গদ্যের পোডিয়ামে মালা মিত্র

প্রথম আমেরিকা ভ্রমনের স্মৃতিকথা

প্রথম আমেরিকা ভ্রমনের এক দারুণ অভিজ্ঞতা, টানটান উত্তেজনায় ভিসা থেকে টিকিট,সবই সম্ভব হয়েছিল একমাত্র মেয়ের ঐকান্তিক সহায়তায়।
আমি কেবল তালে তাল দিয়ে গেছি মাত্র।
মেয়ে নাতনী সঙ্গে প্রথম ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে।
উত্তেজনা ভয়,সব মিলেমিশে এক দারুণ খুশীর ক্ষণ।
সারা শরীর তন্নতন্ন করে চেক্ ইন হল।
অপেক্ষার বিমান কলকাতা থেকে আবুধাবি।
যথা সময় টেক অফ করল বিমান।
উড়ান চলাকালীন শুনেছি অনেকের বমি, মাথা ঘোরা না না উপসর্গ হয়, সৌভাগ্যবশত আমার তেমন হয় নি,কারন আমার দেশীয় বিমানে পূর্বে যাতায়াত ছিল।
চার ঘন্টা পাখা উড়িয়ে বিমান আবুধাবির মাটি ছুঁল।
আবুধাবিতে তেমন পরিবেশ টা অচেনা মনে হল না, কারন সেখানে কর্মী এবং অনেকেই ভারতীয় ভাষা ব্যবহার করছিল,বাংলাদেশিও অনেকে ছিল।
কয়েকঘন্টার বিশ্রাম এয়ারপোর্টেই।নৈশভোজ ফ্লাইট এই করা গেছিল।আবুধাবি যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের দেশের অনেক রাত।
ক’ঘন্টা পর আমার স্বপ্ন বিমান আরো একদফা সিকিউরিটি চেক ইনের পর পতপত করে আকাশে উড়াল দিল শিকা গোর উদ্দেশ্যেে।
আমার মন ও উড়ে গেল ১৮৯৩এর ১১ই সেপ্টেম্বর, ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অক্সিলিয়ারী শিকাগো।
এক তরুণ সন্ন্যাসী গৈরিক বসনধারী,পাগড়ী পরিহিত, সে সভায় তার বিশ্বজয়ী ভাষণ,গর্বিত বোধ করলাম স্বামী বিবেকানন্দের কথা ভেবে।
মনে মনে তাঁকে প্রণাম জানালাম,তাঁর স্মৃতিবিজরিত সুবিখ্যাত মাটির দিকে অগ্রসর হলাম।
এ উড়ান চোদ্দ ঘন্টার।তখন অন্তরিক্ষেই ঘর সংসার।
ল্যান্ডিং এর পর বিস্ময়বিস্ফারিত নেত্রে বুঝতে চেষ্টা করলাম,’এলেম নতুন দেশে’।
একদম উল্টো এক দেশ,তার মাটির বা রঙ কেমন,কেমন-ই বা মানুষজন,ছবির দেখা আমেরিকা আর বাস্তবে দেখা আমেরিকা মিলিয়ে দেখছিলাম কতটাই বা মিল, অমিল।
বিদেশিদের খোদ রাজ্য কেমন স্বপ্ন পুরীর মত মনে হতে লাগল।
আমেরিকার মানুষের নিয়মানুবর্তিতা দেখার মতন, আমাদের মত ঠ্যালাঠেলি গুঁতোগুঁতি নেই।যে যার মত ব্যাগ গুছিয়ে হাঁটা দিচ্ছে। পারলে অন্য কে সহায়তা করছে,অনভ্যাসের চোখ তো অবাক ছানাবড়া!
