সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ৭)

মজুর, মার্ক্স ও মে দিবস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শুরু হবার বছর দশেক আগে ভার্জিনিয়া প্রদেশের এক ক্রীতদাস মেয়ে শার্লটের গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন লুসিয়া। হয়তো শার্লট যাঁর ক্রীতদাস ছিলেন সেই টমাস জে টালিয়াফেরোর ঔরসেই লুসিয়ার জন্ম। হয়তো টালিয়াফেরো যখন একটি আমোদ ভ্রমণে গিয়েছিলেন, সেই সময় শার্লট পালিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন।
ক্রীতদাস জীবনের সাংঘাতিক নিষ্পেষণ, কালো মানুষের উপর ভয়ংকর নিপীড়ন, আর তার বহুমাত্রিক সমস্যা লুসিয়াকে ভীষণ ভাবে তাড়া করে ফিরত। অল্প বয়সেই নিজের থেকে অন্ততঃ কুড়ি বছরের বড় একজন কালো মানুষের শরীরী চাহিদা মেটাতে বাধ্য হল লুসিয়া। লোকটার নাম অলিভার বেনটন। তার ঔরসে লুসিয়ার একটি সন্তান হয়। শৈশবেই সেই সন্তান মারা পড়ে। ১৮৭২ এ নওজোয়ান অ্যালবার্ট পারসনসকে পেয়ে নিজের পুরোনো জীবনটাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন পরিচয় গড়ে তুললেন লুসি।
১৮৭৩ এ লুসি ও অ্যালবার্ট পারসনস চিকাগোয় আশ্রয় নেবার পর ক্রমশঃ ঘনিয়ে উঠল চিকাগোর রেলপথ ধর্মঘট। ১৮৭৭এর ১৬ জুলাই রেল রোকো করে দিল শ্রমিকরা। প্রথমে ন্যাশনাল গার্ড ও পরে ফেডারেল ট্রুপের হাতে নির্মমভাবে অত্যাচারিত হয়ে থামল সেই বিদ্রোহ। ক্রীতদাস জীবনের থেকে মুক্তি পেয়েও আমেরিকার গরিব মানুষ কিন্তু সুতীব্র অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পায় নি। রাষ্ট্রের সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থের একটা মৌলিক দ্বন্দ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই রেলশ্রমিকদের বিরাট আন্দোলন।
রাষ্ট্র যেভাবে নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগের পথে রেলশ্রমিকদের আন্দোলনের কোমর ভাঙল, তা দেখতে দেখতে লুসির রাজনৈতিক বীক্ষা রূপ নিচ্ছিল। তিনি শ্রমিকদের সাংগঠনিক চেতনা ও সংঘবদ্ধতার অধিকারের পক্ষে ও শ্রেণিসংঘর্ষের পক্ষে দাঁড়ালেন। কলম হাতে লুসি পারসনস রাজনৈতিক মতবাদিক সংগ্রাম শুরু করলেন। কোনো রকম মেয়েলিপনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে প্রকাশ্য মঞ্চে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গলা ছাড়লেন।
লুসি লেখালেখি শুরু করলেন অ্যালার্ম কাগজে। সেলাইকর্মী মেয়েদের সংগঠিত করতে শুরু করলেন। গর্ভবতী অবস্থায়, যখন আর পাঁচটা মেয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে ঘরের মধ্যে দিন কাটায়, সেই অবস্থায়ও শ্রমিকদের সংগঠিত করার স্বার্থে লুসি পথে বেরোতেন। নিজের কালো মানুষ পরিচয় আর ক্রীতদাস অতীতকে একদম পাত্তা দিতেন না নিজেকে চিনতে শিখলেন দুনিয়াজোড়া শোষিত মানুষের সংগ্রামী অংশের একজন হিসেবে।
১৮৮৬র ২ মে, রবিবার, অ্যালবার্ট গেলেন ওহায়ো-তে। সেখানে মিছিল পরিচালনার ভার তাঁর কাঁধে।
লুসি গেলেন আরেকটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে নেতৃত্ব দিতে। সেখানে জড়ো হয়েছিল পঁয়ত্রিশ হাজার শ্রমিক।
গোলমাল বাধল সোমবার, তেসরা মে। শ্রমিকদের নেতৃত্ব খুব সজাগ ছিলেন যাতে কিছুতেই আন্দোলনটা মারমুখী হয়ে না ওঠে। অশান্তির ঘটনা ঘটলেই তার ছুতোয় মালিকরা পুলিশ লেলিয়ে দেবে। দশ বছর আগের রেল ধর্মঘটের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা শিক্ষা নিয়ে রেখেছিলেন যে, শান্তি বজায় রাখাটা শ্রমিকদের বেঁচে থাকার স্বার্থেই প্রয়োজনীয়। পুলিশের হাতে আছে অস্ত্র আর তা ব্যবহার করার প্রশিক্ষণ। সর্বোপরি আছে রাষ্ট্রের সমর্থন। ওই জিনিসটি যথেষ্ট পরিমাণে ভারি। আইন আদালত প্রায়ই পুলিশের হয়ে কথা বলে। এই শিক্ষাটার কারণে নেতৃত্বের তরফে সর্বদা সাবধানতা অবলম্বন করা হচ্ছিল। নৈরাজ্যবাদ মানেই অশান্তি সৃষ্টি করার বা গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করতে হবে, এটা তাঁরা মনে করতেন না। বরং উলটো। শ্রমিকদেরকেই মাথা ঠাণ্ডা রেখে নিজেদের আন্দোলনের বার্তা দূরে দূরান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।
