T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় মনোরঞ্জন ঘোষাল

চারা বাগানে রহস্য
বেশ কিছুদিন পর কটাদিন ছুটি পেয়েছে দুজো। যদিও সে কোন বাঁদাধরা চাকরি করে না। যে তাকে সময় মোতাবেক ডিউটি করতে হবে।
কাজ সে নিজের ইচ্ছা মতে করে। তাই বলে কাজ হাতে থাকলে সে অন্য কিছুকে আমোল দিতে পারে না। তা সে বেড়াতে যাওয়াই হোক না কেন।
সবে মাত্র দিল্লি থেকে একটা সমস্যার সমাধান করে এসেছে। বিশুকে বলল।
“নে জামা কাপড় গুছিয়ে নে, কটাদিন কোন সমুদ্র সৈকতে ঘুরে আসি চল!”
সেই মত দীঘা দুজনে ঘুরতে চলে গেল।
সবে দিন দুই হয়েছে একটা ফোন গেল দুজোর কাছে।
“হ্যালো! আমি মুচিশা থেকে কথা বলছি গুরুপদ গায়েন। আমার চারা বাগানে একটি সমস্যা তৈরী হয়েছে আপনাকে তার সমাধান করতে হবে! শিঘ্রই চলে আসুন। আমি আপনার বাড়িতে গিয়ে ছিলাম। সেখান থেকে নাম্বার নিয়ে ফোন করছি। একটু তাড়াতাড়ি আসুন নইলে সব শেষ হয়ে যাবে।”
গুরুপদ গায়েন। মুচিশার নামকরা এক চারা গাছের ব্যবসায়ী। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। একদা কমদামি সবুজ বা রঙিন গাছের ব্যবসা করত। এখন দেশি বিদেশি অর্কিড বনসাঁই ইত্যাদির চাষ করছে। বড় বড় ঘরে চলে এদের চাষ। কাগজে দুজো এই সম্পর্কে পড়েছে।
খবর পাওয়া মাত্র সে আর সেখানে বসে থাকতে পারল না। জামা কাপড় বেঁধে সেই দিনেই রওনা দিল।
ট্রেনে ফেরার পথে সে কাগজে পড়েছে মুচিশার ঘটনা। পর পর দু দিনে দুটি লোক মারা গেছে সেখানে। কেউ যেন বিদ্যুতের শক লাগিয়ে তাদের মেরেছে! ভয়ে আর কেউ কাজ করতে চাইছে না সেখানে!
কোলকাতায় ফিরেই সে বিশুকে নিয়ে চলল স্পটে।
গিয়ে সে সব ঘটনা বৃত্যান্ত শুনেছে। বেশ বড় বড় দুই খানা বহুতল বাড়ি। তার প্রতিটি তলে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার করে গাছ। প্রতিটি তলে দুই জন করে কাজের লোক আছে।
গত দুই দিন আগে তার একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলের কর্মিটি হঠাৎ মারা যায় ঐ ঘরের মধ্যে। পোষ্ট মার্টাম রিপোর্ট অনুযায়ী পুলিশ বলছে তাকে বিদ্যুতের শক দিয়ে মারা হয়েছে! কে? কী ভাবে? কেন তাকে মারল কেউ বুঝতে পারছে না!
গত কালও ঠিক ঐ ভাবে আরো একজন মারা গেছে। ওরা সকলেই খুব ভীত হয়ে পড়েছে। আর কর্মিরা কেউ ঐ খানে কাজ করতে যেতে চাইছে না। মালিকও সাহস করে কাউকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারছি না।
কিছু চুরিও যায় নি! সেইটি তাদেরকে আরো অবাক করে তুলছে!
দুজো সব শুনে স্পটে গিয়ে দেখল। মস্ত বড় হল ঘর চারা গাছে ভর্তি। একেবারে শীততাপ নিয়ন্ত্রণ করা থাকলেও সে ব্যবস্থা হাতের নাগালে নেই। যদি কেউ শক দেয় তো তাকে বাহিরের কোথাও থেকে সরঞ্জাম ব্যবস্থা করে আনতে হবে। সেটিও যে সহজ তা নয়। কারো না কারোর নজরে পড়ে যাবার কথা।
“তবে কী অনেকে যুক্ত এই ঘটনায়?”
ভাবনা এল দুজোর মাথায়।
এক এক করে সকলকে সে জিজ্ঞাসাবাদ করল। কিছুই পেল না সন্দেহ করার মত।
গোপনে নজর রাখবে সে ঐ স্থানটির উপর। তাই স্বাভাবিক দিনের মত তদেরকে চলতে বলল। তবে সেই তলে আলো আর জ্বালানো হল না।
সকলে জানলো দুজো চলে গেছে। সে কিন্তু চলে গেল না। ঐ তলে বুলেট প্রুফ কাঁচের বাহিরে থেকে নজর রাখছে সে।
সে দেখেছে ঐ তলের বাহিরে একটা দিকে কার্নিশটি একটি জায়গাতে কিছুটা বাড়ানো। বেশ হাত পা ছড়িয়ে বসা যায়। ওখান থেকে কোন গোপন শত্রু এই কাজ করতে পারে বলে তার মনে হল।
হয়তো তার কোন গাছ চুরির উদ্দেশ্য আছে। সে তার কাজে সফল হতে পারে নি। তাই আজও আসতে পারে সে! আর ওখান দিয়েই সে উঠবে! গোপন ডেরা থেকে সে নজর দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে বসে থাকল সেখানে!
