গদ্যের পোডিয়ামে মালা মিত্র

আমার এ ঘর বহু যতন করে……

এ ঘর তখনো হয়ত ঘর হয়ে ওঠেনি,একজায়গায় খুঁটি তো বহু দূরে ইট সিমেন্ট।
পাগল হাওয়ায় যত্র তত্র ছড়ানো ছেটানো, বার তের বছরের এক খড়ের কাঠামো, উদভ্রান্ত, না সে ঘর চিনেছে না বাহির।না পূর্ণ প্রতিমায় রূপ পেয়েছে।
সবটাই ভাসা ভাসা জ্ঞান, শরৎ কালের মেঘের মত হৃদাকাশে এই আছে এই নেই।
তবে মন কিন্তু চিনতে চায় সব কিছ, যা কিছু ও-ই ডাগর চোখে দৃষ্ট হয়,চোখ দিয়ে গিলে মগজে জমা রাখে,স্মৃতিঘর বৃদ্ধির তাগিদ। শুভ অশুভ, মন্দ ভাল, সবটাই গোগ্রাসে গেলে।
বয়ঃসন্ধিতে হটাৎ তার বোহেমিয়ান চলা ফেরায় এক বন্ধক আসে, সে তখন নিজেকেই আর চিনতে পারে না,সে তখন অন্য গ্রহের মানুষ, যেন অন্য কোনো কেউ তার ওপর ভর করেছে।
দেহপটটি সুন্দর সুগঠিত হতে থাকে,যা কিছু সুন্দর তা যেন এক নিমেষে একচুমুকে গিলে খেতে চায়,এতদিন নারী পুরুষের আলাদা স্বত্বা বড় একটা চেনা থাকে না,কিন্তু দেহে মধুঋতুর আগমনে তার ছন্নছাড়া স্বভাবে এক ছন্দবীনা বেজে ওঠে।
যুবক গৃহশিক্ষকের সামনে পড়তে বসলে,যেন তার চোখে আর পুরো তাকানো যায় না,অচেনা এক ভাল লগায় মন অবস হয়ে আসে,শিক্ষকের সাধারণ কথা ও,নানা রকম মানে করতে থাকে।
একসাথে এক স্কুলের দৌড়ঝাপের সঙ্গীকেও পথ না আটকে পথ ছেড়ে দেয় আবেগে।
গায়ে এক মৃদু ভালোলগা অনুভূতি আসে।
সবকিছু ভাল লাগতে শুরু করে, জীবনটা এক সুগন্ধি ফুলেল কার্পেট বনে যায়,বিস্তৃত আকাশ চোখে লাগে, নতুন ভাবে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে,জীবজগত দেখে তার মধ্যে ও এক আপন সাথীর,আপনজনের চাহিদা আসে।
ফাগুনের ফাগ অন্তরে রঙ লাগায়, কোকিলের ডাক মিষ্টি লাগতে থাকে, হটাৎ করে এক পুরুষ বা নারী কে মনপ্রাণ দিয়ে বসে,আপনার করে পেতে চায়,তাই তো কবি গেয়ে ওঠেন, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন খুঁজি তারে আমি আপনায়’।
প্রেমাস্পদ কে পাবার আশায় স্বপনে জাগরণে এক খোঁজ শুরু হয়ে যায়,কবি বলে ওঠেন,’স্বপনে তাহারে কুড়ায়ে পেয়েছি, রেখেছি স্বপনে ঢাকিয়া,স্বপনে তাহার মুখখানি নিরখি স্বপন কুহেলী মাখিয়া’।
পরম প্রিয় মানুষটিকে কাছে পেতে নিজেকে পূর্ণরূপে গোলাপ বাগের গোলাপে রুপান্তরিত করে , অলির জন্য অপেক্ষায় কাটে দিন…..
কবির সাথে সেও গলা মিলিয়ে গেয়ে ওঠে,
‘মোরে ডেকে লও সেই দেশে, প্রিয় যে দেশে তুমি থাক,মোর কি কাজ জীবনে বঁধু যদি তুমি কাছে নাহি ডাক’।
প্রেমাস্পদ ছাড়া জীবন মৃতপ্রায় লাগে,
সেই রেশ ধরেই কবিন্দ্র রবিন্দ্র গেয়ে ওঠেন,
‘আমার এ ঘর বহু যতন কর, ধুতে হবে, মুছতে হবে মোরে,আমারে যে জাগতে হবে, কি জানি সে আসবে কবে, যদি তাহার পড়ে আমায় মনে, বসন্তের এই মাতাল সমীরণে’।
তাই তো মানব মানবী প্রিয় মিলনের জন্য আকুল হয়ে নিজেকে প্রসাধনে, পরিচর্যায় পরিপাটি করে সাজিয়ে গুছিয়ে তোলে, একটিবার প্রাণপ্রিয়ের ছোঁয়া পাবার আশায়!

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।