দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৮০)

পর্ব – ১৮০

শ‍্যামলী বলল, দিদি, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কথা মনে করি।
অনসূয়া বলেন, হ‍্যাঁ, মোনালিসা এঁকেছিলেন। আর লাস্ট সাপার।
শ‍্যামলী বলল, দিদি, মোনালিসা আঁকতে উনি সাংঘাতিক ভাবে নিজেকে তৈরি করেছেন। নাক চোখ ঠোঁট, মুখের পেশির গড়ন কি রকম জানবেন বলে মৃত মানুষের শরীর কেটে কেটে পরীক্ষা করতেন। জানার অদম‍্য নেশায় পাগল। চূড়ান্ত পর্যায়ে নিখুঁত করতে চেয়েছেন। লাস্ট সাপারে যীশু নিজের শিষ‍্যদের নিয়ে খেতে বসেছেন। খাবার আগে তাদের হাত ধুইয়ে দিয়েছেন। খাবারের তালিকায় রুটি আর মদ। রুটির টুকরো হাতে নিয়ে যীশু বললেন এই আমার মাংস, আর মদটা দেখিয়ে বললেন, এই আমার রক্ত। আমি তা মানুষের জন্য উৎসর্গ করলাম।  তারপর শিষ‍্যদের উদ্দেশে বলবেন, আগামীকাল মোরগ ডেকে ওঠার আগেই তোমাদের একজন সামান্য কয়েকটি মুদ্রার জন্য  আমাকে অস্বীকার করবে। শিষ‍্যরা আতঙ্কিত। তারা প্রত‍্যেকে জানতে চাইছে, সে কি আমি?
অনসূয়া বললেন, জুডাস।
শ‍্যামলী বলল, লাস্ট সাপার ছবির সামনে দিয়ে হাঁটলে মনে হবে যীশুর হাত আর শরীর যেন নড়ছে। বাস্তব জীবনকে কতটা নিখুঁত করে জানলে এমন অসাধারণ শিল্পসৃষ্টি করা যায় দিদি! অথচ কতদিন আগের মানুষ। কোপার্নিকাস জন্মালেন ১৪৭৩ সালে। আর তার‌ও একুশ বছর আগে দা ভিঞ্চির জন্ম। ১৫১৯ সময় সালে সাতষট্টি বছর বয়সে ভিঞ্চি মারা যান। কোপার্নিকাস মারা যাবেন ১৫৪৩ এ। বছর চব্বিশ পরে। তাহলে কোপার্নিকাসের ব‌ই তো তাঁর পড়বার প্রশ্ন ওঠে না। তবু ভিঞ্চি বলতে পেরেছিলেন, ইল সোলে নন সাই মুভ।
অনসূয়া বললেন, পৃথিবীটা ঘুরছে। গ‍্যালিলিওর উপর তো কম অত‍্যাচার হয় নি। অমন যুগন্ধর প্রতিভা। ওঁকে হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষমা চাইতে বলা হল। চাইতে হল। কেননা, বিজ্ঞান বিষয়ক আরো গবেষণা বাকি ছিল। মরে গেলেই তো ফুরিয়ে গেল না। ওরা মারলে কোনো ঈশ্বর তো বাঁচাতে আসবেন না। তাই গবেষণার স্বার্থে গ‍্যালিলিও ক্ষমা চেয়ে সে যাত্রা মিটিয়ে নিলেন। গ‍্যালিলিওর ক্ষমাভিক্ষা পত্রটা কেউ লিখে দিয়েছিল নিশ্চয়ই। শাসকের কাছে ক্ষমা চেয়েও তিনি বিড়বিড় করে বলেছিলেন, এপ্পার সাই মুভ। তবুও পৃথিবী ঘুরছে। ১৬৪২ সালের একেবারে গোড়ায়, জানুয়ারি মাসের আট তারিখে কারারুদ্ধ অবস্থায় মারা যান গ‍্যালিলিও। ঠিক ওই বছরেই ডিসেম্বরের পঁচিশ তারিখে জন্মাবেন আইজ‍্যাক নিউটন।
নিউটন সূর্যের আলো ভেঙে দেখিয়ে দিলেন তার ভিতরে সাতরঙা বর্ণালির ঐশ্বর্য। অপটিকস নামে ব‌ইও লিখেছেন। সেটা ১৭০৪ সাল। তখন নিউটনের বয়স বাষট্টি।
