দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৯৪)

পর্ব – ১৯৪

কারখানায় ঢুকে শ‍্যামলীর মনে হল সে বুঝি কোনো অচেনা জায়গায় পা রেখেছে। একমনে কাজ করে চলেছে মিস্ত্রি মজুরেরা। তারা যেন ঠিক করে রেখেছে শ‍্যামলীর দিকে তারা তাকাবে না। অফিসঘরের দিকে তাকাতেই দেখতে পেল শান্তু আর অন্তু দুজনেই অফিস ঘরে বসে আছে। শান্তু বসেছে সেই চেয়ারটায়, যেটাতে বাবা বসতেন। বাবার চেয়ারে কখনো বসে নি শ‍্যামলী। আলাদা একটা চেয়ার নিয়ে সে বসত। আজ সেই চেয়ারটা অন্তু দখল করেছে। শ‍্যামলী অফিসঘরের দৃশ‍্যটা এক ঝলক দেখেই বুঝে ফেলল একটা বিপুল পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। সবচাইতে দেখার মতো পরিবর্তন হয়েছে যে ইন্দিরা গান্ধীর ছবিটি সে দেয়াল থেকে নামিয়ে দিয়ে খবরের কাগজে মুড়ে নিচে এক কোণে রেখে দিয়েছিল, বাস্তব মানুষটি এক সপ্তাহ আগে নিজের বাড়িতে নিজের দেহরক্ষী দলের হাতে খুন হলেও এখানে ছবিটির পুনর্বাসন ঘটেছে। স্বমহিমায় তিনি আবার পাল অটোমোবাইলের অফিস ঘরে।
তাকে দেখেই শান্তু বলল, কি চাই?
চোখ থেকে বিদ্বেষ ঝরে পড়ছে। শ‍্যামলী মৃদু হেসে চুপ করে র‌ইল। ঘরে আর কোনো চেয়ার নেই। সব সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্তু বলল, এখানে কোনো সুবিধে হবে না। এই কারখানা এখন আমাদের।
শ‍্যামলী বলল, বুঝলাম।
শান্তু বলল, বাবা কারখানা আমাদের দুজনকে পুরোপুরি দিয়ে দিয়েছে। তোর আর এখানে দেখতে আসার কিছু নেই।
অন্তু বলল, মালিক এখন আমরা। তোর খেল খতম।
শান্তু বলল, তুই এখানে আর আসবি না। ঢোকার চেষ্টা করবি না।
শ‍্যামলীর মনে পড়ে গেল, সেই দিন টার কথা, যখন সে কারখানায় তালা লাগিয়ে দিয়ে চুরি আটকেছিল। আর সেই দিনটার কথা, যে দিন সে এসে দেখেছিল টেবিলের কাচটা ভাঙা। তার মনে পড়ল কারখানার শ্রমিকেরা কাজ করতে করতে বিড়ি খেত। খ‌ইনি ডলত। আর কারখানার দরজা থেকে সামান‍্য দূরে প্রকাশ‍্যে জলবিয়োগ করত। গরমকালে তাপ বাড়লে কড়া অ্যামোনিয়ার গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে থাকত। সে শ্রমিকদের জন্য একটা আড়াল দেওয়া বাথরুম বানিয়ে দিয়েছিল। আর দুবেলা ফিনাইল দিয়ে বাথরুম ধুয়ে দেবার লোক রেখেছিল। শ্রমিকেরা রুটি তরকারি টিফিন পেত কারবারের খরচে। খাবার ছুতোয় বাইরে গিয়ে দু পাত্তর মদ গিলে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল সে। প্রকৃতির ডাকে বা খিদের ডাকে, এ দুটোর কোনো কারণেই বাইরে যাওয়া যাবে না। এসব নিয়ে শ্রমিকদের ইউনিয়নগুলি কোনোদিন ডেপুটেশন দেয় নি। তারা শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি বাদে অন‍্য অনেক কিছু নিয়ে ভাবে। কিন্তু পরিচ্ছন্ন বাথরুম, নেশায় নিষেধাজ্ঞা, জুয়াতে বাধা, এসব তুচ্ছ বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার মতো বোকামি ইউনিয়ন লিডারদের নেই। এই বাংলায় ছাত্র সংগঠন আর শ্রমিক ইউনিয়ন আসলে ভোটসর্বস্ব পলিটিক্যাল দলের লেজুড়। শ‍্যামলীর মনে পড়ল, বাবার থেকে ইউনিয়ন লিডাররা মাসোহারা পেত। বাবা বলতেন, মাসোহারার টাকায় ওদের সংসার চলে। আগুনখেকো আগমার্কা দলের নেতা পর্যন্ত সময়ে মাসোহারা না পেলে ফোন করে করে অস্থির করে দেয়। বাবার কাছেই শুনেছে শ‍্যামলী।  তুমি নেতাকে মাসোহারার টাকা না গুঁজলে, তোমার কারখানায় কাজ ঢিলেঢালা করে দেওয়া হবে। চুরিচামারি বাড়বে। হয় কথায়, নয় কথায় তোমাকে হুমকি শুনতে হবে। শ্রমিকদের ন‍্যায‍্য প্রাপ‍্য কেটে রেখে তা দিয়ে ইউনিয়নের খাঁই মেটাও, তাহলে তুমি খুব বুদ্ধিমান।
মালিকপক্ষ পলিটিক‍্যাল লোকেদের পেট ভরাতে গিয়ে শ্রমিকদের নির্মম শোষণ করে। ইউনিয়নের চাপে মজুরি বাড়লেও সুস্থ জীবনভাবনার প্রতি শ্রমিকের আগ্রহ তৈরি হয় না বলে, তার জীবনের মান বাড়ে না। মদের নেশা আর জুয়ার আড্ডায় সব শেষ হয়ে যায়। শ্রমিকদের পরিবার যে তিমিরে, সেই তিমিরেই পড়ে থাকে।
শান্তু বলল, কি, কথাটা কানে গেল না তোর? বাবা কারখানা আমাদের দিয়ে দিয়েছে। জানলি। এবার যেখানে খুশি যা। এখানে আর ঢুকবি না।
 অন্তু বলল, গেট আউট। জাস্ট গেট আউট।
শ‍্যামলী আস্তে আস্তে বেরিয়ে গেল। শ্রমিকদের মধ্যে কোনো হেলদোল দেখা গেল না।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।