গদ্যানুশীলনে মিঠুন মুখার্জী

গোপাল ভাঁড়ের রহস্য ভেদ

কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় খুবই চিন্তিত হয়ে রাজসভায় পায়চারি করছেন। মাঝে মাঝে বলছেন — “না, আর সহ্য করতে পারছি না। এবার চোরদের ধরতেই হবে। ধরতে পারলে একেবারে পেটে পা দিয়ে অন্নপ্রাশনের ভাত তুলে দেব। আমার প্রাসাদে চুরি! চোরের সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। আমার প্রাসাদে এতসব মানুষেরা কি নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে ? এই চোরদের ধরার মতো ক্ষমতা কারো নেই?” রাজসভায় সকলে রাজার কথা শুনে চুপচাপ ছিলেন। হঠাৎ একজন বলেন — “রাজামশাই এই চোর অনেক চালাক, সবাই যখন ঘুমে আচ্ছন্ন থাকেন সেই সুযোগে একেবারে মিস্টার ইন্ডিয়ার মতো ওর আগমন ঘটে। যারা রাত্রে আপনার প্রাসাদ পাহাড়া দেন, তারাও এই চোরটাকে কখনো চোখে দেখে নি। ওকে ধরতে হলে পরপর সাত রাত্রি জেগে থাকতে হবে। কবে কখন কোথা দিয়ে চোরের আগমন ঘটবে তা কেউ জানেন না। লোকও লাগবে খান দশেক। ইঁদুর ধরার জন্য আমরা যেমন ফাঁদ পাতি তেমনি এই চোরটাকেও ফাঁদ পেতে আমাদের ধরতে হবে ‌। এমনও হতে পারে চোর আমাদের প্রাসাদের মধ্যেই আছে। আমরা ধরতে পারছি না। ” এই কথা বলার পর ওই ব্যক্তি মন্ত্রীমশাইয়ের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করেন। মন্ত্রীমশাই তার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বলেন — “আপনি আমার দিকে তাকিয়ে রাজামশাইকে কী বোঝাতে চাইছেন? এই চুরির সঙ্গে আমি যুক্ত আছি? আপনি যদি প্রমান করতে না পারেন তাহলে আমি আপনাকে যা শাস্তি দেবো আপনি তাই মাথা পেতে নেবেন তো?” ওই ব্যক্তি বলেন— “হ্যা নেব। আর আমি যদি প্রমান করতে পারি এই চুরি আপনার কথা মতোই হচ্ছে, তবে আমি যা চাই তাই মাথা পেতে নেবেন তো মন্ত্রীমশাই?” ওই ব্যক্তির শর্তে রাজি হয়ে মন্ত্রীমশাই বলেন—“হ্যা তাই হবে। আমাকে আপনাদের সকলের সামনে যখন তখন যে-সে অপমান করে,আমার তা ভালো লাগে না। আমি এই রাজ্যের মন্ত্রীমশাই। আমার তো একটা আত্মসম্মান আছে। আজ হয়ে যাক একটা ফ্যাসলা। দেখি কে জেতে আর কে হারে।” রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় দুজনকেই চুপ করিয়ে বলেন— ” নিজেদের মধ্যে এভাবে কাঁদা ছোড়াছুড়ি না করে প্রকৃত চোরদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করো তো ভায়া। এরকম ঝামেলা আমার একদম ভালো লাগেনা জানো তো তোমরা। তবে এভাবে সমস্যা আরও গভীরে নিয়ে যেওনা তোমরা। এই পর্যন্ত আমার দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, বেশকিছু জমির দলিল ও রানীর সোনার গহনাপত্র চুরি গেছে। তবে আমার মন বলছে যারা এই কাজ করছে তারা রাজবাড়ির সম্পর্কে তথ্য পেয়েই এই সকল কাজ করছে। নতুবা আমার এই সকল জিনিসপত্র কোথায় থাকে তা তারা জানল কি করে! আর কোন সময় রাজবাড়ি আসলে একেবারে শান্তিতে লুঠ করা যাবে সেই খবরইবা তাদের কে দিচ্ছে? আমাদের মধ্যে কে সেই ঘরশত্রু বিভীষণ তা ধরতে হবে।”
