আশ্চর্য রকম যুক্তি দিয়ে টাকা কার, তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কমলাকান্ত ওরফে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কলম। দুধ নিয়ে আদালতে কথা ওঠে। দুধ তো গাইয়ের। দুহিয়াছে প্রসন্ন গোয়ালিনী। বিড়ালের যুক্তি হল, তাহাতে কমলাকান্তবাবুর যে অধিকার, মার্জারকুলতিলকেরও তদ্রূপ। সেই রকম চলতে চলতে কমলাকান্ত বলেন, তাহলে বাঙ্গাল বেঙ্কের টাকাও আমার।
ওই যে বাঙ্গাল বেঙ্ক, বঙ্কিমচন্দ্র ওই বানানেই লিখেছেন, ও হল ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গল। ১৯১১ সালের আগে কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী শহর।
কলকাতায় গঙ্গার ধারে স্টেট ব্যাঙ্কের মিউজিয়াম আছে। ঢুকে দেখার ফুরসৎ হয় নি। সেকালে হিন্দু কলেজ গড়তে বাঙালি জাতির অগ্রণী বাবুরা টাকা দিয়েছিলেন। ব্যাঙ্ক গড়তেও। ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গল এ দ্বারকানাথ ঠাকুরের টাকাও ছিল। আরো অনেক বড়লোক বাঙালিরও। তারপর ক্রমে ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্ক হয়ে ওঠা। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এল পরে। অবশ্য স্বাধীনতার আগেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠা। গুটিচারেক ব্যাঙ্ক মিলে মিশে ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক। নইলে ভারতে ব্যাঙ্ক শিল্পের নামে প্রাদেশিক বোধ স্পষ্ট। ব্যাঙ্ক অফ বরোদা, এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক, কানাড়া ব্যাঙ্ক, পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক, পাঞ্জাব অ্যাণ্ড সিন্ধ ব্যাঙ্ক, স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ত্রিবাঙ্কুর….
ব্যাঙ্ক কথাটার উৎস হল বেঞ্চ। আমরা ছড়া কাটতাম, ন্যাড়া ন্যাড়া ন্যাড়া, বেঞ্চির ওপর দাঁড়া। বেঞ্চ বলতে যে সুপ্রিম কোর্টের কনসটিটিউশনাল বেঞ্চ অবধি হয়, নিচের ক্লাসে আমি জানতাম না। আর শেক্সপিয়র হাতে নিয়ে শাইলকের গল্প পড়লাম। সে বিষয়ে পাঠ্যবইতেও কিছু ছিল। তো শাইলক করত সুদের ব্যবসা। বাংলায় কাবুলিওয়ালারাও সুদের ব্যবসা করত। লোকজন তাদেরকে ভয় করত। আমাদের বরানগর বাজারে কয়েকটি বিপুল চেহারার কাবুলিওয়ালা থাকতেন। আমার মেজোভাই মৈনাককে তাঁরা খুব ভালবাসতেন। কাবুলিওয়ালা যে ভালবাসতে জানে তা রবীন্দ্রনাথ পড়ে জেনেছি। আর কাবুলিওয়ালা যে ভালবেসে বাড়িতে ডেকে ডালরুটি খাওয়ায়, মৈনাকের কাছে জেনেছি। তো সুদের ব্যবসা করলেই কিছু হৃদয়হীন হয় না, নবী পয়গম্বর মহম্মদ রসুলুল্লাহ্ যতই বলুন না কেন। ইসলামে সুদ খাওয়া হারাম, কিন্তু তা বলে মুসলমানদের টাকা ব্যাঙ্কে থাকে না, তা তো নয়।
