[লুডউইক লেইজার জা়মেনহফ (১৮৫৯ – ১৯১৭) এর জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন]
ছেলেটি স্কুলে পড়ত। বছর চৌদ্দ বয়স। বাবা মা পোল্যাণ্ডের লোক। আসলে ইহুদি। সে স্বপ্ন দেখত সারা পৃথিবীতে যুদ্ধ থাকবেনা। থাকবে ভাব ভালবাসা আর মতবিনিময়ের চমৎকার পরিবেশ। আর ভাবত, কি করে এই নানা জাতি, নানা সংস্কৃতি আর নানা ভাষায় টুকরো টুকরো হয়ে থাকা পৃথিবীটা যুদ্ধ ভুলে বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তার মনে হল, নিজের নিজের মাতৃভাষার পাশাপাশি যদি এমন একটা ভাষা তৈরি করা যায়, যা হবে আন্তর্জাতিক, যা সবাই বুঝতে পারবেন, আর যা একান্ত ভাবে কারো পকেটের হবে না, অথচ সবাই আত্মীয়তা বোধ করতে পারবে! হয় না বুঝি এমন ভাষা, যা হবে আন্তর্জাতিক! সে ভাষা হবে নিরপেক্ষ, কোনো নির্দিষ্ট ভাষাগোষ্ঠীর দিকে তার ঝোঁক থাকবেনা, যা হবে বেশ ভদ্রগোছের, আর যেখানে সব ভাষার দেয়া নেয়া থাকবে। হোক না এমন একটা ভাষা!
সে ছেলের জন্ম হয়েছিল এখনকার পোল্যাণ্ডের বেলোস্টক নামে জায়গায়। বলছি বটে পোল্যাণ্ডের জায়গা, সে ছেলের জন্মের সময় জায়গাটা ছিল রাশিয়ার অধীনে। লিথুয়ানিয়ায় যে ইহুদিরা থাকত, তার বাপ মায়ের বংশের শিকড় ছিল সেইখানে। বেলোস্টকে ইহুদিরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। সাধারণভাবে ইহুদিদের ভাষা হিব্রু হলেও, ইদ্দিশ ভাষাও ছিল ইহুদিদের মুখের ভাষা। বেলোস্টকে ইহুদি জনতার সিংহভাগই ওই ইদ্দিশ ভাষায় কথা বলত। আবার জন্মস্থান বেলোস্টক সেকালে রাশিয়ার শাসনাধীনে থাকায় একেবারে ছোটোবেলা থেকেই সে ছেলে রাশিয়ান ভাষা জানত। বেলোস্টকে আর থাকত রোমান ক্যাথলিক পোলরা, আ্য ছিল ইস্টার্ন অর্থোডক্স রাশিয়ানরা। রাশিয়ান শাসনে সরকারি আধিকারিকদের পদগুলো ছিল এই ইস্টার্ন অর্থোডক্স রাশিয়ানভাষীদের দখলে। এছাড়া বেলোস্টকে থাকত কিছু বেলারুশ, জার্মান, এবং আরো কিছু ছোটোখাটো নৃগোষ্ঠী। মুশকিলের কথা হল এইসব নানা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ বিসম্বাদ লেগেই থাকত।
সেই ছোট ছেলেটি এইসব দেখতে দেখতে বড় হতে হতে একটা আন্তর্জাতিক ভাষার কথা ভাবে, যা বিবদমান গোষ্ঠীর মধ্যে শান্তির রাস্তা গড়তে সহায়তা করবে।
তার বাবা ছিলেন শিক্ষক। জার্মান ও ফরাসি ভাষা শেখানোর কাজ করতেন। বাবার কাছে ছেলে শিখল জার্মান আর ফরাসি। আর বেলোস্টকে যেসব ভাষায় লোকে কথা বলত, সেই পোলিশ, ইদ্দিশ, বেলারুশ ভাষাও সে বেশ আয়ত্ত্ব করেছিল। স্কুলে সে ধ্রুপদী ভাষাশিক্ষা করেছিল। এগুলি হল, লাতিন, গ্রীক, হিব্রু আর আরামাইক। মনে রাখি যে যিশুখ্রীস্ট এই আরামাইক ভাষায় কথা বলতেন।
ইংরেজি ও সে খানিকটা শিখেছিল, তবে তার মতে সে ওই ইংরেজি ভাষার বিশেষ কিছু শিখে উঠতে পারেনি।
১৮৭৮ সালে সে ছেলে তার আন্তর্জাতিক সর্বজনগ্রাহ্য ভাষা তৈরির কাজটা সমাধা করে। তখন বয়স মোটে ঊনিশের কোঠায়। মানে কৈশোরকাল ফুরোয় নি।
আজকের দিনে সে ছেলের জন্মদিন। ইংরেজি ভাষায় তাকে চিনি লুডউইক লেইজার জ়ামেনহফ (১৮৫৯ – ১৯১৭) নামে। ফরাসি ভাষায় বলতে হবে লুই লাজারে জ়ামেনহফ। লিথুয়ানিয়ান ভাষায় বলতে হবে লিউডভিকাস লাজারিস জ়ামেনহফাস।