রাজসভায় এতক্ষণ ধরে যে সকল বিষয় আলোচনা হয় তা একটা জায়গায় বসে গোপাল ভাঁড় শুনছিল। কেড়ে আঙুল দিয়ে কান চুলকাতে চুলকাতে সে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় মহাশয়কে বলে— “রাজামশাই আপনি যদি এই বিষয়ের রহস্য প্রকৃতই উন্মোচন করতে চান, তবে এর দায়িত্ব আমার উপর ছেড়ে দিতে পারেন। আমি এক সপ্তাহের মধ্যে এই চোরের সঙ্গে যুক্ত সকলকে আপনার সামনে নিয়ে আসব। আর তার জন্য আমি যাকে যাকে যা যা জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইব সকলকে আমায় সহযোগিতা করতে হবে। আমি আপনার এই সমস্ত সমস্যা দূর করতে গিয়ে বিপদে পড়তে পারি। তাই আমার সঙ্গে এই একসপ্তাহ দুজন করে প্রহরী সবসময় নিয়োজিত করতে হবে।” রাজা কৃষ্ণচন্দ্র গোপাল ভাঁড়ের কথা শুনে বলেন— “তুমি যেমন বলবে তেমনি হবে গোপাল। তবে তোমার কথা মত চোর ধরা চাই। সে যদি আমার রাজপ্রাসাদের কেউ হয় কিংবা তার সঙ্গে চোরের যোগাযোগ থাকে তাহলে আমাকে বলতে এক বিন্দু দ্বিধাবোধ করবে না। আমি তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেবো। তুমি যদি এই সমস্যার সমাধান করে দিতে পারো তাহলে আমি তোমায় পুরস্কৃত করবো।” এরপর গোপাল ভাঁড় রাজামশাইয়ের সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলতে চায়। রাজামশাই রাজসভার পাশের একটি ঘরে গিয়ে গোপালের সঙ্গে কথা বলেন। গোপাল বলে—“দেখুন রাজামশাই আমি যে কথাগুলি আপনাকে বলব সেগুলি রাজসভায় সকলের সামনে বলা যাবে না। তাই এখানে ডেকে নিয়ে আসলাম। সন্দেহের বাইরে কেউই নন। প্রত্যেকের প্রতি আমাদের নজর রাখতে হবে। তারা যেন কোনওক্রমে জানতেও না পারেন আমরা বা আপনার গুপ্তচরেরা তাদের উপর নজর রাখছি। তাছাড়া চোরের চুরি করার দিন ও সময় লক্ষ করলে দেখা যাবে চোর প্রায় রাতে আলাদা আলাদা সময়ে চুরি করছে। আমাদের চোর ধরতে হলে ফাঁদ পাততে হবে এবং কয়েকদিন রাতে ঘুমানোর ভান করে না ঘুমিয়ে সজাগ থাকতে হবে। তবেই হয়তো চোরকে ধরা যাবে।” গোপালের কথা শুনে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বুঝতে পারেন এই চোর যদি কেউ ধরতে পারে তবে সেটা গোপালের দ্বারাই সম্ভব হবে ‌। গোপালের দেখানো পথেই আমাদের চলতে হবে। চোরের এতো বড় সাহস আমার মেয়ের প্রিয় জামাগুলোও বাদ দেয় নি। সেগুলোও চুরি করে নিয়ে যায়।
পরদিন রাতে গোপাল ভাঁড়ের বুদ্ধি মতো ফাঁদ পাতা হয়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঘরে ঢোকার রাস্তায় সরিষার তেল দিয়ে ভালো করে মুছে দেওয়া হয় এবং সরিষা রাজার ঘরের সিন্দুকের সামনে ছড়িয়ে রাখা হয়। