প্রবন্ধে মৃদুল শ্রীমানী

কোথায় গেলে পাই (π)

গণিতের ছাত্র, যাঁরাই নবম দশম শ্রেণিতেও পড়েছেন, তাঁরা পাই (π)এর নাম শোনেননি, এটা ভাবা যায় না। গণিতের এমন কোনো শাখা নেই যে যেখানে পাই ( π ) এর কিছু না কিছু প্রয়োগ নেই। একটা বৃত্তের ব‍্যাসের তুলনায় পরিধির যে অনুপাত, অর্থাৎ পরিধির দৈর্ঘ্য÷ ব‍্যাসের দৈর্ঘ্য = π (পাই)। গোলক, চোঙ, শঙ্কু, এদের ক্ষেত্রফল ও ঘনফল মাপতে গিয়ে পাই এর ব‍্যবহার অপরিহার্য। পাই (π) একটা ধ্রুবক। এর সাহায্যে আমাদের বিশ্বজগৎকে ক্রমেই পরিষ্কার করে বোঝা যাচ্ছে। তাই বহু অতীতের ব‍্যাবিলনীয় গণিতবিদগণ এবং প্রাচীন মিশরীয় গণিতবিদগণ এই ধারণাটা নিয়ে ভেবেছেন। মোটামুটি হাজার চারেক বছর ধরে মানুষ এই গাণিতিক ধারণার পিছনে দৌড়চ্ছে। জ‍্যামিতিক আঁক কষে পুরাকালের ব‍্যাবিলনীয় পণ্ডিতরা বৃত্তের পরিধি আর ব‍্যাসের তুলনা করে এই ধ্রুবকটির মান নির্ধারণ করেছিলেন 3.125 , আর প্রাচীন মিশরীয় পণ্ডিতেরা কষেছিলেন 3.16 ।
এর আঙ্গিকে একটা বদল আনলেন গ্রীক মহাবিজ্ঞানী আর্কিমিডিস, হ‍্যাঁ, সাইরাকিউজের আর্কিমিডিস ( ২৮৭ খ্রিস্টপূর্ব – ২১২ খ্রিস্টপূর্ব)। তিনি করলেন কি একটা বৃত্তের বাইরে একটা বহুভুজ ক্ষেত্র আঁকলেন, আর বৃত্তটির ভিতরেও ওই একই সংখ্যক বাহু বিশিষ্ট একটা বহুভুজ ক্ষেত্র আঁকলেন। যতোই বহুভুজের বাহুসংখ‍্যা বেড়ে চলল, তা ক্রমেই যেন বৃত্তের কাছাকাছি হয়ে উঠতে থাকল। এইভাবে শেষ পর্যন্ত বৃত্তের ভিতর ও বাহিরে ছিয়ানব্বইটি বাহু বিশিষ্ট বহুভুজ এঁকে সাইরাকিউজের আর্কিমিডিস বললেন এই ধ্রুবকটির মান = 223/71 < π <22/7

আর্কিমিডিসের অনুসরণে ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ান জ‍্যোতির্বিদ ক্রিস্তফ গ্রিয়েনবার্গার টেন টু দি পাওয়ার ফরটি মানে দশের চল্লিশ ঘাত পর্যন্ত বাহুসংখ‍্যা নিয়ে বহুভুজ এঁকে π এর একটা আটত্রিশ ডিজিটওয়ালা মান নির্ধারণ করেছিলেন। বহুভুজের সাহায্য নিয়ে π এর মান গণনার ওইটাই সেরা নিদর্শন হয়ে আছে।
এখন আমরা মোটের উপর বলতে পারি π একটা ইরর‍্যাশনাল নাম্বার, একটা দশমিক ভগ্নাংশ সংখ্যা, যার কোনো শেষ নেই, যার কোনো রিপিটিং প‍্যাটার্ন নেই, আর এটা একটা ট্রানসেনডেনটাল নাম্বার। মোটামুটি ভাবে এর মানটা 3.14 বা 22/7 ধরে নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের কাজে ঠেকে যেতে হয় না।
কিন্তু তারপরেও π নিয়ে মানুষের জিজ্ঞাসা শেষ হল না। উইলিয়াম এল শ‍্যাফ বলেছেন, গণিতে আর কোনো সাংকেতিক চিহ্ন কিন্তু মানুষের এত আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পারে নি। এত রহস‍্য, এত রোমান্টিকতা, এত ধরনের ভ্রান্ত ধারণা π দিনের পর দিন যুগের পর যুগ জাগিয়ে রেখেছে, তা আশ্চর্যজনক তো বটেই। π কে আশ্চর্য না বলে উপায় নেই, কেননা বৃত্তের পরিধি জিনিসটা লোকের কাছে সোজা, আর ব‍্যাসটাও যথেষ্ট সোজা, তাহলে পরিধি ÷ ব‍্যাস = π কেন এমন একটা ইরর‍্যাশনাল আর ট্রানসেনডেনটাল হয়ে উঠল?
