গদ্যের পোডিয়ামে মালা মিত্র

মন মানে না
দেহের ভাব তবু বোঝা যায়,কিন্তু মনের ভাব বোঝা বড় দায়।
কারণ মন একভাবে থাকে না।এই ‘মন কে নিয়েই আমার যত ভাবনা’।
‘এ মন ব্যকুল যখন তখন’মনকে নিয়েই যত হয়রানি,এই এখানে আছে তো পরক্ষণেই সহস্র যোজন দূরে কোথাও পৌঁছে গেছে।মন বড় বেয়াদব এক নিমেষেই জীবনের ঘটে যাওয়া অতীত
সে যেমন ভাবতে পারে,আবার এক লহমায় ভবিষ্যতের চিন্তায় ডুবে যেতে জানে।
তাই তো সাধক রাম প্রসাদ বলেন,’মন রে কৃষি কাজ জাননা,এমন মানব জমীন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা’।
সত্যি তো মন কি কোন বাঁধা ধরা গতে চলায় অভ্যস্ত?উত্তর একেবারেই না।
মনের বাসনা মনে মনে পূর্ণ করা তো তার ‘বাঁয়ে হাত কা খেল’ হ্যায়।তাই তো কবি গেয়ে ওঠেন,’মন রে ওরে মন,তুমি কোন সাধনার ধন,পাইনে তোমায় পাইনে,শুধু খুঁজি সারাক্ষণ ‘।
মনের নাগাল পাওয়া ভার।কখন সে ঘন সবুজ সষ্য ক্ষেত্রে,কখনো,’মন মোর মেঘের সঙ্গী,উড়ে চলে দিগদিগন্তের পানে,নিঃসীম শূণ্যে’।
তাই তো বিচ্ছেদের ব্যথায় কাতর হয়ে বলি,’মনে কি দ্বিধা রেখে গেলে চলে’।
মন হাওয়ায় হাওয়ায় হালকা হয়ে যদি না ভাসল তবে আর কল্পনারা কেমন করে পেখম মেলে,’মন হাওয়ায় লিখেছি তোর নাম,আবার হাওয়ায় হারিয়ে ফেললাম ‘এ মনের এক মজার খেলা।
আবার পুরোনো স্মৃতির ভীড়ে মন বলে ওঠে,’মন বড় অবুঝ এ মন,কিছুতে মানে না হায়,অবিরাম আহত স্মৃতির ভীড়,তবু আমি যে চেয়েছি তোমায়’
মনের এই চাওয়া পাওয়া মনকেই সামলাতে হয়।
মন ছাড়া শরীরটা একদলা মাংস বই কিছু নয়।
যে মানুষের সহানুভূতি সম্পন্ন মন না থাকে,তার কার্যকলাপ কেই আমরা বলি,অমানবিক।
এই মনেই প্রেম অপ্রেম,ভাল মন্দ,সুখ দুঃখ,সবকিছু।
তাই তো কারো সঙ্গে দেখা হলে জিজ্ঞাসা করি,কেমন আছ?শরীর ভাল তো?মন ভাল তো?
শুধু শরীর ভাল থাকলে মানুষ ভাল থাকে না,অবশ্যই মন ভাল থাকতে হবে।
আর এই মনই মস্তিষ্ক কে ধরে,ভাল কাজ মন্দ কাজ করায়।
তাই তো লালন সাঁই গেয়ে ওঠেন,’খাঁচার ভিতর অচীন পাখী কেমনে আসে যায়,তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখীর পায়’।
না মন কে কোনো দড়ি দিয়ে বাঁধা যায় না।সর্বত্র বিচরণ তার।
তাই তো ফুল্ল প্রকৃতিতে কবি লেখেন,’বনে নয় মনে মোর পাখী আজ গান গায়’।
এক কথায় মন হল,চিন্তা অনুভূতি,কল্পনা আবেগ,ইচ্ছা,বিবেকবোধের মিশেল।
মন চাইলেই নিজেকে রাজা রানী ভাবতে পারি।যে বাসনা বাস্তবে পূরণ হবার নয়,মনে মনেই সে বাসনা কে ছুঁয়ে দেখতে পারি।
তাই গলা ছেড়ে কবি করিমের সাথে গাইতেই পারি,’মনে চায় প্রাণে চায় দিলে চায় যারে,তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো,আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে’।
মন যদি কলকলিয়ে কথা বলে,চাঁদের দেশে ঘুরতে যায়,সখ্যতায়,যার মন কষ্ট পেয়ে পেয়ে নষ্ট হয়ে গেছে,যার আশা নেই উদ্যম নেই,তার বাঁচা মরা সমান কথা।তখনই তার জন্য মনোবিদের দরকার পড়ে।
মনের যদি বাস্তব মিশ্রিত কল্পনা থাকে তবে দেহ মনের পরিপূরক,তাদের সহাবস্থান ঘটে,কোনো কারণে মন যদি বিরূপ হয়,নিজের সাথে নিজের কথা বলা বন্ধ করে,সে কল্পহীন রাজ্যে থাকে,জীবনমৃত অবস্থায়।
উড়নচন্ডী অবুঝ মন,’যদি মন মেঘলাদিনে ওড়ায় নিজের মনপাখী কে,যদি মন পোড়ায় আকাশ আগুন লেখে,যদি মন বৃন্দাবনে চড়ায় গরু বাজায় বাঁশী,’ তা সে বাজাতেই পারে,কোনো বাধা নেই।
এই মন যা মানুষের আছে,শুধু মানুষই বলি কেন,জীব জগতের বহু প্রাণীর মধ্যেও দেখা গেছে।
তাই তো আমরা মন থেকে কাউকে শুভকামনা করে,বলি,ভাল থাকুন!মানে দেহে মনে সমতা বজায় থাক,সবার জীবন আনন্দে প্রেমে,হাসি খুশিতে ভরা থাক এই কামনা করে আজ ইতি টানি।