সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ৮)

মজুর, মার্ক্স ও মে দিবস

তেসরা মে বৃষ্টি নামল রাতে। রাতভোর বৃষ্টির জের চলল তার পরের সারা দিনমান জুড়ে। বৃষ্টির কারণে যত লোক জমায়েত হবে আশা করা গিয়েছিল, তার খুব অল্পসংখ্যক হাজির হতে পারল।
বিকেলে সমাবেশের আসল কাজ। বৃষ্টির দৌরাত্ম্যেই পূর্বঘোষিত বক্তারা অনেকেই এসে উঠতে পারেন নি। শ্রমিকদের মধ্যে বক্তা হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় অগাস্ট স্পিজ। আর অ্যালবার্ট পারসনস। কিন্তু পারসনস অন‍্যত্র তাঁর সঙ্গিনী লুসি পারসনস আর শ্রমিক নেত্রী লিজি হোমস এর আয়োজনে সেলাই কর্মীদের একটা জমায়েতে আটকে পড়েছিলেন।
অগত‍্যা ঠিক হল অগাস্ট স্পিজ একাই সমাবেশে বক্তব্য রাখা শুরু করবেন। বৃষ্টির কারণে জমায়েত ঠিক দানা বাঁধতে পারে নি। লোকেরা আসছে যাচ্ছে। তার মধ‍্যেই একটা গাড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে অগাস্ট স্পিজ তেজোগর্ভ বক্তৃতা শুরু করলেন।
গোলমালের আশঙ্কায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে স্পিজের বক্তব্য তাদের‌ও কানে যাচ্ছিল।
শ্রমজীবী জনতা শুনছিল, অগাস্ট স্পিজ বলছিলেন, কোনো কোনো মহল মনে করছেন যে, দাঙ্গা হাঙ্গামা বাধানোর উদ‍্যোগ করতে বুঝি শ্রমজীবী মানুষ এখানে জমায়েত ডেকেছেন। আর সেই রকম ধারণা থেকেই বোধ হয় প্রশাসন ও সরকারের তরফে তথাকথিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার ছুতোয় এই ব‍্যাপক পুলিশি আয়োজন। ওঁরা যেন যুদ্ধে নেমেছেন। আমি, অগাস্ট স্পিজ, শ্রমিক সমাবেশ সংগঠকদের তরফে সভা শুরুর সূচনাতেই সবাইকে পরিষ্কার ভাবে জানাচ্ছি, দাঙ্গা হাঙ্গামা করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে মোটেও আমরা হাজির হ‌ই নি। আজ আমাদের এই মহতী সমাবেশের একটিই লক্ষ্য, আট ঘণ্টার কর্মদিবসের দাবিকে সামনে রেখে আজ শ্রমিকদের জীবনে বিরাজমান সমস‍্যাটিকে চিরে চিরে তুলে ধরা। আট ঘণ্টার কর্মদিবসের ন‍্যায‍্য দাবিকে আমাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। আর তা করতে গিয়ে শ্রমিকদের কতখানি রক্ত ঝরেছে, কতগুলি অমূল‍্য প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে, তা মেহনতি মানুষের ভোলা উচিত নয়।
মে দিবসের সূত্রে হে মার্কেটের ঘটনাপ্রবাহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে স‍্যামুয়েল ফিলডন ( ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৭ – ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯২২) এর কথা জানা দরকার।
স‍্যামুয়েল ফিলডন ছিলেন একজন ইংরেজ আমেরিকান মেথডিস্ট পুরোহিত বা পাদ্রি। মেথডিস্ট রা প্রোটেস্টান্টদের‌ই একটা শাখা। তবে স‍্যামুয়েল ফিলডন সাহেব ছিলেন একেবারেই সাদামাটা গোছের পাদ্রি। না ছিল তাঁর ধর্মীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ডিগ্রি, না ছিল তাঁর সঙ্গে বড়সড় নামজাদা চার্চের যোগাযোগ।
অতীব সাধারণ এই পাদ্রি ইংল‍্যাণ্ডে চার্টিস্ট আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ইংল‍্যাণ্ডে গোটা দেশজুড়ে ১৮৩৮ – ১৮৫৭ এই সময়কালে চার্টিস্ট আন্দোলন গড়ে ওঠে।
১৮৩৮ এর পিপলস চার্টার বা জনগণের সনদকে আশ্রয় করে শ্রমিকশ্রেণীর এই আন্দোলন গড়ে ওঠে।
আট বছর বয়সেই অর্থাৎ নিতান্তই শৈশবে স‍্যামুয়েল ফিলডন মজুরের কাজ নেন। তাঁর বাবা ছিলেন একটা কাপড়কলের হতদরিদ্র ফোরম‍্যান। তিনিও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
স‍্যামুয়েল ফিলডনকে কেউ কেউ স‍্যাম বলে ডাকতেন, কেউ আবার বলতেন রেড স‍্যাম। যাই হোক ফিলডন ইংল‍্যাণ্ডে দশঘণ্টা শ্রমদিবসের আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ১৮৬৯ সালে যুবক স‍্যামুয়েল ফিলডন চিকাগোর উদ্দেশে পাড়ি দেন। সেখানে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশুনা করে অতি সাধারণ স্তরের পাদ্রি হন।
