অনসূয়া বললেন, নার্সিং পড়তে এসে ছাত্রীদের মুচলেকা দেবার বাধ্যবাধকতা আজও আমার খারাপ লাগে।
শ্যামলী বলল, এটা তো খারাপ লাগারই কথা। একজন একটা জিনিস নিয়ে পড়তে চাচ্ছে। তার যদি তাতে উপযুক্ত বয়স হয়ে থাকে, যোগ্যতা থাকে, পড়ার খরচ যোগানোর আর্থিক সম্বল থাকে তো পড়বে না কেন? বিয়েটা তো একদমই ইররেলিভ্যান্ট ব্যাপার। কত মেয়েই তো খেয়ালিপনা করে একটা বিয়ে করে ফেলতে পারে।
অনসূয়া বললেন খেয়ালিপনা না করে, বেশ ভাল রকম ভেবে চিন্তে দেখে বুঝে বিয়ে করার পরেও একটা মেয়ে নার্সিং পড়তে চাইতে পারে। জানিস্ তো শ্যামলী অনেক দেশে ছেলেদেরও নার্সিং পড়ার সুযোগ আছে।
শ্যামলী বলল, বাহ্, সে তো বেশ ভাল ব্যাপার। শিক্ষা জিনিসটা লিঙ্গ নিরপেক্ষ হওয়া দরকার।
অনসূয়া বললেন, আমরা একবার গোপালপুর অন সী বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা একটা দামি লজে ছিলাম। সেখানে ফরেনাররা কয়েকজন ছিল। কানাডার একজন ছিল। লোকটা বলেছিল যে সে মেল নার্স।
শ্যামলী বলল, আমি একজায়গায় মনিরুল ইসলাম নামে একটা লোকের কথা পড়েছিলাম। তার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। কিন্তু মনিরুল খুঁজে বেড়াচ্ছে কোন্ হসপিটালে লেডি ডাক্তার আছেন। সেখানেই সে তার স্ত্রীর প্রসব করাবে।
একশো কিলোমিটার দূরে বাড়ি শুনে লেডি ডাক্তার বললেন, কেন, গর্ভবতী বৌকে নিয়ে তুমি মেডিকেল কলেজে চলে এলে কেন? তোমার থানা এলাকায় বাচ্চা হবার জন্য মায়েরা কোথায় যায়?
মনিরুল বলল, আপনি লেডি ডাক্তার, তাই এসেছি।
অনসূয়া বললেন, তারপর কি হল?
শ্যামলী বলল, ভদ্রমহিলা গাইনি ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র ডাক্তার। তিনি মনিরুলের বউ সালমার প্রসবের সময় তাঁর গোটা আষ্টেক পুরুষ ছাত্রকে ডেকে নিয়ে ক্লাস করাতে করাতে প্রসব করিয়ে দিলেন। সুন্দর একটা খোকা পেয়ে সালমা কি খুশি!
মনিরুল যখন জানল, সালমার প্রসবের সময় গোটা আষ্টেক নওজোয়ান ডাক্তার ছাত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গোটা পর্বটা দেখেছেন, তার মধ্যে জনা চারেক আবার সালমার পেটে ও প্রসবের দ্বারে হাত দিয়েও দেখেছেন, তখন রাগে ক্ষোভে সে মাথার চুল ছেঁড়ে আর কি। সে সালমাকে জিজ্ঞাসা করল, সালমার কোনো অস্বস্তিবোধ হয়েছে কি না। তখন সালমা বলল, অস্বস্তি হবে কেন? ওরা সব ভাল ভাল ছাত্র। তাই না ডাক্তারী পড়তে পেয়েছে। আর হাতে কলমে না শিখলে বড় ডাক্তার হবে কি করে? তাছাড়া আমাকে ম্যাডাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ওরা শিখবে, তোমার আপত্তি আছে কি? আমি বলেছি, আপত্তি নেই।
মনিরুল বৌয়ের কথা শুনে হতবাক। বলল, তোর আব্রু রাখা ছিল তো?
