ক্যাফে ধারাবাহিক গল্পে মনোরঞ্জন ঘোষাল (পর্ব – ১)

টলি ট্যাব আবিষ্কার
আজ ২৫শে জুলাই। লণ্ডনে রয়াল সোসাইটির একটি অধিবেশনে যোগদান করতে এসেছি। ওরা ওরাল প্রেজেন্টেশনের আয়োজন করলে আমাকে খবর দেয়। আমি সব সময় উপস্থিত হতে পারি না।
তবে ওদের এমন বাৎসরিক সভার আয়োজনে আমি বেশ কয়েক বছর ধরে উপস্থিত থাকছি। এখানের বৈজ্ঞানিক মহল। আর তাদের নানা রকম গবেষণা সম্পর্কীত আলোচনা আমাকে নতুন কিছু করতে ইন্ধন যোগায়। তা ছাড়া এখানের লোক জনদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চললে খুব সহজে আবিস্কার গুলকে বৈজ্ঞানিক মহলে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। তবে আমার সব আবিস্কার আমি সকলের সঙ্গে ভাগাভাগি করি না। তাতে আমার নিজস্বতা বা গোপনীয়তা বলে কিছু থাকবে না। কোন বিপদে পড়লে ঠিক সময়ে ঠিক জিনিসটা প্রয়োগ করে নিজেকে উদ্ধার করতে নইলে অসুবিধায় পড়তে হবে। ওরা সকলেই আমার সক্ষমতাটা জেনে গেলে ওরা আট ঘাট বেঁধে আমাকে ফাঁদে ফেলবে। এই লাইনে ফাঁদে ফেলে তার সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া বা তাকে মেরে ফেলার একটা ঘৃণ্য প্রবণতা অনেকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। ছলে বলে কৌশলে তারা নিজেদেরকে শিরোপা পরা অবস্থায় দেখতে চায়। তেমন কিছু হলে এই গোপন অস্ত্র গুলো নিজেকে বা অপর কাউকে বাঁচানোর জন্য ভীষণ কাজে দেয়।
দুপুরে লাঞ্চ সেরে কনফারেন্স রুমে বসে আছি। একটু পরেই ডঃ ডেনিয়লের বক্তৃতা আছে। সে একটি বিশেষ গবেষণার বিষয়ে আলোক পাত করবে বলে লিখে ছিল। তার ঐ লেখায় আমার আগ্রহ জন্মেছে। তার বক্তব্য শুনবো বলে আগ্রহ ভরে বসে আছি।
ও এখন মস্ত বড় উদ্ভিদ বিজ্ঞানী। গোটা পৃথিবী জুড়ে তার খ্যাতি। বর্তমানে ও একটি নির্জন আইল্যাণ্ডে একান্তে তাঁর গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই অধিবেশনে সেই বিষয়ে বিশেষ বক্তব্য রাখবে বলে ক দিনের জন্য এখানে এসেছে। এ কাজটি সেরে আবার সেখানেই চলে যাবে।
আমার সঙ্গে ওর বিশেষ পরিচয় আছে। ও আমাদের শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে বেশ কিছু দিন কাজ করে এসেছে। তখন আমার সঙ্গে ওর পরিচয় হয়। আমি তখন একটি বিশেষ অর্কিড নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। আর ও করছিল বিশেষ রকমের বাঁশ গাছের বাকল নিয়ে গবেষণা।
সাধারণত বাঁশ গাছের বাকল হয় না। আমি এক বিশেষ প্রকার বাঁশের প্রজাতির উদ্ভব করেছিলাম যার বাকল গঠিত হয়। এটি আমার আর একটি ছোট ট্রান্সজেনিক আবিস্কার বলতে পার। আর তার সেই বাকল থেকে তৈরী হতে পারে দ্রুত লম্বা হবার ওষুধ। আমি বোটানিক্যাল গার্ডেনের শোভা বাড়ানোর জন্য সেটিকে ওখানে রেখে আসি। দিব্যি সেখানে বেড়ে চলেছে সে গাছ। দেশ বিদেশের উদ্ভিদ প্রেমিরা সেখানে আসে সেই বাঁশ দেখতে। আসলে ঐ বাঁশের বাকলে দংশক রোঁয়া থাকে না তাই সহজেই সবাই তা কাছে যায় সেলফি তোলে বন্ধু মহলে ইম্প্রেশণ জমানোর জন্য।
আমিই আগে সেই টলি ট্যাব ওষুধ তৈরী নিয়ে চিন্তা ভাবণা করছি। বেশ অনেকটা অগ্রসর ঘটেছে আমার কাজে ঠিক তখন ও আমার কাছে থেকে সেই কাজটি সম্পন্ন করবে বলে প্রতিশ্রুতি চেয়ে নেয়।
ও বললে- “আপনি তো ওষুধ বানিয়ে ব্যবসা করবেন না? সর্বত্র জন সাধারণের কাজে তা লাগাবে কী করে? তার থেকে ও ওষুধটি তৈরী করার ভার আমাকে দিয়ে দিন।”
আমি তার করুণ মুখের দিকে চেয়ে ঐ গবেষণা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ওর হাতে সে আবিষ্কারের ভার তুলে দিয়ে ছিলাম। ভাবলাম ও যদি তা থেকে দুটো পয়সা উপার্জন করে তো ক্ষতি কী? আমি তো আর টাকা রোজগার করার জন্য এ সব করি না। আমি চাই মানব কল্যানে তা ব্যবহার হোক। বোধ হয় সেই কথাই বলবে এখানে। ও এখন সেই কাজে কতটা সফলতা লাভ করেছে তা ওর নিজের মুখে শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছি।
