সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২৯)

আমার কথা

১১৩

বড়ো হতে থাকা মেয়েদের মাসের পাঁচটা দিন একটু সমস্যা হয়। অনেক বাবা জিনিসটা বুঝতে পারে না। বুঝতে চায় না। এ কটা দিন মেয়েদের দরকার স্যানিটারি ন্যাপকিন । স্যানিটারি ন্যাপকিনের অভাবে গরিব মেয়েরা অনেকে নোংরা কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করে । ছেঁড়া চটও । এমন কি শুকনো ঘাস বা খড়। এগুলো সব বিপজ্জনক। ওরা ভালো করে শুকোতে পায় না কাপড়ের টুকরো । লজ্জায় সঙ্কোচে ঘুপচি কোণে রেখে দেয় কাপড়ের টুকরো। আরশুলা আর পোকা মাকড় হাঁটে সেই ঘুপচি কোণে । ভিজে স্যাঁতস্যাঁতে কাপড় ব্যবহার করে যৌনাঙ্গে সমস্যা হয় অনেক মেয়ের ।ওদের জন্যে স্কুলে স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বসিয়ে দিন। মেয়েরা নিজেরা পয়সা ফেললে মেশিন থেকে বেরিয়ে আসবে টাটকা স্যানিটারি ন্যাপকিন । সস্তা হবে। তাহলে মেয়েরা স্কুলে আসতে সমস্যায় পড়বে কম। সত্যকারের ” কন্যাশ্রী” হয়ে উঠতে সুবিধে হবে।

১১৪

কবি কাকে বলেজালিয়ান ওয়ালাবাগের গণহত্যার ঘটনার সুত্রে কবি কাকে বলে তার একটা ধারণা গড়ে তুলেছি মনে মনেসেদিন মাইকেল ও’ ডায়ারের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ পঞ্জাবের নিরীহ জনতার উপর গুলি ছোঁড়ে , আর হতাহত হয় প্রচুর মানুষঢোকা ও বেরোনর পথ ছিল সংকীর্ণ, পুলিশের তরফে সভাস্থল খালি করে দেবার জন্যে সময় দেওয়া হয়েছিল সামান্যআসলে ব্রিটিশ প্রশাসন চেয়েছিলেন এক অংশের ভারতীয়দের হত্যা করে অন্য অংশের ভারতীয়দের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিতেওরা সফল হয়েছিলযারা ছিলেন আগুন খেকো নেতা, ব্রিটিশ শাসনকে গালি না দিয়ে যারা জলটুকু খেতেন না, তারা জালিয়ান ওয়ালাবাগের গণহত্যা দেখে শিউরে উঠলেনরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কি চেহারা নেয় জালিয়ান ওয়ালাবাগের গণহত্যার বিপুলতা তা টের পাইয়ে দিয়েছিলবাঘা বাঘা বিপ্লবী নেতৃত্ব তখন চুপএক কবিহতে পারে তিনি জমিদার পরিবারের সন্তানহতে পারে তিনি দুধে মধুতে বড় হয়ে ওঠা বুর্জোয়াহতে পারে তিনি কোনোদিন লাঙল টানেন নি নিজে হাতেকারখানার ভোঁ শুনে দৌড়োতে হয়নি তাঁকে বয়লার ঘরেসেই কবি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বললেন প্রতিবাদ ধ্বনিত করতে।তখন ব্রিটিশের নখ দাঁত দেখে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব থরহরি কম্পমানআগুনখেকো নেতারা রয়েছেন আড়ালে আবডালেবেরিয়ে এসে বুক চিতিয়ে প্রতিবাদের সময় নয়এই ছিল তাঁদের মতবাঘা বাঘা বিপ্লবী নেতৃত্ব তখন বোবা কালা সেজেছেনতখনএক কবিহতে পারে তিনি ছন্দের সুষমায় প্রাণ ঢেলেছেনহতে পারে তিনি গানের সুরে পাখনা মেলেছেনতিনি বললেনতাহলে আমাকেই কিছু করতে হয়সেই কবি আশ্চর্য সমৃদ্ধ ভাষায়ব্রিটিশ সরকারের শীর্ষ পদাধিকারীকে লিখলেন এক পত্রতাতে বললেনযেভাবে জালিয়ান ওয়ালাবাগের গণহত্যা হলতা মানবিক সমস্ত ধারণাকে পদ দলিত করেছেএক কবিরাষ্ট্রীয় নেকড়ে হায়েনা শ্বাপদের ধারালো দাঁতের সামনেমাথা উঁচু করে দাঁড়ালেনআমার দেশবাসীকে যে অবমাননা করেছ,আমাকেও ঠেলে দাও সেই নিচেকবি পারে এই কথা বলতে…সেই থেকে জানি কাকে কবি বলে …

১১৫

তাঁর গায়ে থুতু দিলেঈশ্বর কিছু বলেন নিতাঁর কাপড় হেঁচড়ে খুলে নিলেওঈশ্বর কিছু বলেন নিমাথায় পরিয়ে দিলো কাঁটার মুকুটনিয়ে চললো হই হই করে ।তার পর দু পাশে দুটো চোর এর সাথেওঁকেও ঝুলিয়ে দিল ক্রুশেঈশ্বর কিছু বলেন নিঈশ্বর কিছু বলেন নাতেষ্টা পেলে গলায় ঢেলে দিলকড়া মদ ।গলা যেন জ্বলে যাবেতখনো ঈশ্বর কিছু বলেন নিঈশ্বর কিছু বলেন নাতিনি নবম প্রহরে ক্ষোভে আর্তনাদ করে উঠলেনএলি এলি লামা সাবাকতানিহে ঈশ্বর, হে মানুষের ঈশ্বরকেন আমায় পরিত্যাগ করলে ?তখনো ঈশ্বর কিছু বলেন নিঈশ্বর কিছু বলেন না।

১১৬

মা, আমার মা বিয়েতে কয়েকটি বই উপহার পেয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি অমিয় চক্রবর্তীর ” ঘরে ফেরার দিন” । ছুটির দুপুরে লুকিয়ে বড়দের বই পড়ার অভ্যেস করেছিলাম সেই ক্লাস ফোর থেকে । সে সব কবিতার পংক্তি বেশ মনে আছে – ” জগৎযাত্রী গাছের তলায় বসে / চেয়ে দেখে মাছ ছোটো পুকুরের জলে / সারা ভুবনে ভ্রমণের মন নিয়ে ” । নাভানা থেকে প্রকাশিত বইটা। তখন থেকেই জানি সুমুদ্রণ কাকে বলে। ১৯০১ সালের তাঁর জন্ম । রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠির সাথেও অমিয় চক্রবর্তী জড়িয়ে আছেন।বিয়েতে বই দিলে এসব ক্রমে জানা হয়। একজনের কথা ভেবে উপহার একটি প্রজন্ম পেরিয়ে কাজ করে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।