রবিবারে রবি-বার – এ মৃদুল শ্রীমানী

মৃত্যুর নিপুণ শিল্প
প্রান্তিক: একটি মহাজাগতিক পরিভ্রমণের কথা।
পুনশ্চ যেন নতুন করে শুরু। শেষ করার আগে আরো একটু দরকারি প্রসঙ্গ ছোট্ট করে উল্লেখ করা। ‘পরিশেষ’ -এ কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসৃষ্টিপ্রবাহ থামল না। নতুন একটা বাঁকবদল হল। ভাষায় ছন্দে দেখার আঙ্গিকে একটা উল্লেখযোগ্য বদল। ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের পর এল বিচিত্রিতা, শেষ সপ্তক, বীথিকা, পত্রপুট, শ্যামলী, প্রান্তিক, সেঁজুতি, নবজাতক, এরকম আরো কতকগুলি কাব্যগ্রন্থ।
এরমধ্যে ‘প্রান্তিক’ কাব্যগ্রন্থ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুসংক্রান্ত ভাবনার সঙ্গে বিশেষ ভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৩৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ হতচৈতন্য হয়ে পড়েন। তিনি তখন শান্তিনিকেতনে। সুস্থ হয়ে ওঠেন দু দিন পর। এই সুস্থতায় প্রত্যাবর্তনকে তাঁর মনে হয়েছিল প্রায় মৃত্যুগুহা থেকে ফিরে আসা।
এর আগে রবীন্দ্রনাথের শরীর যে কখনো খারাপ হয়নি, তা কিন্তু নয়। তিনি অর্শের রোগী ছিলেন। আর সে রোগের সম্পূর্ণ নিরাময়ে দরকার ছিল অস্ত্রোপচারের। কিন্তু শল্যচিকিৎসায় কবির অনীহা ছিল। সে অনীহা যে তাঁকে সমস্যা থেকে আরাম দিয়েছিল, তা কিন্তু নয়। নেচারোপ্যাথি, জলচিকিৎসা ইত্যাদি নানারকম করেও অর্শ থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠলে তিনি অনেক দোদুল্যমানতার পর আধুনিক বৈজ্ঞানিক শল্যচিকিৎসার আশ্রয় নিয়েছিলেন। বিদেশে সেই অস্ত্রোপচার হয়েছিল।
সাধারণ মানুষের মতোই বয়সকালে শরীর তাঁকে কখনো কখনো সমস্যায় ফেলত। কিন্তু একেবারে টানা দু দিন ধরে হতচৈতন্য অবস্থায় থাকাটা তাঁর পক্ষে নতুন অভিজ্ঞতা ছিল।
কয়েক মাস পরে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দের সূচনায় নববর্ষ ভাষণে বলেছিলেন:
‘কিছুকাল পূর্বে আমি মৃত্যুগুহা থেকে জীবনলোকে ফিরে এসেছি।’ এই যে দুই দিনের হতচৈতন্য অবস্থা, এটা তাঁকে দিয়ে নিজের এত দিনের গড়ে ওঠা মূল্যবোধের একটা নতুন মূল্যায়ন করতে শেখায়। নিজের জাগতিক ক্রিয়াকলাপেরও একটা হিসাব নিকাশ ব্যালান্স শীট বের করেন তিনি।
১০ সেপ্টেম্বর ১৯৩৭ তারিখটা বাংলা ক্যালেন্ডারে ছিল ২৪ ভাদ্র, ১৩৪৪। ভাদ্র মাসে বাংলাভূমিতে গরম এবং গুমোট থাকে। বীরভূমের রুক্ষ প্রান্তরে তার দাহ আরো তীব্র হয়। সত্তরোর্ধ একজন প্রবীণ মানুষের পক্ষে ভাদ্রমাসের গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়া খুবই স্বাভাবিক।
সঞ্চয়িতায় ‘অবরুদ্ধ ছিল বায়ু’ শীর্ষক কবিতাটি আলোচ্য ঘটনার তিন বছর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ তারিখে লেখা। ওই কবিতায় একেবারে সূচনায় লিখেছেন:
“অবরুদ্ধ ছিল বায়ু; দৈত্যসম পুঞ্জমেঘভার
ছায়ার প্রহরীব্যূহে ঘিরেছিল
সূর্যের দুয়ার…
চিরপ্রাচীনতা স্তব্ধ হয়ে আছে বসে দীর্ঘকাল, ভুলে গেছে কথা,
ক্লান্তিভারে আঁখিপাতা বদ্ধপ্রায়।।…” তিন বৎসর আগের ভাদ্রেও কি প্রবীণ কবির অনুরূপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল?