জন্মের সময় বাবা তার নাম রেখেছিলেন এলিয়েজার। ওটা হিব্রু ভাষায় রামা শ্যামা যেদো মেধো গোছের নাম। ওই নামটা ইংরেজি ভাষায় চেহারা নেবে লাজারাস। কিন্তু ছেলেটার জন্মস্থান বেলোস্টক তখন রাশিয়ার শাসনাধীনে থাকায়, জন্মের শংসাপত্রে নামের চেহারা হল লেইজার জ়ামেনগভ। লেইজার শব্দে ইদ্দিশ ভাষার ছোঁয়া, আর জ়ামেনহফকে রাশিয়ান কেতায় বানানো হল জ়ামেনগভ। ওদের যে পারিবারিক পদবি জ়ামেনহফ, সেটার উৎস ছিল জার্মানি, আর জার্মান ভাষায় লেখার কথা ছিল সামেনহফ। সেটা ইদ্দিশ ভাষা হয়ে আবার রোমান চেহারা নিয়ে জ়ামেনহফ দাঁড়াল। মাঝখানে রাশিয়ান সামাজিক বিধি অনুযায়ী মার্কোভিচ শব্দটি ঢুকল। ওতে বোঝানো গেল ছেলেটার পিতৃনাম মার্কাস। ওর মায়ের নাম ছিল রোজালিয়া। আজ তাঁর জন্মদিন। ১৮৫৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর জন্মেছেন। মৃত্যু ১৯১৭ সালের ১৪ এপ্রিল।
যে যুবক কৈশোর শেষ না হতেই একটি আন্তর্জাতিক ভাষা তৈরি করে ফেলেছেন, তাঁর নিজের নামে আন্তর্জাতিক ছোঁয়া পাওয়া গেল। আর তিনি নিজেই নিজের নাম নিয়ে কম পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন নি। বয়ঃসন্ধিকালে তিনি নিজের নাম কখনো ইদ্দিশ ভাষায় লিখতেন লেইজার, আবার কখনো রাশিয়ান কেতায় লিখতেন লাজার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে তিনি নিজের নাম লিখলেন লিউডোভিক। হয়তো যে মানুষ সে যুবকের জন্মের দুশো বছরের বেশি আগে, ১৬৫২ সালে একটা সর্বজনীন ভাষা গঠনের প্রস্তাব প্রকাশ করেছিলেন, সেই ফ্রান্সিস লডউইকের প্রতি শ্রদ্ধায় তিনি একাজ করে থাকবেন। যখন তাঁর একটি বড়দাদা লিওন চিকিৎসক হয়ে নাম স্বাক্ষর করতে শুরু করলেন ডঃ এল জ়ামেনহফ, তখন, ১৯০১ সাল থেকে যুবকটি দাদার থেকে নিজেকে পৃথক করে চেনানোর জন্য স্বাক্ষর করতে শুরু করেন ডঃ এল এল জ়ামেনহফ হিসেবে।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন তিনি ব্যাকরণসমেত একটি আন্তর্জাতিক ভাষা নির্মাণ করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রথম অবস্থায় এই ব্যাকরণ সন্দর্ভটি বেশ সমৃদ্ধ হলেও বেশ একটু জটিল ছিল। পরে ইংরেজি চর্চা করতে গিয়ে জ়ামেনহফ একটি সহজ সরল সর্বজনবোধ্য ব্যাকরণ গঠনের প্রয়োজন অনুভব করেন। অন্ততঃ যে ভাষা সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠতে চায়, তার ব্যাকরণকে জটিল করলে, তা কার্যসিদ্ধিতে অপারগ হবে, এটা তিনি অনুভব করেন। ১৮৭৮ সালেই জ়ামেনহফের লিঙ্গয়ে ইউনিওয়ারসালা বা আন্তর্জাতিক ভাষা তৈরি সম্পন্ন হয়ে যায়।
কিন্তু এই সময় তিনি বইটি প্রকাশের আয়োজন করে উঠতে পারেন নি। গ্রাজুয়েশন করার পর তিনি চিকিৎসা বিদ্যায় পাঠগ্রহণ শুরু করেন। প্রথমে মস্কোয়, পরে ওয়ারশ তে। ১৮৮৫ সালে ডাক্তারি পাশ করে তিনি ১৮৮৬ থেকে চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে প্র্যাকটিশ শুরু করে দেন। তখন তাঁর সাতাশ যৌবন। ভিয়েনায় লোকজনের চক্ষুরোগের চিকিৎসা সেবা দিতে দিতে তিনি ওই আন্তর্জাতিক ভাষা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন।
