|| লিও জিলার্ড || জন্মদিনের স্মরণলেখায় মৃদুল শ্রীমনী

জন্মদিনে স্মরণলেখ: লিও জিলার্ড
লিও জিলার্ড ( ১১ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৮ – ৩০ মে ১৯৬৪) এর নাম পারমাণবিক শক্তি বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত। তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রে নাস্তানাবুদ হয়ে মারা যাবার কথা ছিল। অসুখে পড়ে গিয়ে হাসপাতালে ভরতি হয়ে আর যুদ্ধে যেতে হল না। স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা তাঁকে একরকম বাঁচিয়ে দিল। কিন্তু তাঁর সূত্রে পৃথিবীর সবচেয়ে আতঙ্কজনক দু দুখানি যুদ্ধ বিপর্যয় ঘটানো হয়, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করার সূত্রে তাঁর নাম এসে যায়। ম্যানহাটান বোমা প্রকল্পের সূত্রপাত ঘটানোর জন্য লিও জিলার্ড পরিচিত। যদিও জিলার্ড চান নি যে কোনো নগরীর অজ্ঞাত সারে সেখানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হোক। তিনি চেয়েছিলেন একটা প্রদর্শনী, যাতে করে যুদ্ধবাজ শক্তি গুলিকে পারমাণবিক বোমা হামলার বীভৎসতা বোঝানো যাবে, ও
সমরনায়কদের সংযত রাখা সম্ভব হবে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের তেত্রিশতম প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান জিলার্ড ও আরো ঊনসত্তরজন বিজ্ঞানীর লিখিত সমবেত আবেদনে কর্ণপাত করেন নি। ১৯৪৫ সালের ছয় আগস্ট হিরোশিমায় ও নয় আগস্ট নাগাসাকিতে পর পর দু দুটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
লিও জিলার্ডের উৎসাহেই কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট পরমাণু বোমা বানাবার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।
তবে জিলার্ড ভালই জানতেন পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে নেওয়াতে হলে আইনস্টাইনের মাপের বিশ্ববন্দিত ব্যক্তিত্বকে দিয়ে লেখাতে হবে।
লিও জিলার্ড ছিলেন আইনস্টাইনের ছাত্র। জিলার্ডের ডক্টরাল থিসিস দেখে আইনস্টাইন মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেছিলেন। তারপরেও মহাবিজ্ঞানীর সঙ্গে মিলে মিশে বেশ কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ জিলার্ডের ছিল। আইনস্টাইন ছিলেন ঘোষিতভাবে বিশ্বশান্তির পক্ষে। সুতরাং তাঁকে দিয়ে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির সপক্ষে বলানো ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। কিন্তু জিলার্ড আইনস্টাইনের মনের গহনের কথা জানতেন। তিনি জানতেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের উদ্যোগে জার্মান সমরবাদের প্রতি আস্থাসূচক ম্যানিফেস্টোয় তাবড় তাবড় নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী গবেষক অধ্যাপক স্বাক্ষর করলেও আইনস্টাইন সে ম্যানিফেস্টোর থেকে দূরে সরে থেকেছেন। জিলার্ড আইনস্টাইনের সেই জার্মান সমরবাদের প্রতি সন্দেহকে খুঁচিয়ে তুললেন।
১৯৩৯ সালের ১২ জুলাই। বিশ্ববন্দিত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তখন নিউ ইয়র্কের লং আইল্যাণ্ডে কাছোগ নামে একটি ছোট্ট জনবিরল গ্রামে থাকেন। লিও জিলার্ড এবং ইউজিন উইগনার গাড়িতে চড়ে তাঁর সমীপে উপস্থিত হলেন। গাড়িটি ছিল উইগনারের, আর তিনিই গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। জিলার্ড আর উইগনার মহাবিজ্ঞানীকে বোঝালেন যে পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব। আইনস্টাইন প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, আমি তো স্বপ্নেও এমন কথা ভাবতে পারি নি । তারপর জিলার্ড মুখে মুখে একখানি আমেরিকায় কর্মরত বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূতের উদ্দেশে একখানি চিঠি বলে গেলেন, আর শুনে শুনে উইগনার সেটি লিখে নিলেন। এরপর মহাবিজ্ঞানী তাতে স্বাক্ষর করলেন। এই চিঠির উদ্দেশ্য ছিল যাতে বেলজিয়ামের শাসনাধীন কঙ্গো থেকে জার্মানি ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করতে না পারে।
