করে দেবার নির্দেশ দেন।
এরপরে ঘটনা সংক্ষিপ্ত। কবি লিখেছেন, অতি দুর্দাম কৌতুকরত/ যৌবনমদে নিষ্ঠুর যত/ যুবতীরা মিলি পাগলের মতো/ আগুন লাগালো কুটিরে।
ঘটনার গতির উপর মানুষী নিয়ন্ত্রণ রইল না। আগুন ছড়াতে লাগল দ্রুত গতিতে। কবি আগুনের ভয়াবহতাকে বর্ণনা করতে উল্কা, লোল জিহ্বা, জ্বালাময়ী নাগিনী, গর্জন গান, প্রলয় মত্ত এবং দীপক রাগিণী শব্দগুলি ব্যবহার করেছেন। তারপর লিখেছেন, ‘ উত্তরবায়ু হইল প্রবল,/ কুটির হইতে কুটিরে অনল/ উড়িয়া উড়িয়া ছুটিল। তারপর, রাণীর কৃতকর্মের জন্য পরিণতি কি হল, লিখেছেন কবি, ছোটো গ্রামখানি লেহিয়া লইল/ প্রলয়লোলুপ রসনা। এরপর কি কি হল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাটি পড়লে জানা যায়।
উচ্ছেদের প্রতিবিধান কাশীরাজ করেছিলেন। কিন্তু সাধারণতঃ গরিবের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ আক্রমণের প্রতিবিধান বাস্তব জগতে দেখা যায় না। ৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০২ বঙ্গাব্দে, ‘কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থে ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতাটি লেখেন রবীন্দ্রনাথ। কবিতাটি সুপরিচিত ও বহুপঠিত। এই কবিতার কয়েকটি পংক্তি যেন প্রবাদ হয়ে গিয়েছে। ‘ এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি/ রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’
কবি বলেন, ‘ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি/ তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারিনে সেই দুই বিঘা জমি। একেবারে শেষে আমরা পাই, ‘তুমি মহারাজ, সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’ এও যেন প্রবাদ হয়ে উঠেছে।
নৈতিকতার সমস্ত সামাজিক মানদণ্ড, ন্যায়বিধান, ন্যায়বিচার এবং ঈশ্বরীয় সুবন্দোবস্তের সমস্ত ধারণাকে কঠিন আঘাত করে এই প্রশ্ন তোলেন এক কবি। যাঁর সহোদর দাদা ছিলেন একজন আইসিএস জজসাহেব, পারিবারিক আত্মীয়বর্গের কেউ কেউ ছিলেন ব্যারিস্টার, কেউ কেউ ছিলেন বিচারকের সহযোগী জুরি। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর জমিদারি উপস্বত্ব হতে আহৃত ধনসম্পত্তিতে সেকালের বাংলা তথা ভারতে অন্যতম সেরা ধনী ছিলেন। যার জন্য ব্রিটেনের রাণীর সাথে সৌহার্দ্য স্থাপন তাঁর পক্ষে সহজ হয়েছিল। সামগ্রিক ভাবে ঠাকুর পরিবার ছিল জমিদারির আয়ে পুষ্ট। এই কারণেই দেশের আইন এবং বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশের কাজকর্ম সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা রবীন্দ্রনাথের ছিল। সেই রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, ‘করিল ডিক্রি সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে’, তখন তাঁর দেখাটাকে নিছক ওপর ওপর দেখা বলে নস্যাৎ করা যায় না। আগ্রহী পাঠক এই সব কবিতার সাথে তাঁর রক্তকরবী এবং মুক্তধারা নাটক দুটি পাঠ করলে শোষণমূলক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গরিব মানুষের দশা, ব্যুরোক্রাট, টেকনোক্রাটদের অবস্থান আরো স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাবেন।
