T3 || বর্ষ শেষে বর্ষবরণ || সংখ্যায় মৃদুল শ্রীমানী

চৈত্র নিদাঘের গল্প
(বর্ণপরিচয়কারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় নিবেদিত)
চৈত্রের বেলা চড়ছে। এরই মধ্যে প্রচণ্ড গরম। তায় রেল অবরোধ হয়েছিল। লক্ষ্মীকান্তপুর বা ডায়মন্ডহারবার লাইনে হরবখত রেল অবরোধ হয়। রেল লাইনের ধারে বিস্তর কলাগাছ। ওই গাছের পাতা কেটে বিদ্যুৎবাহী ওভারহেড তারে ঝুলিয়ে দিলেই হল। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রেল অবরোধ সফল হয়ে যাবে। এই লাইনে যাত্রী সংখ্যার প্রবল চাপ। কামরায় ঠাসাঠাসি গাদাগাদি করে অফিসযাত্রী বাঙালি যায়। আজ সবার দেরি হয়ে যাবে। টাইম টেবিল নয়ছয় হয়ে ফেরার সময়েও বিপদে পড়বে অফিসযাত্রীরা। একটা যে অবরোধ হয়েছিল, তা যাতে মানুষ সহজে ভুলতে না পারে, তার জন্যে বন্ধ আহ্বায়কদের তরফে ওই ব্যবস্থা। কিন্তু এতে যে তাদের উপর কি গালমন্দ চলে তা হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতা নেই লোকগুলির। যাই হোক, সবে ট্রেন চালু হয়েছে। কামরায় বিস্তর চাপ। সূঁচ পর্যন্ত ঢোকে, সাধ্য কি। সুতরাং, হাল ছেড়ে বসে আছি। ট্রেনের ভিড় হালকা হলে চেষ্টা করব উঠতে। আমার তত তাড়াও নেই, শারীরিক সামর্থ্যও তথৈবচ। তাই স্টেশনে বসে আছি। একটা পর একটা ট্রেন বাদুড়ঝোলা ভিড় নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।
একরকম হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছি, এমন সময় এক বাহাত্তুরে বৃদ্ধ বেঞ্চিটার একধারে কোনোমতে বসে পড়ল। আমি তাকালাম। বৃদ্ধ খর্বাকৃতি, একটু বড় ধরণের মাথার সামনের দিকে কোনো চুল নেই, হাঁটু অবধি ময়লা ধুতি পরিহিত। সঙ্গে বেশ বড় একটা বোঝা।
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি টের পেয়ে ম্লান হাসি হেসে বৃদ্ধ বললেন, “এইখানটায় একটু ছায়া, তাই বসতে ইচ্ছে হল। আপত্তি নেই তো বাবু?”
কি মুশকিল! রেল কোম্পানির স্টেশন। সেই স্টেশনের বেঞ্চি। আমি আপত্তি করব কোন যুক্তিতে?
আমার মনের কথা বৃদ্ধ যেন চোখ দেখে পড়ে ফেললেন। “বাবা, তোমায় বাবাই বলছি, আমি তোমার বাপ ঠাকুরদার থেকেও ঢের বুড়ো, গরিব মানুষ কাছে বসলে ভদ্রলোকের জাত যায়।”
আমার বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। এই বৃদ্ধ আমার বাপ ঠাকুরদার চাইতেও বৃদ্ধ? বলে কি! কিন্তু যাই হোক, ওঁর সাথে তর্কে গেলাম না। গল্প করার ছলে বললাম “ট্রেনে উঠতে পারলেন না তো?”
“তা আর উঠতে পারলাম কই!” বুড়ো হাড়ে আর কত চলে? মায়া হল। রোগা, দুর্বল, অশক্ত বৃদ্ধ, তাঁর অত বড়ো মোট। জিজ্ঞাসা করলাম, “কি করেন আপনি?”
“ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে বই বিক্রি করি বাবা।”
“দাদু, এই বয়সে বাড়িতে অবসর নিয়ে থাকার কথা আপনার। বাড়িতে কে কে আছে?”
বৃদ্ধ ম্লান হাসলেন। “কেউ নেই। কারো সাথে সম্পর্ক রাখতে পারি নি। ছেলেকে শিক্ষিত করেছিলাম। সে শিক্ষার মর্যাদা রাখে নি। আমি তার সংশ্রব ত্যাগ করেছি।” একটা দীর্ঘশ্বাস কোনোমতে চাপলেন বৃদ্ধ। আমি টের পেলাম।
আমার মনে পড়ল বুড়ো বাপ মা কে খেতে দেবার দায় কন্যা সন্তানও অস্বীকার করতে পারেন না। খানিকক্ষণ উসখুস করে বলেই ফেললাম, “আর মেয়েরা?”