১০ সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যায় কবির শারীরিক বিপর্যয়ের ঘটনাটা মনে রাখলে এই পংক্তিগুলির অর্থ অনেক স্পষ্ট হয়ে যায়।
মৃত্যুর অনুষঙ্গ এই কবিতায় এভাবে এসেছে:
“…..মনে ভাবি
পুরানোর দুর্গদ্বারে মৃত্যু যেন খুলে দিল চাবি,
নূতন বাহিরি এল; তুচ্ছতার জীর্ণ উত্তরীয় ঘুচালো সে…
তার আগে লিখেছেন:
“আপনারে দেখি আমি আপন-বাহিরে; যেন আমি
অপর যুগের কোনো অজানিত, সদ্য গেছে নামি
সত্তা হতে প্রত্যহের আচ্ছাদন;…”
রবির অন্তর্জীবনের সঙ্গে বিজড়িত সেই রহস্যপ্রতিমার কথা এই কবিতায়ও আছে, মৃত্যুর স্পর্শে তিনি যেন প্রকাশিত হচ্ছেন:
“…অস্তিত্বের পূর্ণ মূল্যে কী অভাবনীয়
প্রকাশিল তার স্পর্শে; কালো তার চুল
পশ্চিম দিগন্তপারে নামহীন বননীলিমায়
বিস্তারিল রহস্য নিবিড়।।”
তাঁর নিজের দুটি সত্তার কথা বলেছেন কবি। একটি তাঁর রক্তমাংসের বুকের পাঁজরের মধ্যে ধুকপুক করতে থাকা জৈব অস্তিত্ব। আরেকটি তাঁর পথিক সত্তা, সে দূরে দূরেই থাকে। এই কবিতা লেখার সময়ে এক সহমরণের কথা ভাবছেন লেখক। সহমরণে প্রবীণ স্বামীর দেহাবশেষকে চিতায় তোলার সময়ে তার তরুণী বধূকেও সেই চিতায় উঠতে হয়। এইভাবে সতী সহমৃতা হতেন। সেই অনুষঙ্গ আলোচ্য কবিতাটিতে এসেছে। কবি লিখেছেন:
“আজি মুক্তিমন্ত্র গায়
আমার বক্ষের মাঝে দূরের পথিকচিত্ত মম
সংসারযাত্রার প্রান্তে সহমরণের বধূ-সম।।”
মৃত্যুর স্পষ্ট অনুষঙ্গ রয়েছে ‘প্রান্তিক’ কাব্যগ্রন্থের “যাবার সময় হল বিহঙ্গের” শীর্ষক কবিতাতেও। এটি আরো আগে লেখা, ১৩৪১ বঙ্গাব্দের ১৫ বৈশাখ। হতচৈতন্য হয়ে পড়ার ঘটনার অনেক আগে লেখা এটি। এখানে লিখেছেন:
“যাবার সময় হল বিহঙ্গের। এখনি কুলায়
রিক্ত হবে; স্তব্ধগীতি ভ্রষ্টনীড় পড়িবে ধূলায়…
…শুষ্কপত্র জীর্ণপুষ্প-সাথে
পথচিহ্নহীন শূন্যে যাব উড়ে রজনীপ্রভাতে
অস্তসিন্ধু-পরপারে।..”
মৃত্যুগুহা থেকে যেন ফিরে এসে তিনি বলেন:
“দেখিলাম – অবসন্ন চেতনার গোধূলিবেলায়
দেহ মোর ভেসে যায় কালো কালিন্দীর স্রোত বাহি…
বিহঙ্গের মৌনগান অরণ্যের শাখায় শাখায়
মহানিঃশব্দের পায়ে রচি দিল আত্মবলি তার।
এক কৃষ্ণ অরূপতা নামে বিশ্ববৈচিত্র্যের ‘পরে
স্থলে জলে। ছায়া হয়ে, বিন্দু হয়ে, মিলে যায় দেহ
অন্তহীন তমিস্রায়।…”
(রচনা: শান্তিনিকেতন ৮ ডিসেম্বর, ১৯৩৭)।
বলেন:
“পশ্চাতের নিত্যসহচর, অকৃতার্থ হে অতীত,
অতৃপ্ত তৃষ্ণার যত ছায়ামূর্তি প্রেতভূমি হতে
নিয়েছ আমার সঙ্গ;….
