সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৩)

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পরে বিশেষতঃ দীর্ঘকালব্যাপী মন্দার পরে আবার শিল্পোৎপাদনের জোয়ার আসে। চিকাগো হয়ে ওঠে একটা গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র। আর হাজারে হাজারে জার্মান শ্রমিক দুটো রোজগারের আশায় সেখানে পাড়ি দিতে থাকে। এইসব শ্রমিকদের গড় দৈনিক রোজগার ছিল দেড় ডলার। সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করতে হত, আর ছয় দিনে মোট ষাট ঘণ্টারও বেশি কাজ করতে হত। শ্রমিকরা চাইত পরিচ্ছন্ন ও ভদ্র পরিবেশে কাজ করতে। এজন্য তারা সংগঠিতও হচ্ছিল। ‘নাইটস অফ দ্য লেবার’, বা শ্রমিকদের মুক্তিযোদ্ধা নামে সংগঠন, যারা সমাজতন্ত্রে আস্থা রাখত না, এমনকি কোনো বৈপ্লবিক কর্মসূচী পর্যন্ত গ্রহণ করা স্থগিত রেখেছিল, তারাও শুধুমাত্র দৈনিক কাজের সময় সীমাকে আটঘণ্টার মধ্যে বেঁধে রাখার দাবিকে সমর্থন করেছিল বলেই ১৮৮৪তে তাদের সদস্যসংখ্যা সত্তর হাজার থেকে ১৮৮৬ তে দশগুণ বেড়ে সাত লাখে পৌঁছে গেল। চিকাগো হয়ে উঠল নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। হাজারে হাজারে অভিবাসী জার্মান শ্রমিকের মনের খিদে মেটাত ‘আরবেইটার জাইটুং’ নামে জার্মান ভাষার সংবাদপত্র। অগাস্ট স্পিজ ১৮৮০ থেকে এই কাগজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৮৮৪ থেকে এই কাগজের সম্পাদক হিসেবে লক্ষ করা যেত। মে দিবসের আন্দোলন গড়ে তুলতে আরবেইটার জাইটুং সংবাদপত্র আর তার কর্মীরা অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। শ্রমিকনেতারা আরবেইটার জাইটুং আর অ্যালবার্ট পারসনস সম্পাদিত দি অ্যালার্ম পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে পুঁজিবাদী শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির সংগঠিত আন্দোলনের প্রয়োজনের কথা লিখতেন। তাঁরা দৈনিক কাজের সময়সীমাকে আটঘণ্টার মধ্যে বেঁধে রাখার দাবিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের যুক্তিবিন্যাস করতেন। তাঁরা বলতেন, এই আটঘণ্টার লড়াইকে নির্ভর করেই শ্রমিকশ্রেণির পক্ষে উন্নততর জীবন লাভ করা সম্ভব।
এইসব সংবাদপত্রে লেখা হত, শ্রমিকরা দুর্দশার অতলে ডুবছে, বেকারত্ব বাড়ছে, আর বড় ব্যবসায়ীরা ফুলে ফেঁপে উঠছে। তারা দেখাত যে, যেসব সংস্থায় মুনাফার অঙ্ক চড়চড় করে বাড়ছে, সেখানেও মালিক কর্মচারীর মজুরি কাটার ছুতো খুঁজছে। এইসব কাগজগুলির সক্রিয়তায় প্রায়ই ধর্মঘট বেধে যেত। কখনো কখনো হিংসাও ছড়িয়ে পড়ত। অগাস্ট স্পিজের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সোশ্যালিস্ট লেবার পার্টির সুবিধাবাদী অংশ ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল। স্পিজ নিজে, ও অনুগামীদের সাহায্যে এই পার্টির এক্সিকিউটিভ কমিটি দখল করে নেন এবং আপোসপন্থীদের দূর করে দেন। তখন দলের জাতীয় নেতৃত্ব অগাস্ট স্পিজ এবং চিকাগোর বিপ্লবপন্থী নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন এবং আরবেইটার জাইটুংকে পার্টিবহির্ভূত বলে ঘোষণা করেন। তখন স্পিজের নেতৃত্বে সোশ্যালিস্ট লেবার পার্টির বিকল্প একটি বিপ্লবপন্থী সংগঠন গড়ে ওঠে। এর নাম হয়, ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ইন আমেরিকা। চার মে সন্ধ্যায় হে