“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় মহুয়া চৌধুরী

নতুন রানি

পুলক সাইকেলে বাড়ি ফিরছিল। ওধারে ব্যানার্জিদের বাড়ি পেরিয়ে এল। ওটাই শেষ বাড়ি। এরপর অনেকখানি ফাঁকা জায়গা দুপাশে। আকাশে সূর্য অস্ত যাওয়ার লাল আভা ক্রমশ ধূসর হয়ে উঠছে। বড় রাস্তা থেকে নেমে খানিকটা মেঠো পথ পেরিয়ে পুকুরের ধারে ওর বাড়ি। দু একটা বড় গাছ, কিছু ঝোপ ঝাড় পথটুকু জুড়ে। নীলা অপেক্ষা করে আছে। ওর নতুন বোউ নীলা। অমন সুন্দর মেয়ে নিজের এত বড় জীবনটাতে আর দেখেনি পুলক।
সুখগঞ্জের হাটে পরিচয়। এক রাশ কাচের চুড়ি নিয়ে বসেছিল নীলা। সেদিনও এমনি গোধূলিবেলা। পুলক পাইকারি দরে রেডিমেড ‘নাইটি’ ‘সায়া’ কিনতে এসেছিল নিজের দোকানের জন্যে। নীলার রূপ চোখ টেনেছিল ওর। নীলার সেদিন বিক্রিবাটা হয়নি মোটে। মুখ হতাশ। অত সুন্দর মেয়ের করুণ মুখ দেখে কেমন মায়া হয়েছিল পুলকের। নিজেই কিনে নিয়েছিল সব চুড়ি।
নীলা খুশির মধ্যেও অবাক হয়েছিল। “এত চুড়ি নিয়ে কি করবে গো? বউকে দেবে?” –
“মাথা নেই তার মাথাব্যথা। যদি দাও তো কিনবো! কি করব না করব সে খবরে কাজ কি!” – পুলক হেসে বলেছিল। এমনি ভাবে আলাপ। তারপর ওরা দেখা করত রোজ। পুলক জেনেছিল কি দুঃখের জীবন নীলার! কোন ছেলেবেলায় বাপ, মা মরেছে। আপন বলতে কেউ নেই। লোকের দুয়ারে বাসন মেজে আর ঘর ঝাড়ু দিয়ে বড় হওয়া। এক এক বাড়িতে এক এক রকম জ্বালা। কোন বাড়ির গিন্নি দজ্জাল মূর্তি। কাজের একটু ঊনিশ-বিশ হলেই চড় থাপ্পড় কষায়। কোনো বাড়িতে কর্তাটির স্বভাব খারাপ। সুযোগ পেলেই আঁচল ধরে টানাটানি। টের পেয়ে গিন্নি উলটে ওকেই ঝাঁটা পেটা করেছিল। শেষে দাঁতে দাঁত চেপে সামান্য পুঁজি জমিয়ে এই ব্যবসায় নেমেছে। ঘর ভাড়া দেবার ক্ষমতা নেই। ইস্টিশানে পড়ে থাকে। সে যে কি দুর্দশা! রাত নামলে মাতাল আর কানাখোঁড়া সেজে থাকা শয়তান ভিখিরিগুলো মেয়েমানুষের মাংসের লোভে ওৎ পেতে থাকে। বলতে বলতে চোখ দিয়ে টপ্‌ টপ্‌ করে জল পড়ছিল নীলার। ময়লা কাপড়খানার কোল আঁচল ভিজে যাচ্ছিল। নরম মন পুলকের। বড্ড কষ্ট হয়েছিল। মনে হয়েছিল এ যেন পাঁশ গাদায় ফোটা ফুল। এত দুঃখ অভাবেও রূপ ঝল্‌মল্‌ করছে কেমন!
