দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২৪৩)

পর্ব – ২৪৩

স্কুল থেকে ফিরে খোকা সোজা ঢুকল লাইব্রেরি ঘরে। এখানেই এখন তার আশ্রয়।  বড়ো কাগজে একজন ছেঁড়া খোঁড়া জামা পরা বলিষ্ঠ যুবকের ছবি এঁকেছে সে। তর্জনী উঁচিয়ে আছে। আর পাশে একজন খর্বাকৃতি মানুষ। নিচে লিখেছে, রবিনসন ক্রুশো আর ফ্রাইডে। দেয়ালে টাঙিয়ে দিয়েছে ছবিটা।

স্কুলের পোশাক বদলে, মুখ চোখ ধুয়ে খোকা বসল হোমটাস্ক নিয়ে।
মা নিজের ঘরে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছেন।
তুমি    ডাক দিয়েছ কোন্‌ সকালে কেউ তা জানে না,
আমার           মন যে কাঁদে আপন মনে কেউ তা মানে না ॥
          ফিরি আমি উদাস প্রাণে,   তাকাই সবার মুখের পানে,
                   তোমার মতো এমন টানে   কেউ তো টানে না ॥
                   বেজে ওঠে পঞ্চমে স্বর,   কেঁপে ওঠে বন্ধ এ ঘর,
                   বাহির হতে দুয়ারে কর   কেউ তো হানে না।
          আকাশে কার ব্যাকুলতা,   বাতাস বহে কার বারতা,
                   এ পথে সেই গোপন কথা   কেউ তো আনে না ॥
জ‍্যাঠাইমা ঘরে ঢুকে বললেন,
রবিনসন ক্রুশো জলখাবারে আজ কী খাবে?
জ‍্যাঠাইমা, রবিনসন ক্রুশো এখন সুবোধ বালক। সে যাহা পায় তাহাই খায়।
জ‍্যাঠাইমা খোকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
বাবা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে কোনোভাবেই প্রতিক্রিয়াশীল ঔপন্যাসিক বলা যায় না।
খোকার কথায় বাবা ফিরে তাকালেন।
হুঁ।
বাবা, ওই যে বন্দেমাতরম্ লিখলেন, আনন্দমঠে আছে না?
হুঁ।
ওটা আগেই লিখেছিলেন। পরে আনন্দমঠে ঢুকিয়ে দিলেন।
হুঁ।
খোকার মা বললেন, দোহাই তোমার, ছেলেটা কি বলছে, একটু মন দিয়ে শোনো।
 কলেজের পরীক্ষার খাতা ফেলে প্রফেসর তাঁর স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তোমার কি মনে হচ্ছে, আমি শুনছি না? আমাকে তো খাতাগুলো দেখে দিতে হবে! অনার্সের খাতা। অনেকেই কলেজে টিচার্স রুমে বসে দেখেন, আমি তো তা পারব না!
মা বললেন, চল্ খোকা, লাইব্রেরি ঘরে গিয়ে আমি তোর কথা শুনব। চ, বাবা কাজ করছেন।
খোকা মাকে বলল, মা বন্দেমাতরম্ গানটা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিন্তু হিন্দু মুসলমান সবরকম ভারতীয়ের জন‍্য‌ই লিখেছেন।
তুই কি করে বুঝতে পারলি?
ও একটা গোপন কথা মা।
মা বললেন, গোপন কথা? তোর আবার গোপন কথা কিসের?
জ‍্যাঠাইমা বললেন, আহা, ওর যেন গোপন কথা থাকতে নেই?
মা বললেন, কি গোপন কথা, আমায় বলবি না?
খোকা বলল, ওই যে বলছিলাম বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রতিক্রিয়াশীল বলা ঠিক নয়।
জ‍্যাঠাইমা বললেন, প্রতিক্রিয়াশীল কথাটা তুই শুনলি কোথায়? কারা বলে এসব?
খোকা বলল, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এত ভালবাসা যার থাকে সে কোনো দিন প্রতিক্রিয়া শীল হতে পারে না।
