কর্ণফুলির গল্প বলা সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে মনিরুল ইসলাম (পর্ব – ৪)

রাজলক্ষী

কমলা

শহর থেকে বহু দূরে মোহাম্মদপুর একটি ছোট্ট গ্রাম। সব মিলিয়ে স-আড়াই ঘরের বাস। গ্রামের মাঝখান দিয়ে সোজা একটা কাঁচা রাস্তা চলে গেছে গ্রামের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। তিনটি পাড়ায় বিভক্ত গ্রামখানি। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ দিনমজুরি করে চাষের কাজে। কাকভোর থেকে এক সন্ধা পর্যন্ত সকলে মাঠে থাকে। সন্ধ্যার পর পাড়ার চায়ের দোকানে সকলে বসে বিভিন্ন গল্পগুজব করে, তাস খেলে, লুডো খেলে, রেডিওতে স্থানীয় সংবাদ শুনে সকলে বাড়িতে ফেরে। পরদিন আবার চলে রুটিনমাফিক মাঠের কাজ।
গ্রামের সব থেকে বড় লোক ছাত্তার মোড়ল। বাড়ির উঠানে বড় বড় ধানের গোলা। হাল-লাঙল জোন মেনদার কোন কিছুর অভাব নেই তার। তিন ছেলের ছোট ছেলে কলিমুদ্দিন বি. এ. পাস করে পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে বছর চারেক হল। সেও এখন বড় ভাইদের সঙ্গে মাঠের কাজে লেগে পরেছে।
বাড়ির লাগজোনা কাজ করে হাতেম আলী। সেই সূত্রে হাতেম আলীর বাড়িতে যাতায়াত ছিল কলিমুদ্দিনের।
দেখতে দেখতে হাতেম আলীর বড় মেয়ে কমলা বেশ বড় হয়ে উঠেছে। সে এবছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। পড়াশোনায় আলোচনার জন্য দুজনের মধ্যে প্রায়ই কথা হতো। দুজন দুজনের কাছাকাছি আসতে আসতে একে অন্যের ওপর একটা মায়া তৈরি হলো নিজেদের অজান্তে। একে অন্যকে মনে মনে ভালবাসতে শুরু করল।
আজ প্রথম পরীক্ষা স্কুলের বাইরে। পরীক্ষার সেন্টার রুদ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয়। বাড়ি থেকে সাত কিলোমিটার দূরে।
হাতেম আলি কলিমুদ্দিনকে রাজি করিয়েছে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কলিমুদ্দিনও এমনটাই চাইছিল।
কলিমুদ্দিন সাইকেল নিয়ে কমলার বাড়ির সামনে দাঁড়ালো, একটা ছোট্টো ডাক দিল- কমলা
কমলা উত্তর দিল- যাচ্ছি।
কাগজপত্র সব গুছিয়ে নিও, বেশি করে কলম নিও, এডমিট নেওয়া হয়েছে কি একবার চেক করে নিও।
আচ্ছা সব দেখে নিচ্ছি।
কমলা দাদীমা ও মাকে সালাম করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। পিছনে দাদীমা এগিয়ে আসতে আসতে বলল মাথা ঠান্ডা করে লিখিস। মা বলল প্রশ্নগুলো ভালো করে পড়ে তবে উত্তর দিস। কলিমুদ্দিন তুমি সব ঠিকঠাক বুঝিয়ে ঘরে বসিয়ে দিও।
আচ্ছা তোমাদের চিন্তা করতে হবে না, আমি সব সামলে নেব। আল্লাহর নাম করে বেরিয়ে পড়- দাদি মা বলল।
কলিমুদ্দিন সাইকেলে উঠে বসলো। কমলা কে ডেকে বলল এসো দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কমলা সাইকেলের সামনে উঠে বসলো। কলিমুদ্দিন বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, গ্রামের রাস্তা ছেড়ে বড় পাকা রাস্তায় চলে এলো।
এই প্রথম কমলা কলিমুদ্দিনের সাইকেলে চাপল। মনের ভিতরে একটা ভয় কাজ করছিল, তাই রাস্তায় কেউ কাউকে কোন কথা বলতে পারলোনা।
স্কুলের সামনে চলে আসলো। কলিমুদ্দিন সাইকেলে বসে একটা পা মাটিতে দিয়ে সাইকেল থামালো। দুই হাত তার সাইকেলের দুই হ্যান্ডেলে।
সাইকেল থেকে নামো।
নামবো কিভাবে?
কেন?
তুমি হাত সরাও বলে কমলা কলিমুদ্দিন এর হ্যান্ডেলে থাকা বাঁ হাতটা সরিয়ে দিল। কলিমুদ্দিন হাতটা সরিয়ে নিল। কমলা সাইকেল থেকে নেমে পড়ল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ছোঁয়া কলিমুদ্দিনের আপাদমস্তক শিহরিত করল। মনের ভিতরে একটা আলাদা অনুভূতি জাগলো। মনে মনে ভাবতে লাগল যদি আরো কয়েকটি মুহূর্ত ছুঁয়ে থাকতো।
ও- বলবাতো।
হাঃ হাঃ হাঃ। সাইকেল কোথায় রাখবে?
এখন এখানে থাক। সময় এখনো অনেক বাকি।
কয়টা বাজে?
এখন এখন 11টা10
তাহলে এখনো তো অনেক সময় বাকি।
হ্যাঁ 15 মিনিট আগে ঘরে ঢুকতে হবে, মানে এখনো আধঘন্টা বসতে হবে। এক কাজ করো। সামনে ওই গাছের গোড়াতে বসো, বইটা তারে দেখতে লাগে।
চলো তাই করি। রচনা টা একটু চোখ বুলিয়ে নিই।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।