তা পুলকেরও তো তিনকুলে কেউ নেই। গত বছর বাচ্চা হতে গিয়ে বোউটা মরেছে তার। বাচ্চাও বাঁচেনি। রেডিমেড পোশাকের দোকানটা থেকে আয় যথেষ্ট ভাল। এদিকে সন্ধ্যেবেলা খেটেখুটে যখন ফাঁকা ঘরখানাতে ফেরে, মনে হয় চতুর্দিক যেন ধূ ধূ করছে। স্বভাবটা তার খুব মিশুক নয় বলে, তেমন বন্ধু-বান্ধবও নেই। এদিকে বদ নেশাও নেই। শূন্য ঘর যেন গিলতে আসে তাকে।
অতএব দুই আর দুইয়ে যোগ করলে যা হয়, সেই সোজা অঙ্কটাই কষে ফেলেছিল সে। নীলাকে প্রস্তাব দিতে হ্যাঁ, না কিছুই বলেনি। চোখ নীচু করে হেসেছিল কেবল। সেই হাসিতেই পুলক তার সব কথার উত্তর পেয়ে গিয়েছিল। ঘটাপটা কিছু হয়নি। সই করা বিয়ে। পুলকের ব্যবসার জগতের জনা কয়েক পরিচিত মানুষ শুধু। তা নীলার কেউ নেই বলে, তাদেরই মধ্যে থেকে দুজনকে নীলার সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল। নতুন বৌয়ের রূপ দেখে তারা অবাক। পুলকের পছন্দ করা গোলাপি সিল্কের কাপড়ে একেবারে ভোরবেলাকার পদ্মফুলটি যেন!
তারপর দুটো দিন কেটেছে স্বপ্নের মতো। আজ অনিচ্ছে সত্বেও প্রথম কাজে বেরিয়েছে পুলক। কি আর করা! নিজের দোকান যত দিন বন্ধ, ততই লোকসান। তার ওপর এখন কেনাকাটার মরশুম। তবে সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে নীলার ফুটফুটে মুখখানাই ভেসেছে ওর চোখের সামনে। হিসেবের গন্ডগোল করে এক খরিদ্দারকে তো পঞ্চাশটাকার একটা নোটই বেশী দিয়ে ফেলেছিল। এমন কখনও হয় না ওর! নেহাৎ চেনা লোক, তাই ফেরত দিয়ে খানিক রঙ্গতামাশা করে গেল।

পুলক তাড়াতাড়ি সাইকেলের চাকা ঘোরাচ্ছে। বড় রাস্তা থেকে নেমে, এখন মেঠো পথ। আর বড়জোর মিনিট দশেক। হঠাৎ ওর মনে হোল, চারদিকে কি যেন তফাৎ লাগছে। অন্য দিন এমন সময়ে বাসা ফেরত পাখিদের কিচির মিচিরের চোটে কান পাতা দায়। আজ আশ্চর্য রকমের নিস্তব্ধ চারিদিক।
ঝোপে ঝাড়ে একটা বেজি কি কাঠবেড়ালিরও দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।
– কি হোল রে বাবা! অন্ধকার নামার আগেই আজ ঘুমিয়ে পড়ল নাকি সব! – আপন মনে বলে একটু হেসে ফেলল পুলক।
সে যখন নিজের বাড়ির দরজার সামনে এসে পৌঁছাল, তখন আকাশের গা থেকে হলদে, কমলা, লাল সব রঙ পুরোপুরি মুছে গেছে। ধূসর রঙটাই হয়ে উঠেছে আরো অনেক গাঢ়। চতুর্দিক ছায়া ছায়া।
কড়া নাড়ার আগেই দরজা খুলে দিল নীলা। জানলা দিয়ে দূর থেকে দেখেছে নিশ্চয়। কি যেন এসেন্স মেখেছে প্রচুর। খুব চড়া গন্ধ। পুলক দেখল নীলা এখন টক্‌টকে লাল একটা শাড়ি পরে আছে। ঠোঁটে গাঢ় লাল রঙ। কপালে খুব বড় লাল টিপ। পুলক জানে নীলা সাজগোজ করতে ভালবাসে। কিন্তু কি দরকার ওর? ও তো এমনিতেই এত সুন্দর।
পুলক ভিতরে ঢুকতেই নীলা জড়িয়ে ধরল ওকে। ওর কপালে, গালে, ঘাড়ে নিজের মুখ ঘষতে লাগল। এমনই আদরের ধরন ওর। একটু পরে ছেড়ে দিয়ে বলল,-“যাও, কলঘরে কাচা জামা দিয়ে রেখেছি। তাড়াতাড়ি এস, জলখাবার তৈরি।”
অনেক দিন পরে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা পুলকের। ফাঁকা বাড়িটার নির্জনতা এত দিন ধরে সাতমণী বস্তার মতো চেপে ছিল ওর ঘাড়ে। আনন্দে বুড়বুড়ি কাটছে বুকের মধ্যে।
কলঘরে ঢুকলো পুলক। এ বাড়িটা ওদের ছোট শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে। এমন একটেরে বলে অনেকটা সস্তায় পেয়েছে এমন বাড়ি। যদিও বেশ পুরানো। একতলা। তবু বড় বড় চারটে ঘর। সামনে পিছনে খানিকটা করে খোলা উঠোন। কলঘর, রান্নাঘরও বেশ বড়।
কিন্তু বড্ড আরশোলার উপদ্রব। চারদিকে ঝোপঝাড়ের জন্য সন্ধ্যে নামলেই মশাদের দাপট খুব। কলঘরেও ম্যাট না জ্বালালে, নড়বে না মশা। কামড়ের চোটে হাত মুখ ফুলে, চুলকে চুলকে অস্থির হয়ে যেতে হয়। কলঘরের দোর বন্ধ করেই ওর প্রথম কাজ বোর্ডে লাগিয়ে রাখা ম্যাটের সুইচ টিপে জ্বালানো।
কিন্তু আজ পুলক দেখল ম্যাটটা লাগানো নেই সুইচ বোর্ডে। গেল কোথায়?
