ক্যাফে গল্পে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস

অন্য মিনির গল্প

হাতের চামরটা গায়ে মাথায় বুলিয়ে চাচা রিক্তার মেয়েকে মন্ত্র পড়ে দেন৷ রোগাসোগা, জোব্বা পরা, দাড়িওয়ালা চাচার মুখের থেকে ওসব মন্ত্র গড়িয়ে পড়ে মেয়ের মাথায় কাঁধে৷ রিক্তা আরবি ফার্সি এসব এক বর্ণও বোঝে না৷ শুধু জানে মানুষটা দুটো চাল আলু পটল আর পাঁচ দশটা টাকার সিধের জন্যই এই মন্ত্র পড়েন না৷ এর সাথে মিলে থাকে হিসেবের ঊর্ধে এক ভালোবাসা৷ সপ্তাহান্তে এক দিন এসে বড় রাস্তার বাড়িটায় তিন ধাপ সিঁড়ি ওঠে গ্রিল ঠেলে হাঁকেন, ‘দিদিভাই’৷
রিক্তার মেয়ে টিকলি দারুণ খুশিতে ছুটে আসে ওর মুশকিল আসান দাদু এলেই৷ হাতের কাজ ফেলে রিক্তা টুকিটাকি গুছিয়ে আনতে আনতে দাদু আর দিদিভাইয়ে খানিক গল্প হয়৷ চাচা রিক্তাকে পেছনে কখনও মেয়ের পেছনে দেখে বলে, মা, তোমাদের এই ছেলেপুলের আদর আব্দারটুকু ছাড়া আল্লা তালার কাছে আর চাইবার কী বা আছে?
রিক্তা চাচার ঝোলায় ঢেলে দেয় চাল-টাল৷ হাসি মুখে ঘেমো জোব্বায় চাচা আবার হাঁটা লাগায়৷
লক ডাউনে ট্রেন বন্ধ হতেই চাচার আসা বন্ধ হল৷ চাচা আসতো প্রায় চল্লিশ কিমি পাড়ি দিয়ে অচেনা গ্রাম থেকে৷ মেয়ের সাথে চাচার গল্পে সূত্রে এইটুকুই জানা হয়েছিল তাঁর সম্বন্ধে৷
প্রতিবারের মতো বলেছিল, পাথরচাপরির মেলায় যাব, দিদিভাই৷ তোমার নামে দোয়া করব৷ ও রকম বলে যায় চাচা৷ কত মাজার, কত মেলা, কত বাউল আখরার কথা এ ভাবেই দল বছরের টিকলির জানা হয়ে যায়৷
সপ্তাহ গেল, মাসের পর মাস গেল, চাচার দেখা নেই৷ ট্রেন চালু হল, নিউ নর্মাল জীবন আস্তে আস্তে হাঁটতে লাগল৷ চাচার দেখা নেই৷
আমার মুসকিল আসান দাদু আর আসবে না, মা? টিকলির কথায় শূণ্যে তাকিয়ে থাকে রিক্তা৷ মাঝে মাঝে মেয়ের বাবা প্রকাশও খবর নেয়, টিকলি তোর সেই দাদু এসেছিল আর?
এই মানুষের ফোন নম্বর ছিল কি না কখনও জানা হয় নি৷ কোভিডে আজ কতজনই তো নেই৷ ভিন ধর্মের এই মানুষটাকে কোনো দিনই সুচোখে দেখে না পাশের বাড়ির গৌরী বৌদি৷ সেও বলে, ছেলেধরাটা আর আশে না রিক্তা?
