দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২১৯)

পর্ব – ২১৯

 অরিন্দম বললেন, একটা অসাধারণ জীবনবোধ তাই না?
অনসূয়া বললেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের?
অরিন্দম বললেন, না আমি আনা ফ্রাঙ্কের কথা বলছি। একটা মেয়ে বেশ টের পাচ্ছে কেমন একটা ভয়াবহ অবস্থার মধ‍্য দিয়ে তাদেরকে চলতে হচ্ছে। কিন্তু সে সেসব কথা লিখে রাখছে।
 অনসূয়া বললেন, হলোকস্টের কথা মনে পড়লেই খারাপ লাগে। কি সাংঘাতিক অত‍্যাচারটাই না করেছিল হিটলার। গ‍্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে মারা, উদ্ভট সব অপারেশন, মানুষের শরীরের চর্বি দিয়ে সাবান বানানো… উফফ আমি ভাবতে পারি না। কী বীভৎস একটা লোক!
অরিন্দম বললেন, অপরাধপ্রবণ জনগোষ্ঠী বলে একদিন লোধা সম্প্রদায়ের মানুষকে বিনা কারণে, অযথা অত্যাচার করেছে ব্রিটিশ প্রশাসন। অথচ, নৃতাত্ত্বিকরা দেখিয়ে দিয়েছেন, “অপরাধপ্রবণ” বলে কোনো জনগোষ্ঠী হতে পারে না। একটা দেশের একটা বিরাট সংখ্যক মানুষকে তাড়িয়ে দেওয়া , এথনিক ক্লিনজিং একটা সাংঘাতিক ব্যাপার। শুধুমাত্র ইহুদি বলেই তাদের বিরুদ্ধে জাতিঘৃণা ছড়িয়েছিল হিটলার। নিজের জাতের মনগড়া শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারে হিটলারের দলবলের কোনো ক্লান্তি ছিল না। লক্ষ লক্ষ ইহুদি নারী ও শিশুকে গ্যাস চেম্বারে ঠেলে দিতে তাদের বাধে নি। এই যে জাতি বিদ্বেষ, এটা সাংঘাতিক। এই যুগে ইন্দিরার মৃত্যু সূত্রে নিরীহ শিখ জনতার উপর আক্রমণ প্রসঙ্গে হিটলারী জমানার সেই জাতিঘৃণা আর এথনিক ক্লিনজিং এর পুনরভিনয় দেখতে পাচ্ছি।
জানিস্ অনু, আমি হিটলারের নাম জানতাম কোন ছোটবেলা থেকে। আর জানতাম তিনি জাতি ঘৃণা করতেন। নিজেকে আর্য ভেবে তিনি ক্ষেপে গিয়েছেলেন, আর নিজের জার্মান জাতিকে আর্য আখ্যা দিয়ে তিনি ইহুদি নিধন শুরু করেন। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প গড়ে ইহুদিদের উপর সাংঘাতিক অত্যাচার নামিয়ে এনেছিলেন। চূড়ান্ত বিকৃতির দলিল হয়ে আছে সে সব। আঠারো পুরো না হতেই একটি এনসাইক্লোপিডিয়া ধাঁচের বইতে সেই অমানবিক অত্যাচারের কথা ছবি সহ জেনে ফেলি। আর আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি অনুবাদ নেড়ে ঘেঁটেও কিছু টের পাই।
হিটলারের আত্মজীবনীমূলক বই মেইন ক্যাম্ফ ১৯২৫ সালে  ১৮ জুলাই প্রকাশ পেয়েছিল। Eher Verlag প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে সে বই ইংরেজিতেও প্রকাশ করা হয়। আমার ভাবলে গা শিরশির করে, এক সময় কেউ কেউ এ দেশে গান্ধীজীর জয়ধ্বনি দিতে গান্ধীকে “ভারত কি হিটলার” বলতেন।
অনসূয়া বললেন, আমিও “হিটলার” শব্দটিকে ভালো মনে নিতে পারি নি কোনোদিন।
আমার একটা কথা ভেবে খুব কষ্ট হয়, আমাদের সুভাষচন্দ্র বসু কেন হিটলারের কাছে গিয়েছিলেন? তিনি কি হিটলারের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারতেন? হিটলারের রুচি পছন্দ আর দার্শনিক অবস্থান কি তিনি মেনে নিতে পারতেন? না কি হিটলারের কুৎসিত ভাবনা পদ্ধতির তীব্র প্রতিবাদ করে শহিদ হতেন? তোর কি মনে হয়?