“নীলা–নীলা–” – দুচার বার ডাকল পুলক। সাড়া নেই। সে বোধহয় ওপাশে রান্নাঘরে ব্যস্ত। থাক গে! পুলক দেখল তাকে পরিপাটি করে গোছানো রয়েছে নতুন সাবান, তেল, শ্যাম্পুর শিশি, পাউডার, টুথব্রাশ, পেস্ট। আলনায় তার ইস্ত্রি করা পাজামা পাঞ্জাবি, পরিষ্কার তোয়ালে। কলঘরের মেঝে, দেওয়াল সব তক্‌তক্‌ করছে। মশার ম্যাট না থাকার বিরক্তি ভুলে গেল সে তক্ষুনি। কিন্তু লক্ষ্য করল আজ আর মশার পনপনানি শোনা যাচ্ছে না। ঝাঁজরির ফাঁক দিয়ে প্রতিদিন অবধারিত ভাবে উঁকি মারা আরশোলারও আজ দেখা পেল না সে। কি সুন্দর পরিষ্কার করেছে নীলা সব কিছু। আহা এত কাল পরে নিজের ঘর পেল মেয়েটা। খুশী খুশী মনে ভাবল পুলক।
কলঘর থেকে বেরতেই ভাল ঘিয়ের সুঘ্রাণ পেল সে। আর সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল এতক্ষণ ধরে সাইকেল চালিয়ে ক্ষিদেয় পেট চুঁইচুঁই করছে তার। ‘নীলা’ ‘নীলা’ বলে ডাকতে ডাকতে খাবার ঘরে ঢুকলো । ছোট্ট প্লাস্টিকের টেবলের ওপর ফুলকাটা ফাইবারের প্লেটে গরম গরম সুজির হালুয়া। কাচের কাপে চা। ধোঁয়া উঠছে। কিন্তু পিছন দিকে উঠোনের দরজাটা খোলা। ঘরে কেউ নেই। তখনই পাশের ঘর থেকে নীলা এল। হাসিমুখে বলল,-“খেতে বোস। ঠান্ডা হয়ে যাবে নয়তো।”
পুলকের চোখ খোলা দরজার দিকে। “এমন দরজা খুলে রেখো না নীলা। একটা কেলে বেড়াল আছে। ভয়ানক পাজি! যখন তখন ঢুকে আসবে আর খাবারে মুখ দেবে–অনেকবার এমন–”
পুলককে কথা শেষ করতে না দিয়ে নীলা হাসল মুখ টিপে।নীচু স্বরে বলল,-“আর আসবে না।” ওর গলায় এক ধরনের মজবুত নিশ্চিন্ততা।
উঠোনের বাইরে একটুখানি পর্যন্ত ঘরের আলো পড়েছে। তার পরেই আবছা অন্ধকার। সেদিকে তাকিয়ে নিমেষের জন্যে পুলকের কেন যেন গা ছম্‌ছম্‌ করে উঠল। সন্ধ্যেবেলায় এদিকটাতে অনেক জোনাকি দেখা যায়। আজ একটাও নেই।
—-
অনেক রাত। পুলক খাটে বসে আজকের কেনাবেচার হিসেব শেষ করে ফেলেছে এইমাত্র। যাক মিলে গেছে সব। রোজই এমন সময়ে একটা স্বস্তির আওয়াজ বেরিয়ে আসে ওর মুখ দিয়ে। আর তক্ষুনি দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার পিছন থেকে মুখ বাড়িয়ে টিকটিকিটা বলে ওঠে ঠিক ঠিক ঠিক। কই আজ বলল না তো! বুকের মধ্যেটা কেঁপে উঠল পুলকের। কোথাও কি হিসেবের গরমিল হয়েই গেছে তবে?