পাই ( π) এর ধারণা হাজার চারেক বছর আগে থেকে চলে এলেও এই সংখ্যাটা যে ইরর‍্যাশনাল আর ট্রানসেনডেনটাল, এটা বুঝতে মানুষকে বিস্তর মাথার ঘাম পায়ে ঝরাতে হয়েছে। সাধারণ গণিত শিক্ষক বা অধ‍্যাপকদের কথা বাদই দিলাম, স্বল্পপরিচিত গণিতবিজ্ঞানীদেরকেও ধরছি না, কিন্তু গণিতজগতের প্রবাদপ্রতিম ব‍্যক্তিত্বরা, যথা, ফিবোনাচ্চি, নিউটন, লাইবনিৎজ, অয়লার, কার্ল ফ্রিডরিশ গস এর মতো কিংবদন্তি গণিতপ্রতিভারাও পাই (π) নিয়ে বহু মূল্যবান সময় ব‍্যয় করেছেন।
অবশ‍্য (পরিধি÷ব‍্যাস) করলে ঠিক যা পাওয়া যায়, ১৬৪৭ অবধি তার কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্য কোনো নাম বা সাংকেতিক চিহ্ন ছিল না। ওই সময় একজন ইংরেজ গণিতবিদ উইলিয়াম আউটরেড তাঁর ক্ল‍্যাভিস ম‍্যাথমেটিকা সন্দর্ভে (পরিধি÷ব‍্যাস) কে π আখ‍্যা দিলেন। ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম জোনস নামে একজন ওয়েলশ গণিতবিদ দেখালেন পরিধির গ্রীক প্রতিশব্দ পেরিমিত্রোস গ্রীক অক্ষরে যেভাবে লিখতে হবে, তার প্রথম অক্ষরটা হল π (পাই)। কিন্তু লিওনার্দ অয়লার তারও বছর ত্রিশ পরে, ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ π ব‍্যবহার শুরু করলে তাঁর বিশ্ববিশ্রুত গণিতপ্রতিভার জোরে π কে সবাই জানল, বুঝল, মেনে নিল, বা মাথায় তুলে নিল।
১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে সুইস জার্মান গণিতবিদ জোহান হাইনরিশ ল‍্যামবার্ট ( ১৭২৮ – ১৭৭৭) প্রমাণ করে দিলেন যে π একটা ইরর‍্যাশনাল নাম্বার। ল‍্যামবার্ট খুব সতর্কতার সঙ্গে, কঠোর নিয়ম নিষ্ঠায় ওই প্রমাণটা তৈরি করেছিলেন। ল‍্যামবার্ট বললেন যে, (পরিধি÷ব‍্যাস) অর্থাৎ π কোনোভাবেই কোনোদিন দুটি ইন্টিজার বা রাশির কোশেন্ট বা অনুপাত হিসেবে প্রকাশ করা যাবে না।
১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে জার্মান গণিতবিদ ফার্দিনান্দ ভন লিণ্ডেমান (১৮৫২ – ১৯৩৯) প্রমাণ করে দিলেন যে (পরিধি÷ব‍্যাস) অর্থাৎ π একটা ট্রানসেনডেনটাল নাম্বার। ততদিন পর্যন্ত মানুষ ভাবত যে, একটা বৃত্তের ক্ষেত্রফলের সমান ক্ষেত্রফলবিশিষ্ট একটি বর্গক্ষেত্র আঁকা সম্ভব। ওই কাজটাকে বলত স্কোয়ারিং এ সার্কল।
ট্রানসেনডেনটাল নাম্বার জিনিসটা হল এমন একটা নাম্বার, যাকে কোনো বীজগাণিতিক সমীকরণের সমাধান হিসেবে দেখানো যায় না। মনে রাখতে হবে যে, সব ট্রানসেনডেনটাল নাম্বারই ইরর‍্যাশনাল, কিন্তু সব ইরর‍্যাশনাল নাম্বারই ট্রানসেনডেনটাল নয়।
লিণ্ডেমান ওই যে প্রমাণ করে দিলেন, π একটা ট্রানসেনডেনটাল নাম্বার, সেই প্রমাণটা গড়ে উঠেছিল ফরাসি গণিতবিদ চার্লস হারমাইট ( ১৮২২ – ১৯০১ ) এর ১৮৭০ এর দশকে করা গবেষণার উপর ভিত্তি করে। তরুণ গণিতপিপাসু লিণ্ডেমান প‍্যারিসে গিয়ে হারমাইটের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং সরাসরি তাঁর কাছে বসে গণিতচর্চা করেছিলেন। হারমাইটের শিক্ষায় আলোকিত হয়ে লিণ্ডেমান ১৮৮২ তে π এর এই ট্রানসেনডেনটাল ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা সন্দর্ভ “π সংখ্যা সম্পর্কে” প্রকাশ করেন। তখন লিণ্ডেমান এর বয়স ত্রিশ। এই সন্দর্ভের জোরে লিণ্ডেমান সহসাই বিপুল খ‍্যাতির অধিকারী হয়ে গিয়েছিলেন। পরের বৎসরই তিনি জার্মানির কোনিসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ‍্যাপকের পদ লাভ করেন, আর দশ বছরের মধ‍্যেই মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ‍্যাপক পদ লাভ করেন।
