সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ১৫

মর্তকায়ার অন্তরালে

|| ১৫ ||

বিপ্লবী আন্দোলনে স্বামীজির প্রভাব সম্পর্কে যুগান্তর দলের অন্যতম নায়ক হরিকুমার চক্রবর্তী লিখছেন : “বিপ্লবী আন্দোলনে স্বামীজির প্রভাব ! উত্তরে একটা কথাই যথেষ্ট – তাঁর প্রভাব ও প্রেরণা সর্বাধিক | তাঁর বাণীর উদ্দীপনা ছাড়া বিপ্লব আন্দোলন ঐভাবে হত কিনা সন্দেহ |” ১৮
এই প্রসঙ্গে বেঙ্গল ভলেন্টিয়াস এর দুর্ধর্ষ নায়ক হেমচন্দ্র ঘোষের সশ্রদ্ধ স্বীকারোক্তি : “স্বামী বিবেকানন্দ আমাদের কাছে ধর্মনায়ক অপেক্ষা রাজনৈতিক প্রফেটরূপেই বেশি প্রতিভাত হয়েছিলেন | আমরা তাঁর কাছে বিদায় নিলাম | সারাজীবন আমরা সেই মহাগুরুর বাণী স্মরণ রেখেছি | তাঁর নির্দেশ শিরোধার্য করে আমি এবং আমার বন্ধু ও সতীর্থরা নিজেদের সামান্য সাম্যর্থ্য অনুযায়ী উন্নততর বাঙলা, সমৃদ্ধতর ভারত এবং নতুনতর ও সুন্দরতর এক পৃথিবী গঠনে আত্মনিয়োগ করেছিলাম | বিবেকানন্দের প্রেরণা ও আশীর্বাদ পাথেয় করে আমরা স্বাধীনতা মন্দিরের তীর্থ পথে বের হয়েছিলাম | আমাদের হৃদয়ে ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর মস্তকে ছিলেন ঈশ্বর |” ১৯
আর এক মহান বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত, যিনি মাত্র কুড়ি বছর দু’মাস ন’দিন ( ৩১.৮.১৮৮৮- ১০.১১.১৯০৮) বয়সে ফাঁসির দড়িতে নিজেকে আত্মবলিদান দেন | তিনি কতবড়ো দেশপ্রেমিক তার প্রমাণ মিলে ফাঁসির পর তাঁর দাদা ডাঃ আশুতোষ দত্তকে মৃতদেহ অর্পনের সময় আইরিশ ওয়ার্ডার সজল নেত্রে বলেছিলেন : “মি.দত্ত , আপনি কাঁদিবেন না | আপনার ভাই একজন খাঁটি বীর এবং এতবড়ো নির্ভীক দেশপ্রেমিক আয়ার্ল্যাণ্ডেও অধিক মিলিবে না |” ২০
আমাদিগকে আরও বিস্মৃত হতে হয় যখন দেখি, ফাঁসির আদেশ শোনার পর তাঁর ওজন ষোল পাউণ্ড বেড়ে গিয়েছিল | এর থেকে এটা স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতককে হত্যা করে কানাইলাল কতটা আত্মতৃপ্ত | তিনি বললেন : “মৃত্যুকে আমি ভয় করি না | আমার কর্ম সুসম্পন্ন হইয়াছে, আমি হাসিতে হাসিতে ফাঁসির দড়ি গলায় পরিব |” ২১
তিনি মৃত্যুজয়ের এই সাহস কোথায় পেলেন ? নি:সন্দেহে স্বামীজির লেখা থেকে | কানাইলাল যখন ফাঁসির আসামী সেই সময়ের একটি ঘটনা | কানাইলাল একদিন তাঁর কক্ষে স্বামীজির জ্ঞানযোগ থেকে উচ্চকণ্ঠে পাঠ করছিলেন | এত উচ্চৈ:স্বরে কানাইলাল পাঠ করছিলেন যে , সাহেব-সুপার পর্যন্ত ছুটে এসেছিলেন কী হয়েছে দেখার জন্য | ” ……তিনি পড়েই চললেন | ইংরেজীতেই লেখা স্বামীজির ‘জ্ঞানযোগ |’ সাহেব শুনছে | সাহেব জিজ্ঞাসা করল উদ্ধত ভঙ্গিতে : “অত চেঁচাচ্ছ কেন ?” পড়া থামিয়ে শান্তভাবে কানাইলাল সাহেবকে বললেন : “শুনতে পাচ্ছ না ? বুঝতে পারছ না ? আমি তো তোমারই মাতৃভাষাতেই পড়ছি , সাহেব ! তোমাদের দেশে লণ্ডনে একথা তোমাদের দেশের মানুষকেই শুনিয়েছেন আমাদের স্বামী বিবেকানন্দ | শোন, শোন | এই আমাদের মন্ত্র , আমাদের বাইবেল, আর তোমাদের মৃত্যুর পরোয়ানা | মরতে আমরা ভয় পাই না , সাহেব | মৃত্যুতে আমাদের আনন্দ | মৃত্যুকে আমরা ভালবাসি, আর ভালবাসি আমাদের দেশকে , আমাদের মাতৃভূমিকে | যাঁর লেখা আমি পড়ছি সেই বিবেকানন্দ আমাদের তা শিখিয়েছেন | আমরা সবাই তার সন্তান |” ২২
