অণুগল্পে মিঠুন মুখার্জী

উত্তর 24 পরগনা জেলার গোবরডাঙাতে নিবাস। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় প্রথম মাস্টার ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে নেতাজী সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে সেকেন্ড বার বাংলায় মাস্টার ডিগ্রি।লেখালেখি, গান শোনা এবং গান করা পছন্দ করি। বিশেষ করে রবীন্দ্র সংগীত ও আধুনিক। নেতাজী সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটির বেঙ্গল পার্টিশন বিষয়ক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছি ।বাড়িতে প্রাইভেট পড়ানো হয় ,সঙ্গে একটি এনজিওতে সমাজসেবামূলক কাজ কর্মের সঙ্গে যুক্ত আছি। বাস্তব সমস্যাকে লেখার মধ্যে বেশি ফুটিয়ে তুলতে পছন্দ করি। আনন্দলোক পত্রিকায় দশটার অধিক ক্যাপশন প্রকাশিত হয়েছে।

কলির অর্জুন

দুষ্টের দমন শিষ্টের পালনে বারংবার বিষ্ণুদেব অবতার রূপে পৃথিবীতে এসেছেন। নারায়ন,পরশুরাম, রামচন্দ্র রূপে এসেছেন ; এসেছেন বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ রূপেও। ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের সারথি হয়ে কৌরবদের ধ্বংস করতে সহযোগিতা করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। ধর্মপ্রতিষ্ঠার কান্ডারী অর্জুন বিশ্বরূপ দর্শন করে কুরুক্ষেত্রের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। অর্জুনের আজ কলিকালে পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু পরিবর্তন হয়নি তাদের কাজের। ধর্ম প্রতিষ্ঠা দুজনেরই লক্ষ্য। মানুষ হয়ে বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো একপ্রকার ধর্মের মধ্যে পড়ে। অর্জুনরা যুগ থেকে যুগান্তরে এভাবে অন্যের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে চলেছে। কলিকালের এমনই একজন অর্জুনের কথা আজ বলবো, যার ধর্ম মানব সেবা।
গ্রীষ্মের পড়ন্ত এক বিকেল বেলা অসুস্থ অর্জুন সারা বারান্দা ও উঠান পায়চারি করে বেরিয়েছে। গত একমাস ধরে অসুস্থ সে। অনেক এলোপ্যাথি হোমিওপ্যাথি করা গেছে, রোগ ধরা পড়েনি। যে দিনের কথা বলা হচ্ছে, সেই দিনটি অভিশপ্ত বলে মনে হয় অর্জুনের। একেতো করোনার আতঙ্ক, অন্যদিকে শরীর খারাপ, এর উপর আমপান ঝড় আসবে আসবে করছে। অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে সে, নিজের বাচ্চা নিয়ে মাঝে মাঝে সংশয় জাগে তার। খবরে জানতে পেরেছে এই ঝড় 180 কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা তীব্রতা নিয়ে দীঘা- কলকাতা- বসিরহাট- তেতুলিয়া হয়ে গোবরডাঙ্গার ওপর দিয়ে বনগাঁ হয়ে বাংলাদেশে চলে যাবে। চার বছরের মেয়ে আরাধ্যা ও বাবা-মাকে নিয়ে প্রচন্ড দুশ্চিন্তা তার ভাবনার আকাশকে কালো মেঘাচ্ছন্ন করে দিয়েছে। দুশ্চিন্তা সাধারণ মানুষদের নিয়েও, যারা কোন রকম ভাবে মাথা গোঁজার জায়গা পেয়েছে।
