আজ থেকে আশি বছর আগের কথা। তখন আমার বয়স আঠারো বছর। সকলে শুভ বলে ডাকত আমাকে। শুভাশিস থেকে সংক্ষেপে শুভ। আজ এই আটানব্বই বছর বয়সে সেসব দিনের কথা মনে পড়লে চোখের কোনে জল গড়ায় আমার। কোন কোন বিষয় মনে আনন্দেরও প্রকাশ ঘটায়। তখন আমি স্কুলে পড়ি,সালটা 1940। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, দেশের স্বাধীনতার জন্য একে একে অসংখ্য যুবককে বিপ্লবী হয়ে যেতে দেখেছি। যুবক বয়স, রক্ত টগবগ করে ফুটছে। ইংরেজের অত্যাচার সত্যিই সহ্য করা যায় না। আমিও নাম লিখালাম বিপ্লবীদের খাতায়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসকে সামনে থেকে দেখেছিলাম কয়েকবার। আমাদের বাড়ি ছিল কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের কাছেই। বাবা খুব কষ্ট করে আমাদের পাঁচ ভাই ও তিন বোনকে মানুষ করেছেন। আমি বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়ায় বাবা-মার আপত্তি ছিল। কিন্তু আমি শুনি নি। অল্প বয়সের আবেগে যা হয়।
একবার আমরা কয়েকজন বিপ্লবী মিলে ইংরেজ সরকারের এক থানা পুড়িয়ে দিতে গিয়ে শহীদের খাতায় নাম লেখাচ্ছিলাম। কানের পাশ থেকে কনস্টেবলের ছোড়া গুলি চলে যায়। একটুর জন্য আমরা চারজন বিপ্লবী প্রাণে বাঁচি। দীর্ঘদিন গা-ঢাকা দিয়ে এখানে ওখানে পালিয়ে বেরিয়েছি। “প্রয়োজনে দেশের জন্য রক্ত দেব”– এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে, আমরা জীবনকে হাতে নিয়ে দুঃসাহসী কাজে লিপ্ত হোতাম। 1942 সালে গান্ধীজীর ভারতছাড়ো আন্দোলন চলছে। আমার দাদারা ভয় পেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আমার বাড়িতে পুলিশ খানাতল্লাশি চালিয়েছিল। বাবা-মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছিলো। আমি ভয় পেয়েছিলাম তাদের উপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করার কথা ভেবে।
তখন 1947 সাল, ইংরেজরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ভারতবাসী তাদের জন্মভূমি মাকে স্বাধীন হতে দেখবে ভেবে খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। কিন্তু জওহরলাল নেহেরু ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের ষড়যন্ত্রে আমাদের সাধের জন্মভূমি ভেঙে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। আমার এখনো কষ্ট হয় এই ভেবে, যে নেতাজির জন্য এই দেশ স্বাধীনতা পেল, তিনিই তাঁর যথাযোগ্য সম্মানের জায়গা পেলেন না। দেশে থাকতে পারলেন না। রাজনীতির নোংরা খেলার শিকার হতে হল তাঁকে। দলে দলে মুসলিম ভাই-বোনদের চলে যেতে হয়েছিল ভারতবর্ষ ছেড়ে পাকিস্তানে। পাকিস্তান থেকে হিন্দুরা সব ছেড়ে এ দেশে এসেছিল। নেতারা অন্ন- বস্ত্র- বাসস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও সবাই তা পাই নি। আমার কাকা, জ্যাঠা পূর্ব-পাকিস্তান থেকে আমাদের বাড়িতে এসে উঠেছিল। কাঁটাতারের মোড়কে ঘিরে ফেলা হয় দুই বাংলাকে। আমার কাকারা সব ফেলে চলে এসেছিলো এদেশে; সময় পায়নি সম্পত্তি বিক্রি করার। নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করার যন্ত্রণা পেত আমার কাকা, মাঝে মাঝে কান্না করত। আমার ঠাকুমাও স্বদেশের জন্য চোখের জল ফেলত । ঠাকুমার কান্না দেখে আমিও কেঁদে দিতাম। কারণ মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা কি জিনিস, তা আমি বুঝতাম।