ছেলেধরা কে মা? টিকলির প্রশ্নে রিক্তা না শোনার ভান করে৷ গৌরী বৌদির ছেলেটা এ বাড়িতে খেলতে থাকাকালীন চাচা এলে ওর নামেও দোয়া মাঙেন৷ গৌরী বৌদির চোখে পড়ি নি ভাগ্গিস কখনও৷
‘মুসকিল আসান’ বলে টিকলি যতই ডাকুক না কেন, পৃথিবীর এই মহা মুশকিল আসান করার সাধ্যি নেই তার৷ রিক্তারা ভালোই বোঝে৷ তবু তাঁর ধর্ম, তাঁর বিশ্বাস তাঁর থাক৷ মানুষটা যেন ভালো থাকে৷ নিজের পূজার সময় হাতজোড়ে সবার কল্যাণ চাওয়ার সময় রিক্তা চাচার কথাও মনে মনে বলে৷
এই বছরও দোল খেলতে বারণ টিকলির৷ কোভিডের ভয় এখনও কাটেনি৷ বাবার ওপর রাগ করে গোমড়া মুখে রাস্তার দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল একা৷ রিক্তা হঠাৎ শুনতে পেল চিল চিৎকার, মুসকিল আসান দাদু আসছে মা৷
তারপর ধুপধাপ করে দোতলা থেকে নেমে আসে বাইরের দিকে ছুট লাগায় টিকলি৷
রিক্তার চোখে মুখে অবিশ্বাসের ঢেউ৷ ততক্ষণে গ্রিলের আওয়াজ আসে কানে৷ রিক্তাও বাইরের দিকে পা বাড়ায়৷
‘দিদিভাই’ ডাক শুনে টিকলি জড়িয়ে ধরে তার মুসকিল আসান দাদুকে৷ ভুলে যায় এই সময় এমন করা বারণ৷ ভুলে যায় ভয়ঙ্কর জীবাণুদের শরীরের থেকে শরীরে ছড়িয়ে যাবার কথা৷ জোব্বা থলে চামর সবে একাকার দাড়িয়ালা চাচা হা হা করে হেসে ফেলেছে রিক্তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে৷
বেটি, মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছি ভয়ানক রোগ থেকে৷ তোমাদের ভালোবাসা আর আল্লার করুণায়৷ এইসব বড়ো বড়ো পাওনাগুলো যে পাবার বাকি ছিল, বেটি৷
আরে আরে দিদিভাই, কাঁদো কেন? টিকলির গালের অশ্রু ফোঁটা রোগা রোগা শক্ত আঙুল দিয়ে মোছাতে মোছাতে বলে, পাথরচাপরি যেতে পারিনি তো কি হয়েছে৷ এই দেখ, তোমার জন্য কী এনেছি৷ আমার গ্রামের মেয়েরা কেমন বানায় দেখ তো!
ঝোলা থেকে তার বার হয় শোলার ছোট্ট মুকুট একখানা৷ বলেছিলাম না, রাজপুতের সাথে দিদিভাইয়ের বিয়ে দেব৷
রিক্তা দাদু আর দিদিভাইএর এসব গল্পের উৎস না জেনে অবাক হয়েই তাকিয়ে থাকে৷ চাচার ওই হাসিমাখা ফোকলা মুখে কী প্রশান্তি! টিকলির ছোট্ট হাতে মুকুটখানা ধরে অবাক হয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখায় কী অনাবিল খুশি!
তারপর হুঁসে এসে হাতের প্লেটের সামান্য সিধের উপকরণটুকু ঝোলায় ঢেলে দিতে দিতে রিক্তার মনে একাকার হয়ে যায় কত ছবি৷ কাবুলিয়ালা আর চাচা, মিনি আর টিকলি৷ ধর্ম আর ধর্মান্ধতা, মানুষ আর অদৃশ্য কত সম্পর্ক৷
ঝোলাটা কাঁধে দুলিয়ে রাস্তার বাঁকে যে দাড়িয়ালা চাচা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে তাকে কি কষ্ট করে রবীন্দ্রনাথ সাজতে হয় ভালোবাসা কেনার জন্য? মুকুটটা মাথায় পরে টিকলি অবাক চোখে টিকলি আর অদ্ভুত এক মানবতার মায়া-কাজল পরে টিকলির মা রিক্তা দুজনেই তাকিয়ে আছে নাম না জানা আত্মীয়টার দিকে৷
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।