কিন্তু তেসরা মে তারিখে গোলমালকে পাশ কাটানো গেল না। লড়াকু শ্রমিক আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব চেয়েছিলেন চিকাগোর হে মার্কেট স্কোয়ারে মালিক শ্রেণীর তরফে শ্রমিকদের উপর অবর্ণনীয় অত্যাচারের প্রসঙ্গ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে, শ্রমিকদের মধ্যে উচ্চতর অধিকার বোধ ও সচেতনতার জন্ম দিতে। পুলিশের অত্যাচারে একটিও শ্রমিকের মৃত্যু ছিল তাঁদের অবাঞ্ছিত।
সেই হে মার্কেট স্কোয়ারে বহুবাঞ্ছিত বহু আকাঙ্ক্ষিত শ্রমিক জমায়েতের আগের দিনেই সোমবার তেসরা মে গোলমাল বেধে গেল। লুসি গঞ্জালেস বা অ্যালবার্ট পারসনস, দুজনের কেউই ধারে পাশে ছিলেন না। গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অগাস্ট ভিনসেন্ট থিওডোর স্পিজ ( ১০ ডিসেম্বর, ১৮৫৫ – ১১ নভেম্বর, ১৮৮৭)। ত্রিশ বছর বয়সের তাজা তরুণ যুবক। কিন্তু জীবনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। অকুস্থল হল ম্যাককর্মিক রীপার প্ল্যান্ট। কারখানাটা চিকাগোর ওয়েস্টার্ন অ্যাভিনিউ আর ব্লু আইল্যাণ্ড অ্যাভিনিউয়ের মোড়ের মাথায়।
মে দিবসের ইতিহাসে চিকাগোর ম্যাককরমিক হারভেসটিং মেশিন প্ল্যান্টে ঘটে যাওয়া বিষয়টির দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করা দরকার।
চিকাগো শহরের এই মেশিন কোম্পানি সাইরাস ম্যাককরমিক এর মালিকানায় ম্যাককরমিক রীপার নামে ফসল কাটার মেশিন তৈরি করত। সাইরাস হল ম্যাককরমিক ( ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮০৯ – ১৩ মে ১৮৮৪) ছিলেন চিকাগোর একজন প্রখ্যাত শিল্পপতি। আমাদের তেসরা মে তারিখের অঘটনের বছর দুয়েক আগেই ১৮৮৪ তে তিনি প্রয়াত হয়েছিলেন। শিল্পপতি জীবনের গোড়ায় তিনি ছিলেন আবিষ্কারক। ১৮৩১ সালে বাইশ বছর বয়সে তিনি যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফসল কাটার সরঞ্জাম আবিষ্কার করেন। তারপর ১৮৩৪ এ তার পেটেন্ট পাওয়ার পরে শহরের মেয়র উইলিয়াম অগডেন এর সঙ্গে পার্টনারশিপ কারবার গড়ে তুলে কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন।
তবে সত্যের খাতিরে বলতে হয়, ফসল কাটার এই মেশিন তৈরির পিছনে আসলে ছিলেন জো অ্যাণ্ডারসন নামে এক আফ্রো আমেরিকান প্রকৌশলী, যাঁকে সাইরাসের পৈতৃক পরিবার ক্রীতদাস হিসেবে পেয়েছিলেন।
যাই হোক, ম্যাককরমিক রীপার প্ল্যান্টে শ্রমিকেরা আট ঘণ্টার শ্রমদিবসের দাবিতে সোচ্চার হলে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ ক্ষুণ্ণ ও ক্ষুব্ধ হলেন। ওই সময় কারখানায় শ্রমিকেরা এক সপ্তাহে ষাট ঘণ্টা পরিশ্রম করতে বাধ্য থাকত। অর্থাৎ সপ্তাহে একটা মোটে ছুটির দিন বাদ দিলে দৈনিক গড়ে দশ ঘণ্টা করে কাজ। আট ঘণ্টার কর্মদিবসের দাবিকে দাবিয়ে রাখতে তেসরা মে আন্দোলন রত শ্রমিকদের কারখানার ভিতর তালাবন্ধ করে আটকে ভাড়াটে গুণ্ডা দিয়ে নির্যাতন করতে থাকে। কারখানার গেটের বাইরেও তখন বিভিন্ন জায়গা থেকে শ্রমিকেরা এসে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে জমায়েত হয়েছে। ম্যাককরমিক হারভেসটিং মেশিন প্ল্যান্টের বাইরে সেই শ্রমিক জমায়েতে বক্তৃতা করছিলেন অগাস্ট স্পিজ। তিনি ধর্মঘটী শ্রমিকদের বলছিলেন, দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে, সাংগঠনিক চেতনায় ঋদ্ধ হতে। সচেতন সংগঠিত শ্রমিকদের পক্ষেই আন্দোলন করে জয় ছিনিয়ে আনতে পারা সম্ভব।