অনসূয়া বললেন, নিউটনের আসল কাজটা বল্? ল অফ মোশন। প্রিন্সিপিয়া।
শ‍্যামলী বলল, হ‍্যাঁ, বলব। কিন্তু ওই যে সূর্যের আলো ভেঙে দেখালেন তিনি, সেখানে কাজে লাগিয়ে ছিলেন প্রিজম । বছর দুয়েকক আগে ১৯৮২ সালে ওই প্রিজম দিয়ে আলো প্রতিফলিত করে লেসার রশ্মি বানানো হয়েছে। আজ‌ও নিউটনের কাজ আমাদের আলো দেখায়। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে নিউটনের নামকরা ব‌ইটা প্রকাশ পেয়েছিল।
অনসূয়া বললেন, প্রিন্সিপিয়া।
শ‍্যামলী বলল, ফিলজফিয়া ন‍্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম‍্যাথমেটিকা। ব‌ইটা ছেপে বের করতে টাকা যুগিয়েছেন এডমণ্ড হ‍্যালি। নিউটন দেখিয়ে দিলেন, মাধ‍্যাকর্ষণের জন‍্য‌ই সূর্যের চারিদিকে না ঘুরে পৃথিবী আর অন‍্য গ্রহগুলোর কোনো উপায় নেই। কোনো ভগবান গ্রহগুলোকে দম দিয়ে ছেড়ে দেননি। সবটুকু পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মেনে তবেই হচ্ছে। আর ওই যে অ্যারিস্টটলের চিন্তা, টলেমির চিন্তা, সে সবের ত্রুটি সবাই বুঝে ফেলল।
অনসূয়া বললেন, ঘুরিয়ে দুনিয়ার লাট্টু, ভগবান হারিয়েছে লেত্তি…. এই গানটা জানিস্ মান্না দে গেয়েছেন। একদিন রাত্রে ফিল্মে ছবি বিশ্বাসের লিপে ছিল গানটা। শুনলেই ভারি মজা লাগত। সলিল চৌধুরীর লেখা গান জানিস তো?
শ‍্যামলী হাসল। বলল, ভগবান লোকটাকে একেবারেই আক্ষরিক অর্থে পথে বসিয়ে দিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ডার‌উইন সাহেব। বাইবেলে বলা ছিল ঈশ্বর ইচ্ছা করিলেন, আলো হ‌উক, তাহাতে আলো হ‌ইল। এইভাবে তাবৎ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের এক একটি জিনিস এক এক দিন সৃষ্টি হ‌ইল। সব কিছু সৃষ্টির পরে পরমপিতা ইচ্ছিলেন, মানব হ‌উক। তাহাতে প্রথম মানব আদম জন্মিল। তাহার পর ঈশ্বর রবিবার বিশ্রাম করিলেন।
বাইবেলের গল্প এইরকম। প্রথম মানব আদমকে ঈশ্বর সৃষ্টি করলেও প্রথম মানবী ইভ জন্মালেন আদমের পাঁজরের হাড় থেকে।
বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ও প্রাণজগতের উদ্ভবের কথা হিন্দুর পুরাণেও আছে। সেখানে সপ্তদ্বীপা বসুন্ধরার কথা আছে। আছে সাপের মাথায় পৃথিবীর অবস্থানের কথা। জলমধ‍্যে শয়ান বিষ্ণু এবং প্রজাপতিগণের কথাও বলা হয়েছে। দক্ষ এবং কশ‍্যপ এই রকম প্রজাপতি। দ্বাদশ আদিত‍্যের কথা বলা আছে, অষ্ট বসুর কথা বলা আছে, সপ্তর্ষিগণ, দেব দানব দৈত‍্য, বৈবস্বত,স্বায়ম্ভূব সহ  অনেকগুলি মনু, আর শ্বেতবরাহ প্রভৃতি অনেকগুলি কল্প মিলিয়ে হিন্দুর পুরাণ খুব রঙিন।
