দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২৫০)

পর্ব – ২৫০

জ‍্যাঠামশায়ের কাছ ঘেঁষে বসে আছে খোকা। জ‍্যেঠু, মানুষ বিয়ে করে কেন?
জ‍্যাঠাইমা খোকার প্রশ্ন শুনে চটে উঠে বললেন, এই ছেলেটার খালি পাকা পাকা কথা। ওইজন‍্য বাবার কাছে মার খায়।
খোকা বলল, মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
জ‍্যাঠামশায় জিজ্ঞাসা করলেন, মা কি বলল?
মা বলল, একটা ছেলের জন্য একটা মেয়ে তৈরি করে রাখে প্রকৃতি। একসাথে থাকার জন‍্য বিয়ে করতে হয়।
জ‍্যাঠাইমা বললেন, মা তো ঠিকই বলেছে। আবার জ‍্যেঠুকে বিরক্ত করছ কেন?
মা কি করে ঠিক বলল? একটা ছেলের জন্য একটা মেয়েই যদি হিসেব করে প্রকৃতি তৈরি করে থাকে, তাহলে ছেলেটা বা মেয়েটা দুজনের কেউ একজন মারা গেলে আবার বিয়ে হয় কি করে?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, বাঃ, চমৎকার একটা প্রশ্ন।
খোকা বলল, আর যদি একটা ছেলের জন‍্যে একটাই মেয়ে তৈরি করা থাকে, তাহলে লোকজন অতগুলো করে বিয়ে করে কি করে?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, বেশ ভাবতে হচ্ছে তো! তা কে কে অনেকগুলো করে বিয়ে করেছে?
কেন, দশরথ, তিনটে ব‌উ। কৌশল‍্যা, কৈকেয়ী আর সুমিত্রা। আর পাণ্ডু, কুন্তী আর মাদ্রী।
আর উদাহরণ?
কেন, অর্জুন। দ্রৌপদীর কথা যদি ছেড়েই দাও, তবুও সুভদ্রা, চিত্রাঙ্গদা আবার উলূপী।
রাবণের স্ত্রীদের নাম জান?
জ‍্যাঠাইমা বললেন, রাবণের আবার কটা ব‌উ? একটাই তো জানি!
খোকা বলল, বীরবাহুর মা চিত্রাঙ্গদার কথাটাও তো তুলতে হবে।
কি জানি বাবা, তুই কি সব ব‌ই ঘাঁটাঘাঁটি করিস্, কে জানে?
খোকা বলল, এমন কিছু শক্ত ব‌ই ঘাঁটি নি। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ পড়লেই জানতে পারতে।
এই রকম মন দিয়ে পড়ার ব‌ই গুলো পড়লে ক্লাসে ফার্স্ট হতিস। সেই দিকে চেষ্টা নেই। যতো উল্টো পাল্টা ব‌ই নাড়াচাড়া করছিস।
আচ্ছা, জ‍্যাঠাইমা, তোমাদের ঠাকুর ঘরে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি আছে, তাই তো?
হ‍্যাঁ, আছে তো, তাতে কি?
রাধা তো কৃষ্ণের ব‌উ নয়। তাহলে রাধামাধবকে একসাথে রাখো কেন?
ওমা, কোথায় যাব গো? এইটুকু একটা বেগুন বিচি ছেলে, এরমধ্যেই উৎকট প্রশ্ন করতে শিখেছে।
জ‍্যাঠামশায় হেসে বললেন, ওর কথার উত্তর জানা থাকলে দিও। আর না জানা থাকলে জানিয়ে দেব।
তুমি নিজে নাস্তিক। আর এইটুকু ছেলেকে দুবেলা ভুলভাল শেখাচ্ছ। ওর বাবা যদি রাগ করে?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, ওর প্রশ্নের জবাব জানা থাকলে দাও। ‌ন‌ইলে বলে দাও জানি না। শোনো খোকা, মানুষ বিয়ে করে কেন, এই প্রশ্নের জবাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা উত্তর দিয়েছেন।
খোকা বলল, কি বলেছেন রবীন্দ্রনাথ?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, রবীন্দ্রনাথ বলছেন, পিঠের মাছি তাড়াবার জন‍্যে মানুষেরা বিয়ে করে।
জ‍্যাঠাইমা হেসে বললেন, এ মা, ইশশ ছিঃ!রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন বাজে কথা বলতেই পারেন না।
আর মেয়েরা কেন বিয়ে করে জ‍্যেঠু?