শিকাগো বিমানবন্দরে আড়াই ঘন্টা বিশ্রাম।ভীষণ ভাল লাগছিলো এখান কার মিটমিটে বোতাম চোখো শিশুদের দেখে।স্বর্ণালি ও নানা রঙের চুলের শিশু গুলিকে কেমন পুতুল পুতুল বোধ হচ্ছিল।বাচ্চারাও নিজেদের ব্যাগ নিজেরা বইছিল,ছোট বয়স থেকেই ওরা খুব স্বাবলম্বী।
আরো এক দফা টাইট সিকিউরিটি চেক ইনে র পর মিনিয়াপলিশ বিমানে চেপে বসা গেল।
ঘন্টা দেড়েকের উড়ান শেষে বাইরে এসে আলোয় আলোকিত চারিধার,আবিষ্কার করলাম, ওখানকার সময় অনুযায়ী দুপুর১২ঃ৩০ ভারতে ঠিক উল্টোটা গভীর রাত।
মাটি সেই মাটি রঙেরই,একটু বেশী কাল, হয়ত উর্বর বেশী।
আমাদের দেশের বানানো সমতল রাস্তাঘাট নয়,ঠিক প্রাকৃতিক যেমন উঁচুনিচু জমি, সেরকম ভাবেই বানানো,
রাস্তার দুপাশে সবুজের সারি সারি ছোট বড় গাছ।তবে ও-ই পাঁচ মাসই সবুজ, মে থেকে সেপ্টেম্বর, সেপ্টেম্বর এর শেষ থেকে গাছের পাতার রঙ পরিবর্তিত হতে থাকে,ওরা বলে ফল সিজন্।পাতার রঙ লাল, নীল, হলুদ,কমলা, শেষে ঘন খয়েরী সে এক অনন্য প্রকৃতি, নয়নলোভন।
এরপর শুরু হয় কনকনে ঠান্ডা হাড়কাঁপানো শীত,আরো পরে বরফে ঢেকে যায় বিশ্বচরাচর।
রাস্তার ধারের গাছগুলির মূলতঃ জ্যাক পাইন,রেড পাইন,ব্যালসাম।
গাড়ি করে চলেছি আমার গন্তব্য মিনিয়াপলিশ হেনপিনের প্লিমথ।
গাড়িতে চলেছি, আসে পাশের গাছ গুলি যেন মাথা নেড়ে হায়!হেলো! বলে স্বাগত জানাচ্ছে।
এখান কার লোকেরা চেনা অচেনা সবাইকে হাত নেড়ে মিষ্টি হেসে হায়!হেলো!বলে।
এ ব্যাপারটা আমার খুব ভাল লাগেছিল।
খুব সকাল থেকেই শুরু হয় আমেরিকান দের জীবনযাত্রা।
বাড়ির প্রতিটি মানুষ কাজ করে খায়, তিন মাস বয়স থেকে বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য ডেকে কেয়ার আছে, আর একটু বড় বাচ্চাদের আছে প্লে স্কুল।
বিকেলে কাজ সেরে যে যার শিশুকে আপন গৃহে নিয়ে যায়।
আর একটি বিশেষত্ব এখান কার ঘর বাড়ি কাঠের তেরী, আস্তে কথা বললে জোরে জোরে শোনা যায়।
এখানকার বেশীরভাগ বৃদ্ধ বৃদ্ধারা ওল্ড এজ হোমে সবাই মিলে ফুর্তিতে থাকে,লাঠি, ক্র্যাচ, নিয়েও তাদের উদ্যম কারো থেকে কম নয়।
মাথায় না না রঙের উইগে, মেক আপে, থাকে, কোনো দৈনতাই যেন তাদেরকে ছুঁতে পারে না।নিজেরাই নিজেদের কাজকর্ম করে, কারো সাহায্য নিতে চায় নাবড় একটা।খানা পিনা মৌজমস্তি তে ব্যাপক কাটে তাদের বৃদ্ধ বয়স,আমাদের মত ম’লাম ম’লাম, গেলাম গেলাম করে না।
এখানকার ভূখন্ড বেশী, মানুষ কম হওয়া, পলিউশন বিহীন এয়ার,অর্গানিক খাবার দাবার পাওয়া যায়।আমাদের দেশের মত এত ভ্যাজাল নেই।
আমাদের মত, ঠাসাঠাসি, মারামারিও নেই,চরম নিয়মানুবর্তীতা দেখা যায় ওদের মধ্যে।
সূদুর প্রাচ্য থেকে আমেরিকায় এসে বলতে ইচ্ছে করে’কত অজানারে জানাইলে তুমি,কত ঘরে দিলে ঠাঁই,দূর কে করিলে নিকট বন্ধু পরকে করিলে ভাই’।
বৈচিত্র্য ভরা আমেরিকায় বসে তবু এ হার হভাতে মন,সেই দূর,অনেক না পাওয়া,ঠেলাঠেল, মারামারি, গুঁতোগুঁতি, করা, ঘাম ঝরানো দিনদুখীনি বাংলা মায়ের, সকাল, দুপু, রাত্রি,পাওয়া না পাওয়া যেন চোখ ছোট করে মিষ্টি হেসে বলে ‘ফিরেএস, এই বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে,কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকার বৈচিত্র্যে’।
বারমাস্যা সবুজ ডাকে তার সহজতায়,যেখানে বুকে বুক দিয়ে বন্ধুর বন্ধুত্ব,আত্মার আত্মীয়তা,ওঠা বসা, সুখ দুঃখ,গলাগলি, মারামারি, অলি গলি তস্য গলি, কানা গলি,রকের আড্ডা, ঝগড়া, হাতাহাতি, পরমুহূর্তেই কোলাকুলি , দুহাত বাড়িয়ে ডাকে কাছের জন,এত বৈপরীত্য, এত হৃদ্যতা এই না হলে আমাদের ভারতবর্ষ! কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছা করে’নম নম নম সুন্দরী ম-ম জননী বঙ্গভূমি, গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি’।
আমরা গর্বিত আমাদের ঋতু বৈচিত্র্যে,আমরা গর্বিত আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির জন্য,গর্বিত আমাদের সব মনিষীদের জন্য।
সারা দুনিয়া তার মত সাজানো থাক, আমরা ভারতবাসী সর্ব ধর্ম নির্বিশেষে আমাদের মাতৃভূমিকে জানাই হাজার শ্রদ্ধা ভরা প্রণাম।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।