মার্কেট স্কোয়ারের রক্তারক্তি ঘটনার পরদিন ৫ মে সামরিক আইন জারি হয়ে গেল। না, শুধুমাত্র চিকাগোয় নয়, গোটা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র একইসঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের কণ্ঠরোধ করতে সেনা নামল। হে মার্কেটের ঘটনার অভিঘাত পড়েছিল দুনিয়ার কোণে কোণে। যেখানে যত শ্রমিকস্বার্থবিরোধী সরকার ছিল, তারা চিকাগোর ঘটনাকে হাতিয়ার করে নিজেদের দেশে শ্রমিক সংগঠনকে গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যোগ নিল। চিকাগোয় সরকার শ্রমিক নেতাদের উপর ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করল। সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়াই বাড়ি বাড়ি ঢুকে খানাতল্লাসি শুরু হল। আর শ্রমিক সংগঠনগুলির মুখপত্রগুলি বন্ধ করে দেওয়া হল। চিকাগোর ঘটনাকে দাঙ্গা আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। আর তেমন দাঙ্গা বাধানোর দায়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেন অগাস্ট স্পিজ, স্যামুয়েল ফিলডন, অ্যাডলফ ফিশার, জর্জ এঞ্জেল, লুইস লিঙ, অস্কার নিবি এবং মাইকেল শোয়াব। অ্যালবার্ট পারসনস, তাঁর স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন, তাঁর সহযোগীদের বিচার শুরু হয়েছে, তখন তিনি স্বউদ্যোগে এসে প্রশাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পুলিশ আরবেইটার জাইটুং কাগজের কর্মচারীদের আটক করে তদন্ত শুরু করে। আর কাগজটির বিভিন্ন সংস্করণ সংগ্রহ করে আদালতের কাছে নৈরাজ্যবাদ ও অশান্তি পাকানোর অভিযোগ আনেন। চিকাগোর আরবেইটার জাইটুং কাগজের উপর মালিকশ্রেণি যথেষ্ট ক্ষুব্ধ ছিল। আগেই বলেছি, অগাস্ট স্পিজ প্রথমে এই কাগজের সঙ্গে ততটা জড়িত ছিলেন না। কাগজটি মূলতঃ দেখতেন, জার্মান আমেরিকান অভিবাসী পল গ্রোটোয়ান। কিন্তু ১৮৮৩র দিকে গ্রোটোয়ান উইসকনসিন প্রদেশের মিলাওয়াকিতে গিয়ে সেখানে আরবেইটার জাইটুং এর স্থানীয় সংস্করণ বের করতেন। চিকাগোর শাখাটি দেখাশোনা করতেন অগাস্ট স্পিজ। সেটা ১৮৮৩। পরবর্তী বছর ১৮৮৪ থেকে স্পিজের নাম কাগজে সম্পাদক হিসেবে উল্লিখিত হতে থাকে। স্পিজের পরিচালনায় চিকাগোর আরবেইটার জাইটুং শ্রমজীবী মানুষের নয়নের মণি হয়ে উঠেছিল। ১৮৮৬র প্রথমদিকে কাগজের গ্রাহকসংখ্যা ফুলে ফেঁপে উঠল। দিনের পর দিন অগাস্ট স্পিজ এই কাগজে ধৈর্য ধরে লিখে গিয়েছেন। কেন কাজের সময়সীমাকে দৈনিক আটঘণ্টার মধ্যে না বাঁধলে শ্রমজীবী মানুষের জীবনের গুণমান বৃদ্ধির কিছুমাত্র সম্ভাবনা নেই। তিনি আরো লিখলেন, মালিকেরা আরামে আয়েশে দুধে মধুতে জীবনযাপন করে আর শ্রমিকেরা দুটি রুটি যোগাড় করে উঠতে পেরে ওঠে না। একই সাথে তিনি বলতেন, কিভাবে বেকারত্ব বেড়ে চলেছে। লিখতেন, যেসব কোম্পানিতে যথেষ্ট ভাল লাভ হয়, সেখানে পর্যন্ত মালিকেরা শ্রমিকের মজুরি ছাঁটাই করতে দুবার ভাবে না। অগাস্ট স্পিজের এইসব লেখাই শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে দিয়েছিল। আর পুলিশ কর্তৃপক্ষ এইসব সংস্করণগুলিই আদালতে পেশ করেছিলেন।
