সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মৌসুমী নন্দী (যাপন চিত্র)

এক হেরোর গল্প
“হ্যাঁগো শুনছো, একটা নেমন্তন্ন এসেছে..” রান্নাঘর থেকে হাঁক দেয় মঞ্জু।
স্ত্রীর কথা শুনে জিজ্ঞাসা করে পরমেশ্বর বাবুর , “কিসের নেমন্তন্ন?”
“হালখাতার।”
“কে করেছে?”
“কেজানে, চিনতে পারলাম না। তুমি অফিসে শুনে আমার হাতে কার্ডটা দিয়ে গেলো। আমাদের সবাইকেই খুব করে যেতে বলেছে।”
পরমেশ্বরবাবু ভাবেন নতুন কে আবার নিমন্ত্রণ করবে। সাধারণত সিমেন্টবালির দোকান, মিষ্টির দোকান, ওষুধের দোকান, এসব থেকেই হালখাতার নিমন্ত্রণ আসে, রত্নাও চেনে তাদের সকলকে ৷মনোযোগ সহকারে কার্ডটা দেখতে থাকে পরমেশ্বর বাবু ৷ ঠিকানা অনুযায়ী খুব কাছেও নয়। যাকগে, সে একাই চট করে চলে যাবেন।
রত্লনা আর একমাত্র সন্তান শ্রেয়সীকে নিয়ে পরমেশ্বরের সুখী পরিবার। তাহলেও বিত্তবান আত্মীয়স্বজনদের কাছে পরমেশ্বর একজন হেরো মানুষ। ছোট্ট বাড়ি, জাঁকজমকহীন জীবন। একটা সরকারি দপ্তরে চাকরি করেন তিনি, খুব বেশি মাইনে না হলেও ভালোই চলে যায় তাদের। একসময় অনেক গরীব ছেলেমেয়েকে সে বিনামূল্যে পড়িয়েছেন ৷ এতে বন্ধুরাও তাকে কথা শোনাত যে, এসব সমাজসেবায় পেটের ভাত জুটবে না। এর সাথেই পরীক্ষা দিতে দিতে একসময় চাকরিটা পেলো। আর এখন স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে তার শান্তির সংসার, মা বাবা গত হয়েছেন বহু আগেই।অবশেষে নির্দিষ্ট দিনে কার্ডের উল্লিখিত ঠিকানায় পৌঁছে যায় পরমেশ্বর । কার্ডটাও সঙ্গে করে এনেছে, যদি ভুল করে দিয়ে থাকে তাহলে অন্তত দেখাতে পারবে সে বিনা নিমন্ত্রণে আসেনি। আসবাবপত্রের দোকান, বেশ বড়ো, ঝাঁ চকচকে। ভালোই লাগে পরমেশ্বর বাবুর । ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে সে।
এমনসময় একখানা পড়ার টেবিলচেয়ারের দিকে চোখ আটকে যায় তার। এমনই একটা টেবিলচেয়ার অনেক ধরেই কিনবে ভাবছেন শ্রেয়সী র জন্য। কতো দাম কেজানে!জিজ্ঞাসা করতে দোকানের এক কর্মচারী জানায়, “স্যার, এটা গিফ্ট পারপাসে বুক করা। আপনি অন্যকোনো স্টাডি টেবল দেখতে পারেন।”
হঠাৎ হইহই শুনে দেখে এক ভদ্রলোক, তার চাইতে বয়সে বেশ খানিকটা ছোটই হবে, সকলকে অভিবাদন জানাচ্ছে। মনে মনে ভাবে পরমেশ্বর বাবু ইনিই তাহলে দোকানের মালিক। পরমেশ্বর বাবুকে দেখে সেই ভদ্রলোক হাসিমুখে এগিয়ে এসে একটা প্রণাম ঠুকে বসলো, “চিনতে পারছেন স্যার? আমি সুশান্ত ”
পরমেশ্বরের তো হতভম্ব অবস্থা! সেই ভদ্রলোক নিজেই বলতে থাকে, “চিনতে না পারাই স্বাভাবিক। সেই কবেকার কথা। আপনি আমাদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতেন। আপনার জন্যই উচ্চমাধ্যমিকটা পাশ করতে পেরেছিলাম। সে ঋণ জীবনে শোধ করতে পারবো না। আজ আমি এই দোকানের ম্যানেজার। আপনার আশীর্বাদ ছাড়া এমনটা হওয়ার ছিল না স্যার।”
সেই সন্ধ্যেটা যে কিভাবে কাটলো পরমেশ্বরের তা তিনি নিজেই জানেন না। একটা অনাবিল আনন্দ, বিস্ময় সব মিলিয়েমিশিয়ে দারুণ এক অনুভূতি। তবে আরো কিছু বাকি ছিল বিস্ময়ের।
ফেরার সময় সুশান্ত বললো, “স্যার, আমি একটা উপহার রেখেছি আপনাদের জন্য। প্লিজ না বলবেন না।”
“না না, উপহার কিসের! তুমি যে তোমার সাফল্যের দিনে আমায় মনে রেখেছো, এই অনেক।”
“না স্যার, আমার বড়ো ইচ্ছা। না নিলে খুব দুঃখ পাবো। আপনি আমার জন্য যা করেছেন, তার তুলনায় এটা কিছুই নয়।”
দু’জন কর্মচারীকে দিয়ে সুশান্ত হাজির করল সেই টেবিলচেয়ার। পরমেশ্বরবাবু বিস্মিত হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যান ৷”না না, এ আমি নিতে পারবো না। এর তো অনেক দাম!”
“ওভাবে বলবেন না স্যার। আপনার সাহায্যের কাছে এ খুবই নগণ্য।”
শেষপর্যন্ত সুশান্তর বারংবার অনুরোধে উপহারটি নিতে সম্মত হয় পরমেশ্বরবাবু । সুশান্ত তার কর্মচারীদ্বয়কে বলে জিনিসদু’টো পরমেশ্বর বাবুর বাড়িতে পৌঁছে দিতে।
ছাপোষা প্রিয়তোষ টোটো চেপে বাড়ির পথ ধরেন ৷ সাধারণ পোশাক, সাধারণ চেহারা, আত্মীয়স্বজনদের চোখে একটা হেরো লোক। আনন্দে বিহ্বলা পরমেশ্বর বাবু মনে মনে বলতে থাকে, “আমি জিতে গেছি রত্না , আমি জিতে গেছি শ্রেয়সী । ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে সম্মান পাওয়া প্রতিটা শিক্ষক শিক্ষিকা আজ জিতে গেছে..”