বৌ বলল, গায়ে আমার সুতোটুকু ছিল না। কিন্তু ছেলেদের চোখে আব্রু ছিল। আমার একটুও অসুবিধে হয় নি, লজ্জাও মোটে করেনি। বরং আমি ভি আইপি হয়ে গেছি। নার্স দিদিরা বলছিল, ম্যাডাম অনেক দিন বাদে নিজে হাত লাগালেন। এখানে তো নরমাল ডেলিভারি সিনিয়র নার্সরাই করে দেয়।
মনিরুল তো হাঁ।
অনসূয়া হাসলেন। আমাদের দেশে জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশনটা সাংঘাতিক।
শ্যামলী বলল, দিদি শুনুন তারপর কি হল, সন্ধেবেলা রাউন্ডে এসেছেন ডাক্তার। খোকাটা দুধ খাবে বলে কেঁদে উঠেছে। সালমা ইতস্ততঃ করছিল। ডাক্তার এসে বললেন, যেই মাত্র বাচ্চা দুধ চাইবে, অমনি দেবে। যত দেবে, তত আসবে। সামনে কে আছে না আছে মানবে না। যে খারাপ ভাববে, সে লোকটা খারাপ । মা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে, এর চাইতে ভাল দৃশ্য নাকি আর হয় না। খোদ পুরুষ ডাক্তারের মুখে একথা শুনে মনিরুল হতবাক। ডাক্তারের চেহারা দেখে তার কোনো কিছু বলার সাহস পর্যন্ত হয় নি।
এই রকম একটা কথাই বলছেন সিমোন দি বুভুয়া। এখনো বেঁচে আছেন তিনি। ছিয়াত্তর সাতাত্তর বছর বয়স।
অনসূয়া বললেন, জানি জানি, উনি সেই জাঁ পল সার্ত্রর…
শ্যামলী বলল, ওটা নারী হিসেবে ওঁর দুর্ভাগ্য। সাধারণত একটা মেয়েকে আমরা কোনো একটা পুরুষের সাপেক্ষে পরিচয় দিয়ে থাকি। সেদিন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত সম্পর্কে আমার বাবা বললেন উনি জওহরলাল নেহরুর বোন। অথচ বিজয়লক্ষ্মী খুব বড় মাপের রাষ্ট্রবিদ ও ডিপ্লোম্যাট ছিলেন। পাণ্ডিত্যও কম ছিল না। নিজের যোগ্যতায় পরিচিত হবার পূর্ণ ক্ষমতা তাঁর ছিল। বুভুয়াও তাই। বড় গণিতবিদ ছিলেন।
অনসূয়া বললেন, তুই কি দার্শনিক বুভুয়ার কথা বলছিলি?
শ্যামলী বলল, তিনি গণিতবিদ তো বটেই, তার উপর দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক, ঔপন্যাসিক, সোশ্যাল অ্যাকটিভিস্ট।
অনসূয়া বললেন, আমি ওঁর সেকেণ্ড সেক্স বইটা দেখেছি। আমাদের লাইব্রেরিতে রয়েছে।
শ্যামলী বলল, বুভুয়া অবশ্যই গণিতবিদ। লাইবনিৎজ নিয়ে তাঁর থিসিস আছে।
১৯২৯এ ওঁর সাথে সার্ত্রর বন্ধুত্ব, চিন্তার গভীর আদানপ্রদান ঘনিষ্ঠতা এবং
অনসূয়া বললেন, সার্ত্রকে তো উনি বিয়ে করেন নি।
শ্যামলী বলল, সার্ত্র তবু দুই বছরের লীজের মতো টেম্পোরারি একটা বিয়ের কথা ভেবেছিলেন। বুভুয়া বলেছিলেন বিয়ে কবভি নেহি।
অনসূয়া বললেন, ওঁরা একসাথে থাকতেন।
শ্যামলী বলল, শুধুমাত্র থাকতেন না, সেক্স রিলেশনও ছিল।
অনসূয়া বললেন, লিভ টুগেদার, তাই না?
শ্যামলী বলল, না, ওঁদের চোখে এটা ছিল আত্মার সম্পর্ক। তা বলে কোথাও আটকে যান নি তাঁরা। গত ১৯৮০ সালে সার্ত্র মারা যাওয়া অবধি তাঁরা একসাথে ছিলেন। একান্নটি বছর একটানা। তবু এরমধ্যে অন্যত্রও সেক্স রিলেশন করেছেন বুভুয়া। এবং সেটা লুকিয়ে চুরিয়ে নয়। নেলসন অ্যালগ্রেন আর ক্লদ ল্যাঞ্জম্যানের সাথেও তিনি সহবাস জীবন যাপন করেছেন একই সাথে। আর তা নিয়ে কোনো ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছিল না। দি মান্দারিনস উপন্যাসে তিনি তাঁর সাথে নেলসন অ্যালগ্রেনের সহবাসী জীবনের বর্ণনা করেছেন। কোনো আড়ষ্টতায় ভোগেন নি। এ ছাড়াও আরো নানামাত্রিক যৌনতা উদযাপন করেছেন বুভুয়া। এবং সার্ত্রও। সে সব বুভুয়া লিখেছেন তাঁর শী কেম টু স্টে উপন্যাসে। ওটাই বুভুয়ার প্রথম উপন্যাস। বেরিয়েছিল ১৯৪৩ সালে।
অনসূয়া বললেন বুভুয়ার সব থেকে নামকরা বই দি সেকেণ্ড সেক্স।
শ্যামলী বলল, হ্যাঁ, ১৯৪৯ সালে বেরিয়েছিল। ওইখানেই বুভুয়া তাঁর অসাধারণ কথাটা বললেন।
অনসূয়া বললেন, কোন্ কথাটা?