এক‌ই ভাবে, প্রাচীন সভ‍্যতার ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবিশ্বাস গুলিও যথেষ্ট উর্বর কল্পনাশক্তির পরিচয়বাহী। কিন্তু গোল বাধল একের পর এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আর কিছু মানুষের তীব্র অনুসন্ধিৎসা আর জিজ্ঞাসার কারণে। জিজ্ঞাসাদীর্ণ হৃদয়ে তাঁরা নানাবিধ প্রশ্ন তুললেন, অভিযানে বেরোলেন, তথ‍্যসংগ্রহ করলেন, ও সংগৃহীত তথ‍্য বিশ্লেষণে ব্রতী হলেন।
চার্লস ডার‌উইন  জন্মেছিলেন ১৮০৯ সালে। ফেব্রুয়ারিতে, আর ১৯ এপ্রিল, ১৮৮২ অবধি বেঁচেছিলেন। শুরুতে ডার‌উইন ছিলেন একজন প্রকৃতি পর্যবেক্ষক ও ভূতত্ত্ববিদ। জন্মপরিচয়ে তিনি ইংরেজ। ১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বরে পঞ্চাশ বছর বয়সে তিনি একটি ব‌ই প্রকাশ করলেন। ব‌ইটির নাম, “অন দ‍্য অরিজিন অফ স্পিসিস বাই মিনস অফ ন‍্যাচারাল সিলেকশন অর দ‍্য প্রিজারভেশন অফ ফেভারড রেসেস ইন দ‍্য স্ট্রাগল ফর লাইফ”। সেকালে ব‌ইয়ের নাম অমন লম্বা লম্বা হত। ছোটো করে ওই ব‌ইকে পণ্ডিতেরা ডাকেন “অরিজিন অফ স্পিসিস” বলে।
এই ব‌ই যেন সেইসব দুনিয়া বদলে দেওয়া ব‌ইয়ের মতো। নিকোলাস কোপার্নিকাসের দ‍্য রেভলিউশনিবাস অরবিয়াম কোয়েলেসটিয়াম (১৫৪৩), ও আইজ‍্যাক নিউটনের ফিলজফিয়া ন‍্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম‍্যাথেমেটিকা ( ১৬৮৭) ব‌ইয়ের সাথেই যেন তুলনীয় এই ব‌ইটির ভূমিকা।
 ডার‌উইনের বাবা চেয়েছিলেন ছেলে হোন চিকিৎসক। কিন্তু, সে ব‍্যাপারে আগ্রহ ছিল না ছেলের। তাঁর চেষ্টা গেল ধর্মীয় ব‍্যক্তিত্ব হতে। পাদ্রি হবেন। বাস্তবে  সেটাও জমে নি। পোকামাকড় নিয়ে পড়াশুনা করতেন। তারপর নেশা জাগল ভূতত্ত্ব নিয়ে গবেষণায়।
তারিখটা ছিল ১৮৩১ সালের ২৭ ডিসেম্বর। ব্রিটেনের প্লিমাউথ বন্দর থেকে দ্বিতীয় বারের সমুদ্র যাত্রা শুরু করল বিখ্যাত জাহাজ এইচ‌এম‌এস বীগল। জাহাজের ক‍্যাপটেন ছিলেন রবার্ট ফিটজ়রয়। তিনি বছর বাইশের তরুণ চার্লস  ডার‌উইনকে কাছে টেনে নিলেন। ঈশ্বরবিশ্বাসী ডার‌উইন চললেন অগাধ সমুদ্রে। বীগল জাহাজের ঘোষিত লক্ষ‍্য ও কাজ ছিল অতলান্তিক মহাসাগরে ঘুরে বেড়িয়ে জলবিষয়ক সার্ভে করা। আর দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ অংশ ঘুরে অস্ট্রেলিয়া ছুঁয়ে ফেরা। এইসময় ডার‌উইন ভূতত্ত্বের আগ্রহী গবেষক এবং সেই বিষয়ে সন্দর্ভ তৈরিতে মনোযোগী। বীগল জাহাজে চড়ে আর্জেন্টিনা গিয়ে তিনি বিলুপ্ত স্তন‍্যপায়ী প্রাণীদের জীবাশ্মের একটি বড়োসড়ো সংগ্রহ দেখতে পেলেন। এখানে তিনি বেশ কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করলেন। এই যে পর্যবেক্ষণ ও নমুনা সংগ্রহ করলেন, এতে তাঁর মনে প্রাকৃতিক নির্বচনের উসকানি জাগে। তারপর তো ইতিহাস। বিজ্ঞানীর মন