জিলার্ডের মাথায় ছিল ইউরেনিয়াম নিয়ে গভীরতর গবেষণার বাসনা। এটার বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইউরেনিয়াম সরবরাহ করতে পারত রাষ্ট্রশক্তিই। গবেষণায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইউরেনিয়াম সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে তা বোঝানোর দরকার ছিল। এজন্য প্রয়োজন ছিল বড়মাপের বিজ্ঞানীর অনুরোধ। জিলার্ড ধরে পড়লেন এনরিকো ফের্মিকে।
ইতালিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফের্মি তখন সদ্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। পরমাণুর কেন্দ্রকে নিউট্রন ছুঁড়ে তেজস্ক্রিয়তা আরোপের সূত্রে ও ইউরেনিয়ামোত্তর মৌলের সন্ধানের জন্য ১৯৩৮ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নোবেল সম্মান পেয়েছিলেন। তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান ও ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, উভয় ক্ষেত্রেই এনরিকো ফের্মি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। ১৯২৫ সালে তিনি উলফগ্যাং পাউলির একসক্লুশন প্রিন্সিপল এর সূত্রে আদর্শ গ্যাসের পরমাণুর গতি বিষয়ক একটি বলবিদ্যা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ফের্মি ডিরাক সংখ্যায়ন তৈরি হয়। ১৯২৮ সালে এনরিকো ফের্মি ইনট্রোডাকশন টু অ্যাটমিক ফিজিক্স নামে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। নানা মহলে তা বিশেষ আদৃত হয়। ওই একই বছরে, ১৯ জুলাই, ১৯২৮ তারিখে ফের্মি তাঁর বিয়েটা সেরে ফেলেন। পাত্রী লরা ক্যাপন ছিলেন বিজ্ঞানের ছাত্রী, আর ছিলেন ইহুদি পরিবারের দুহিতা।
এর অনেক দিন আগেই বেনিতো মুসোলিনি ২৩ মার্চ, ১৯১৯ তারিখে ইতালিতে ফ্যাসিস্ট আদর্শে সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯২১ এর নভেম্বর মাসের নয় তারিখে তৃতীয় ফ্যাসিস্ট কংগ্রেসের মাধ্যমে নিজের শক্তি আরো সংহত ও দৃঢ়বদ্ধ করে তোলেন তিনি। ১৯২২ এর আঠাশে অক্টোবর তারিখে একটি ক্যু দেতা বা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তিনি রাজা ভিক্টর ইম্যানুয়েল এর ক্ষমতা কেড়ে নেন। ১৯২৪ সালে প্রতারণা করে নির্বাচনে জেতেন। বেশ বোঝা যাচ্ছিল মুসোলিনি একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন। বিরোধী নেতৃত্ব গিয়াকোমো ম্যাত্তেওত্তি মুসোলিনির কাজকর্মের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে, তাঁর কণ্ঠকে ১০ জুন ১৯২৪ তারিখে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়।
ফিরে আসি এনরিকো ফের্মির কথায়। ১৯২৯ সালের ১৮ মার্চ তারিখে ইতালির ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ফের্মিকে ইতালির রয়্যাল আকাদেমিতে নিযুক্ত করে। আর মাস খানেকের মধ্যেই ২৭ এপ্রিল ১৯২৯ তারিখে ফের্মি যোগ দেন ফ্যাসিস্ট পার্টিতে।
ফের্মি গভীর প্রতিশ্রুতির সঙ্গে পারমাণবিক গবেষণা করে চলেছিলেন। জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী হান্স বেথআ রকফেলার ফাউণ্ডেশনের ফেলো হিসাবে ইতালিতে এলে ১৯৩২ ফের্মি তাঁর সঙ্গে একত্রে অন দি ইন্টার অ্যাকশন বিটুইন টু ইলেকট্রনস শীর্ষক গবেষণা পত্র লিখলেন।