ডেনিয়ল ডায়াসে উপস্থিত হল। দেখে মনে হল খুব একটা ভাল খবর তার কাছে নেই। মুখটা কেমন বিষন্ন বলে মনে হল। সে তার গোটা বক্তব্যে তেমন বিশেষ কিছু নতুনত্ব যোগ করতে পারল না। যার জন্য আমি অধির আগ্রহে বসে আছি। শুধু বলল খুব শিঘ্রই সে মানুষের জন্য লম্বা হবার ওষুধ হাতে তুলে দেবে। তৈরী সমাপ্ত কেবল জীব দেহে প্রয়োগ করা বাকি।
বলে সে ডায়াস থেকে নেমে চলে গেল। আমি তার এই ছেঁড়া ছেঁড়া বলা কথায় সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। আমার হাতেও তেমন বিশেষ সময় নেই। একটা বিশেষ গবেষণার কাজ কিছু দিনের জন্য স্থগিত রেখে এখানে চলে এসেছি। মনে হয়েছিল বিশেষ কিছু বার্তা আমি এখান থেকে নিয়ে যেতে পারব। তা হল না। তাই মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য। গবেষণার কাজে মন দিতে হবে। যতটা তাড়াতাড়ি সেই কাজটি শেষ করা যায় তার প্রচেষ্টায় আগ্রহী হলাল। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। আমাকেও রওনা দিতে হবে। একটি বিশেষ গবেষণার কাজ আমি ফেলে রেখে চলে গেছি। মনটা সেই দিকেই টেনে রেখেছে।
সবে রুমের বাহিরে বের হয়ে এসেছি। তখন দারোয়ান একটি চিঠি হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন- “এই চিঠি ডেনিয়ল স্যার আপনাকে দিয়েছেন। এখুনি দেখে আপনাকে ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন।”
অবাক হলাম! ডেনিয়ল আবার এই ভাবে আমাকে চিঠি পাঠিয়ে কী বলতে চাইছে? নিশ্চয়ই কোন গোপন কথা যা সবার সামনে তার পক্ষে আমাকে বলা যায় না। হয়তো বা সে কোন বিপদে পড়েছে? সে কথা আর না ভেবে আমি চিঠিটি খুলে দেখলাম। সেখানে একটা ফোন নাম্বার লেখা। তার নিচে লেখা “দয়া করে কল করুন।”
আমি বুঝলাম ও খুব বিপদে আছে নিশ্চয়ই। তাই মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে একটা কল লাগালাম সেই নম্বরে।
হ্যালো! ডেনিয়ল?
“হ্যাঁ। আপনি ছয় নম্বর ঘরে একবার আমার সঙ্গে দেখা করুন দয়া করে! আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পাবর না। তাতে বহু সমস্যা আছে। তাই আপনি একা গোপনে এখানে আসবেন।”
ফোনটা সে রেখে দিল। এ চত্বর আমার চেনা। এখানে কোন বিপদের আশঙ্কা নেই তাই নির্ভয়ে এগিয়ে চললাম।
এখন যেখানে আমি দাঁড়িয়ে। ঠিক তার বাম দিকে কিছুটা গিয়ে বাম হাতে একটা গলি পড়বে। সেই গলির দ্বিতীয় ঘরটি ছয় নম্বর ঘর। এক বছর আমি ঐ ঘরেই ছিলাম।
আমি গোঁ ভরে সেই দিকে এগিয়ে গেলাম। গলি পথে ঢোকার আগে পিছনের দিকে চেয়ে দেখলাম। আমার উপর কেউ নজর রাখছে না তো? কাউকে দেখতে পেলাম না।
এবার কোন দিকে না তাকিয়ে ছ নম্বর ঘরের দরজার সামনে চলে গেলাম। তার পর নক করলাম দরজায়। টক্ টক্। টক্ টক্।
ভিতর থেকে খট করে দরজার ছিট কিনি খোলার শব্দ হল। তার পর দরজার পাল্লা খুলে গেল। আমি সেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে গেলাম। সে আমার ঘরে ঢোকা মাত্র দরজা বন্ধ করে তাতে ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। তার ওপর পর্দা টেনে দিল। যাতে আমাদির গোপন আলোচনা কেউ কান পেতে না শুনে ফ্যালে।
ডেনিয়ল আমাকে সোফার এক পাশে বসিয়ে। আর তার এক পাশে সে বসে পড়ল। তার পর আমার হাতে ধরে বলল- “আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে পানকু?”
সাহায্য? এ ভাবে বোলো না ডেনিয়ল। আমি আমার সহকর্মীদের কাউকে এমন ভাবে মাথা নত অবস্থায় দেখতে চাই না। বল তোমাকে আমি কী ভাবে সাহায্য করতে পারি? আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম।
এবার সে বলতে শুরু করল- “আমি তোমার দেখানো পথে এতদিন চলে ওষুধ তৈরী করে ফেলেছি। কিন্তু তা প্রাণী দেহে প্রয়োগ করতে পারছি না!“
ক্রমশ…