মেয়েদের কথা উঠতেই বৃদ্ধের মুখ কালো হয়ে গেল। বললেন, “জানো শেষ বয়সে মেয়েরা আমার ভিক্ষা করে খেয়েছে। এমন পাষণ্ড ছেলে আমার, বোনেদের একটু দেখে নি পর্যন্ত।”
শুনে অবাক হলাম। এই বৃদ্ধের মেয়েরা শেষ বয়সে ভিক্ষা করে খেয়েছে? তাহলে এঁর বয়স কত?
“আপনি কিছু খাবেন দাদু? একটু চা খান?”
স্মিত হাসলেন বৃদ্ধ। “আমি অকিঞ্চন নহি। আমি কোনো প্রকার দান পরিগ্রহ করি না।”
আমি বৃদ্ধের মুখে হঠাৎ এমন শীলিত মার্জিত ভাষা লক্ষ্য করে অবাক হলাম।
খানিক বাদে জিজ্ঞাসা করলাম
“এত বড় মোট নিয়ে ট্রেনে উঠছিলেন, কি করেন আপনি?”
“আমি পুস্তক ব্যবসায়ী। একসময় আমার নিজের প্রেস ছিল। নিজের অনেক বই ছিল। সে সব বই বিক্রি করে বিস্তর রোজগার ছিল আমার। সে সব নিয়ে পরে মামলা মোকদ্দমাও হয়েছিল নানা রকম। শেষে বই রিসিভারের কাছে যায়।”
রিসিভারের কাছে বই? কোথায় যেন একটি শিশুপাঠ্য বইতে রিসিভার সংস্করণ লেখা দেখেছিলাম। কিন্তু কোথায় দেখেছি তা আর মনে করতে পারি না।
“কি বই আছে আপনার ঝোলায়?”
“সে অতি নিম্নমানের বই। তবে এই সব বইই ট্রেনে লোকে কিনে থাকে। চকমকে ছাপার দৌলতে বিক্রি হয়। না আছে লেখার গুণমান, না আছে প্রকাশনার সৌষ্ঠব।”
ভাবতে লাগলাম, বৃদ্ধ বেশ শক্ত শক্ত শব্দ ব্যবহার করেন। এসব শিখলেন কোথায়?
“ভালো বই যে রাখব, তার বিক্রি হবার ভরসা নেই। নইলে শেক্সপিয়রের কমেডি অফ এররস এর একটা অনুবাদ সেকালে করেছিলাম। লোকে ধন্য ধন্য করেছিল। এখনো হাত সুড়সুড় করে। তোমাদের হাল আমলের ভাষায় লিখেও ফেলতাম। কিন্তু কে বা ছাপাবে, কে বা পড়বে! পরিশ্রমই সার।”
“আপনি বই লিখেছিলেন?”
“তা লিখেছিলাম বাপু। আর একটি দুটি নয়। অনেকগুলি।”
আমি অবাক হয়ে ভাবতে থাকি। বৃদ্ধের নির্ঘাৎ মাথা খারাপ।
বৃদ্ধ এবার একটি বই বের করেন। ছোটো। ওই বইয়ের মলাটটা খুব পাতলা। হাতে নিয়ে দেখতে যাব, এমন সময় ট্রেন এসে যেতে বৃদ্ধ ছোটেন অত ভারি মোট নিয়ে।
বললাম, “এই যে, আপনার বইটা… এটা নিন। “
ট্রেনের দিকে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়ান বৃদ্ধ। ট্রেনে উঠতে গিয়ে একপাটি হাওয়াই চটি আলগা হয়ে পড়ে যায় রেল লাইনে।
আমি দাঁড়িয়ে দেখি। অন্নসংস্থানের দায়ে দুর্বল অশক্ত বৃদ্ধ ট্রেনের ভিড়ে নিজেকে কোনোমতে গুঁজে দিলেন।
আমার হাতে রয়ে গেল তাঁর দেওয়া একটা বই। বর্ণপরিচয়। উপরে বর্ণপরিচয়কারের একটি পরিচিত ছবি ও স্বাক্ষর।
সহসা আমার মনে হল, আমার পাশে যে বৃদ্ধ নিজেকে পুস্তক ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন, তাঁর চেহারার সাথে এই বইয়ের উপরের ছবিটির যেন খুব মিল। আচ্ছা, উনি থাকতে আমার একবারও মনে হল না কেন? তাহলে কি উনিই আমাকে দেখা দিতে এসেছিলেন?
মনে পড়ল, অনেকদিন আগে ১৮৫৫ সালে এমন একটা তেরোই এপ্রিল এই বর্ণপরিচয় প্রকাশিত হয়েছিল।
আমি ধীরে ধীরে রেল লাইনে নেমে একপাটি অতি জীর্ণ হাওয়াই চপ্পল কুড়িয়ে মাথায় ঠেকালাম।
আশপাশের লোকেরা আমায় রেল লাইনে নেমে হাওয়াই চপ্পল কুড়িয়ে মাথায় নিতে দেখে হাঁ হয়ে গেল।