T3 || নারী দিবস || সংখ্যায় মিঠুন মুখার্জী

নারী জীবন
সাথীর বাংলা অনার্স নিয়ে গ্ৰাজুয়েটে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়া সুমনের মনে আনন্দের সঞ্চার করেছিল। একমাত্র বোন সাথী সুমনের কাছে নয়নের মনি স্বরূপ ছিল । বাবার মায়ের সাথে প্রতারণা করে মণি মাসিকে বিয়ে করা সুমন ভালোভাবে নেয়নি। সুমনের বয়স তখন বাইশ বছর, সাথীর বারো ও ভাই অরিজিতের পনের। অংকে অনার্স নিয়ে ভালো রেজাল্ট করার দু’বছর পর এম.এসসিতেও প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে সুমন। বাবার এই লজ্জা জনক কাজের জন্য সুমন মনে মনে খুব লজ্জিত। বড় ভাই হবার সুবাদে সংসারের পুরো দায়িত্ব সুমনের মাথার উপর পড়ে। এরপর ‘গোবরডাঙ্গা হিন্দু কলেজ’এ অনেক চেষ্টা করে অতিথি অধ্যাপক হিসাবে সুযোগ পাওয়ায় বুকে জল এসেছিল সুমনের। সাত বছর পর রাজ্য সরকারের পার্মানেন্ট ঘোষণায় সুমনের ষাট বছর পর্যন্ত চাকরি স্থায়ী হয়। সুমন যা বেতন পায় তাতে সংসার চালিয়ে, ভাই-বোনকে পড়িয়েও সামান্য কিছু সঞ্চয় করে ভাই ও বোনের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। অরিজিৎ তারই প্রচেষ্টায় ইতিহাসে এম. এ. পাশ করে ডাব্লুবিসিএস- এর জন্য পড়ছে। মায়ের চোখে জল দেখলে সুমন খুব কষ্ট পায়। মাকে বলে — “যে লোকটা তার বউ, ছেলে-মেয়েদের কথা চিন্তা না করে নির্লজ্জের মত এমন কাজ করতে পারেন, তার জন্য তুমি চোখের জল ফেলছ কেন মা ! তোমার জগৎ এখন আমরা। তুমি কেঁদো না। তোমার চোখের জল আমায় খুব পীড়া দেয়।”
আজ সুমনের বয়স তিরিশ বছরের কাছাকাছি। বোনকে সুপাত্রস্থ না করে বিয়ে করবে না বলে পণ করেছে সুমন। ভাইকে নিয়ে খুব চিন্তা করে সে। ভাই – বোনের এমন মিল সচরাচর চোখে পড়ে না। মাও মাঝে মাঝে দুঃখ ভুলে গর্ব করেন সুমনের মতো সন্তানকে নিয়ে। সুমন সাথীকে গ্র্যাজুয়েট পাশ করানোর পর ডি.এল.এড ভর্তি করে দেয়। সাথী দুচোখে স্বপ্ন দেখে দাদার মতো শিক্ষক হওয়ার। দু-বছরের মধ্যে ডি.এল.এড শেষ করার পর প্রাইমারি স্কুলে চাকরি পেয়ে যায় সাথী। বাড়ির সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। এই খবর পাওয়ার পর সুমন মিষ্টি এনে সবাইকে খাওয়ায়। মাকে বলে –” আমার ছোট্ট বোন সাথী আজ চাকরি পেয়েছে মা, স্বাবলম্বী হয়েছে, তুমি খুশী হও নি ? ” মায়ের আনন্দ-দুঃখ মিশ্রিত অশ্রু ও সুমনদের তিন ভাইবোনকে বুকে জড়িয়ে ধরায় তাঁর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল।
বাবার সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলে সুমন এবং তার ভাই অরিজিত কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। কিন্তু সাথী তা পারে না । বাবার প্রতি তার ভালোবাসা একটু বেশি, কিন্তু মাকেও খুব ভালোবাসে। আজ দশ বছরে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। মনি মাসির দুই মেয়ে হয়েছে। তাদের নাম হাসি ও খুশি। ফুলের মত সুন্দর দেখতে হয়েছে তারা । বাবার ‘বাটা’ কোম্পানির চাকরিটা একটা দুর্ঘটনায় চলে যাওয়ায় মনি মাসিকে অন্যের বাড়িতে রান্না করতে হয়। বাবা বাড়িতে কাগজের ঠোঙা বানান। তিনি যা করেছেন তার জন্য লজ্জায় আমাদের কাছে যেতে পারেন না। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করি, কথা বলি। দাদারা সে কথা জানেনা। আমি জানি তিনি আমার মার সঙ্গে যে অন্যায় করেছেন তা সহ্য করার নয়। তবে বাবার কষ্ট মেয়ে হয়ে কিভাবে সহ্য করি। মা যেমন আমার আপনার, বাবা টাও তো তেমনি। তাই স্কুলের মাইনে থেকে কিছুটা বাবাকে দিয়ে সাহায্য করি আমি।