শ্যামলী বলল, ওয়ান ইজ় নট বর্ণ বাট বিকামস আ ওম্যান। এটাই বিকশিত হয়ে যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয়ের ভিন্নতা দেখিয়ে দিল। যৌনতা জিনিসটা জীবশরীরগত। প্রকৃতির পছন্দ অনুযায়ী একটি মানুষ পুরুষ বা নারী। কিন্তু লিঙ্গ পরিচয়, আর তার সাথে জড়িয়ে থাকা আর পাঁচটা বিষয় সামাজিক ঐতিহাসিক ভাবে গড়ে ওঠে। শ্যামলী আরো বলল, পুরুষের তুলনায় খাটো করে, দুর্বল করে অসহায় করে মেয়েদের দেখাতে পছন্দ করে সমাজ। অ্যারিস্টটলের মতে মেয়েদের কিছু কিছু গুণ কম আছে, তাই না তারা মেয়ে। সেন্ট টমাস বলেছেন, মেয়েরা অসম্পূর্ণ মানুষ। বুভুয়া বলছেন, পুরুষেরা মেয়েদের তফাত করে দিয়েছে তাদের মোহময়ী, রহস্যময়ী, এই সব মিথ্যে আর ফাঁপা বুলির বিশেষণ দিয়ে। এইসব গালভরা কথা বলে সামাজিক পরিসরে মেয়েদের ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে পুরুষেরা। আর এই ভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তুলেছে। প্রকৃতি নারীর জন্ম দেয়। সমাজ তাকে ক্রমশঃ মেয়েমানুষ করে তোলে। তুমি মেয়ে, তোমাকে পুরুষের পিছন পিছন চলতে হয়। তুমি মেয়ে, তোমাকে জোরে কথা বলতে নেই। পেট ভরে খেতে নেই। কষ্ট হচ্ছে বলতে নেই। তুমি মেয়ে, দুদিন পর পরের বাড়ি যাবে। দুপ দুপ করে তোমার চলা ঠিক নয়।
অনসূয়া বললেন, মেয়েমানুষের বারো হাত কাপড়ে কাছা হয় না। পুড়ল মেয়ে উড়ল ছাই, তবে মেয়ের গুণ গাই। পথি নারী বিবর্জিতা। পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য নহিলে খরচ বাড়ে।
দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল।
অনসূয়া আরো বললেন, তোর বুভুয়া সবে ১৯৪৯ সালে এসব বলছেন, কিন্তু আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার থেকে পঞ্চাশ বছরের বেশি আগে কি বলেছেন শুনবি?
নিমীলিত চক্ষে আবৃত্তি করে যান অনসূয়া,
শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী! পুরুষ গড়েছে তোরে সৌন্দর্য সঞ্চারি
আপন অন্তর হতে। বসি কবিগণ
সোনার উপমাসূত্রে বুনিছে বসন।
সঁপিয়া তোমার ‘পরে নূতন মহিমা
অমর করিছে শিল্পী তোমার প্রতিমা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবে লিখেছেন জানিস্, সঞ্চয়িতা বের করে দেখান অনসূয়া, এই দ্যাখ, চৈতালি কাব্যগ্রন্থের মানসী নামে কবিতা। উনি লিখেছেন, আঠাশ চৈত্র, ১৩০২। ওর সাথে ৫৯৪ যোগ কর্, ইংরেজি সাল পেয়ে যাবি।
কাজের সহায়িকা শ্যামলীকে তাগাদা দিল, ওঠো ওঠো, কলেজে যাবে বলেছিলে যে, চলো টেবিলে খাবার দিয়েছি।
খাবার দেখে শ্যামলী অবাক। চিঁড়ে, কলা, আর সন্দেশ। আর কয়েক টুকরো আমসত্ত্ব আর খেজুর। সে মজা পেয়ে বলে উঠল আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিই তাতে, নো হাপুস হুপুস শব্দ, তুমি সেকেণ্ড সেক্স। অ্যারিস্টটলের ফতোয়া। দুজনে হো হো করে হেসে উঠল।