দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৯৮)

পর্ব – ১৯৮

খুব অভিমান করেই এতদিনের চেনা আস্তানাটা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল শ‍্যামলী। বাবাকে চাপ দিয়ে জামাইবাবু দলিলে সই করিয়ে নিয়েছে। এই চাপ দেবার চেষ্টাটা আগে থেকেই চলছিল। রক্ত সম্পর্ক জিনিসটা একটা কুসংস্কারের মতো। রক্তের সম্পর্ক না থাকলে তুমি আমার কেউ নও। এটা একটা আদিম কুসংস্কার।
অথচ ভায়ে ভায়ে ঝগড়াঝাঁটি এদেশের মানুষের একটা বৈশিষ্ট্য। দেওয়ানি কোর্টে যাও, দেখবে বেশিরভাগ মামলা জমি নিয়ে। ভায়ে ভায়ে, জ্ঞাতিদের মধ‍্যে মামলা, দিনের পর দিন। এরা কিন্তু সবাই রক্তের সম্পর্কে আত্মীয়।
আজ কারখানায় গিয়ে যে দুর্ব‍্যবহার পেল দাদা আর ভাইয়ের কাছে, সেটা ও বাবার কাছে বলে নি। বাবাকে বললে, তাঁর দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর কি কিছুই করার থাকত? এই অবস্থায় এক বাড়িতে থাকা মানে নিত‍্যদিন ধিক্কার আর যন্ত্রণা আর গায়ে হাত তোলার ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এক বাড়িতে থাকা আর কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কিন্তু একটা মেয়ে কোথায় যাবে? বাড়ির লোকজন যদি একটি মেয়ের উপর অন‍্যায় আচরণ করতে থাকে, একটি অবিবাহিত মেয়ে যাবে কোথায়? বিয়ের পর যদি স্বামী শ্বশুরের আচরণগত সমস্যা লক্ষ্য করে একটি মেয়ে, তার জীবন যদি অতিষ্ঠ হয়ে যায়, সে তখন যাবে কোথায়? ভায়েরা যে তার গায়ে হাত তুলেছে বার বার, কঠিন আঘাত করেছে, এ কথা পুলিশের কাছে বলতে তার রুচিতে বেধেছে। পুলিশকে জানালে হয়তো সাময়িক ভাবে তারা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে যাবে। তারপর তারা জামিন পেয়ে বাড়িতে ফিরে এসে আবার কি করবে, সেটাও তো মাথায় রাখতে হবে। পুরোনোপন্থী শান্তিপ্রিয় মানুষ এর থেকে রেহাই পাবার একটা রাস্তা জানত, মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া। মামাবাড়িতে মাসিদের সব চটপট বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। এক যে ছিল ছোটদাদু। তিনি ওপর ওপর খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন। ভিতরে পাকা ধড়িবাজ। তাঁর হাতে বাড়ির কুমারী মেয়েরা অশোভন স্পর্শের শিকার হত। দিদিমারা উপায় খুঁজে বের করলেন, মেয়েগুলোর বিয়ে দিয়ে দাও। দাদুদের কানে ওসব ছুটকো কথা তুলতেনই না দিদিমারা। তাঁরা জানতেন, পুরুষদের কাছে কোন্ কথাগুলো বলতে হয়, আর কোন্ গুলো বলতে নেই। তার চেয়ে অনেক সহজ মেয়েদের বিয়ে ঠিক করে ফেলা। কিন্তু বিয়ের পর?
বিয়ের পর যদি একটা তরুণী বধূ শ্বশুর বাড়িতে অন‍্য পুরুষের হাতে লাঞ্ছিত হয়? বিশেষতঃ বিধবা তরুণীটি যদি যৌনলাঞ্ছিত হয়? তাহলে ঠিক কি হয়, তা বুঝতে শরৎচন্দ্রের উপন্যাস পড়তে হবে।
বঙ্কিমচন্দ্র অনেকটা দেখিয়েছেন। বাঙালি পয়সাওয়ালা ব্রাহ্মণ পুরুষের আচরণ দেখিয়েছেন দেবী চৌধুরাণীতে। বজরা ডুবে জলের নিচে তলিয়ে গেলে দুর্গানাম জপ করার কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন হরবল্লভ, প্রফুল্লর শ্বশুর। অনেক দেখিয়েছেন বঙ্কিম। তবু পরিবারের ভিতর মেয়েদের উপর যৌন অত‍্যাচার নিয়ে তখনো বলা যায় নি। সেটি বললেন শরৎচন্দ্র। কিভাবে বেণী ঘোষাল রমাকে ব্ল‍্যাকমেল করে করে রমেশের বিপরীতে তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে। প্রথম প্রথম জ‍্যেঠাইমা চরিত্রটাকে বড় অবাস্তব অশরীরী মনে হত। পরে মনে হল, বেণী ঘোষালের মত ছেলেরা একটু বয়স্ক হবার পর মাকে পাত্তাই দিত না। রবি ঠাকুরের চোখের বালিতে মহেন্দ্র আশা বিনোদিনী সম্পর্কে রাজলক্ষ্মীর জায়ের ভূমিকার ওজন কতটুকু?
