মেঘ করেছে। তবে বৃষ্টি হতেও পারে আবার হাওয়ায় মেঘ উড়েও যেতে পারে। সমস্যা হল, আমি সঙ্গে করে ছাতা আনিনি। ফলে বৃষ্টি হলে ভিজে যাব। আজ রথ। রথের দিন বৃষ্টি হয়। এছাড়াও আষাঢ়ের প্রথম দিন, মনসা পুজোর দিন, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন, দশহরার দিন বৃষ্টি হয়। তবে রথের দিন আর বিশ্বকর্মা পুজোরদিন বৃষ্টি হলে বাচ্চারা কান্নাকাটি করে। যদিও এবছর কোভিডের জন্য রথের দিন বৃষ্টি হল কি হলনা তাতে কারো কিছু এসে যায় না। কারণ রথের মেলার আর রথ টানার পার্মিশান দেয়নি প্রশাসন।
আমি তবু অভ্যাসবশতঃ বিকেলে বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে রথতলার দিকে গেলাম। সুজন বাগানের গলিটা পেরোতেই অন্যবার ভিড় ঠেলতে হয়। সাইকেল চালানো মুশকিল হয়ে যায়। এবার ফাঁকা রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে অনায়াসে পৌঁছে গেলাম রথতলা মাঠের সামনে। ফাঁকা রথটা মাঠের উল্টোদিকে দাঁড় করানো। অন্যবার এইসময় রথ এগিয়ে যায় শিবতলার দিকে। রথের ওপর থেকে ভিড়ে ফল বাতাসা জিলিপির টুকরো ছোঁড়া হয়। সেই বাতাসা কুড়াতে গিয়েই তো অত বড় ঘটনাটা ঘটেছিল। সেটা অবশ্য আমি জানতে পারি মিতার মুখে।
রাস্তার দুপাশে মেলা বসেনি। বাঁশির প্যাঁপোঁ আওয়াজ নেই। পাঁপড় ভাজার গন্ধ নেই। রথের দড়ি ধরার জন্য ঠেলাঠেলি নেই। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম, দেখতে পেলাম বর্মণ বাড়ির নীচে বন্ধ সেলুনের দরজাটার সামনে একটা হিন্দুস্তানী বউ চপ ভাজছে। আমি সাইকেল স্ট্যান্ড করে দুটো আলুর চপ দুটো পেঁয়াজী চাইলাম। কড়াইতে তখন চপ ভাজা চলছে। রাস্তার উল্টোদিকের টিনের ক্লাবঘর থেকে একটা ফ্রক পরা মেয়ে বেড়িয়ে এসে বউটাকে বলল, ‘দশটা পেঁয়াজী আর আড়াইশো মুড়ি চাইল।’ আমি আনন্দে বিহ্বল হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘মুনাই’!
মেয়েটা অবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে আমার দিকে চেয়ে বলল, ‘আমাকে ডাকছেন?’
– হ্যাঁ।
– আমি তো মুনাই নই।
আমি ভাল করে দেখলাম মুনাইকে। না আমার ভুল হতে পারে না। সেই বড় বড় চোখ, শ্যামলা রঙ, জোড়া ভ্রূ, থুতনিতে কাটা দাগ, টিকালো নাক। যদিও মুনাইকে দেখেছিলাম আজ থেকে ছয়বছর আগে। তখন মুনাইএর বয়স তিন। মেয়েটা মুড়ি চপ নিয়ে ক্লাবে ঢুকে গেল আবার। আমি চপ নিয়ে বাড়ি এসে মিতাকে বললাম, ‘মুনাইকে দেখলাম আজ রথতলায়।’
মিতা কথাটা শুনেই ওর দিদিকে ফোন করল। ওর দিদি জানালো, কাল আসবে। ট্রেন কোভিডের জন্য বন্ধ তাই কাল আসবে নাহলে আজই আসতো। ফোন রেখে মিতা বলল, ‘তোমায় চিনতে পারলো?’