অরিন্দম বললেন,  সুভাষচন্দ্র কি করে জানবেন যে হিটলার আসলে কেমন লোক? প্রচারের ঢক্কানিনাদ এড়িয়ে আসল খবর বের করতে গেলে যতটা সময় লাগে, তা তো সুভাষ পান নি। খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত প্রথমে মুসোলিনি কে বুঝতে পারেন নি। ভাল লোক ভেবে বসেছিলেন। ওই যে সমাজবাদ শব্দটার একটা মাদকতা আছে। ওটা হিটলার মুসোলিনি দুটোই চমৎকার কায়দাবাজি করে ব‍্যবহার করেছিল। পরে রম‍্যাঁ রলাঁ কবিকে বোঝালেন। সাবধান করলেন, কবি আপনি করছেন টা কি, এই মুসোলিনি লোকটা সাংঘাতিক বজ্জাত। বদের ধাড়ি। তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের টনক নড়ল। সুভাষের সেই রকম কোনো গাইড জোটেনি।
অনসূয়া জিজ্ঞাসা করলেন, এগুলো তুই জানলি কি করে?
অরিন্দম বললেন, শ‍্যামলীর মুখে শুনেছি প্রথমে। পরে এনসাইক্লোপিডিয়া ধরে ধরে যাচাই করেছি।
অনসূয়া বলল, শ‍্যামলীর সঙ্গে তোর এইসব কথা হয়?
অরিন্দম বললেন, হ‍্যাঁ রে, ও ভীষণ সিরিয়াস মেয়ে। আচ্ছা, যা বলছিলাম, অথচ  অ্যাডলফ হিটলারকে নিয়ে অনেক তলিয়ে ভাবার দায় আছে। কেন, কি করে হিটলারি মানসিকতা গড়ে ওঠে, তা তো জানতে হবে। আজ আমরা তীব্র নিন্দা করছি, ধিক্কার জানাচ্ছি, অথচ অত্যন্ত কুখ্যাত এই স্বৈরাচারী শাসক ক্ষমতায় থাকাকালীন জার্মানিতে অত‍্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ১৮৮৯ সালে ২০ এপ্রিল হিটলারের জন্ম। অস্ট্রিয়াতে। ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসের ৩০ তারিখে জার্মানিতে সদ‍্য পরিণীতা দীর্ঘদিনের সঙ্গিনী ইভা ব্রাউনকে সাথে নিয়ে নিজের বন্দুক দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
হিটলারের বিখ্যাত ব‌ই “মেইন ক‍্যাম্পফ”। এতে ওঁর রাজনৈতিক দর্শনের হদিশ পাওয়া যায়। ১৯২৫ সালে জেলে বসে তিনি এই ব‌ইয়ের প্রথমাংশ লিখিয়েছেন।  সমাজতন্ত্রের কথা বলতে বলতে ক্রমশঃ জাতিঘৃণা জাতিবিদ্বেষ ও নিজের জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারে মনোনিবেশ করেন হিটলার। ১৯৩৩ সালে তিনি জার্মানির চ‍্যান্সেলর হন। ১৯৩৪ সালে নিজেই নিজেকে ফুয়েরার বা সর্বাধিনায়ক উপাধি দেন।
“মেইন ক‍্যাম্পফ” ব‌ইটির প্রথম খণ্ড বের হয় ১৯২৫ ও দ্বিতীয় খণ্ড বের হয় ১৯২৬ সালে। প্রথমে এই ব‌ইয়ের কাটতি ভাল না থাকলেও ১৯৩৩ সালে লেখক জার্মানির চ‍্যান্সেলর হলে ব‌ইটির বিক্রি সাংঘাতিক রকম বাড়ে ও বেস্ট সেলার হয়। দেখবি বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা কোনো ব‌ই লিখলে তা নিয়ে হ‌ইহ‌ই পড়ে যায়। ক্ষমতার অলিন্দের কাছে থাকতে চায় অনেকেই।   হিটলার বড়ো জায়গায় চলে যেতেই ব‌ইটার কাটতি বেড়ে গেল। এখন বলি মেইন ক‍্যাম্পফ, কিন্তু ব‌ইটি প্রকাশিত হবার কালে এর নাম ছিল “ফোর অ্যাণ্ড এ হাফ ইয়ারস এগেইনস্ট লাইজ়, স্টুপিডিটি অ্যাণ্ড কাওয়ার্ডিস।” পরে প্রকাশকের ব‍্যবসাবুদ্ধিতে ব‌ইটির নাম পরিবর্তন করা হয়।