একটা একটা করে বিয়ের সম্বন্ধ আসে সাথীর। ইঞ্জিনিয়ার, বড় কোম্পানির ম্যানেজার, স্কুল শিক্ষক, ডাক্তার। সবারই সাথীকে পছন্দ হয়। কিন্তু বাবার কথা শোনার পর পিছিয়ে যান। সুমন তাদের বোঝাতে চেষ্টা করে বাবার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই । কিন্তু সবাই তো সমান ভাবে নেন না। অবশেষে সাথীর স্কুলের একজন শিক্ষক দীপক ঠাকুরের সঙ্গে সাথীর বিয়ে হয়। দীপকদের একান্নবর্তী সংসার। বাবা- কাকা- জ্যাঠা সবাই একই সঙ্গে থাকেন। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া খুবই ভালো। তাই সুমনের খুবই পছন্দ হয়েছিল দীপকের পরিবারকে। চোখের জলে বিদায় জানিয়েছিল সুমন সাথীকে।
বোন সাথীর বিয়ের দু-মাসের মাথায় সুমনের দেখাশোনা করে বিয়ে ঠিক হয়। পাত্রীর নাম তৃষ্ণা রায়। গোপালপুরের এক রিটার্ড প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের মেয়ে। ভূগোলে অনার্স নিয়ে গ্রাজুয়েট সম্পূর্ণ করেই বিয়ে ঠিক হয়ে যায় সুমনের সাথে তৃষ্ণার । বিয়ের দিন সারা বাড়ি হৈ হৈ রৈ রৈ কান্ড। দাদার বিয়েতে খুব আনন্দ করেছিল সাথী। অরিজিৎ খুব নেচেছিল দাদার বিয়ে করতে যাওয়ার সময়। সাথীর সাথে বৌদি তৃষ্ণার সম্পর্ক খুব জমে উঠেছিল। দেখে কখনো মনে হয়নি বৌদি-ননদ, মনে হয়েছে দুই বোন। সাথীর কাছে দাদা সুমন সম্পর্কে সব শুনেছিল তৃষ্ণা, আর মনে মনে সুমনের প্রতি একটা সম্মান গড়ে উঠেছিল। সাথীর শুধু খারাপ লেগেছিল তার বিয়ের মতো দাদা সুমনের বিয়েতেও বাবার অনুপস্থিতির কথা ভেবে। মাঝে মাঝে দু চোখে জল এসেছিল তার।
তৃষ্ণা তাদের সংসারে আসার পর থেকে আনন্দে ভরে উঠেছিল সংসার। কথায় বলে ‘ সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে ‘। সুমনের, অরিজিতের ও মায়ের সমস্ত দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় কাজ তৃষ্ণা করে দিত। মনে একটুও অহংকার ও হিংসা ছিলনা এই মেয়েটির। তৃষ্ণাকে পেয়ে সুমন যে খুশি তা সুমন অনেকের কাছেই স্বীকার করেছে। বৃদ্ধ বাবার সুখ- দুঃখের সঙ্গী এই তৃষ্ণা। অল্প বয়সে মা মারা যাওয়ায় তাকে বড় করেছে তার বাবাই। বৃদ্ধ বাবাই তার কাছে উভয়ের ভূমিকা পালন করেছে। মা মরা মেয়ের চোখের জল তার বাবা কৃষ্ণকান্ত রায় সহ্য করতে পারেন না। তৃষ্ণাকে ডাকেন ‘মা’ বলে।
বিয়ের পর বছর দুই সাথী তার স্বামী দীপক ঠাকুরের সঙ্গে ভালোই ছিল। তারপর ধীরে ধীরে এক অশনী তাদের সংসারে প্রবেশ করে। সাথী বুঝতে পারে দীপকের কাকার ছেলের বউয়ের সাথে তার অবৈধ সম্পর্ক আছে। নিজের চোখে এমন কিছু আপত্তিকর বিষয় দেখেছে, যা কাউকে বলা যায়না। দীপককে অনেকবার সাথী বুঝিয়েছে, এভাবে তার সঙ্গে সম্পর্ক যেন সে না রাখে। সে এও বলেছে সম্পর্ক রাখলে দাদাদের বলতে বাধ্য হবে। দীপক সাথীর কথা তো শোনেই নি,বরং সাথীর উপর নানান মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার করা শুরু করে। দীপকের মা-বাবা সব জেনে-শুনেও চুপ করে থাকেন। দীপক তাকে ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। একান্ত নিভৃতে বসে বসে সাথী কান্না করে। অবশেষে সে ঠিক করে বৌদির সঙ্গে সব খুলে বলবে। পুজোর সময় একদিন সাথী