এভাবেই চলতে চলতে ১৯৩৮ সালে ইতালির ফ্যাসিস্ট প্রশাসন জারি করল জাতি পরিচয়গত আইন। তাতে ইহুদি বিদ্বেষ ছিল মুখ্য বিষয়। এখন ফের্মির স্ত্রী লরা ছিলেন ইহুদি বাড়ির মেয়ে। তাঁকে তো ফ্যাসিস্ট সরকার টিঁকতে দেবে না। এছাড়া ফের্মির বহুসংখ্যক গবেষক ছাত্রও ছিলেন ইহুদি। সবার মুখ চেয়ে ফের্মি দেশ ছাড়লেন। জিলার্ড যখন ফের্মিকে ধরে পড়লেন রুজভেল্টকে রাজি করানোর জন্য তখনো আমেরিকার মাটিতে পারমাণবিক বোমা তৈরির সম্ভাব্যতা নিয়ে ফের্মি সন্দিহান। তিনি জিলার্ডকে বললেন, তাঁর চেয়েও অনেক বড় মাপের ব্যক্তিকে দিয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে দরবার করলে যদি কাজ হয়। তখন জিলার্ড আবার অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের শরণাপন্ন হলেন। ১৯৩৯ সালের আগস্টের দুই তারিখে জিলার্ড আবারো পাড়ি দিলেন আইনস্টাইন সকাশে। এবার অবশ্য সাথে আর উইগনার নেই। রয়েছেন এডওয়ার্ড টেলার। গাড়িটা টেলারই চালিয়েছিলেন। টেলার (১৫ জানুয়ারি ১৯০৮ – ০৯ সেপ্টেম্বর ২০০৩) ছিলেন একজন হাঙ্গেরিয়ান আমেরিকান তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি একটি ইহুদি পরিবারের সন্তান ছিলেন। মাত্র আঠারো বছর বয়সেই দেশত্যাগ করেন হাঙ্গেরিয়ান টেলার। প্রথমে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন জার্মানিতে। সেখানে কার্লশ্রুহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৬ থেকে ১৯২৮ সাল অবধি গণিত ও রসায়ন বিভাগে পড়াশুনা করে তিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর একজন পলিমার রসায়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারমান মার্কের সঙ্গে টেলারের যোগাযোগ হয়। অধ্যাপক মার্ক টেলারকে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে আকৃষ্ট ও আগ্রহী করে গড়ে তোলেন। ১৯৩০ সালে টেলার হাইজেনবার্গের অধীনে হাইড্রোজেনের মলিকুল আয়নকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার পরিবেশে রাখলে তার কী প্রতিক্রিয়া হয় সেই বিষয়ে গবেষণা করে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট করেন। ১৯৩২ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ প্ল্যাকজেক এর সহায়তায় এনরিকো ফের্মির সঙ্গে টেলারের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। টেলারকে ফের্মি নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের আঙিনায় টেনে আনেন।
যাই হোক, লিও জিলার্ড এবং সহযোগী হিসেবে এডওয়ার্ড টেলার অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের কাছে অনুরোধ করায় তিনি জিলার্ডের লেখা বয়ানে স্বাক্ষরদান করেন। চিঠিটি পেয়ে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তাঁকে লিখেছিলেন, আপনার চিঠির বক্তব্য ও তথ্যাদি আমি পর্যাপ্ত গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করেছি, এবং ইউরেনিয়াম মৌলটি নিয়ে আপনি যে পরামর্শ দিয়েছেন, তার বাস্তবায়নের দিকটি খতিয়ে দেখতে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর থেকে প্রতিনিধি বাছাই করে, তাঁর নেতৃত্বে একটি বোর্ড গঠন করে দিয়েছি।
এই সূত্রে ইউরেনিয়াম বিষয়ে পরামর্শদানকারী কমিটি সৃষ্টি হয়। তার মুখ্য ব্যক্তিত্ব হন ব্যুরো অফ স্ট্যাণ্ডার্ডসের ডিরেক্টর লাইম্যান জেমস ব্রিগস। সঙ্গে রইলেন অ্যাডামসন এবং হুভার।