গোটা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে মালিকশ্রেণি আর বিভিন্ন প্রদেশের সরকারগুলি একবগগা মনোভাব নিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল। শ্রমিক নেতাদের সাধারণ নাম দেওয়া হয়েছিল অ্যানার্কিস্ট বা নৈরাজ্যবাদী এবং শেষ অবধি এদের মধ্যে চারজনকে ফাঁসির মঞ্চে শহিদ হতে হয়। আরেকজন ফাঁসির আসামি জেলের ভিতর আত্মহত্যা করেন। একজনকে পনেরো বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, এবং ইলিনয়ের গভর্নর রিচার্ড যে অগলেসবি অন্য দুজনের মৃত্যুদণ্ড রদ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ব্যবস্থা করেছিলেন।
১৮৮৭র ১১ নভেম্বর অগাস্ট স্পিজ, অ্যালবার্ট পারসনস, জর্জ এঞ্জেল, ও অ্যাডলফ ফিশারের ফাঁসি হয়ে যায়। এই ফাঁসির ঘটনা সারা পৃথিবী জুড়ে শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা ধিক্কৃত ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা নিন্দিত হতে থাকলে মামলার নানা খুঁটিনাটি জিনিস প্রকাশ্যে আসতে থাকে।
১৮৯৩ সালে ইলিনয়ের গভর্নর জন পিটার আল্টজেল্ড ফাঁসি না হয়ে যাওয়া বন্দীদের ক্ষমাপ্রদর্শন করেন এবং রেহাই দেন। তিনি এমনকি এই বিচারকে যথেষ্ট সমালোচনাও করেন।
মনে রাখতে হবে যে, চিকাগোর হে মার্কেটের এই ঘটনা সারা দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্ক যে কেন একটা অনিরসনীয় দ্বন্দ্ব, তা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরে।শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসের গবেষক উইলিয়াম জে আডেলমান লিখেছেন যে, শুধু ইলিনয়ের শ্রমসম্পর্কের ইতিহাস নয়, এমনকি, গোটা আমেরিকার শ্রমিক ইতিহাসও নয়, তামাম দুনিয়ার শ্রমিক ইতিহাসে সবচাইতে বড় তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হে মার্কেট স্কোয়ারের এই আন্দোলন। তিনি বলেছেন, হয়ত এই আন্দোলন ১৮৮৬র ৪ মে সূচনা হয়েছিল, কিন্তু এর প্রভাব ও অভিঘাত আজও অনুভব করা যায়।
যে আটজনকে হে মার্কেটের ঘটনায় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল তাঁরা হলেন, অগাস্ট স্পিজ, জর্জ এঞ্জেল, অ্যাডলফ ফিশার, লুইস লিঙ, মাইকেল শোয়াব, অস্কার নিবি, স্যামুয়েল ফিলডন এবং অ্যালবার্ট পারসনস।
হে মার্কেটে বক্তব্য রাখার পরেই বিরূপ আবহাওয়ার কারণে অকুস্থল ত্যাগ করে অ্যালবার্ট পারসনস স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। পরে রক্তারক্তির ঘটনার খবর জেনে তিনি নিরাপদ জায়গায় গা ঢাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন শুনেছিলেন, তাঁর সতীর্থদের পুলিশ আটক করেছে, তখন বিবেকের ডাক শুনে সতীর্থদের সঙ্গে দুঃখ যন্ত্রণা সমভাবে ভাগ করে নেবেন বলে পুলিশ প্রশাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। আটক হওয়া এই আটজনের প্রত্যেকেই চিকাগোর বড়লোক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, আর, এঁরা প্রত্যেকেই বিশ্বাস করতেন যে, গরিব শ্রমিকের অনাহার ও অনশনের মূল্যে বড়লোকেরা শৌখিন জীবনযাপন করেন। এই একটা ব্যাপারে একমত হলেও, কোন্ পথে, কোন্ কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে শ্রমিকদের মুক্তি আসবে, তা নিয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির গুরুতর ও মৌলিক পার্থক্য ছিল। এঁদের কেউ কেউ ভাবতেন অশান্তি ও গণ্ডগোল পাকিয়ে তুলে হিংসাশ্রয়ী পথে সমাজের বদল ঘটবে। হিংসাকে কেউ আবার শুধুমাত্র আত্মরক্ষার্থে অবলম্বন করবেন ভাবতেন। আবার কেউ কেউ ভাবতেন, গরিব মানুষের মুক্তি বাস্তবে যথেষ্ট ধৈর্যের মধ্য দিয়ে সামাজিক সুস্থ সম্পর্কের বিকাশের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হয়। আমরা অ্যালবার্ট পারসনস, অগাস্ট স্পিজ ও স্যামুয়েল ফিলডনকে নিয়ে আগেই বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখন বাকি পাঁচজন বন্দী সম্বন্ধে আলোচনা করা দরকার।