‘শাস্তি’ গল্পে নায়েব গোমস্তার আচরণ এবং পুলিশ, পেয়াদা, পেশকার ও বিচারকের কাছে সাক্ষ্য মামলা বিচার জিনিসগুলো ঠিক কি, তাও আমরা দেখতে পাই। বিচারক’ গল্পে জজ মোহিত মোহন দত্ত, স্ট্যাটুটরি সিভিলিয়ান , ক্ষীরোদাকে কি রকম কঠিন শাস্তি দিয়েছিলেন, তা পৌষ, ১৩০১ বঙ্গাব্দে কবি লিখেছেন। ‘হালদারগোষ্ঠী’ গল্পে ব্রিটিশ ভারতের বিচার ব্যবস্থা কবির চোখে নৈতিক ও মানবিক প্রশ্নে কোন্ জায়গায় ছিল, তা আমরা দেখতে পাই।
সমাজ যে শ্রেণিবিভক্ত, এবং তেমন বিভক্ত সমাজে শ্রেণিগত অবস্থান বিচারের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়, তা বুঝতে ও বোঝাতে রবীন্দ্রনাথের ক্লান্তি ছিল না। আমি গোরা উপন্যাসের কথা বিশেষ ভাবে স্মরণ করছি। ভদ্র, শিক্ষিত, স্বচ্ছল, মধ্যবিত্ত কিভাবে ব্রিটিশ প্রশাসনের পদলেহন করত, তা ব্রাহ্মসমাজের ধর্মনেতা হারাণবাবু ওরফে পানুবাবুর চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটকে খুশি করতে একটি শিক্ষিত আলোকপ্রাপ্ত ব্রাহ্ম পরিবার সন্তান সন্ততিসহ ব্রিটিশ কর্মচারীর মনোরঞ্জনের জন্য নাটক এবং কবিতা পাঠে কতটা উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে থাকে, তা তিনি ক্লান্তিহীন কলমে লিখেছেন।
ওই গোরা উপন্যাসেই গরিব মুসলমান মালবাহক ইংরেজের কোচোয়ানের হাতে চাবুকের মার খেয়ে, সে অত্যাচারের প্রতিবিধানের ভার আল্লার হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত থেকেছে, তাকে মেরুদণ্ডহীনতা বলে চিনতে রবীন্দ্রনাথ দ্বিধা করেন নি।
এর পাশাপাশি কুসংস্কারের কারণেগরিব ছুতোর কাঠমিস্ত্রি ঘরের নওজোয়ান ছেলের কাজের সরঞ্জামের ঘায়ে ধনুষ্টঙ্কারে আক্রান্ত হলে কিভাবে ওঝাকে দিয়ে তাকে সারারাত মারধোর করা হয়, তাও তিনি দেখিয়েছেন।
খুব যত্নের সঙ্গে তিনি নিচের থাকের হিন্দু ও মুসলমান ভারতীয়ের অজ্ঞতা ও অশিক্ষা এবং আত্মবিশ্বাসহীনতাকে দেখাতে থাকেন। তার পাশাপাশি দেখান, এদের সাথে শিক্ষিত স্বচ্ছল ভারতীয়ের মানসিক বিচ্ছিন্নতাটা।
এতখানি বিচ্ছিন্নতা নিয়ে একটা দেশ এবং জাতি কিভাবে স্বাধীন হবে এবং কালের গতিকে ইংরেজ যদি ভারতকে ছেড়েও যায়, তাহলে কোন্ ভারত অবশিষ্ট থাকবে, তা নিয়েও রবীন্দ্রনাথের উদ্বেগের অবধি ছিল না।
‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে স্বদেশী হুজুগ ও স্বদেশীর নামে দেশের গরিবের উপর তথাকথিত স্বদেশ ব্রতধারী নায়কদের নিষ্ঠুরতা তিনি কলমের আঁচড়ে দেখাতে দ্বিধা করেন নি। দেশ জিনিসটা যে আসলে যুক্তি ও বিজ্ঞান দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করে, বুঝে কাজ করার জায়গা, সেটা বারবার ধাক্কা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে থাকেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতার প্রথম পংক্তিটি ছিল এই রকম “সোম মঙ্গল বুধ এরা সব আসে তাড়াতাড়ি, এদের ঘরে আছে বুঝি মস্ত হাওয়া গাড়ি?” বলতে বলতে রবিবারের কথা আসে। শিশুর মন নিয়ে কবি বলেন, “সে বুঝি মা তোমার মতো গরিব ঘরের মেয়ে?”