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে গোপাল বলে— “আপনি পালঙ্ক ছেড়ে উঠবেন না, একটু সজাগ থাকবেন।” প্রহরীরা রাজপ্রাসাদে ঘুমের ভান করে কিন্তু ঘুমায় না। রাত তিনটে বেজে যায় কিন্তু চোরের দেখা মেলে না। রাজা সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ে। গোপাল ভাঁড়ের খুব চিন্তা হয়। সে ভাবে– ” তাহলে চোর কি আসবে না! আমাদের ফন্দির কথা সে কি আগেভাগেই জেনে গিয়েছিল? সমস্ত কষ্টটাই তাহলে জলে যাবে। গোপাল ভাঁড়ও কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল তা সে টের পায় নি। সকালবেলা গোপালের ঘুম ভেঙেছিল রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিকট চিৎকারে। গোপাল হন্তদন্ত হয়ে তার ঘরে গিয়ে দেখে রাজা সিন্দুক খুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, সিন্দুক পুরোপুরি ফাঁকা। রাজা এবার একটু পাগলের মতো আচরণ করতে লাগলেন। রাজার গলা পেয়ে ইতিমধ্যে প্রহরীরা রাজার ঘরে উপস্থিত হয়। রাজা গোপালকে বলেন— ” গোপাল তোমার উপর আমার বিশ্বাস ছিল। তুমিও শেষমেশ ব্যর্থ হলে। আমার ঘরে আবার চুরি হল। হায় হায় আমি কি করি। চোর ধরার মতো ক্ষমতা এরাজ্যে কারো নেই নাকি?” চিৎকার করে প্রহরীদের বলেন—- “প্রহরী তোমরা সারারাত করছিলে কি? তোমাদের নাকের ডগা দিয়ে চোর আবার আমার সিন্ধুক ভেঙে সব নিয়ে কেটে পড়লো, তোমরা সব কোথায় ছিলে? তোমাদের সকলকে শাস্তি দেব, কড়া শাস্তি দেব।” রাজার এই কথা শুনে প্রহরীরা মাথানত হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
সকালে গোপাল ভাঁড় বাড়িতে যায়। অস্থির ভাবে বারান্দায় পায়চারী করতে লাগে। গোপালের বউ গোপালকে বলে — ” কী গো তোমায় খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে?কাল রাতে বাড়ি ফিরলে নে। তা কি সমস্যা আমি একটু শুনতে পারি? যদি কোনো বুদ্ধি আমার মাথা থেকে বেরোয়।” বউয়ের কথার উত্তরে গোপাল বলে — ” ও তুমি বুঝবে নে। মেয়ে মানুষের বুদ্ধিতে এসব কুলাবে নে। আমার মতো পাকা মাছ পর্যন্ত হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে এই ঘটনায়, আর তুমি তো কোন ছাড় ‌‌।” বউ বার বার শোনার জন্য অনুরোধ করায় পুরো বিষয়টি বউয়ের সামনে খোলাসা করে বলে সে। বউ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলে— ” আচ্ছা আমি বলছিলাম রাজা মশাইয়ের যে ঘরে সিন্দুক থাকে সেই ঘরেই কোনো রহস্য নেই তো। তুমি একবার ভালো করে খুঁজে দেখো তো। তা না হলে তোমরা চোরটাকে এত ধরার চেষ্টা করেও ধরতে পাচ্ছ না কেন! এই চোর অত কাঁচা কাজ করার নয়। এ গভীর জলের মাছ। তাছাড়া রাজপ্রাসাদে সকলের উপর তুমি সতর্ক দৃষ্টি রেখো। যাকে সন্দেহের তালিকায় রাখছ না সেই হয়তো চোর।” বউয়ের কথা শুনে গোপাল ভাঁড় বলে — ” তুমিই হয়তো ঠিক বলছ গিন্নি। আমরা যাকে আপন ভেবে চুরি যাওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি। সেই হয়তো আসল চোর বা সেই হয়তো কাউকে দিয়ে এই কাজটি করাচ্ছে। সে আমাদের কাছে সব শুনে আগেভাগেই সাবধান হয়ে নিজের প্লান পাল্টে নিচ্ছে।” ঠিক আছে তোমার কথা মতো কাল থেকে আমি এই রহস্য উন্মোচনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করব। কারোকে কিচ্ছু জানাব না। এমনকি রাজামশাইকেও না। চোরকে ধরে একেবারে রাজার সামনে উপস্থিত করব‌।
