সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৯)

মজুর মার্ক্স ও মে দিবস

এই তো কয়েকটি সপ্তাহ আগে, আমি খুনের অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে অ্যারেস্ট হবার কিছুদিন আগেই কনগ্রিগেশনাল চার্চের পুরোহিতদের পক্ষ থেকে আমি সোশিয়ালিজম, মানে, সমাজতন্ত্র নিয়ে বক্তৃতা দিতে ও তাঁদের সঙ্গে বিতর্ক করতে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। অনুষ্ঠানটা হয়েছিল গ্র‍্যাণ্ড প‍্যাসিফিক হোটেলের সভাকক্ষে। তো এর মানে হল, খুনের দায়ে অপরাধী হিসেবে ধরা পড়ার পর আমি যে হঠাৎ করে আমার কৃতকর্মের সপক্ষে আমার নৈতিক শিক্ষা ও মূল‍্যবোধের কিছু নিদর্শন খাড়া করছি, তা কিন্তু নয়। পুরোহিতদের আমন্ত্রণ রক্ষা করে ওই বিতর্কসভায় আমি কী বলেছিলাম, তা একটু পড়ে শোনাতে চাই।
 ক‍্যাপটেন ব্ল‍্যাক: কাগজটা কবে প্রকাশিত হয়েছিল বলবেন।
মিস্টার স্পিজ: ১৮৮৬ র জানুয়ারির নয় তারিখ।
ক‍্যাপটেন ব্ল‍্যাক: কোন্ কাগজ, দি অ্যালার্ম?
মিস্টার স্পিজ: দি অ্যালার্ম।
ওই বিতর্ক সভায় যখন আমার কাছে জানতে চাওয়া হল, সোশিয়ালিজম ঠিক কী, তখন আমি বলেছিলাম:
সোশিয়ালিজম হল বিগত দিনের ও বহমান সময়ের সামাজিক জীবনের ঘটনাধারার কার্যকারণ খুঁজে তাকে যুক্তির নিক্তিতে বিচার বিশ্লেষণ করে তার নিহিত গভীরতর সত‍্যের সারসংক্ষেপ। মানুষের আদর্শ কী হবে, তার মনন চিন্তনের কাঠামো, তার আধ‍্যাত্মিকতা, তার ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাস, ভাবনা চিন্তার সব কিছুই দাঁড়িয়ে আছে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ও প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় সংগঠনের উপর। যুগে যুগান্তরে মানুষের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিটি পরিবর্তন, তার অগ্রগতির প্রত‍্যেকটি পদক্ষেপ, শাসক ও শাসিতের সংঘর্ষের গভীর থেকে উদ্ভূত হয়েছে।
হে মহাত্মন্, আপনারা এই বৈজ্ঞানিক যুক্তিপ্রণালীর মাঝে দাঁড়িয়ে থ‌ই পাবেন না। আপনার যে জীবিকা, সেই পেশাগত প্রয়োজনে আপনি ঠিক বিপ্রতীপ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আপনাকে জীবিকার তাগিদে জানতে হয়েছে, ঠিক কোন্ টা কী এবং কেন। কিন্তু বস্তুজগতের গভীরতর নিয়মগুলি পর্যবেক্ষণ করে, আয়ত্ত করে, আগামী দিনের দিশা নির্দেশ করার যে দর্শন, তা সাধারণ মধ‍্যমেধার মানুষের পক্ষে একান্তভাবে অসম্ভব। ঠিক এই কারণেই আপনাদের পক্ষে সোশিয়ালিস্ট হ‌য়ে ওঠা সামর্থ‍্যের অতীত।
আমি বেশ বুঝতে পারছি, আমার কথার অর্থ ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে আপনাদের সমস্যা হচ্ছে। যাই হোক, আপনাদের বোঝার স্বার্থে এই বিষয়টি আমার আরো সরল করে বলা দরকার। আপনাদের অজানা নয় যে বর্তমান এই শতাব্দীতে বহুসংখ‍্যক আবিষ্কার হয়েছে। আর এই সমস্ত আবিষ্কার দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় ও আরামদায়ক পণ‍্য উৎপাদনের জগতে চোখধাঁধানো পরিবর্তন এনে ফেলেছে।