তো আবেগে ভাসে না। নানাভাবে নিজেকে খুঁড়তে থাকে যুক্তি দিয়ে। “কেন?” , এই প্রশ্নটাই বিজ্ঞানীকে এগিয়ে নিয়ে চলে নতুন নতুন আবিষ্কারের পথে। দুই বৎসর পরিভ্রমণ করবে বীগল জাহাজ। যাত্রা শুরুর কালে এমনই স্থির ছিল। কিন্তু সেটা বাড়তে বাড়তে গিয়ে ঠেকল প্রায় পাঁচ বৎসরে। এর মধ‍্যে তিন বৎসরের বেশি সময় ধরে ডার‌উইন ডাঙায় ঘুরে ঘুরে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ করেছেন। জাহাজ করে জলে ভেসেছেন তিনি মোটে বছর দেড়েক। ১৮৩৬ সালের ২ অক্টোবর দেশের বন্দরে ফিরল বীগল। ধর্মপিপাসু যুবকটি ফিরল না। সে এখন একজন জিজ্ঞাসু সংশয়বাদী ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিগ্ধ মানুষ। সে এখন এমন এক বিশ্বের নাগরিক, যে বিশ্বটি ঈশ্বরের হাতে গড়া নয়।
একজন বদলে যেতে থাকা প্রশ্নশীল সংশয়ী মানুষ।
 ওই যে বীগল জাহাজে চড়ে সে ঘুরে বেড়িয়েছিল, সেই সব বিবরণ সে দিনলিপির পাতায় লিখে রেখেছিল।
জাহাজ ফিরে আসার বছর ঘুরতে ঘুরতে তার ব‌ই লেখা হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে একটি বড়ো ব‌ইয়ের তৃতীয় খণ্ড হিসেবে ডার‌উইনের ভ্রমণ বিবরণী প্রকাশ পায়।
অরিজিন অফ স্পিসিস তৈরি করতে আরো অনেক সময় নিলেন। ত্রিশ বছরের মতো। বছর বাইশের যুবক নিজের সংগৃহীত তথ‍্য নানাভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে পরিপ্রশ্নের মধ‍্য দিয়ে তিনটি দশক ধরে চলতে চলতে ১৮৫৯ সালে গড়ে তুললেন “অরিজিন অফ স্পিসিস”। ১৮৩৫ সালে সমুদ্রবেষ্টিত  গ‍্যালাপাগোস দ্বীপমালায় ভ্রমণের মাধ‍্যমে তথ‍্য সংগ্রহ ডার‌উইনের অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচন করে। ভিন্ন ভিন্ন দ্বীপে একই প্রজাতির পাখির ঠোঁটের গড়নে ভিন্নতা তাঁকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে। এর আগেই যদিও কোনো কোনো পণ্ডিতের কলমে বিবর্তনবাদ আলগোছে উঁকি দিয়েছে, তবু সুসংহত সুগঠিত তত্ত্ব হিসেবে পর্যাপ্ত প্রমাণসহ তাকে বিদ্বৎসমাজে পেশ করলেন ডার‌উইন।
দুনিয়া গেল বদলে। ঈশ্বরের করুণা নয়, প্রকৃতির কারখানা ঘরে বহুদিনের মরণপণ চেষ্টায় প্রাণ বিকশিত হয়েছে, এমন উপলব্ধিতে পৌঁছে গেল মানুষ।
কাজের সহায়িকা মহিলাটি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এলেন। বললেন, সারারাত কেউ শোও নি জানি।  তবু বেডটি খাও। শ‍্যামলী বলল, দাঁড়াও, মুখ না ধুয়ে চা খাব না। বলেই দৌড়ে গেল বাথরুমে।
অনসূয়া বললেন, দিদি, তুমি জানলে কি করে যে আমরা সারারাত ঘুমোই নি? তুমিও কি জেগে জেগে শ‍্যামলীর বক্তৃতা শুনছিলে? বলে নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।