বউয়ের কথা মতো পরদিন রাজার বাড়ি যায় গোপাল। রাজার অনুপস্থিতিতে রাজার ঘরে যায়। সব কিছু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে সে। সিন্দুকের আশেপাশে ভালো করে দেখে। কিন্তু কোথাও কোনো অসঙ্গতি সে দেখতে পায় না। রাজার ঘর ছেড়ে সে যখন বেরিয়ে আসছিল তখন হঠাৎ রাজার একটি বড় ক্যানভাসের দিকে গোপালের চোখ যায়। তার কেমন সন্দেহ হয়। সে সেই ক্যানভাসের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে। ক্যানভাসটি সরিয়ে দেখে তার পিছনে ছোট্ট একটি দরজা আছে। সে সেই দরজাটা খুলে অবাক হয়ে যায়। গোপাল দেখে সেখান থেকে একটা সুড়ঙ্গ মাটির নীচে চলে গেছে। সে মিনিট পাঁচের মধ্যে একটি মশাল বানিয়ে সেই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে। অনেক পুরনো সেই সুড়ঙ্গ। মাঝে মাঝে মাকড়সার জাল, কয়েকটি বাদুর লক্ষ করে গোপাল। এই সুড়ঙ্গটি শেষ হয়েছে রাজবাড়ির বাইরে একটি প্রচীন বটগাছের কাছে। তবে হঠাৎ করে কেউ বুঝতে পারবে না এটা একটি সুড়ঙ্গ। গোপাল সুড়ঙ্গের মধ্যে একটি সোনার আংটি পায়। আংটিটা দেখে তার চেনা চেনা মনে হয়। অনেক ভাবনা – চিন্তা করে গোপালের মনে পড়ে এই আংটিটা মন্ত্রী মশাইয়ের। কিন্তু সে কিছুই বলে না।
সেই দিন রাত্রে রাজবাড়িতে প্রহরীরা সারারাত পাহাড়া দিয়েছিল। চোরের আগমনও ঘটে নি। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র গোপালকে ডেকে বলেন— ” গোপাল চোরের কোনো হদিস পেলে? আমার রাজ্যে এবং স্বয়ং আমার বাড়িতে চুরি করছে, অথচ কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না, ধরতেও পাচ্ছে না। তাহলে চোর কী জাদু জানে? তোমার মতো মানুষকেও চোর ঘোল খাইয়ে দিচ্ছে।” রাজার কথা শুনে গোপাল খুবই লজ্জা পায়, কিন্তু তখনো সে রাজাকে চোর ধরার রহস্য উন্মোচনের কথা জানায় না। সেই দিন রাজসভায় মন্ত্রীমশায় উপস্থিত ছিলেন। তার হাতে আংটিটা দেখে না গোপাল। গোপাল বুঝে যায় এই চুরি করার পিছনে মন্ত্রী মশাইয়ের হাত আছে। কিন্তু তখনও সে কিছুই বলে না। সেইদিন গোপাল বাড়ি যাওয়ার নাম করে রাজার ঘরের পালঙ্কের নীচে লুকিয়ে থাকে। তার বিশ্বাস ছিল চোর আজ অবশ্যই আসবে। মাঝ রাতে গোপাল দেখে রাজার ক্যানভাস সরিয়ে দুজন মুখ বাঁধা ব্যক্তি রাজার ঘরে প্রবেশ করছে। একজন এসে রাজার নাকে কি একটা শুকলে রাজার শরীর একেবারে অসাড় হয়ে যায়। তারপর রাজার বালিশের তলা থেকে সিন্দুকের চাবি নিয়ে সিন্দুক খুলে তারা দুজন একেবারে অবাক হয়ে যায়। সিন্দুকে কিছুই ছিল না। তারপর তারা চাবি দিয়ে রাজার আলমারি খোলে এমন সময় গোপাল পালঙ্কের তলা থেকে বেরিয়ে একজনকে জাপটে ধরে চিৎকার শুরু করে। প্রাসাদের প্রহরীরা গোপালের চিৎকার শুনে ছুটে রাজা মশাইয়ের ঘরে আসে। রাজা তখনও অচেতন। অন্যজন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে গোপাল তাকে ল্যাং মেরে ফেলে দেয়। তার পায়ে ও মাজায় প্রচন্ড লাগে। দুজনকে একসঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