পণ‍্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে যন্ত্রের প্রয়োগের সাহায্যে ক্রমাগত এগিয়ে যাচ্ছে সভ‍্যতা। সেই সূত্রে মানুষের ঘাম ঝরাবার কাজটা যন্ত্র বিপুল পরিমাণে নিয়ে নিয়েছে। মেশিনারির মাধ্যমে বিরাট ক্ষমতার একীকরণ হয়ে তার সূত্রে শ্রমের বিভাজনের অনেক বিকাশ ঘটেছে। পণ‍্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই যে কেন্দ্রীভূত পরিস্থিতি, এর থেকে উদ্ভূত সুবিধা রোজ রোজ আরো নিবিড়ভাবে কেন্দ্রায়ণের পরিবেশ গড়ে তুলছে। ওর চরিত্রটাই তাই। কিন্তু শ্রমের ও শ্রমিকদের কাজের এই সমস্ত কেন্দ্রীকরণ হতে থাকল, অথচ উৎপাদিত পণ্যের বণ্টনের নিয়মটা পড়ে র‌ইল মান্ধাতার আমলে, এই বিসদৃশ পরিস্থিতিটাই এমন অন‍্যায় ও অযৌক্তিক, যা সমাজকে প্রতিনিয়ত অসুস্থ করে তুলছে।
এইভাবে পণ‍্য উৎপাদনের উপায় জিনিসটা ক্রমেই মুষ্টিমেয়ের কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে, আর সেই সংখ‍্যাটাও দিন দিন কমতে কমতে অঙ্গুলিমেয় হয়ে উঠছে। আর যারা যথার্থ উৎপাদক, গতরে খেটে গায়ের ঘাম ঝরানো শ্রমিক, তারা এই যন্ত্রের সাহায্যে পরিচালিত উৎপাদন ব‍্যবস্থার ক্রমপ্রসারের কারণে কর্মসংস্থান হারাচ্ছে, আর এক‌ই সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদ, যা সকলের, তার মালিকানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, হঠে যাচ্ছে। মজুরদের স্বাভাবিক কর্মসংস্থান কেড়ে নিয়ে তাদের নিঃস্ব করে দেওয়া হচ্ছে। তাদেরকে একটা দিশাহীন বেতালা জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। কর্মহীনতার অন্ধকারে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে তথাকথিত অপরাধ জগতে। মেয়েরা ধরছে বেশ‍্যাবৃত্তি। আপনারা, ভদ্রলোকেরা আপনাদের ধর্মপুস্তকটি হাতে নিয়ে যেসব নোংরামি দূর করার কথ বলেন ঠিক সেইসব নোংরামিগুলোই গজিয়ে উঠছে, ঘুলিয়ে উঠছে এই লাগামছাড়া কর্মহীনতা থেকে।
সমাজ থেকে নোংরামি হঠাতে ধর্মপুস্তক হাতে আপনাদের চেষ্টা দেখে আমাদের হাসি পায়।  নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে আপনাদের ওই সচেষ্টতা দেখে আমাদের ঠাট্টা করতে ইচ্ছে করে। (আদালত কক্ষে গুঞ্জন। সকলে অস্বস্তি প্রকাশ করছেন।) আচ্ছা, আমার ঠাট্টার কথাটায় যদি আপনার বিশ্বাস না হয়, তাহলে অনুগ্রহ করে বলবেন, আপনার ওইসব নীতিগর্ভ উপদেশামৃতে কতজন পাষণ্ডের চিত্তোন্নতিবিধান হয়েছে? যে লোকগুলো অভাবের তাড়নায় পেটের জ্বালায় দুষ্কৃতীর জীবন অবলম্বন করেছে, অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছে, তাদের মধ্যে কতজনকে সৎপথে আনতে পেরেছেন? (এই সময় কয়েকজন ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে বলতে থাকেন, আমরা কতকগুলি ক্ষেত্রে বিপুল সদর্থক কাজ করেছি।)
 হ‍্যাঁ, আমি মানছি, কয়েকটি ক্ষেত্রে আপনারা অভাবী মানুষকে যৎকিঞ্চিৎ মুষ্টিভিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু বলতে পারেন ওটুকুতে বাস্তবে কতটুকু সমস্যা মেটে? সামাজিক অব‍্যবস্থার কিছুই কি সমাধান হয়? তবে শুনে রাখুন, কিচ্ছুটি হয় না। শুনছেন, আমার কথাটা মেনে নিন। কেননা, একটাও বিরুদ্ধ প্রমাণ আপনারা দেখাতে পারবেন না।
(আগামী সংখ‍্যায়)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।