রান্নাঘরে বাসন গুছিয়ে তুলছে নীলা। তার মৃদু শব্দ আসছে। নাহ্‌ আজকের রাতটা ভাল নয়। দরজা বন্ধ করে একলাই শোবে ও। ওর মগজের ভিতরে নির্দেশ দেয় এক অজানা ভয়। খাট থেকে লাফিয়ে নেমে দরজা বন্ধ করতে যায় সে।
কিন্তু তার আগেই নীলা ঘরে ঢুকে এসেছে। ওর ঠোঁটের লাল রঙ আরো গাঢ় করে দিয়েছে কি ও!
“তোমার মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন? ফ্যাকাশেপানা–” – হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে নীলা। পুলক কি জবাব দেবে ভেবে পায় না। আবার পিছিয়ে গিয়ে খাটে বসে। নীলা দরজার খিল তুলে দেয়। হালকা নাইট ল্যাম্প জ্বালিয়ে বড় আলোটা নিভিয়ে দেয়। পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে খাটের দিকে। পুলকের পাশে বসে। আধো অন্ধকারে নীলার গায়ের সেই ভীষণ তীব্র গন্ধে পুলকের দম বন্ধ হয়ে আসে যেন।
“সারাদিনের সব কাজ সেরেও কত সময় ছিল। কি যে করি?” – নীলা বলে চলেছে,-“আগের কথা সব মনে পড়ছিল। ইস্টিশানে একটা লোক বই বেচতে আসত। ঝোলা ভরা কত বই। খানিক খানিক চেঁচিয়ে পড়ত–শেষটুকুনি আর বলত না। গল্পর শেষ জানার লোভে লোকে বই কিনত।” নীলা হাসল। চারদিকের থমথমে নৈঃশব্দের মধ্যে নীলার গলার স্বর যেন বুকে ধাক্কা দিচ্ছে পুলকের।
“সেই রাজা আর রাক্ষুসীরানির গল্প বলত। বনের মধ্যে শিকার করতে গিয়ে রাজা দেখে এক পরমাসুন্দুরী মেয়ে গাছতলায় বসে কাঁদছে। রাজা তাকে রাজপুরীতে নিয়ে এল রানি করে। পরদিন রাজ্য জুড়ে হৈ চৈ পড়ে যায়– রাজার ঘোড়াশালে একটি ঘোড়ারও চিহ্নটুকুন অবধি নেই। তার পরদিন হাতিশাল খাঁ খাঁ করে। রাজপুরী শুদ্ধু মানুষ ভয়ে অস্থির। এ কেমন কান্ড! তারপর তেরাত্তির পোয়াল–জান এই পর্যন্ত বলে থেমে যেত লোকটা। তখন–”
পুলককে জড়িয়ে ধরে নীলা। পুলক ছাড়াতে চেষ্টা করেও পারছে না। কি ভয়ানক শক্তি নীলার ওই ছিপছিপে শরীরটাতে। পুলকের মুখের খুব কাছে মুখ আনে সে। কোথাও একটি জীবিত প্রাণীর সাড়া নেই। পুলকের গলার মধ্যে থেকে শেষ বারের মতো বেরিয়ে আসতে চায় আপ্রাণ চেষ্টার একটা আর্তনাদ–। কিন্তু বেরতে পারে না।
—-
পরদিন নিশিপুরের মোড়ে পুলকের রেডিমেড জামার দোকান ‘মোহিনী স্টোর্স’ কেন বন্ধ রয়েছে কেউ বলতে পারে না। কেনাকাটার ভরভরন্ত মরশুম এখন। কত খরিদ্দার এসে ফিরে যায়। দোকানে পুলকের সাহায্যকারী ছেলেটা অনেক চেষ্টা করেও ওকে মোবাইলে ধরতে পারে না কিছুতেই। যান্ত্রিক স্বর প্রতিবারেই পরিষেবা সীমার বাইরে থাকার খবর ঘোষণা করে চলেছে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।