নিজের জীবনটা জলাঞ্জলি দেবার জন‍্য।
জ‍্যাঠাইমা বললেন, এটা ঠিক বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। তোমাকে বিয়ে করে সেটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
সেক্ষেত্রে জ‍্যাঠাইমা তোমার উপায় আছে। তুমি আর দুয়েকটা বিয়ে করতেই পারো।
তবে রে অসভ‍্য ছেলে? দেখবি মজা? আমি কাল‌ই বাপের বাড়ি চলে যাব। তুই থাকবি তোর জ‍্যাঠাকে নিয়ে।
তুমি না থাকলে কোনো কাজ আটকে যাবে? রান্নার লোক আছে, তারা আজ‌ও যেমন রেঁধেছে, কালও তেমন রাঁধবে। অসুবিধার কি আছে?
দেখেছ, তোমার সামনে বসে বসে খোকা আমাকে যা নয় তাই বলে যাচ্ছে, আর ওকে তুমি প্রশ্রয় দিচ্ছ।
জানো জ‍্যেঠু, অনুও টারজানের গল্প পড়ে। ও বলেছে, ও আমাকে বিয়ে করবে। তারপর আমরা একসাথে সাঁতার কাটব।
জ‍্যাঠাইমা আঁতকে উঠলেন। ও কি রে? এসব কি বিচ্ছিরি কথা? ও যে তোর চেয়ে বয়সে ছয়মাসের বড় রে! তাছাড়া ওরা ব্রাহ্মণ। বামুনদের সঙ্গে আমাদের বিয়ে হয় না।
জ‍্যেঠু, জ‍্যাঠাইমা সত‍্যি বলছে? বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে করতে নেই?
জ‍্যাঠামশায় বললেন, ইতিহাসে কিন্তু আছে, জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী তাঁর চেয়ে বয়সে বড় মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। কস্তুরী বাঈ বাপুর চাইতে সাড়ে পাঁচ মাসের বড় ছিলেন।
জ‍্যাঠাইমা বললেন, ওমা কোথায় যাব গো, এরা জ‍্যাঠা ভাইপো যে ভীষণ বজ্জাতি শুরু করেছে। লক্ষ্মী ছেলে আমার। অনু তোমার দিদি হয়। তাছাড়া ওরা বামুন। ওকে বিয়ে করব বলতে নেই।
জ‍্যেঠু সত‍্যি সত‍্যি বামুনদের মেয়েকে আমাদের বিয়ে করতে নেই?
না, রামের গল্প তা বলে না।
জ‍্যাঠাইমা বললেন, ও কি গো, আবার রামকে নিয়ে টানাটানি শুরু করছ!
জ‍্যাঠামশায়  বললেন রাবণ ছিল ব্রহ্মার নাতি, আর সেই সূত্রে সেরা জাতের বামুন।   বাল্মীকি রামায়ণে মন্দোদরীকে সীতার মা বলে উল্লেখ করা না হলেও, পরবর্তীকালে রচিত রামায়ণের কয়েকটি সংস্করণে মন্দোদরীকে সীতার মা, অথবা অন্তত তার জন্মের কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অদ্ভুত রামায়ণ-এর বর্ণনা অনুযায়ী: রাবণ ঋষিদের হত্যা করে তাদের রক্ত একটি বৃহৎ কলসে সঞ্চয় করে রাখতেন। ঋষি গৃৎসমদ দেবী লক্ষ্মীকে কন্যারূপে পাওয়ার জন্য তপস্যা করছিলেন। তিনি দর্ভ ঘাস থেকে দুগ্ধ সংগ্রহ করে তা মন্ত্রপূত করে একটি পাত্রে সঞ্চয় করছিলেন যাতে লক্ষ্মী সেখানে অবতীর্ণ হতে পারেন। রাবণ এই দুগ্ধ ঋষিরক্তের কলসে ঢেলে দেন। ঋষিরক্তকে বলা হয় সকল বিষের চেয়েও বিষাক্ত। মন্দোদরী রাবণের অপকর্মে মর্মাহত হয়ে তাই এই বিষাক্ত রক্ত পান করে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু রক্ত পান করার ফলে গৃৎসমদ সঞ্চিত দুগ্ধের প্রভাবে তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। লক্ষ্মী তাঁর গর্ভে প্রবেশ করেন। মন্দোদরী তার কন্যার ভ্রূণটি কুরুক্ষেত্রে মাটির তলায় প্রোথিত করেন। রাজা জনক তা আবিষ্কার করেন এবং কন্যার নাম রাখেন সীতা।