– না, বলল, আমি মুনাই নই।
– শোন তুমি আর একবার যাও।
– এত রাতে কোভিডের জন্য এমনিতেই সব বন্ধ। চপের দোকান কি আর খোলা থাকবে?
– তবু যাও।
আমি গিয়ে দেখলাম, চপের দোকানের বউটা তখন দোকান তুলছে। মুনাই কড়া খুন্তি ঝুড়ি গুছিয়ে পাশের টিনের ঘরটায় রাখছে। আমি ভণিতা না করে বউটার উদ্দেশ্যে বললাম, ‘ও তোমার মেয়ে?’
– হাঁ, কিঁউ?
– না ওকে মুনাই অর্থাৎ……
বউটা আমার কথা শেষ হবার আগেই টিনের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। আমি আর সময় নষ্ট না করে থানায় গেলাম। থানায় তখন কেউ নেই। একজন কনস্টেবল সব শুনে বলল, ‘এতদিন আগের কেস, তাছাড়া সন্দেহের বশে আমরা কাউকে গ্রেফতার করতে পারিনা। কাল আপনি বরং ছবি নিয়ে এসে বড়বাবুকে বলুন।’
রাতে মিতার দিদিকে বার বার ফোন আর মুনাইএর ছবি খোঁজাতেই প্রায় ভোর হয়ে গেল। পরেরদিন বাজারে গিয়ে মাছ মাংস মিষ্টি দই আনলাম। শালী আর ভাইরা ভাই আসবে বলে কথা। সঙ্গে ওদের চার বছরের ছেলে টুপাই। সাইকেলের হ্যান্ডেলের দুপাশে বাজারের ভর্তি থলি নিয়ে ফিরে বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই ভিতর থেকে হৈ হল্লার আওয়াজ পেলাম। জলখাবার খেয়ে আমরা দুই ভাইরা ভাই গেলাম রথতলায়। টিনের ঘরটা বাইরে থেকে তালা দেওয়া দেখে ক্লাব ঘরে একটা ছেলে ছিল তাকে বললাম, ‘আচ্ছা, সামনের বাড়িটার বারান্দায় যে বউটা বিকেলে চপ ভাজে সে কোথায় থাকে জানো?’
– এখন কোভিডের জন্য কোনো দোকান খোলা নেই, আপনি কার কথা বলছেন?
মিতার জামাইবাবু রেগে বাইরে বেরিয়ে বলল, ‘আমি আগেই জানতাম। শুধু মুধু ব্যবসার ক্ষতি করে এত দূর গাড়ি ভাড়া করে আসা!’
আমি ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম, মিতা আর মিতার দিদি দিকভ্রান্তের মতো ভিড়ে ছোটাছুটি করছে। মিতার দিদির তিনবছরের মেয়ে মুনাই হারিয়ে গেছে। ভিড় ঠেলে ওরা একে ওকে তাকে জিজ্ঞেস করতে করতে একবার শিবতলার দিকে একবার বিশালক্ষ্মী তলার দিকে একবার সুজন বাগানের দিকে ছোটা ছুটি করছি।
আমার ভাইরা ভাই ফেরার পথে, নিজের মুদির ব্যবসার উত্তরোত্তর উন্নতির ইতিহাস বলতে মশগুল হয়ে পরল। ফিরে নিজের বউএর কান্না থামাতে বলল, ‘তোমাকে আমি একটা ছেলে দিয়েছি কিনা বলো?’ মিতাও দিদিকে আমার দেখার ভুলের কথা বলে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। আমি মুনাই এর ছবি আমার বিয়ের এলবামে খুঁজে চললাম। টিকালো নাক, জোড়া ভ্রূ, শ্যামলা রঙ……ছবিটা পেলেই উলটোরথে আবার রথতলা যাবার প্রস্তুতি নেব। আমাকে এলবাম হাতড়াতে দেখে মিতা ঘরে ঢুকে খেঁকিয়ে বলল, ‘নিজের ছেলেমেয়ে জন্ম দেবার মুরোদ নেই, অন্যের মেয়ে খুঁজে চলেছে, যত্তসব আদিখ্যেতা।’