জর্জ এঞ্জেল
জর্জ এঞ্জেল জার্মানিতে জন্মেছিলেন এবং ১৮৭৪ সালে চিকাগোয় পৌঁছেছিলেন। তিনি শাসক এবং কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অনমনীয় ভাবে প্রতিবাদ করতেন এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেও কঠোর মনোভাব প্রকাশ করতেন। এঞ্জেল বিরাজমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ও প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের কার্যকারিতার উপর সমস্ত আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি বলতেন, যে সরকার শুধুমাত্র বড়লোকদের তাঁবেদারি করে, এবং গরিবদের জন্য কিছুমাত্র কাজ করে না, তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা আমার নেই। এঞ্জেল ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং পিপলস অ্যাসোসিয়েশনে যোগদান করেছিলেন। যখন হে মার্কেট স্কোয়ারে বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছে, সেই সময় জর্জ এঞ্জেল বাড়িতে বসে তাস খেলছিলেন।
অ্যাডলফ ফিশার
অ্যাডলফ ফিশার জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৮৩ সালে তিনি চিকাগোয় আসেন। তিনি ছিলেন সাংঘাতিকভাবে নৈরাজ্যবাদী। চিকাগোর আরবেইটার জাইটুং কাগজে তিনি টাইপ সেটিং এর কাজ করতেন এবং অন্য একটি কাগজ ডার অ্যানার্কিস্ট তিনি সহ সম্পাদনা করতেন। হে মার্কেট সমাবেশের আগের দিন, ৩ মে, ম্যাককরমিক প্ল্যান্টের ঘটনায় শ্রমিকদের উপর পুলিশী গুলিচালনা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে লিফলেট ছাপা হয়েছিল, সেই লিফলেটে তিনি লিখে দিয়েছিলেন: শ্রমজীবী জনতা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হও এবং পূর্ণশক্তিতে উপস্থিত হও। আরবেইটার জাইটুং কাগজের সম্পাদক অগাস্ট স্পিজ দূরদর্শী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন বলে, ফিশারকে বুঝিয়ে এই বিপদজনক কথা কয়টা লিফলেট থেকে বাদ দেন। তারপর স্পিজ নিজের হাতে রুহে কথাটা লিখে দেন। জার্মান ভাষায় রুহে মানে শান্তি। ফিশার হে মার্কেটের সমাবেশে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু পরদিন ভোরে কাগজ বের করার দায়বদ্ধতায় তিনি আন্দোলন শেষ হবার আগেই চলে যান। ফাঁসির মঞ্চে আদালত ও বিচার ব্যবস্থাকে ধিক্কার দিয়ে অ্যাডলফ ফিশার নৈরাজ্যবাদের সপক্ষে হর্ষধ্বনি করেন এবং বলেন, আজ এই মুহূর্তটি আমার জীবনের সার্থকতম এবং পবিত্রতম মুহূর্ত।
লুইস লিঙ
লুইস লিঙ জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং হে মার্কেটের ঘটনার অল্প কিছুদিন আগে ১৮৮৫ সালে অভিবাসী হয়ে চিকাগোয় এসেছিলেন। চিকাগোর তীব্র নৈরাজ্যবাদী শ্রমিক আন্দোলনের ঝাঁঝ লুইস লিঙকে আকৃষ্ট করেছিল। লিঙ এসে চিকাগোর ছুতোর মিস্ত্রিদের সংগঠনের হাল ধরলেন এবং তেমন মিস্ত্রিদের তরফে কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠনে প্রতিনিধিত্বকারী নেতা হিসেবে নির্বাচিত হলেন।