…..ছিন্ন করো স্বপ্নের বন্ধন;
রেখেছ হরণ করি মরণের অধিকার হতে
বেদনার ধন যত কামনার রঙিন ব্যর্থতা–
মৃত্যুরে ফিরায়ে দাও।…
বাঁশিতে বেজেছে ধ্বনি, আমি তারি হব অনুগামী।”
(রচনা: শান্তিনিকেতন ৪ অক্টোবর, ১৯৩৭)।
‘অবরুদ্ধ ছিল বায়ু’ কবিতায় বলেছিলেন, ‘এই তো ছুটির কাল–
সর্ব দেহ মন হতে ছিন্ন হল অভ্যাসের জাল,
নগ্ন চিত্ত মগ্ন হল সমস্তের মাঝে।’
মৃত্যুগুহা থেকে ফিরে এসে লেখা
সঞ্চয়িতায় সংকলিত ‘কলরব মুখরিত খ্যাতির প্রাঙ্গণে’, যেটি প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থের ১১নং কবিতা, সেখানে লিখছেন:
‘কলরব মুখরিত খ্যাতির প্রাঙ্গণে যে আসন
পাতা হয়েছিল কবে, সেথা হতে উঠে এসো, কবি,–
পূজা সাঙ্গ করি দাও চাটুলুব্ধ জনতাদেবীরে
বচনের অর্ঘ্য বিরচিয়া।’
(রচনা: ১৮ ডিসেম্বর ১৯৩৭)
১২ নং কবিতায় লিখলেন:
“সাঙ্গ হল ফুল ফোটাবার ঋতু, সেই সঙ্গে সাঙ্গ হয়ে যাক
লোকমুখবচনের নিঃশ্বাসপবনে দোল খাওয়া।
পুরস্কার প্রত্যাশায় পিছু ফিরে বাড়ায়ো না হাত
যেতে যেতে; জীবনে যা-কিছু তব সত্য ছিল দান
মূল্য চেয়ে অপমান করিও না তারে; এ জনমে শেষত্যাগ হোক তব ভিক্ষাঝুলি…।”
২ নং কবিতায় লিখেছিলেন:
‘তোর আজন্মকালের ভিক্ষাঝুলি
চরিতার্থ হোক আজি, মরণের প্রসাদবহ্নিতে
কামনার আবর্জনা যত, ক্ষুধিত অহমিকার
উঞ্ছবৃত্তি-সঞ্চিত জঞ্জালরাশি দগ্ধ হয়ে গিয়ে
ধন্য হোক আলোকের দানে।
৪ নং কবিতায় লিখেছেন:
‘…. আদিম সৃষ্টির যুগে
প্রকাশের যে আনন্দ রূপ নিল আমার সত্তায়
আজ ধূলিমগ্ন তাহা, নিদ্রাহারা রুগ্ন বুভুক্ষার
দীপধূমে কলঙ্কিত। তারে ফিরে নিয়ে চলিয়াছি
মৃত্যুস্নানতীর্থতটে সেই আদি নির্ঝরতলায়।’
প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলির ছত্রে ছত্রে এই ধরনের কথা, নিজের অতীতকে অকৃতার্থ’ বলা, ‘অতৃপ্ত তৃষ্ণার ছায়ামূর্তি’ বলা, ‘পুরাতন আপনার ধ্বংসোন্মুখ মলিন জীর্ণতা’ বলা, নিজের সত্তাকে ‘ধূলিমগ্ন’, ‘রুগ্ন বুভুক্ষা’, ‘কলঙ্কিত’ ইত্যাদি শব্দে বিশেষিত করেছেন। যেন হাহাকার করে বলেছেন: ‘মৃত্যুরে ফিরায়ে দাও।’
কিন্তু প্রান্তিকের কবিতাগুলিতে নিজের অতীতকে কঠোর সমালোচনা ছাড়াও নূতনকে আহ্বান করার বিষয়টিও আছে:
‘গাব আমি, হে জীবন, অস্তিত্বের সারথি আমার
বহু রণক্ষেত্র তুমি করিয়াছ পার, আজি লয়ে যাও
মৃত্যুর সংগ্রাম শেষে নবতর বিজয়যাত্রায়।’ ( ৭ নং কবিতা)।
লিখেছেন:
‘হে পূষন্, সংহরণ করিয়াছ তব রশ্মিজাল,
এবার প্রকাশ করো তোমার কল্যাণতম রূপ,
দেখি তারে যে পুরুষ তোমার আমার মাঝে এক।’ ( ৯ নং কবিতা)
শান্ত সংহত স্বরের কথাও রয়েছে:
‘এপারের ক্লান্ত যাত্রা গেলে থামি,
ক্ষণতরে পশ্চাতে ফিরিয়া মোর নম্র নমস্কারে
বন্দনা করিয়া যাব এ জন্মের অধিদেবতারে।’
( ১৪ নং কবিতা)
লক্ষ করা দরকার ১৯৩৭ সালের ২৫ ডিসেম্বরে যীশুখ্রীস্টের জন্মদিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রান্তিকের দু দুটি কবিতা লিখেছেন। এই দুটি, ১৭ নং ও ১৮ নং, প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থের অন্তিম দুটি কবিতা। খ্রীস্ট জন্মদিন প্রান্তিক পর্বেও তাঁকে সমস্ত বঞ্চিত মানুষের সাথে এক পংক্তিতে দাঁড়িয়ে প্রবলের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই কবিতাদুটির কোনো কোনো অংশ প্রবাদের মতো পরিচিতি পেয়েছে:
‘কুৎসিত বীভৎসা-‘পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন।’ ( ১৭ নং কবিতা)। ‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস,
শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস–‘ ( ১৮ নং কবিতা)।
বেশ বোঝা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে শরীরের যে দুর্দশা, দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল, ক্রমেই তা অপসৃত হয়ে মাস তিনেকের মধ্যে চিরকালের লড়াকু মানুষটি আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন। তবু সব মিলিয়ে ১৯৩৭ এ সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর, এই পর্বে লেখা প্রান্তিকের কবিতাগুলি যেন একটা কসমিক জার্নি। মনে মনে একটা মহাজাগতিক পরিভ্রমণের লিখিতরূপ ধরা আছে এই সময়ের কবিতায়।