সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৪)

পরের দিন পাঁচ মে মার্শাল ল জারি হয়ে গেল। না, শুধুমাত্র চিকাগোয় নয়, গোটা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে । সারা পৃথিবীতে যেখানে যেখানে শ্রমিক বিরোধী সরকার ছিল সকলেই চিকাগোর ঘটনার ছুতোয় স্থানীয়ভাবে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট সংগঠনগুলি গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হল।
চিকাগোয় শ্রমিক নেতাদের উপর ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হল। সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়াই বাড়ি ঘর দোরে ঢুকে ঢুকে ভয়াবহ খানাতল্লাসি শুরু করল পুলিশ। শ্রমিক সংগঠনগুলির মুখপত্রগুলি জবরদস্তি করে বন্ধ করে দেওয়া হল। শেষপর্যন্ত চিকাগো ও সন্নিহিত এলাকার আটজন গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিকনেতাকে বাছাই করে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করল পুলিশ। এঁরা হলেন অগাস্ট স্পিজ, অ্যালবার্ট পারসনস, জর্জ এঞ্জেল, অ্যাডলফ ফিশার, লুইস লিঙ, মাইকেল শোয়াব, অস্কার নিবি এবং স্যামুয়েল ফিলডন। বলা দরকার যে বোমা বিস্ফোরণের সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অগাস্ট স্পিজ। আর স্যামুয়েল ফিলডন তখন পুলিশের নির্দেশে বক্তব্য শেষ করে এনেছেন। অ্যালবার্ট পারসনস ঝড় বৃষ্টির আশঙ্কায় মহিলা ও শিশুরা সঙ্গে থাকায় আগেই চলে গিয়েছিলেন। জর্জ এঞ্জেল ওই সভায় হাজির পর্যন্ত হন নি। তিনি ওই সময় বাড়িতে বসে তাস খেলছিলেন।
অ্যাডলফ ফিশার যদিও সভায় একটুখানি সময়ের জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন, তবে কাগজ বের করার দায়ে যথেষ্ট আগেভাগেই চলে গিয়েছিলেন।
মাইকেল শোয়াব খুব অল্প সময়ের জন্য হে মার্কেটের শ্রমিক সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অন্য একটি সভায় বক্তব্য রাখার জন্য হে মার্কেটের সমাবেশ ছেড়ে চলে যান। অস্কার নিবি হে মার্কেটের সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন নি, তথাপি পুলিশ তাঁকে আটক করেছিল। লুইস লিঙও হে মার্কেটের সভায় উপস্থিত ছিলেন না।
অর্থাৎ বোমাটি বিস্ফোরণের সঙ্গে লুইস লিঙ, অস্কার নিবি, এবং জর্জ এঞ্জেল কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না, কেননা, তাঁরা কেউই হে মার্কেটেল সভায় সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না।
আর মাইকেল শোয়াব, অ্যাডলফ ফিশার এবং অ্যালবার্ট পারসনসকে বোমা বিস্ফোরণের দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত করা যায় না, কেননা, বিস্ফোরণের অনেক আগেই তাঁরা হে মার্কেট এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
অর্থাৎ হে মার্কেট বিস্ফোরণের মামলায় আটজন অভিযুক্তের মধ্যে তিনজন, লুইস লিঙ, অস্কার নিবি এবং জর্জ এঞ্জেলের সঙ্গে ঘটনার যোগাযোগ ছিলই না। তাঁরা ওইদিন ওখানে পা পর্যন্ত রাখেননি। আর মাইকেল শোয়াব এবং অ্যাডলফ ফিশার যৎসামান্য সময়ের জন্য হে মার্কেটে থেকে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। ওঁদেরকেও বিস্ফোরণ ঘটানোর সঙ্গে দায়বদ্ধ করা শক্ত। অ্যালবার্ট পারসনস বক্তৃতা করলেও বিস্ফোরণের অনেক আগেই সভাস্থল পরিত্যাগ করেছিলেন। বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটার সময় হে মার্কেটে ছিলেন আটজন অভিযুক্তের মধ্যে মাত্র দুজন, অগাস্ট স্পিজ আর স্যামুয়েল ফিলডন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছিলেন, আটজনের কাউকেই তাঁরা বোমা ছুঁড়তে দেখেননি।
পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ষড়যন্ত্রে শ্রমিক আন্দোলনের কোমর ভাঙতে শ্রমিকদের সেরা সেরা নেতাদের আটক করা হল ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকুন বা না থাকুন, সকলের বিরুদ্ধে মামলা করে দিলেন। তারপর শুরু হল এক নারকীয় বিচার। দু মাস ধরে চলল বিচার অথবা বিচারের নামে প্রহসন।
১৮৮৬ তে আমেরিকান গণতন্ত্র আসলে ঠিক কী ছিল তার ছবি পাওয়া যায় ওই বিচারে। বিচারপ্রক্রিয়ার উপর ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় চাপ ছিল। বিচারের পরিণতি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করেছিল। পুঁজিপতিরা এককাট্টা হয়ে গিয়েছিল যে, ছলে বলে কৌশলে শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠকদের নৈরাজ্যবাদী অংশের সম্পূর্ণ বিনাশ চাই। মালিকপক্ষের হয়ে কথা বলেছিল বড় বড় সংবাদ মাধ্যম। রীতিমতো মিডিয়া ট্রায়াল শুরু হয়ে গিয়েছিল। চিকাগো ট্রিবিউন ঘোষণা করেছিল যে তারা জুরিদের পকেট টাকায় ভরিয়ে দেবে, যদি তাঁরা আট অভিযুক্তকেই দোষী সাব্যস্ত করেন। এই পরিস্থিতিতে বিচারের ফল কী হতে যাচ্ছে, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট ছিল।