বাড়িতে ঘুরতে আসে। সেই সময় বৌদিকে সবকিছু খোলসা করে জানায়। বৌদি সাথীকে বুদ্ধি দেয় — “এখনই তুমি তোমার দাদাকে জানিও না। তোমার বড়দা, অরিজিৎ জানলে জল অনেকদূর পর্যন্ত গড়াবে। তাই বুদ্ধি করে কাজ করতে হবে তোমায়। দীপকের পছন্দ অনুযায়ী তুমি চলবে, আর ওকে এত ভালোবাসা দেবে যাতে, ওই মেয়েটিকে ঘৃনা করে। আমি সময় মত তোমার দাদাকে জানাবো।” বৌদির কথা মত সাথী স্বামীর মন পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করে। সে যেভাবে বলেছে সেভাবেই চলেছে সাথী, কিন্তু দীপককে পাল্টাতে ব্যর্থ হয়েছে। হঠাৎ করে দীপকের জীবনের এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারেনি সাথী।
এরপর স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় সাথী। বাবার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়তো তার। দীপক বাড়ি না থাকলে ও কান্না করত। বৌদিকে ফোন করে প্রত্যেকদিনের ঘটা বিবরণ জানাত। আর বউদি যে ভাবে সাথীকে চলার সু পরামর্শ দিত সেভাবেই চলত সে। একদিন রাত্রে সাথীর জীবনের এই কঠিন অবস্থার কথা তৃষ্ণা সুমনকে জানায়। সব শুনে সুমন প্রচন্ড রেগে যায় দীপক এর উপর । সে বলে — ” দরকার হলে সাথীকে এখানে এনে রাখবো। তবু ওর উপর শয়তানটাকে অত্যাচার করতে দেবো না । দীপকের সঙ্গে আমার একটা আলোচনা করতেই হবে ! জানতে চাই ও এমন করছে কেন ?” এরপর তৃষ্ণা সাথীর কথা চিন্তা করে বারন করলেও সুমন শোনে না। তৃষ্ণাকে বলে– ” মার কানে এখনই কথাগুলি দিওনা। মা খুব কষ্ট পাবে।” রাত তখন দশটা বাজে, সুমন সাথীকে ফোন করে । তাকে অভয় দিয়ে সব কথা জানার চেষ্টা করে। ফোনে কথা বলতে বলতে সাথীর চোখে জল ঝরে পড়ে। তার কান্নার শব্দ শুনে সুমনের বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় মুচড়ে ওঠে।
পরদিন সকালবেলা ভারাক্রান্ত মনে সুমন তৃষ্ণাকে নিয়ে সাথীর শ্বশুর বাড়িতে যায়। দীপককে আলাদা ঘরে ডেকে সুমন অনেক বোঝাবার চেষ্টা করে। দীপকের বুঝতে দেরি হয়না সব বিষয়টা সুমনদাকে কে বলেছে। সুমনরা চলে যাওয়ার পরে আগুন হয়ে ওঠে দীপক। প্রচণ্ড মারধোর করে সাথীকে। দীপকের চন্ডালের মতো রাগ ও আচরণ বিয়ের পর দু’বছরের মধ্যে কখনো দেখেনি সাথী। নিজে স্বাবলম্বী হয়েও যদি এই আচরন দেখতে হয়, তবে শুধু গৃহবধূ হলে তার সঙ্গে কি হতো ভাবতে চিন্তা করে সে। স্কুল করেও সংসারের যাবতীয় কাজ করেছে সে এতদিন। মানসিক অশান্তির কারণে সে স্কুল যাওয়া একেবারে প্রায় ছেড়ে দেয়।
সংসারের এই জ্বালা আর সহ্য হয়না সাথীর। রাত্রে স্বামী ঘুমানোর পর একটা ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সে। সেই সময় কেবল বাবা ও দাদার মুখ দুটি তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। মুহুর্তের মধ্যে জীবনের প্রতি ভালোবাসা উঠে গিয়েছিল তার। নিজেকে নিঃসঙ্গ অনুভব করেছে সে। সাথীর মতো কত মেয়ে সংসারের এই একাকিত্বের অনুভূতি থেকে অকালে ঝরে যায় তার হিশাব দেওয়া কঠিন।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে প্রথম সাথীর শাশুড়ি সাথীকে আবিষ্কার করেছিল পাশের ঘর থেকে। যখন তাকে নামানো হয় তার অনেক আগেই সে চিরতরে ঘুমের দেশে পাড়ি দিয়েছে। হাতে একটি সুইসাইড নোট। যাতে লেখা ছিল — ” আমি চললাম !! চিরজীবন একসাথে চলার স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু পারলাম না।”