‘গরিব ঘরের মেয়ে’, এই কথাটা রবিবার এই আইডিয়ার সাথে লগ্ন করে দিতে পারাটা এক দুরন্ত ব্যাপার। আর, গরিবের মধ্যে যে মেয়েরা আরো হদ্দ গরিব, শোষিতের মধ্যেও চরমতম শোষিত, সর্বহারার মধ্যেও আরো সর্বহারা, সেটা অনুভব করাতে “আফ্রিকা” কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন, দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে। আফ্রিকার উপর যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আস্ফালন আক্রমণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মানহারা মানবীর কথা বলেন, কেননা কবিকে খবর রাখতে হয়, যারা শাসন করে তারা শুধুমাত্র শাসিত অংশের নিরপরাধ মানুষের বুকে গুলিই ছোঁড়ে না, তাদের ঘরের মা বোনকে ধর্ষণ করায়। শক্তিমানের পক্ষে শাসিত জনগোষ্ঠীর মনোবল ভেঙে দেবার জন্য ধর্ষণ একটা প্রচণ্ড কার্যকর অস্ত্র। গণতন্ত্রের নাম জপতে জপতেও ইন্টারনেট বন্ধ করে রেখে নারীমর্যাদা লুণ্ঠন করতে থাকে শাসক।
যৌবনের দিনগুলিতেই ১৮৮৬ সালের ২৮ – ৩০ ডিসেম্বরে কলকাতায় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনের যোগাযোগে দেশভক্ত ব্যারিস্টার তারকনাথ পালিতের বাড়িতে ভোজসভায় গান গেয়েছিলেন, আমায় বোলো না গাহিতে বোলো না। বলেছিলেন, ‘এসেছি কি হেথা যশের কাঙালি কথা গেঁথে গেঁথে নিতে করতালি -/ মিছে কথা কয়ে, মিছে যশ লয়ে, মিছে কাজে নিশিযাপনা।’ ওই কংগ্রেসের আর এক সভায় তিনি গেয়েছিলেন
ঘোর তিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে/ জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়নে অনিমেষে’। এই গানটি শোনামাত্র নেতাজি সুভা চন্দ্র বসু জনগণমনঅধিনায়ক গানটির গভীর মর্মবাণী হৃদয়ে অনুভব করেন এবং পরে আজাদ হিন্দ বাহিনীতে এই গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মর্যাদা দেন। লক্ষ্য করা প্রয়োজন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ইংরেজ অপশাসনের অবসান ঘটাতে রাশিয়া হয়ে জার্মানি যান। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর জাতীয় সঙ্গীত স্থির করতে একটি কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি ১৯৪১ সালের ২ নভেম্বর তারিখে জনগণমনঅধিনায়ক গানটি বাহিনীর জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে চূড়ান্ত করে। পরে ১৯৪২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে জার্মানির হামবুর্গ শহরে জার্মান ইণ্ডিয়া সোসাইটির সভায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বয়ং জনগণমনঅধিনায়ক গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে পরিচিত করান।
স্বাধীনতা প্রাপ্তির পূর্ব মুহূর্তে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালে কনসটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলির বৈঠক বসেছিল। তার অন্ত্যপর্বে বৈঠক সমাপনী অনুষ্ঠানে সদস্যরা সম্মিলিত কণ্ঠে ‘জনগণমনঅধিনায়ক’ গেয়েছিলেন। পরে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি তারিখে স্বাধীন ভারত এই গানটি জাতীয় গাথা হিসেবে গ্রহণ করে।
গরিবের মুক্তিকে যাঁরা গরিবকে কিছু সুবিধা পাইয়ে দেবার নামান্তর বলে মনে করেন, তাঁরা আসলে শোষিত মানুষের মুক্তি আন্দোলনকে পিছন থেকে ছুরি মারেন। গরিবকে মুক্তি পেতে হলে, তার সুবিধাবাদ, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, ভীরুতা, এবং মেয়েদের প্রতি অসম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি সমূলে ত্যাগ করতে হবে। যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গরিবের এই সমস্ত দোষের সঙ্গে আপোসরফা করে লড়াই সংগ্রামের কথা বলেন, তাঁরা গরিবের বন্ধু নন। গরিবের মুখোমুখি শত্রুর চেয়ে তাঁরা অনেক বেশি ভয়ানক। গরিবকে শোষণমুক্তির লড়াইতে জিততে হলে নিজের স্বার্থে এই ছদ্মবেশীদের বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে – রবীন্দ্র সাহিত্যপাঠ আমাকে এই বোধে উপনীত করে।