তখন সন্ধ্যা হবো হবো,মোটামুটি বেগে ঝড় হচ্ছে সঙ্গে বৃষ্টি পড়ছে। তবে আমপান তখনো আসেনি। মা তাড়াতাড়ি বাড়ির মনসা পূজা সেরে ঘরে এসেছে। বাবা টেনশন করছে কি হবে ভেবে। কখনো বাবা, কখনো মা আবার কখনো বউ অর্জুনকে জিজ্ঞাসা করছে ঘূর্ণিঝড় কি শুরু হয়ে গেছে? অর্জুন মোবাইলে খবর দেখে জানায়– কলকাতায় আমপান তছনছ করে দিচ্ছে সবকিছু। জানতে পারে নবান্নের একটা অংশে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘূর্ণিঝড় গোবরডাঙ্গায়ও ভয়ঙ্কর তান্ডব চালাবে বলে জানায় অর্জুন। তখন সন্ধ্যা 7:30। বাড়ির পাশের তিনজন ওদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল সুরক্ষার জন্য। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাত 8:10 মিনিট নাগাদ আমপানের তান্ডব নৃত্য লক্ষ করলেন সকলে। তিন ঘন্টা যা ধ্বংসলীলা চালালো, তা অর্জুন স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।
এক একটা দমকা হাওয়ায় হাড় হিম হয়ে যাচ্ছিল অর্জুনের। মনে হচ্ছিল, এক্ষুনি বোধহয় কংক্রিটের দোতলা বাড়িটা ঘূর্ণিঝড়ের কাছে আত্মসমর্পণ করবে নিজেকে। মুড়ি মুরকির মতো তারা উড়ে যাবে নিমেষে। মেয়ে ও বাবা- মাকে ঘর থেকে বের হতে দিল না সে। শ্রীকৃষ্ণের নাম বারবার স্মরণ করছিল অর্জুন। চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার, ইলেকট্রিক চলে গেছে অনেকক্ষণ, কবে আসবে তা কারো জানা নেই। ঘরের মধ্যে একটা মোমবাতি জ্বলছে। বারবার নিভে যাওয়ায় মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে রাখল সে। কোন রকম ভাবে সেই রাতে প্রাণে বাঁচল তারা।
পরদিন সকালবেলা চোখ খুলে অর্জুন যা দেখল তাতে চোখে জল এসে গেল তার। গ্রামের সমস্ত কাঁচা বাড়ি ভেঙে পড়েছে, পাকা বাড়ির চিলেকোঠার চাল গাছে উড়ে। নিজের বাড়ির ও গ্রামের প্রায় অর্ধেকের বেশি গাছ উপড়ে গেছে, ইলেকট্রিক পোল বেশিরভাগ ভেঙে গেছে, চাষের জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে, ঘর পড়ে চারজন গুরুতর আহত হয়েছে, যাদের পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আশ্রয়হীন মানুষদের দেখে সে হতবাক হয়ে যায়। আকাশের দিকে জলভরা চোখে তাকায় আর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে অসহায়, আশ্রয়হীন মানুষদের এই দুর্দিন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য। ঝড়ের প্রচন্ড তাণ্ডবে মানুষ করোনার কথা ভুলেই গেল।
দুদিন প্রচণ্ড গরমে খুব কষ্টে দিন কাটল সকলের। রাত্রিতে দুচোখের পাতা এক করতে পারল না কেউ। অর্জুন অসহায় মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিল। দীর্ঘদিন ধরে জমানো টাকাগুলো অসহায় আশ্রয়হীন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দিলো। মানসিক শান্তি পেল সে।প্রায় 1 লক্ষ টাকা দশটা পরিবারকে দিয়ে মাথা গোজার জায়গা করে দিল। এলাকায় যে সমস্ত গাছ ভেঙে পড়েছিল সেগুলি কেটে দেওয়ার জন্য কুড়ি জন লোক লাগায়।অসহায় মানুষদের তার সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার ব্যবস্থা করল। বউয়ের সোনার গহনা বন্ধক দেয় এই সমস্ত কাজের জন্য।গ্রামে ধন্য ধন্য রব ওঠে অর্জুনকে নিয়ে।
আমপানের চারদিন পর আরও একটা বড় ঝড় আসার খবর চারিদিকে আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয়। অর্জুন মনকে শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকে বাড়ির উঠানে।হঠাৎ চিৎকার করে বলে–” আমি সর্বদা প্রস্তুত, হে ঈশ্বর তুমি আর কত পরীক্ষা নেবে আমার? শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত আমি মানুষের, মানুষের জন্যই কাজ করে যাব।”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।