তো শাইলকের উপর রাগ দেখাতে সভ্য সমাজ ব্যস্ত। তার ধার দেওয়া টাকা নষ্ট হলে, তার মেয়ে পর্যন্ত তার টাকাপয়সা সব নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলে লোকে খুশি হয়। মার্কসবাদীরা কথায় কথায় বিশ্বব্যাঙ্ক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক আর আই এম এফকে গাল পাড়ে। ঠিক যেমন ইহুদীদেরকে গাল পাড়ে খ্রিস্টানরা। ধার দেবে ইহুদী, আর শোধ দিতে বললে নির্বংশের ব্যাটা। তো শাইলক ইহুদী ছিল বলেই লোকের অত রাগ তার উপর। ওই কথাটাই কৌশল করে বলে গেছেন শেক্সপিয়র। আসলে তিনি অতি গুহ্যভাবে ইহুদীদের উপর খৃস্টানদের অহেতুক বিরূপতার বিরুদ্ধে ছিলেন। নব্য শেক্সপিয়র গবেষকরা আমার কানে এইসব বলে দিয়েছেন। তো বেঞ্চ এ বসে ইহুদী শাইলকের দল ব্যবসা করত। ওই বেঞ্চ থেকেই ব্যাঙ্ক।
ব্যাঙ্ক শিল্পের নিয়ম কানুন অর্থনীতির একটা শাখা হিসেবে গড়ে উঠল। টাকা কি কাজ করে, মানুষ বুঝতে শিখল। টাকা নিয়ে সেই ছড়াটাও মুখস্থ করলাম। আর শিখলাম শীর্ষ ব্যাঙ্ক হিসেবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দায় দায়িত্ব।
স্বাধীনতা পাবার মূল্য হিসেবে বাংলা ও পঞ্জাব দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। এবার বাংলার অগ্রণী ব্যাঙ্ক ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের সাথে মিশে নাম হারাল।
সেকালে ব্যাঙ্ক ফেল পড়ত। তাতে বহুজনের স্বার্থহানি হলেও মুষ্টিমেয়ের সৌভাগ্য ঝাঁপিয়ে পড়ত। ব্যাঙ্ক ফেল রুখবেন বলে ১৯৭৬ সালে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ করলেন ইন্দিরা গান্ধী। লোকে ধন্য ধন্য করল। সূক্ষ্ম দৃষ্টির লোকে আঁচ করল বড় পুঁজির লোকজন যাতে মানুষের মধ্য থেকে আরো পুঁজি টেনে নিয়ে আরো বড় হতে পারে, ইন্দিরার প্রতি পুঁজিপতিদের সেই নির্দেশ ছিল। নেহরু সমাজতান্ত্রিক ছিলেন, নেহরুদুহিতা ইন্দিরা আরো বড় সমাজতান্ত্রিক হলেন, আর সংবিধানে সমাজতান্ত্রিক কথাটা বসিয়ে কেল্লাফতে করতে বিরোধী সমাজবাদী নেতাদের জেলে পুরলেন। ক্রমে মিক্সড ইকনমি। নেহরুর কালে মহলানবীশকে খাটিয়ে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা। ভারি শিল্পে জোর। তারপর ইন্দিরার গরিবি হঠাও। তারপর মনমোহন সিংহ সব মুক্ত করে দিলেন। যেমন ইচ্ছে ব্যবসা করো, শোষণ করো, লুঠ করো।
আজ পুঁজির সেই সমাজতান্ত্রিক নামাবলী গায়ে চাপানোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। এখন বড়পুঁজি ব্যাঙ্ক থেকে লোন নেবে, তারপর কলা দেখাবে। এলাইসিকে ঘাড়ে ধরে অলাভজনক ক্ষেত্রে টাকা গুণাগার দিতে হবে। বিজয় মাল্য, মেহুল চোকসি, টাকা মেরে পালালে দেশের গোয়েন্দারা অন্য দিকে তাকিয়ে থাকবে। নোটবন্দী হয়ে ক পিস কালোটাকা উদ্ধার হল কেউ জানতে পাবে না। প্রাইভেট ইয়েস ব্যাঙ্কের দেনা বহন করবে স্টেট ব্যাঙ্ক। ব্যাঙ্ক শিল্প একটি কামধেনু। অতিথিবেশে বিশ্বামিত্র এসে বশিষ্ঠের কামধেনু চুরি করে পালাচ্ছেন।