আজ বিশিষ্ট ভারতীয় দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক রাহুল সাংকৃত্যায়নের জন্মদিন। আজ থেকে ১২৮ বৎসর আগে ১৮৯৩ সালে, এপ্রিল মাসের ৯ তারিখে উত্তরপ্রদেশের আজমগড়ে রাহুলজী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রয়াণও এই এপ্রিল মাসেই, ১৪ তারিখে, দার্জিলিং শহরে।
কী না ছিলেন রাহুলজী! মার্কসবাদী দার্শনিক, ক্রমে বৌদ্ধ দর্শনে আশ্রয় নিলেন। যেভাবে ভারতকে চিনেছেন জেনেছেন, সমান মন্ময়তায় তিব্বতী ঐতিহ্যকে আয়ত্ত করেছেন তিনি। লোকসংস্কৃতি, বিজ্ঞান, নাটক, ব্যাকরণ, ইতিহাস, জ্ঞান রাজ্যের পথে পথে রাহুলজীর সুমেধ বিচরণ। আমি তাঁকে জেনেছি ভ্রমণ কাহিনীর লেখক হিসেবে। ভবঘুরে শাস্ত্র ও তিব্বতে সওয়া বছর আমি পড়েছি বাংলা অনুবাদে। একজন মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান মানুষ কিভাবে ভ্রমণ করবেন, তা আত্মস্থ করতে রাহুলজী আমার পথপ্রদর্শক। পৃথিবীর সেরা পেশাটি হল ভবঘুরেমি, আর পৃথিবীর সেরা মানুষেরা বড় বড় ভবঘুরে ছিলেন, এই কথা তিনি আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
বস্তুতঃ রাহুলজীর সবচাইতে বিখ্যাত বই ভোলগা থেকে গঙ্গা তেও মানবসভ্যতাকে তার চলিষ্ণু অগ্রসরণশীল রূপেই দেখানো হয়েছে। খ্রীস্টপূর্ব ৬০০০ সাল থেকে কিভাবে ভোলগা তীরের ইউরেশীয় স্তেপভূমি থেকে ক্রমে হিন্দুকুশ পর্বতমালা, হিমালয় পর্বতমালা, অবহিমালয় পেরিয়ে মানবগোষ্ঠী গাঙ্গেয় সমভূমি তে এসে পৌঁছেছে তার একটি সুপাঠ্য নান্দনিক বিবরণ তিনি পেশ করেছেন। তবে এই লেখার পিছনে সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস ও ব্যাকরণ বিষয়ে তাঁর গভীর পড়াশুনা ছিল বলে, ও মার্কসবাদী বীক্ষা ছিল বলে এ লেখা গাঁজাখুরি গপ্পো না হয়ে মূল্যবান গ্রন্থ হয়ে উঠেছে। ১৯৪২ সালে এই বই হিন্দি ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৪৭ সালে এর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ভিক্টর কিয়েরনান। বইটি তামিল, তেলুগু, কন্নড় ও মলয়ালম, এই ধ্রুপদী ভারতীয় ভাষাগুলিতেও অনূদিত হয়েছে। এই বইটি আমি বাংলাভাষায় পড়েছি।
মানুষের সভ্যতা যে আসলে রক্তের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করে না, এক ভৌগোলিক জায়গায় বদ্ধমূল হয়ে থাকায় আস্থা রাখে না, ক্রমেই সে মেশে ও মেশার মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়, এগিয়ে যেতে যেতে বিকশিত হয়, এমন একটা অনুভবে তিনি আমায় প্রাণিত করেন। রবীন্দ্র কথিত শকহুণদল পাঠান মোগল একদেহে হল লীন, কথাটি যে কত গভীর উচ্চারণ, তা তাঁর লেখা পড়ে জানতে পেরেছি।