ক্যাফে গদ্যে মৃদুল শ্রীমানী

জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।

“আলোয় আলোকময় করে হে এলে আলোর আলো”

কতো রকম ভাবেই না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আলোর কথা বলেন। রক্তকরবী নাটকে যক্ষপুরে নন্দিনী লক্ষ্য করে, কেবল তার আর বিশুর মধ‍্যে চিলতে ফাঁক দিয়ে আলো আসছে। ৪৭ফ নামে যক্ষপুরের শ্রমিক ছুটি পেলেই মদ্যপান করতে অভ‍্যস্ত। সেই নিয়ে তার সাদামাটা স্ত্রী চন্দ্রা অনুযোগ করে। তখন ৪৭ফ এর মধ্য থেকে ফাগুলাল জেগে উঠে চন্দ্রাকে বোঝায় তারা গ্রামে ছিল মানুষ। সেখানে সূর্যের আলো গ্রামীণ মানুষের কাছে প্রাণদায়ী মদের কাজ করত। সূর্যের আলোকে যে মদ মনে করে অসামান্য নেশা করা চলে, সে নিয়ে ফাগুলালের বক্তব্য আমাকে সচকিত করে। খোলামেলা প্রাকৃতিক আলো হাওয়ার অভাব অনটনের জন‍্যই যক্ষপুরে শ্রমিককে গাঁজিয়ে ওঠা তরল নিয়ে নেশা করতে বসতে হয়।
ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লেখা ছিন্নপত্রের অসাধারণ চিঠিগুলির একটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেখেন প্রকৃতি তাঁর ভিতরে সূর্যের আলো ঢেলে দিয়ে তাঁকে দেবতাদের সমান করে দিচ্ছেন।
২৭ আষাঢ়, ১৩১৭ বঙ্গাব্দে গীতাঞ্জলি কাব‍্যগ্রন্থের ‘সীমায় প্রকাশ’ কবিতায় তিনি লেখেন, ‘তোমার আলোয় নাই তো ছায়া, আমার মাঝে পায় সে কায়া …’
আবার ওই গীতাঞ্জলিতেই ‘যাবার দিন’ কবিতায় ২০ শ্রাবণ, ১৩১৭ বঙ্গাব্দে লেখেন, ‘এই জ‍্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে তারি মধু পান করেছি ধন‍্য আমি তাই।’
‘পূজারিণী’ কবিতায় আলোকে অন‍্যরকম একটা তাৎপর্য নিয়ে দেখতে পাই। শ্রীমতীর সাথে আমরাও দেখতে পাই, অস্তরবির রশ্মি আভায় উন্মুক্ত বাতায়নের কাছে বসে রাজনন্দিনী শুক্লা কবিতা পড়ছিল। শ্রীমতী নামে দাসীও কি সেই অস্তরবির আলো স্নায়ুতে মনে মেখে অন‍্যমাত্রার জীবন অর্জন করল? সৌরবিভা কি দাসীটির মধ্যে একটি বিদ্রোহী সত্তাকে জাগিয়ে তুলল?
জীবনের উপান্তে পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘সে’। সে গল্পে আলো নিয়ে কতো কি বলেন কবি। সে গল্পে বিজ্ঞান মাস্টার এসে বুঝিয়ে যান, বিশ্বজগতে সূক্ষ্ম আলোর কণাই বহুরূপী হয়ে স্থূলরূপের ভান করছে। আরো জানান, আলোকের অণুপরমাণু বৃষ্টির মতো কণাবর্ষণ‌ও বটে, আবার নদীর মতো তরঙ্গধারাও বটে।
সারাজীবন ধরে গানে গানে অসামান্য মাত্রায় আলোর কথা বলে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আলো তাঁর নয়নে, আলো তাঁর হৃদয়ে। আলোর কথা বলতে বলতে গানে গানে এক উত্তরণ ঘটে যায়।
আমাদের বলতে ইচ্ছে করে, “আলোয় আলোকময় করে হে এলে আলোর আলো”।
স্মরণ রাখি যে, ১৯০৫ সালে আজকের দিনে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন আলোর কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রকাশ করেন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।