মিনিট পাঁচেক পর রাজা মশাইয়ের জ্ঞান ফিরলে গোপাল তাকে বলে— ” রাজা মশাই আজ চোর ধরা পড়েছে। আপনার ক্যানভাসের পিছনে যে পুরনো সুড়ঙ্গ আছে এই মহাপুরুষ দুজন ওখান থেকেই আপনার ঘরে ঢুকে এই মহান কাজ করেছে। তবে আমি ওই সুড়ঙ্গের শেষ পর্যন্ত মশাল জ্বালিয়ে পড়শু দেখে এসেছি। সুড়ঙ্গের মধ্যে একটি আংটি পেয়েছি দেখুন তো চেনেন কিনা।” এরপর গোপাল আংটিটা রাজার হাতে দেয়। রাজামশাই আংটিটা দেখে বলেন —“এটা তো মন্ত্রীর আংটি। এতে ওর নামের প্রথম অক্ষর খোদাই করা আছে।” এরপর গোপাল আবার বলে— ” চোর দুজন কারা তা আমরা এখনো দেখি নি। ওদের মুখ গামছা দিয়ে ঢাকা আছে। আপনিই ওদের গামছা খুলে দেখুন ওরা কারা।” ও আরেকটি কথা “ওরা প্রতিবারই আপনার নাকে রুমালে করে ক্লোরোফর্ম শুকিয়ে অজ্ঞান করে এই চুরি করেছে। আজ যখন ওরা আপনার ঘরে ঢোকে তখন চোর ধরার জন্য আমি আপনার পালঙ্কের তলায় লুকিয়ে ছিলাম।” গোপালের কাছ থেকে এই কথাগুলো শুনে রাজা একেবারে আগুন হয়ে ওঠেন। সঙ্গে সঙ্গে তার তলোয়ার আনার জন্য হুকুম দেন — ” এই কে আছিস, আমার তলোয়ারটা নিয়ে আয়। এদের ধর থেকে আমি মাথা আলাদা করে দেব।” চোর দুজন ভয় পেয়ে বলে ওঠে — ” রাজা মশাই আমাদের মারবেন না, আমাদের ক্ষমা করে দেন। আমরা আর কোনদিন চুরি করব না। আপনার ঘর থেকে আমরা যা যা চুরি করেছি তা ফিরিয়ে দেব।” এরপর চোর দুজনের মুখ থেকে গামছা সরিয়ে রাজামশাই একেবারে আকাশ থেকে পড়েন। বলেন —- “মন্ত্রী তুমি!! সভাকবি!! এ কী দেখছি আমি। আমি নিজের দুচোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! শেষ পযর্ন্ত ঘর শত্রু বিভীষণ। গোপাল সভায় তোমার নাম বারবার বলেছে ঠিকই কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় নি। তাছাড়া তোমাদের আমি আমার বিশ্বাসী লোক বলেই জানতাম। তোমরা যে বিশ্বাসঘাতক বেরবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।” এরপর রাজামশাই মন্ত্রী মশাই ও সভাকবিকে এই অপরাধের জন্য পঞ্চাশ বার চাবুকের ঘা ও দুমাস কারাগারে আটকে রাখার আদেশ দেন। তাদের দুজনের চাকরি কেড়ে নেন। আর বলেন অপরাধীদের শাস্তি শেষ হয়ে গেলে তাদেরকে আমার রাজ্য থেকে যেন দূর করে দেওয়া হয়। এরপর রাজামশাইয়ের কথা মতো মন্ত্রীমশাই ও সভাকবিকে পঞ্চাশ ঘা চাবুকের বাড়ি মেরে কারাগারে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
পরদিন রাজসভায় জরুরি মিটিং ডাকা হয়। গোপাল ভাঁড়ের খুবই প্রশংসা করেন রাজামশাই। তিনি বলেন — “আজ গোপালের জন্যই চোরদের ধরা সম্ভব হয়েছে। কারা আমার রাজপ্রাসাদে চুরি করেছে তা আশাকরি সকলে জেনে গেছেন। ফলে মন্ত্রী ও সভাকবি নতুন করে নির্বাচন করা হবে। আগামী সপ্তাহে আপনাদের উপস্থিতিতে আমি এই দুটি পদের জন্য যোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন করব। আর গোপালের এই অসাধারণ কাজের জন্য ওই দিন আমি ওকে পুরস্কৃত করব। আজ থেকে গোপালকে আমার সুপরামর্শদাতা হিসাবেও আমি নিয়োগ করলাম।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।