চিকাগো শহরে গরিবপাড়ায় থাকতে থাকতে স‍্যামুয়েল ফিলডন সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৮৮৪ নাগাদ তিনি স্থির করেন শ্রমিকদের অধিকার অর্জন ও মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করাই তাঁর জীবনের ব্রত। তিনি ইন্টারন‍্যাশনাল ওয়ার্কিং পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের আমেরিকান গ্রুপ নামের গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হন ও কিছুদিন পর সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
মে মাসের চার তারিখে বিকেলে যে হে মার্কেট স্কোয়ারে শ্রমিকদের সমাবেশ রয়েছে, সে কথাটা স‍্যামুয়েল ফিলডনের জানা ছিল না। তিনি সেদিন জার্মান ওয়াল্ডহিম সিমেট্রিতে পাথর যোগান দেবার কাজে ব‍্যস্ত ছিলেন। কিন্তু কখনো তিনি শ্রমিকনেতাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে শ্রমিকদের আন্দোলনের ময়দানে তিনি উপস্থিত হয়ে ভাষণ দেবেন।
সারা দিনের ব‍্যস্ততার শেষে যখন ফিলডন ঘরে ফিরবার পথ ধরেছেন, তখন শুনলেন হঠাৎ করেই ইন্টারন‍্যাশনাল ওয়ার্কিং পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের আমেরিকান গ্রুপ, যে সংগঠনের তিনি কোষাধ্যক্ষ, সেই সংগঠনটির তরফে হে মার্কেট স্কোয়ারে শ্রমিকদের একটা জরুরি সমাবেশ ডাকা হয়েছে।
পড়িমরি করে ফিলডন দৌড়োলেন আরবেইটার জা‌ইটুং কাগজের অফিসে। আরবেইটার জা‌ইটুং ছিল শ্রমিক শ্রেণীর সুবিখ‍্যাত সংবাদপত্র। বেরোতো জার্মান ভাষায়। অগাস্ট স্পিজ ছিলেন এর সম্পাদক। ফিলডন সেখানে গিয়ে জানতে পারলেন হে মার্কেটে সান্ধ‍্য শ্রমিক সমাবেশের খবরটি অবশ‍্য‌ই সত‍্য। আরো জানলেন তেসরা মে ম‍্যাককরমিক প্ল‍্যান্টে পুলিশের গুলিতে শ্রমিকের মৃত্যুর প্রতিবাদে এই সভা। আর আরবেইটার জাইটুং কাগজের সম্পাদক অগাস্ট স্পিজ হে মার্কেট স্কোয়ারের জনসভায় বক্তব্য রাখছেন। ফিলডন সঙ্গে সঙ্গে ওই শ্রমিক সমাবেশে উপস্থিত হবার জন্য একটি আন্তরিক আবেগ অনুভব করলেন। অন‍্য সমস্ত দায় দায়িত্ব ফেলে চললেন হে মার্কেট স্কোয়ারে। পথ চলতে চলতেই খবর পেলেন হে মার্কেট শ্রমিক সমাবেশের সংগঠকরা তাঁকে খুঁজছেন বক্তৃতা দিতে হবে বলে।
অ্যালবার্ট পারসনস, দি অ্যালার্ম কাগজের সম্পাদক‌ও হে মার্কেট স্কোয়ারের পথে পা বাড়িয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ওই এক‌ই পত্রিকার সহ সম্পাদক বিখ্যাত শ্রমিক নেত্রী লিজি হোমস, পারসনস এর সঙ্গিনী লুসি, আর তাঁর বাচ্চারা। স্পিজ ভীষণ আন্তরিক ভাবে চাইছিলেন শ্রমিকদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হোক। এবং এই তেসরা মে সকাল পর্যন্ত আট ঘণ্টার আন্দোলন ও সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান সুপরিকল্পিত ও সুসংহত, ও অহিংস ছিল।
কিন্তু ম‍্যাককরমিক হারভেসটিং মেশিন প্ল‍্যান্টের ভিতরে মালিকদের তরফে স্ট্রাইক-ভাঙানিয়া গুণ্ডামির বিরুদ্ধে শ্রমিকরা ক্ষোভে ফুঁসছিল। ছুটির ঘণ্টা যেই বাজল, গেটের বাইরে শ্রমিকদের জমায়েতের খবর পেয়ে ম‍্যাককরমিক প্ল‍্যান্টের অত‍্যাচারিত শ্রমিকরা ধৈর্য ধারণ করতে আর পারল না। তারা তেড়ে গেল মালিকদের পোষা স্ট্রাইক-ভাঙানিয়া গুণ্ডাদের বিরুদ্ধে।
অগাস্ট স্পিজ বার বার শ্রমিকদের গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়তে মানা করছিলেন। তাদেরকে শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকতে বলছিলেন। কিন্তু হুড়োহুড়ি ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়েছে এই ছুতোয় ম‍্যাককরমিক প্ল‍্যান্টের মালিকগোষ্ঠী পুলিশ নামিয়ে দিল। দাঙ্গা রোখার অজুহাতে পুলিশ গুলি চালানোর ফুরসৎ পেয়ে যেতেই পরিস্থিতি স্পিজের হাতের বাইরে চলে গেল।
শেষ পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে ম‍্যাককরমিক প্ল‍্যান্টের দুজন শ্রমিক মারা পড়ল। কোনো কোনো কাগজ অবশ‍্য ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখল যে দাঙ্গায় নিহত ছয়জন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।