এই সাংঘাতিক স্বৈরতন্ত্রী ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর তারিখে পোল‍্যাণ্ড আক্রমণ করে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেন।
হিটলার বা মুসোলিনি একলা পারে নি। হিটলারের সাথে ছিল হিমলার। ছিল গোয়েরিং। সাথে ছিল ব্রাউন শার্ট, এস এস বাহিনী। আর ছিল তথাকথিত আর্যামির স্লোগান। জাতিবিদ্বেষ খুঁচিয়ে তোলার কৌশল। দেশপ্রেমের মিথ্যে চটক। বিরোধী শিবির ছিল ছন্নছাড়া। ভারতের সাথে যেন মিলে যাচ্ছে অনেক কিছু। ভারতের ভাগ‍্যাকাশেও ইন্দিরার মতো হিটলারের উদয় হয়েছিল। জার্মানির বুকে হিটলারকে বাঙ্কারে ঢুকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়েছিল। ভারতেও ভেবেছিলাম তার মতোই কিছু হবে। সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যু নিয়ে রহ‍স‍্য আছে। আর দ‍্যাখ, ইন্দিরাকে শেষ করল তার বাড়ির রক্ষীরা। তুই কি ভাবছিস, এটা খুবই সাধারণ সাদামাটা ব‍্যাপার? ইন্দিরাও কিন্তু দেশের সংবিধানে “সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ” কথাটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আর এমন একটা সময় ঢুকিয়ে ছিল, যে সময়ে অমন করার আইনি এক্তিয়ারটাই ওর নেই। সমাজতন্ত্রের নাম জপতে জপতেই যারা জঘন‍্যতম কাজ করতে লজ্জা পায় নি, ইন্দিরা গান্ধী তাদেরই একজন।
জানিস অনু, হিটলারির মুখোশ খুলে দিয়েছিল একটা ছোট কাগজ। ১৯৪২ সালে জুন মাসের প্রথম দিনে পোল্যান্ডের ওয়ারশ এর একটি ছোট কাগজ “লিবার্টি ব্রিগেড” হিটলারের এই সমস্ত কুকীর্তি ফাঁস করে দেয়। তখন সারা পৃথিবীর শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিটলারকে মানবতার চরম শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন। ছোট কাগজ‌ও চাইলে সভ‍্যতা বাঁচাতে দায়িত্ব পালনে সমর্থ। ছোট সব সময় ছোট কিন্তু ছোট নয়।
এমন সময়ে পর্দা সরিয়ে কলেজে যাবার পোশাক পরে শ‍্যামলী বেরোলো। সে দুধ শাদা একটা শাড়ি পরেছে। টপনট। আর কানে ঝোলানো দুল। হাতে একটা শাদা রঙের এনামেল করা কাঠের তৈরি বালা। অরিন্দম সদ‍্যস্নাতা শ‍্যামলীকে দেখে বলল, এ যে একেবারে দেবী সরস্বতী লাগছে তোমাকে! শ‍্যামলী হাসল।
কাজের সহায়িকা বলল, দুধ রুটি দিয়েছি। খেয়ে নাও। শ‍্যামলী বলল, দুধরুটি?
অনসূয়া বলল, হ‍্যাঁ, দুধরুটি। খুবই ভালো জিনিস চটপট খেয়ে কলেজে যা। নিচে গোবিন্দচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছেন।
শ‍্যামলী বলল, আবার গাড়ি করে যেতে হবে?
অরিন্দম বললেন, অনু, আমি শ‍্যামলীকে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি যাচ্ছি!
অনসূয়া বললেন, উঁহু অরিন্দম, একদম দুষ্টুমি নয়। ওর কলেজ যে দিকে, তোর বাড়ি  তার পুরো উল্টো দিকে। আমার চোখে ধুলো দিতে পারবি না!
ঘরে সবাই হেসে উঠলো।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।