লিঙ শান্ত সরল গোবেচারি ভালমানুষটি ছিলেন না। পুলিশের তরফে শ্রমিকদের উপর অত্যাচার হলে লিঙ ভীষণ ভাবে গর্জে উঠতেন এবং প্রকাশ্যে বলতেন, পুলিশ যদি শ্রমিকদের আন্দোলন ভাঙতে কামানের গোলা ছোঁড়ে, তাহলে শ্রমিকও পাল্টা ডিনামাইট চার্জ করবে। লিঙ শুধু মৌখিকভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধের লোক ছিলেন না, তিনি রীতিমতো রাইফেল নিয়ে গুলি ছোঁড়া অভ্যাস করতেন। কেমনভাবে, কোন্ কোন্ রাসায়নিক পদার্থের সুচারু মিশ্রণে ডিনামাইটের মতো উচ্চশ্রেণির তীব্র বিস্ফোরক বানানো যায়, তা তিনি আয়ত্ত্ব করেছিলেন। বিস্ফোরক দিয়ে বোমা বাঁধার কৌশলও তিনি রপ্ত করেছিলেন।
এই কৌশলের দ্বারাই তিনি ফাঁসির আগে কারারুদ্ধ অবস্থায় গোপনে বিস্ফোরক বানিয়ে শত্রুর হাতে প্রাণ দেবেন না বলে, নিজের মুখগহ্বরের ভিতরে বিস্ফোরণ ঘটান। ওই বিস্ফোরণের ঘায়ে কয়েকদিন পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
মাইকেল শোয়াব
মাইকেল শোয়াব জার্মানিতে জন্মেছিলেন এবং ১৮৮১ কি ১৮৮২ তে চিকাগোয় এসে পৌঁছেছিলেন। শোয়াবের মত ছিল, হিংসা এক জিনিস, আর নৈরাজ্যবাদ তার থেকে আলাদা। হিংসা ঘটলে আমরা তার প্রতিকারে হিংসা ঘটাব, কিন্তু ওটা শুধু আত্মরক্ষার প্রয়োজনে আমি করতে বলি। হিংসার জন্য হিংসা নয়। হিংসাকে রুখতে দরকার পড়লে সশস্ত্র হতে হবে। শোয়াব খুব অল্প সময়ের জন্য হে মার্কেটের শ্রমিক সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অন্য একটি সভায় বক্তব্য রাখার জন্য হে মার্কেটের সমাবেশ ছেড়ে চলে যান। তথাপি পুলিশ শোয়াবকে আটক করেছিল এবং আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। সাতটি বছর কারান্তরালে থাকার পর, ইলিনয় প্রদেশের গভর্নর জন পিটার আল্টজেল্ড ১৮৯৩তে তাঁকে ক্ষমাপ্রদর্শন করেন।
অস্কার নিবি
অস্কার নিবি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্মালেও ছোটবেলা থেকেই জার্মানিতে মানুষ হয়েছেন। ১৮৭৫ সালে, হে মার্কেট কাণ্ডের বছর দশেক আগে তিনি চিকাগোয় আসেন। নিবি নিজেকে কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং শ্রমিকদের আন্দোলন, মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন। এছাড়াও নৈরাজ্যবাদী সামাজিক ক্রিয়াকলাপেও নিবি অংশগ্রহণ করতেন। নিবি গভীর পড়াশুনায় অভ্যস্ত ছিলেন। একদা তিনি লিখেছিলেন, আমরা, সমাজতন্ত্রের কর্মীরা বিশ্বাস করি যে, দিন বদলাতে হলে শ্রমিককে নিজেকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে।
নিবি হে মার্কেটের সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন নি, তথাপি পুলিশ তাঁকে আটক করেছিল। আরো আশ্চর্যের বিষয় যে, হে মার্কেটের ঘটনার সঙ্গে নিবির যোগাযোগ না থাকলেও আদালত তাঁকে পনেরো বছরের জন্য কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। পরে সাতটি বছর কারান্তরালে অতিবাহিত করার পর ইলিনয় প্রদেশের গভর্নর জন পিটার আল্টজেল্ড ১৮৯৩ সালে অস্কার নিবিকে ক্ষমাপ্রদর্শন করে মুক্তি দেন। নিবি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, তিনি যে মদের কোম্পানিতে শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করার কাজ করতেন, সেখানকার অফিসাররা চেষ্টা চরিত্র করে, সম্ভবতঃ ঘুষ দিয়ে, যাতে পুলিশ নিবিকে আটকে রাখে, তার আয়োজন করেছিলেন। তবে এটা নিবির আশঙ্কা মাত্র ছিল। এই অনুমানের সপক্ষে কোনো নথি প্রকাশ্যে আসে নি।