আমি বিপ্লবীদের দলে থাকার সময় অনেক বার জেলে গেছি। আমার উপর কম অত্যাচার হয় নি। কপাল জোরে এখনো বেঁচে আছি। দেশভাগ হওয়ায় যেমন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, তেমনি ভারত স্বাধীন হওয়ায়, ভারতবাসীর স্বাধীনতার কথা ভেবে আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিলাম নিজের মা-বাবাকে। মাকে বলেছিলাম– “মা তোমার সন্তানও স্বাধীনতা আনার একজন সৈনিক, তুমি খুশি হও নি।” মা বলেছিলেন– “আগে বুঝি নি স্বাধীনতার আনন্দ পরাধীনতার থেকে অনেক বেশি ; তাই তোর জীবনের কথা ভেবে আটকে ছিলাম। এখন বুঝছি ভারত মায়ের বীর সন্তানদের ক্ষমতা। এ আনন্দ মৃত্যুর থেকে অনেক বড়। এই আনন্দ আমার একার নয়, সমস্ত দেশবাসীর আনন্দ।” দেশভাগের ফলে অনেক হিন্দু ভাই-বোনদের, তাদের ছেলে-মেয়েদের না খেতে পেয়ে কষ্ট পেতে দেখেছি। কত শত মানুষ না খেয়ে চোখের সামনে মারা গেল ; চোখের জল ফেলা ছাড়া কিছুই করতে পারি নি। করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের ছিল না। 1943 সালের মন্বন্তরে কলকাতার ফুটপাতে না খেতে পেয়ে মরে পড়ে থাকতে দেখেছি অসংখ্য মানুষকে। মনে প্রশ্ন জেগেছে –‘আমাদের কি কিছুই করার নেই?’ যদিও নিজেরাও দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যের লাইনে দাঁড়িয়েছি এক মুঠো খাবারের আশায়।
আজ বাবা-মা মারা গেছেন অনেক বছর হয়েছে। দাদারাও কেউ বেঁচে নেই। আমার বয়স হয়েছে। সময়ের ব্যবধানে দুই ছেলে ও এক মেয়ে হয়েছে আমার। ছেলেরা যে যার মত থাকে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি বেহালায়। এখনো সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজসেবামূলক কাজ করি। বড় ছেলে রথীন রেলে চাকরি করে, ছোট ছেলে পঙ্কজ স্কুলমাস্টার। আমি যে স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলাম ছেলে-মেয়েদের বললে হো হো করে হাসে। তারা বলে– ‘কি পেয়েছো স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়ে?’ সত্যিই তো দেশের জন্য যে জীবনকে উৎসর্গ করেছিলাম একসময়, সেই দেশের মানুষ স্বাধীনতা পাওয়ার পর আমাদের মত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য একটুও ভাবেনি। স্বাধীন সরকার তো প্রমাণ দেখাতে বলে। প্রমাণ দেখাতে না পারলে ভাতা পাওয়া যায় না। কিন্তু আমার তো কোনো প্রমাণ নেই ! সবকিছুর কি প্রমাণ থাকে? বৃদ্ধ ভাতা ও পরের বাড়ি কাজ করে আমরা বুড়োবুড়ি কোনমতে বেঁচে আছি। নাতি-নাতনিরা মাঝেমাঝে কাছে আসে। তাদের দেশের পরাধীনতার গল্প শোনাই, শোনাই আমার স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার গল্প। তারা কেউ বিশ্বাস করে, আবার কেউ এগুলি আজগুবি ভাবে। আসলে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামের কোন উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক নই তো ; তাই আমাদের কথা কেউ মনে রাখে না, কেউ বললেও বিশ্বাস করে না। আমাদের মত এমন কত আছে । কে মনে রাখে বলতো?
চোখের জল নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে। দেশ মায়ের পরাধীনতার জন্য আগে কাঁদতাম। ঠাকুমার স্বদেশপ্রীতি দেখে চোখে জল আসতো। আর এখন নিজের ছেলে মেয়ে দেখেনা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী হয়ে জীবনে কি করলাম– এই কথা ভেবে কান্নায় বুক ভাসাই। সন্তানরা দেখা না বলে ওদের কিছু বলি না। সবই আমার কপাল। ঈশ্বরকে শুধু বলি — “হে ঠাকুর, সব সহ্য করার শক্তি দিও আমাকে। স্বদেশ মাতার প্রতি আমার ভালোবাসা যে খাঁটি, তা তুমি তো জানো। আমার শুধু আফসোস, আমি মানুষকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না।”