ওই যে আন্তর্জাতিক ভাষা নির্মাণ কররে ফেলেছিলেন, ওই সূত্রে তিনি একটি বই লেখেন। বইটির নাম দেন তিনি “ইন্টারন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ : ইন্ট্রোডাকশন অ্যাণ্ড কমপ্লিট টেক্সট বুক”। কিন্তু বইটি ছাপাবার দায়িত্ব কেউ নিল না। তাই যুবক জ়ামেনহফ লিফলেট ছাপিয়ে তাঁর ভাষাপ্রচেষ্টা সম্পর্কে জনগণকে জানিয়ে অর্থসংগ্রহের আবেদন জানালেন। এক ভদ্রলোকের কাছে তিনি অর্থসাহায্য পেয়েছিলেন। ইনি জ়ামেনহফের ভাবী বধূর পিতা।
১৮৮৭ সালে সন্দর্ভটি রাশিয়ান ভাষায় প্রকাশিত হল। লেখকের নাম দেওয়া হল দক্তরো এসপেরান্তো। সরলার্থ হল, আশাবাদী এক ডাক্তার।
নিজের সৃষ্ট আন্তর্জাতিক ভাষাকে জ়ামেনহফ প্রাথমিকভাবে চিনিয়েছিলেন লিঙ্গভো ইনন্টারনাসিয়া হিসেবে। কিন্তু লোকজন লেখকের ছদ্মনামের সূত্রে ভাষাটিকে এসপেরান্তো বলে ডাকতে শুরু করল।
এসপেরান্তো ভাষা গঠনের সূত্রে ডঃ জা়মেনহফের লক্ষ্য ছিল তিনটি। প্রথমতঃ শিশুরা যেমন করে খেলতে শেখে, ততটাই সহজে যাতে ভাষাশিক্ষাটা হয়।
দ্বিতীয়তঃ, নবীন ভাষাটা যেন আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সহজ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
এবং তৃতীয়তঃ, মানুষ যেধ এই ভাষার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। নতুন একটা কিছু বলে উপেক্ষা না করে।
এইসব কথা তিনি তাঁর উনুয়া লিব্রো নামে বইতে লিখেছেন।
আজকের পৃথিবীতে প্রায় বিশ লক্ষ মানুষ এসপেরান্তো ভাষায় কমবেশি কথাবার্তা বলে থাকে। একশো কুড়িটি দেশে এসপেরান্তো ভাষা নিয়ে উৎসাহী মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন।
অ্যাডলফ হিটলার আর তাঁর নাৎসি বাহিনীর সদস্যরা এসপেরান্তো ভাষাকে সন্দেহের চোখে দেখত। কেননা জ়ামেনহফ জন্মসূত্রে ইহুদি ছিলেন । এই ভাষার আন্তর্জাতিক চরিত্র লক্ষ্য করে হিটলারের ধারণা ছিল এ ভাষা শ্রমজীবীদের বিপ্লব গড়ে তোলার সহায়ক হবে। এইজন্যই তিনি এসপেরান্তো ভাষার প্রচারকদের হলোকস্ট এ নিষ্ঠুর ভাবে অত্যাচারের পর খুন করান। ডাক্তার জ়ামেনহফ এর তিনজন সন্তানের প্রত্যেকে হিটলারের নিহত হন।
সোভিয়েত বিপ্লবের প্রথম পর্যায়ে রাশিয়ার বুকে এসপেরান্তো ভাষার আদর হলেও, বছর কুড়ি বাদে, ১৯৩৭ সালে যখন স্তালিন সর্বগ্রাসী একনায়ক দানব হয়ে উঠেছেন, তখন সে দেশে এসপেরান্তোর উপর আক্রমণ নেমে আসে। জাপানের শাসকেরাও এসপেরান্তো কে ভাল চোখে দেখেননি। ভেবেছেন এ ভাষা বামপন্থীদের সংঘবদ্ধ হতে সাহায্য করে।
ডঃ জ়ামেনহফ নোবেল পুরস্কার পান নি। কিন্তু বারোবার নোবেল বিশ্বশান্তি পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম মনোনীত হয়েছিল। ১৯০৫ সালে তাঁকে সর্বোচ্চ ফরাসি নাগরিক সম্মান লিজিয়ন দ্য অনার এ সম্মানিত করা হয়। একটি গ্রহাণুর নাম রাখা হয় তাঁর নামে। আরও একটি গ্রহাণুর নাম রাখা হয় তাঁর সৃষ্ট এসপেরান্তোর নামে। সারা বিশ্বের কোণায় কোণায় তাঁর নামে পাহাড়, সেতু, পার্ক ও রাস্তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আজ জা়মেনহফ দিবস। আজ যে জ়ামেনহফ এর জন্মদিন। সারা পৃথিবীর মানুষকে যাঁরা মতবিনিময় করে ভ্রাতৃত্ববোধের বিকাশ ঘটাতে চাইবেন, এই সভ্যতাকে যাঁরা যৌথ উত্তরাধিকার বলে মানবেন, তাঁরা আজ ডঃ জ়ামেনহফ স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।