“বিরূপাক্ষের ছায়া” ঐতিহাসিক স্থান পরিচয় ময়ূরী মিত্র ঘোষ

নেশা ভ্রমন আর সেই সব অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখালিখি করতে ভালোবাসেন এই লেখিকা।

বিরূপাক্ষের ছায়া

তুঙ্গভদ্রার তীরে ,শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসটি পড়েননি এরকম বাঙালি বইপ্রেমী পাওয়া দুস্কর। তুঙ্গভদ্রার তীরে গড়ে ওঠা বিজয়নগর রাজ্য যার সৌন্দর্য্য ,শিল্প ,গরিমা আজও ইতিহাসের পাতায় খোদিত। এই বিজয়নগরের রাজধানী ছিল হাম্পি ,বর্তমানে এই হাম্পি কর্ণাটকের বল্লরী জেলায় অবস্থিত আর এই হাম্পি তেই প্রতিষ্টিত বিরূপাক্ষ মন্দির। আমার লেখা এই মন্দির কে কেন্দ্র করে নয় ,মন্দিরের উল্টোদিকে এক কক্ষে অদ্ভুত চমৎকার কে ঘিরে। যা সাধারণ মানুষের কাছে জাদু বা চমৎকার। সত্যি জাদু বলে কিছু আছে নাকি এক্ষেত্রেও প্রাচীন ভারতের অবিস্মরণীয় প্রযুক্তিবিদ্যা।
বিরূপাক্ষ মন্দির স্থাপত্য কলার এক নজরকাড়া নমুনা। চতুর্দশ শতাব্দী তে এই মন্দির স্থাপিত করেন রাজা কৃষ্ণদেব রায়। যদিও মনে করা হয় এই মন্দির এর থেকেও প্রাচীন। রামায়ণে এর উল্লেখ পাওয়া গেছে। কৃষ্ণদেব রায় এই মন্দিরটির পুনর্গঠন করেন। এবার আসা যাক সেই অদ্ভুত প্রযুক্তির গল্পে। মন্দিরের উল্টোদিকে এক কক্ষে শুধুমাত্র একটি ছোট গর্ত আছে। যেখান থেকে সূর্যের আলো প্রবেশ করে। দিনের বেলায় আলো প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ছিদ্রের উল্টোদিকের দেয়ালে মন্দিরের চূড়ার উল্টো ছায়া দর্শিত হয়। সবথেকে অদ্ভুত ব্যাপার বেলা যত বাড়ে সেই ছায়া তাতো চকচকে হতে শুরু করে এবং দ্বিপ্রহরে একদম সোনার মতো রং হয়ে সেই মন্দিরের উল্টো চূড়ার প্রতিফলনের। কি করে সম্ভব তাহলে কি ম্যাজিক ? না কখনো না। প্রযুক্তিবিদ্যার খেলা। পদার্থবিদ্যার আলোর চ্যাপ্টারে পিনহোল এর কথা পড়েছিলেন তো ? ধরুন একটি বড়ো বাক্স চারপাশ দিয়ে বন্ধ ,এবার সেই বাক্সের যেকোনো দেয়ালে একটা ছোট গর্ত করুন। এবার ওই ছোটো ছিদ্র দিয়ে সূর্যের আলো ফেলুন। এবার আলো ভিতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে যা কিছু আছে তার উল্টো প্রতিফলন দেখা যাবে বাক্সের দেয়ালে। আসলে সূর্যের আলো দেয়ালে পড়ার আগে তার সামনে যা কিছু রয়েছে তার সঙ্গে আলোর ঘর্ষণ হচ্ছে বা তাতে ধাক্কা খাচ্ছে এবার প্রতিফলিত এল ওই ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় মূলবস্তুর প্রতিফলন উল্টে যায়। মন্দিরের চূড়ার প্রতিফলনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এবার ছায়ার রঙের ঘটনার কথা বলি। সকালের দিকে সূর্যের তেজ থাকে না তাই এমনি ওল্টানো প্রতিফলন দেখা যায়। দুপুরে সূর্যের তেজ বাড়ে ফলে প্রতিফলন উজ্জ্বল হয়। ১৮২৭ সালে ফরাসী বিজ্ঞানী joseph nicephore প্রথম ক্যামেরার মাধ্যমে প্রথমবার ছবি তোলেন পিনহোল পক্রিয়ার মাধ্যমে। এখন কথা হচ্ছে এর বহু আগে ভারতে এই একই পক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছিল। বলা যেতে পারে পিনহোলের প্রথম প্রচেষ্টা। ইতিহাসের পাতায় এর কোনো উল্লেখ কি আমরা পেয়েছি। না পাইনি। সময়ের অতলে হারিয়ে গেছে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ্যার এই অসাধারণ নমুনা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।