মা বললেন, তাই তো রে। কিন্তু তুই বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ভালবাসা কোথায় খুঁজে পেলি?
কেন? এই তো শোনো না, সুখ দুঃখ তোমার আমার প্রায় সমান। তুমি রূপ দেখিয়া সুখী, আমি শব্দ শুনিয়াই সুখী। দেখ, এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যূথিকাসকলের বৃন্তগুলি কত সূক্ষ্ম, আর আমার এই করস্থ সূচিকাগ্রভাগ আর‌ও কত সূক্ষ্ম! আমি এই সূচিকাগ্র সেই ক্ষুদ্র পুষ্পবৃন্তসকল বিদ্ধ করিয়া মালা গাঁথি – আশৈশব মালাই গাঁথিয়াছি – কেহ কখন আমার গাঁথা মালা পরিয়া বলে নাই যে, কাণায় মালা গাঁথিয়াছে।
মা এইখানটা শোনো, পিতা মৃজাপুরে  একখানি সামান‍্য খাপরেলের ঘরে বাস করিতেন। তাহার‌ই একপ্রান্তে ফুল বিছাইয়া, ফুল স্তুপাকৃত করিয়া, ফুল ছড়াইয়া, আমি ফুল গাঁথিতাম। পিতা বাহির হ‌ইয়া গেলে গান গাইতাম – আমার এত সাধের প্রভাতে স‌ই, ফুটলো নাকো কলি –
কতখানি সহমর্মিতা, তাই না মা?
 জানো মা, বিদ‍্যাসাগর মশায় বলেছেন, কানাকে কানা বলিও না, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না। আর সেই কথাটাই আশ্চর্য সুন্দর করে বঙ্কিমচন্দ্র বলছেন, সুখ দুঃখ তোমার আমার প্রায় সমান। এইটা আমার বড্ড ভাল লেগেছে মা। প্রতিবন্ধী মানুষকে আর পাঁচটা মানুষের সঙ্গে সমান করে ভাবা। এটা খুব ভাল মা।
জ‍্যাঠাইমা বললেন, এই তোমার গোপন কথা? আমি ভাবছি কি না কি বলবি!
খোকা বলল, আরো আছে গো।
মা বললেন, গোপন কথাটি রবে না গোপনে
খোকা বলল, জ‍্যাঠাইমা, এইখানটা শোনো তোমরা,
ভাগীরথী তীরে, আম্রকাননে বসিয়া একটি বালক ভাগীরথীর সান্ধ্য জলকল্লোল শ্রবণ করিতেছিল। তাহার পদতলে, নবদূর্বাশয‍্যায় শয়ন করিয়া, একটি ক্ষুদ্র বালিকা, নীরবে তাহার মুখপানে চাহিয়াছিল- চাহিয়া, চাহিয়া, চাহিয়া আকাশ নদী বৃক্ষ দেখিয়া, আবার সেই মুখপানে চাহিয়া রহিল
বালিকা ক্ষুদ্র করপল্লবে, তদ্বৎ সুকুমার বন‍্যকুসুম চয়ন করিয়া মালা গাঁথিয়া, বালকের গলায় পরাইল; আবার খুলিয়া ল‌ইয়া আপন কবরীতে পরাইল, আবার খুলিয়া বালকের গলায় পরাইল। স্থির হ‌ইল না – কে মালা পরিবে;
সন্ধ‍্যার কোমল আকাশে তারা উঠিলে, উভয়ে তারা গণিতে বসিল। কে আগে দেখিয়াছে? কোন্ টি আগে উঠিয়াছে? তুমি কয়টা দেখিতে পাইতেছ? চারিটা? আমি পাঁচটা দেখিতেছি। ঐ একটা, ঐ একটা, ঐ একটা, ঐ একটা, ঐ একটা।
বাল‍্যকালের ভালবাসায় বুঝি কিছু অভিসম্পাত আছে।
দুই জা খোকার কথা শুনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
বাবা এসে দরজায় দাঁড়ালেন। খোকা সারাক্ষণ গল্প করলে হবে না। হোমটাস্ক কি দিয়েছেন করে ফেল।
খোকা হেসে বলল, স্কুল থেকে ফিরেই বসে করে নিয়েছি বাবা।
কেন খেলতে যাও নি কেন?
ধ‍্যুস, কি হবে খেলতে গিয়ে?
বাবা বললেন, অল ওয়ার্ক অ্যাণ্ড নো প্লে মেকস জ‍্যাক এ ডাল বয়।
জ‍্যাঠাইমা তাঁকে বললেন, ছোড়দা, সত‍্যি করে বলো তো, খোকাকে তোমার ডাল বলে মনে হয়?
খোকা জ‍্যাঠাইমার বুকের ভিতর মাথা রাখল।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।