স্বামীজির লেখার প্রভাব দেখা গিয়েছিল স্বামীজির মানস পুত্র নেতাজির জীবনে | তখন তিনি সুভাষ | ঐ লেখায় তাকে করে তুলল নেতাজি | সুভাষ থেকে নেতীজি | বছর পনেরোর সুভাষ সেদিন গেছেন প্রতিবেশি সুহৃৎচন্দ্র মিত্রের বাড়িতে | বই সুভাষের প্রিয় বরাবরই | বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে সুভাষচন্দ্রের নজরে এলো বিবেকানন্দের বইগুলি | তারপর কী হলো তা সুভাষচন্দ্রেরই লেখা থেকে উদ্ধৃত করব | ” ….হঠাৎ নজর পড়ল স্বামী বিবেকানন্দের বইগুলোর উপর | কয়েক পাতা উলটেই বুঝতে পারলাম, এই জিনিসই আমি এতদিন ধরে চাইছিলাম | বইগুলো বাড়ি নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম | পড়তে পড়তে আমার হৃদয়মন আচ্ছন্ন হয়ে যেতে লাগল | প্রধান শিক্ষক মশাই আমার মধ্যে সৌন্দর্যবোধ, নৈতিকবোধ জাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন- জীবনে এক নতুন প্রেরণা এনে দিয়েছিলেন- কিন্তু এমন আদর্শের সন্ধান দিতে পারেননি যা আমার সমগ্র সত্তাকে প্রভাবান্বিত করতে পারে | এই আদর্শের সন্ধান দিলেন বিবেকানন্দ | দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগল, আমি তাঁর বই নিয়ে তন্ময় হয়ে রইলাম | আমাকে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছিল তাঁর চিঠিপত্র ও বক্তৃতা | তাঁর লেখা থেকেই তাঁর আদর্শের মূল সুরটি আমি হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলাম | …..মানবজাতির সেবা এবং আত্মার মুক্তি – এই ছিল তাঁর জীবনের আদর্শ | …..মানবজাতির সেবা বলতে বিবেকানন্দ স্বদেশের সেবাও বুঝেছিলেন | তাঁর জীবনীকার ও প্রধান শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা লিখে গেছেন , ‘মাতৃভূমিই ছিল তাঁর আরাধ্যা দেবী | দেশের এমন কোনো আন্দোলন ছিল না যা তাঁর মনে সাড়া জাগায়নি |’ আরো লিখলেন : “বিবেকানন্দের প্রভাব আমার জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিল | তাঁর আদর্শ ও তাঁর ব্যক্তিত্বের বিশালতাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করার মতো ক্ষমতা তখন আমার ছিল না – কিন্তু কয়েকটা জিনিস একেবারে গোড়া থেকেই আমার মনে চিরকালের জন্য গাঁথা হয়ে গিয়েছিল| চেহারায় এবং ব্যক্তিত্বে আমার কাছে বিবেকানন্দ ছিলেন আদর্শ পুরুষ | তাঁর মধ্যে আমার মনের অসংখ্য জিজ্ঞাসার সহজ সমাধান খুঁজে পেয়েছিলাম | …..স্বামী বিবেকানন্দের পথই আমি বেছে নিলাম |” ২৩ কী সেই পথ ? পথ চরমপন্থার | তাঁর নিজের স্বীকারোক্তি একথা প্রমাণ করে | “আমি একজন চরমপন্থী- চরম পন্থাই আমার নীতি | আমার নীতি হল, হয় সবকিছু না হলে কিছুই নয় ( I am an extremist and my principle is -all or none .) |” ২৪ সুভাষচন্দ্রের সেই স্মরণীয় উক্তি : “তোমরা আমাকে রক্ত দাও , আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব |” এতো চরমপন্থারই নীতি | শহীদের রক্তে পিচ্ছিল পথেই তিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন | এইভাবে স্বপ্ন দেখার মন্ত্র তাঁকে কে শেখাল ? নিঃসন্দেহে বিবেকানন্দ | কারণ বিবেকানন্দকে তিনি গুরুপদে বরণ করেছিলেন | “আজ যদি স্বামীজি জীবিত থাকিতেন তিনি নিশ্চয়ই আমার গুরু হইতেন – অর্থাৎ তাঁকে নিশ্চয়ই আমি গুরুপদে বরণ করিতাম |”২৫

ক্রমশ……

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।