আজ থেকে ছিয়াত্তর বৎসর আগে, ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসের ১৬ তারিখে ভোর সাড়ে পাঁচটা বাজার এক মিনিট আগেই নিউ মেক্সিকোর জর্নাদা দেল মুয়ের্তো মরুভূমিতে ট্রিনিটি বোমাটি ফাটানো হয়। এতে পঁচিশ কিলোটন টিএনটির বিস্ফোরণের সমতুল শক্তি নির্গত হয়েছিল।
ট্রিনিটি বোমাটি ফাটানোর তারিখের কয়েক দিন আগে লিও জিলার্ড চেয়েছিলেন বাস্তবে জাপানের কোনো শহরকে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে ধ্বংস না করে দেওয়া হয়। বরং, জিলার্ডের আগ্রহ ছিল
পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হলে ঠিক কী মাপের সর্বনাশ আসতে পারে, তা জাপানের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে দেওয়া হোক, যাতে তাঁরা সংযত হন।
এই সূত্রে লিও জিলার্ড আমেরিকার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের কাছে ম্যানহাটান প্রজেক্টের অধীনে কাজ করতে থাকা সত্তরজন বিজ্ঞানীর যৌথ স্বাক্ষরিত একটি আবেদন পাঠিয়েছিলেন। অতজন বিজ্ঞানী ওই যৌথ আবেদনে স্বাক্ষর করলেও এডওয়ার্ড টেলার ওতে স্বাক্ষর করেন নি। বলা দরকার, ইউজিন পল উইগনার কিন্তু সহমত হয়ে স্বাক্ষরদান করেছিলেন।
এতজন বিজ্ঞানী সমবেতভাবে জাপানের কোনো শহরে বোমা নিক্ষেপ করে ধ্বংসলীলা সৃষ্টির বিরুদ্ধে আপত্তি তুললেও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তাতে কর্ণপাত করেন নি।
এডওয়ার্ড টেলার ছিলেন আরো বিপুল শক্তিশালী বোমার পক্ষে। তাঁর আগ্রহ ছিল থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা বা হাইড্রোজেন বোমার প্রতি। প্রথম ধাপে আমেরিকান প্রশাসন হাইড্রোজেন বোমা নিয়ে মাথা ঘামান নি। পরে ১৯৫২ সালের নভেম্বর মাসের ০১ তারিখে আইভি মাইক নামে প্রথম হাইড্রোজেন বোমাটির পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে এডওয়ার্ড টেলার এবং স্টানিসল মারসিন উলাম এর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল।
টেলারকে এজন্য হাইড্রোজেন বোমার জনক অভিধা দেওয়া হয়েছিল। যদিও টেলার এই অভিধাটি ভাল চোখে দেখতেন না। এমনকি টেলার হাইড্রোজেন বোমা বানানো বাবদে আমেরিকান প্রশাসনের কাছে যে পরিমাণ খাতির পেতে চেয়েছিলেন তা যেন ততটা হচ্ছে না, এমন সন্দেহ করে টেলার পরীক্ষার রঙ্গমঞ্চে যান নি। বরং তিনি বহুদূরে বার্কলের ক্যালিফরনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসমেন্টে একটি কক্ষে বসে সিসমোগ্রাফে চোখ রেখে বোমার কার্যকুশলতা আন্দাজ করেছিলেন।
বোমার ছক হাতে এসে যাবার পর আমেরিকার রাষ্ট্রীয় শীর্ষ কর্তৃপক্ষ জিলার্ড বা টেলার কাউকে সেভাবে পাত্তা দেন নি। এমনকি ওপেনহাইমার পর্যন্ত গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরে অনেক কেঁদে ককিয়ে তাঁর নামমাত্র পুনর্বাসন হয়। বিজ্ঞানীকে আধুনিক রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ঠিক কী চোখে দেখেন, তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে কী?
ছড়া নামে কাব্যগ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রাদ্ধ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন। তাতে দেখতে পাই:
“ওই শোনা যায় রেডিয়োতে বোঁচা গোঁফের হুমকি –
দেশ বিদেশে শহর গ্রামে গলা কাটার ধুম কী!
..
আকাশ থেকে নামল বোমা, রেডিয়ো তাই জানায়-
অপঘাতে বসুন্ধরা ভরল কানায় কানায়।” এই লেখাটির তারিখ ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪০।
হিরোশিমা নাগাসাকিতে যখন বোমা ফেলা হচ্ছে, তার অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রয়াত। কিন্তু, তিনি বিশ্বরাজনীতির দাবাখেলাটা বুঝতে পেরেছিলেন বলব না কি?