গভীর রাতে হঠাৎ তার চোখটা কয়েক সেকেণ্ডের জন্য লেগে গেল! তখনই সে দেখতে পেল। হঠাৎ সেই ঘরের আলো যেন জ্বলে উঠল! তৎক্ষণাৎ তার চোখ ছেড়ে গেল! সে তাকিয়ে থাকল সেই দিকে আলোটা আবার যদি জ্বলে তার আশায়! আলো আর জ্বললো না!
লাইটের সুইচ গুলি ঘরের বাহিরে। আর সেখানে যাওয়ার সিঁড়িও বাহিরের দিকে। সেই দিকেও সে নজর রেখেছে। কাউকে উঠতে বা নামতে সে দেখল না!
সে দিন কেটে গেল কিচ্ছু বোঝা গেল না। ঠিক পরের দিন সে দেখতে পেল আলো জ্বলে ওঠা। তবে লোকজনকে উঠতে বা নামতে সে দেখল না।
সকালে সে ঘরটিতে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল। কোথাও গোপন পথ আছে কী না! কিচ্ছু খুঁজে পেল না।
তবে যে দেখল আলো জ্বলতে! কে আলো জ্বালালো? তবে কী ভুত? সে জানে ভুত বলে কিচ্ছু নেই। ও সব মানুষের কারসাজি।
হঠাৎ তার নজর পড়ল গাছেদের মাঝে একটি জায়গাতে! একটি গাছ কেমন অদ্ভূত রকমের! তার গায়ে পাতা বলে কিছু নেই। শুধু ডাঁটা! তা আবার শুকনো বলেই মনে হল তার। তার পাশের সব গাছ গুলো কেমন ঝলসে গেছে।
গুরুপদ বাবুকে ডেকে জিজ্ঞেস করল সে। “ এই গাছটি কী এমনই?”
তিনি উত্তর করলেন “হ্যাঁ।”
“আর ঐ পাশের গাছ গুলি?”
“ও গুলি অমন ছিল না। কদিনের অযত্নে এমন হয়ে পড়েছে।”
“ও গাছটির নাম কী?”
“ওটির নাম – ব্রাঞ্চোডেনড্রন! ঐ রেডোড্রেনড্রন প্রজাতির একটি গাছ।”
নামটা তার কেমন আজব বলে মনে হল। আর গাছটিকে। একেবারে পাতাহীন শুকনো গাছের মত! আবার ঐ শাখা গুলির ডগার দিক গুলি কেমন কাঁটার মত সূচাল!
এমন অদ্ভূত গাছ সে কখনো দ্যাখেনি।
সেদিন সে চলে গেল বাড়ি। বহুদিন আগে একটি বই তার এক বন্ধু তাকে পড়তে দিয়েছিল। ঐ গাছপালা সম্পর্কে। একটি বার সে ছোখ বুলিয়ে ছিল। তবে সব মনে করতে পারছে না। এমন একটি অদ্ভূত গাছ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সে প্রাণ হারায়।
বাড়িতে গিয়ে সে সেই বইটি খুঁজে বের করে পড়তে শুরু করল। বিশুকে বলল “একটি বার নেটে খুঁজে দ্যাখতো এমন রকমের গাছ সম্পর্কে কিছু পাওয়া যায় কী!”
বিশু নেটে কিছুই খুঁজে পেল না। তবে দুজো কিছু একটা খুঁজে পেয়েছে তার বন্ধুর দেওয়া বইতে। সেখানে চোখ বুলিয়ে সে অবাক হল!
গাছের এমন অদ্ভূত বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে বলে তার ধারণা ছিল না। কী আশ্চর্য!গাছ এমন বিদ্যুৎ ছড়াতে পারে!
আর তার বুঝতে অসুবিধা হল না রহস্যটা কোথায়!
সে রাতে দুজো আর সেখানে গেল না। একটু আরাম করে ঘুমিয়ে নিল।
পরের দিন সেখানে গিয়ে সকলে ডেকে জড়ো করল। তার পর করল রহস্যের পর্দা ফাঁস।
“বুঝলেন গুরপদ বাবু আপনি ঐ গাছটি নিশ্চয়ই কটাদিন আগে এনেছেন?”
“হ্যাঁ ওই দিন ছয়েক আগে।”
“ওই গাছটি আসলে রাতে একটা সময় বিদ্যুৎ ছাড়ে! ওর ঐ শাখা গুলি তার সূচীমুখ! তাই ওর চারি পাশের গাছ গুলি ঝলসে গেছে। আর সেই বিদ্যুতের ঝলকে ঐ শ্রমিক দুটি মারা গেছে।”
“ ওই গাছ যে বিদ্যুৎ ছড়ায় তা তো আমাকে জানায় নি ঐ গাছ বিক্রেতা!”
“কী করে জানাবে? ওরা নিজেরাই তা জানে? যে জানতো সে সবটুকু জানার আগেই মারা যায়। তাই এই রহস্যের সবটুকু জানা যায় নি! তার ঐ শেষ লেখাটি আমার কাছে। যেটি আমাকে এই রহস্যভেদ করতে সাহায্য করল। ওটিকে আগে বিদায় করুন।”
কথা শেষ করে দুজো বাড়ি চলে গেল।
সমাপ্ত