পাই এর এই ট্রানসেনডেনটাল ধর্ম প্রশ্নাতীত ভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলে স্কোয়ারিং দ‍্য সার্কল কথাটা অসম্ভব অবাস্তব কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে রূপক হিসেবে ব‍্যবহার শুরু হয়ে গেল।
পাই এর মান নির্ধারণ নিয়ে মানুষের আগ্রহ বরাব‌রই ছিল। আরবি গণিতবিদ জামশিদ মাসুদ আল-কাশি ( ১৩৮০ – ১৪২৯) ১৪২৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অসামান্য গ্রন্থ রিসালা আল-মুহিতিয়াইহা বা পরিধি বিষয়ক সন্দর্ভ সম্পূর্ণ করেন। তাতে তিনি π এর মান নির্ণয়ের পদ্ধতি দেখিয়ে ছিলেন। লক্ষ্য করা যায় যে তিনি ষোলটি ডিজিট অবধি সঠিকভাবে মান নির্ণয় করেছিলেন। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপের পণ্ডিতেরা ইনফাইনাইট সিরিজ বা অসীম শ্রেণি ব‍্যবহার করে π এর মান নির্ধারণ করে চলেছিলেন। আইজ‍্যাক নিউটন (১৬৪৩ – ১৭২৭) তাঁর বাইনোমিয়াল থিওরেম ব‍্যবহার করে খুব চটপট দশমিকের পর ষোলতম স্থান অবধি গণনার পদ্ধতিটি দেখিয়ে দিয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে অবিস্মরণীয় ভারতীয় গণিতপ্রতিভা শ্রীনিবাস রামানুজন অসাধারণ দক্ষতায় সঠিকভাবে π এর মাননির্ণয়ের পদ্ধতিটি দেখালেন। ওঁর দেখানো পথকেই বিকশিত করে আজো কমপিউটারের সাহায‍্য πএর মান নির্ধারণের কাজ চলছে। একবিংশ শতাব্দীর গোড়ায় কমপিউটারের সাহায্যে দশমিকের পর 62831853071796 তম স্থান পর্যন্ত সঠিকভাবে নির্দিষ্ট হয়েছে।
১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে জন রেঞ্চ ১১২০ ডিজিট অবধি π এর মান নির্ধারণ করেছিলেন। ওই একই অভিন্ন ব‍ৎসরে এনিয়াক কমপিউটারকে সত্তর ঘণ্টা খাটিয়ে জর্জ রিটউইসনার এবং জন ভন নিউম‍্যান ২০৩৭ ডিজিট পর্যন্ত π এর মান নির্ণয় করেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে এক মিলিয়ন মানে দশলক্ষ ডিজিট অবধি মান নির্ণয় হয়েছিল। শ্রীনিবাস রামানুজনের দেখানো পথ ধরে এই π এর মান নির্ণয়ের কাজ এগিয়ে চলেছে। ২০২২ খ্রিস্টাব্দে এম্মা হারুকা ইয়াও একশো ট্রিলিয়ন ডিজিট অবধি মান নির্ণয় করে ফেলেছেন।
তবে π এর মান দশমিকের পর প্রথম দুটি ডিজিট জানলেই ঘর দোরের সব প্রয়োজন মিটে যায়, আর দশমিকের পর প্রথম পনের টি ডিজিট জানলে নাসা-র মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাজ যথেষ্ট নির্ভুলভাবে চলতে পারে। আর দৃষ্টিযোগ‍্য মহাবিশ্বের গণনা করতে দশমিকের পর ৩৯টি ডিজিট যথেষ্ট। তবুও মানুষের জ্ঞানের ক্ষুধা ছুটে চলেছে অসীমকে ধরতে, ট্রানসেনডেনটাল-কে আরো ঘনিষ্ঠভাবে বুঝতে। তা যে সম্ভব নয়, তা বুঝেও বোঝে না সে।
পাই ( π) কে ভালবেসে মানুষ পাই ( π) দিবস উদযাপন করতে চেয়েছে । পাই এর মান 3.14159 ধরে নিয়ে আমেরিকান কেতায় চোদ্দ মার্চ এ ১টা ৫৯ এ উৎসবের আয়োজন করেছে। সে সব অনুষ্ঠানে হাজার কায়দা কেতা। ১৯৮৮ তে আবার কেউ কেউ খেয়াল করল যে ওই চোদ্দ মার্চ তারিখটা আবার বিশ্ববিশ্রুত বৈজ্ঞানিক অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন। ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে ১৪ মার্চ আইনস্টাইনের জন্ম। তাই চোদ্দ মার্চ পাই (π) দিবসে আমেরিকার মানুষ মহানন্দে মেতে উঠল। আর আমেরিকান ভূখণ্ডের বাইরের লোকেরা বলল, তা কেন, চোদ্দ মার্চ কেন, বাইশে জুলাই করলে কী হয়? তারা বললে, বাইশে জুলাইকে পাই দিবস মানতে চাই।
কিন্তু পাই (π) যে ট্রানসেনডেনটাল, সেটা কে বুঝবে ভাই?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।