দেবীভাগবত পুরাণ-এ বলা হয়েছে: রাবণ যখন মন্দোদরীকে বিবাহ করতে চান, তখন ময়াসুর রাবণকে সাবধান করে বলেন যে, মন্দোদরীর কোষ্ঠীতে আছে, তার প্রথম সন্তান তার বংশের ধ্বংসের কারণ হবে। তাই এই সন্তানটিকে জন্মমাত্রই হত্যা করতে হবে। ময়াসুরের উপদেশ অগ্রাহ্য করে রাবণ মন্দোদরীর প্রথম সন্তানকে একটি ঝুড়িতে করে জনকের নগরীতে রেখে আসেন। জনক তাকে দেখতে পান এবং সীতারূপে পালন করেন। বাসুদেবহিন্দি, উত্তর পুরাণ ইত্যাদি জৈন রামায়ণেও সীতাকে রাবণ ও মন্দোদরীর কন্যা বলা হয়েছে। এই সব গ্রন্থেও আছে যে, সীতা রাবণ ও তার বংশের ধ্বংসের কারণ হবেন বলে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল বলে, রাবণ তাকে পরিত্যাগ করেন। তো, সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে সীতা বামুনদের মেয়ে। আর ক্ষত্রিয়ের ছেলে রামের সাথে তার বিয়ে হল।
জ‍্যাঠাইমা বলল, তুমি কি করছ, তুমি জানো না, ছেলেটাকে কোথায় এ সময় সামলাবে, তা নয়, খেপিয়ে তুলছ।
জ‍্যাঠামশায় হেসে বললেন, রামের দিদি শান্তা, যে কিনা ক্ষত্রিয়ের মেয়ে, তার বিয়ে হয়েছিল ঋষ‍্যশৃঙ্গ মুনির সাথে। তিনি যজ্ঞ টজ্ঞ করতেন। অর্থাৎ বামুন।
জ‍্যাঠাইমা খোকাকে বললেন, এসব চিন্তা ছাড়্, এখন পড়াশুনা করতে হবে। বড় হতে হবে। তারপর একটা চাকরি বাকরি।
খোকা মুখ গোঁজ করে বলল, অনু আমাকে বিয়ে করবেই।
দরজায় এসে হাজির হলেন বাবা। দু চোখে আগুন। অঙ্কের রাফ খাতার পিছনের মলাটে জংলী বালক বালিকা একসাথে সাঁতার কাটছে। তলায় লেখা অনু আর খোকা।
উঠে এসো। অঙ্কের খাতায় এসব কি? এসব কেন এঁকেছ? খোকার মুখে বাক‍্য সরে না। বাবার হাতের চড় গালে এসে পড়ে। এলোপাতাড়ি মার।
জ‍্যাঠামশায় করতলে দুচোখ বুজেছেন। জ‍্যাঠাইমা থাকতে পারলেন না। উঠে এসে দেওরকে আটকাতে চেষ্টা করলেন। ধাক্কাধাক্কিতে শাঁখা ভাঙল জ‍্যাঠাইমার। তিনি অভাবনীয় পরিস্থিতিতে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লেন।
খোকার পিঠে বেতের দাগের উপর গরম জলে তোয়ালে ভিজিয়ে তাপ দিচ্ছেন জ‍্যেঠু। তাঁর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে।
ছোট্ট খোকা লুকোচুরি খেলতে গিয়ে আলমারির পিছনে লুকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাড়িময় তুলকালাম খোকা ক‌ই খোকা ক‌ই? জন্মদিনের হৈচৈয়ে খোকা কোথায়?
তাকে আলমারির পিছন থেকে আবিষ্কার করল অনু।
ওঠ ওঠ অরিন্দম, আজ যে তোর জন্মদিন। রিপ ভ‍্যান উইঙ্কল এর মতো ঘুমিয়ে পড়েছিলি, না রে?  আর ঘুমোস না। উঠে পড়্।
ফরসা একটা হাত কপাল ছোঁয়। কি সুন্দর হাতখানি। শ‍্যামলীকেও দেখতে ভাল লাগছে। রমানাথ আসবে বলে রাতপোশাকের ওপরেই শাড়ি জড়িয়েছে সে। চা এনে ধরল শ‍্যামলী। অনসূয়া বললেন, এই যে বাবু তোমার বেড টি। নিচে কে এল। বারান্দায় দাঁড়িয়েছে অনসূয়া আর শ‍্যামলী। ভোরের সোনালি আলোয় দুজনকেই ভীষণ ভাল লাগছে।
অয়ি সুখময়ী ঊষে কে তোমারে নিরমিল?
বালার্ক সিন্দূরটীকা কে তোমার ভালে দিল!  সাজি ভরে শাদা শাদা ফুল নিয়ে রমানাথ গাড়ি থেকে নামছেন। অপলক চেয়ে আছে দুই নারী। তারাও ফুলের মতো। অরিন্দম তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। হাত রাখল অনসূয়ার কাঁধে। অনসূয়া আশ্চর্য সুন্দর করে হেসে উঠলো।

প্রথম খণ্ড সমাপ্ত

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।