হঠাৎ পদ্মজা নাইডুর কথা মনে পড়ে গেল শ‍্যামলীর। পদ্মজা নাইডু পশ্চিমবঙ্গের রাজ‍্যপাল ছিলেন। কিন্তু তাঁর চোখ ছিল বিপত্নীক জওহরলাল নেহরুর দিকে। নেহরুর তরফে কি আপত্তি ছিল? ঠিক জানা নেই। তবে পদ্মজা নাইডু যেতেন নেহরুর আবাসে। থাকতেন একসাথে। নেহরুপুত্রী ইন্দিরা তাঁর পিতার ব‍্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন।  ইন্দিরার অমত ছিল নেহরুর সঙ্গে পদ্মজার নতুন করে সংসার প্রতিষ্ঠায়। ইন্দিরাই চারহাত এক হতে বাধা হয়ে দা‍ঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু নেহরুর আবাসে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকার ব‍্যবস্থা ছিল পদ্মজা নাইডুর। ব‍্যথাজড়ানো হাসি পেল শ‍্যামলীর।  অনসূয়া দি’র বাড়িতে কিছুতেই থাকা যাবে না। অনসূয়া দির তরফে আন্তরিক ভাল ব‍্যবহারের কিছু মাত্র অভাব নেই। কিন্তু দুটি মানুষ আলাদা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। বিচারধারা আলাদা। দৈনিক একসাথে থাকলে সেই পার্থক্যগুলোই বড় হয়ে দাঁড়াবে।
একটা কোনো কাজ যদি যোগাড় হত, তো বেশ হত। কিন্তু কাল আর আজ সারাদিন ধরে ঘুরে ঘুরেও কাউকে গিয়ে বলতে পারল না ওগো, দুটি শুকনো রুটি যোগাড় হয়, এমন একটা যা হোক কাজ জুটিয়ে দাও আমায়।
নরেন্দ্রনাথ দত্ত দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে মাতৃসাধক শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে গিয়ে নিজের অনটনের কথা বলেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সদ‍্যযুবক নরেন্দ্রকে বলেছিলেন ভবতারিণীর কাছে গিয়ে অন্নকষ্ট নিবারণের জন‍্য দরবার করতে। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের কালিপ্রতিমার নাম ভবতারিণী। তো নরেন্দ্র ভবতারিণীর কাছে কিছুতেই নিজের অন্নকষ্টের কথা বলে উঠতে পারেন নি। আচ্ছা, নরেন্দ্র দত্তের মতো সুস্থ মানুষের পক্ষে কি প্রতিমার কাছে গিয়ে অন্নসংস্থানের ব‍্যবস্থা করে দিতে বলা সম্ভব ছিল?
মনে পড়ে শ্রীনিবাস রামানুজনের কথা। সারাক্ষণ গণিতের গভীরে ডুবে থাকতে ভালবাসতেন। গণিত ছিল ধ‍্যানজ্ঞান, একমাত্র উপাস‍্য।
তাইতে গণিত বিভাগে ভাল ফল করলেও পড়ার অভাবে অন‍্য সব বিষয়ে ফেল করলেন। গ্রাজুয়েট হয়ে উঠতে বাধা সৃষ্টি হল। নিজের গণিত গবেষণার খাতা নিয়ে ভারতীয় গণিতজ্ঞদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন রামানুজন। এই দেখুন, আমি একটু অঙ্কটঙ্ক নিয়ে কাজ করি। আমায় দুটো শাকভাতের যোগাড় করে দিন না, পেটে দুটি দিতে না পারলে বাঁচব কি করে? রামানুজনের মত যুগন্ধর মহাগণিতজ্ঞকে বুঝতেই পারেন নি সমসাময়িক ভারতীয় গণিতবিদগণ। তাঁঁর অঙ্কের খাতা দেখে পাগল ছাগল ভেবে তাড়িয়ে দিয়েছেন। রামানুজনকে খানিক খানিক বুঝেছিলেন হার্ডি। কেম্ব্রিজে গিয়ে তবে মানুষ একটু বুঝতে পারল অসীমের গণিতকারকে। তখন আর জীবনীশক্তি খুব একটা অবশিষ্ট নেই।
কাউকে নিজের অভাবের কথাটা বলতে পারবে না শ‍্যামলী। সম্ভব নয়। আর পড়াশুনা? ছেড়ে দেবে। বারুখ স্পিনোজাকে মনে পড়ল শ‍্যামলীর। কোথাও অধ‍্যাপনা করতে চাইলেন না। কোনো সম্মান, কোনো পুরস্কার গ্রহণে রাজি হলেন না। শুধু লেন্সের কাচ ঘসে ঘসে জীবন শেষ করে দিলেন। কাচের সূক্ষ্ম ধুলোয় ফুসফুসের অসুখ ধরে গেল। তাতেই মরলেন স্পিনোজা। দর্শনচিন্তাকে আধুনিক খাতে বইয়ে দেবার কারিগর। চুয়াল্লিশ বছর বয়সে জীবনের ছুটি হয়ে গেল তাঁর। শ‍্যামলীও কোনো একটা কাজ, যাহোক কিছু একটা কাজ খুঁজে নেবে। আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়বে। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, যে কোনো একটা কাজ নিয়ে সে পরিশ্রম করে অন্ন উপার্জন করবে। তার আগে রমানাথের কাছে একটু বিদায় চেয়ে নিতে হবে। জীবনের একটা বড় মোড় ঘুরছে। তাঁর কাছে একটিবার বিদায় চেয়ে নিতে হবে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।