বালক রবীন্দ্রনাথের একজন বড়ো শিক্ষক ছিলেন পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর | অবশ্য জন্মের কয়েক বৎসর পর্যন্ত পিতা দেবেন্দ্রনাথ ছোট্ট রবির কাছে ছিল অপরিচিত | পিতার সঙ্গে প্রথম অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগ সংঘটিত হলো একটি চিঠির মাধ্যামে | যোগাযোগের পেক্ষাপটটি এইরূপ – ইংরেজ গবর্মেণ্টের চিরন্তন জুজু রাসিয়ান কর্তৃক ভারত আক্রমণের আশঙ্কা যখন লোকমুখে ফিরছিল তখন রবীন্দ্রনাথের মায়ের কানেও কথাটা পৌঁছেছিল | দেবেন্দ্রনাথ তখন পাহাড়ে | রবীন্দ্রনাথের মায়ের মনে আশঙ্কা দেখা দিল | কেন ? আশঙ্কার কারণ এইরূপ – তিব্বত ভেদ করিয়া হিমালয়ের কোনো একটা ছিদ্রপথ দিয়ে রুসীয়েরা সহসা ধুমকেতুর মতো আর্বিভূত হতে পারে এবং দেবেন্দ্রনাথের অনিষ্ট হবার আশঙ্কা বর্তমান | বাড়ির বড়োদেরকে এই আশঙ্কার কথা জানালে তা কেউই সমর্থন করেননি | অবশেষে তিনি একপ্রকার বাধ্য হয়েই তাঁর নাবালক পুত্র রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হলেন | ছোট্ট রবীন্দ্রনাথও মাতার উদ্ বেগের কথা জানিয়ে পিতাকে পত্র লিখলেন | পত্রের উত্তরও এল , “ভয় করিবার কোনো কারণ নাই , রাসিয়ানকে তিনি স্বয়ং তাড়াইয়া দিবেন |”
তারপর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ১২৭৯ সনে | দেবেন্দ্রনাথ তখন বাড়িতে এসেছিলেন পুত্রদের উপনয়ন দেবার মানসে | উপনয়ন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হল ঐ বছরের ২৫শা মাঘ | এতদিনের অপরিচিত পিতৃদেব হয়ে উঠলেন অন্তরঙ্গ | কিন্তু কিভাবে ? তার প্রথম সূত্রপাত রবীন্দ্রনাথের ভাষায় , “একদিন তেতালার ঘরে ডাক পড়িল | পিতা জিজ্ঞাসা করিলেন , আমি তাঁহার সঙ্গে হিমালয় যাইতে চাই কি না ? ” ছোট রবি অভিভূত | ” ‘চাই ‘ এই কথাটা যদি চিৎকার করিয়া আকাশ ফাটাইয়া বলিতে পারিতাম , তবে মনের ভাবের উপযুক্ত উত্তর হইত |” প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সূত্রপাত এ’ভাবেই ঘটল | এরপর থেকে আমরা লক্ষ করব পিতা ও পুত্রের প্রত্যেকটি আচরণের রসায়ণ |
যাত্রা শুরুর পূর্বে পিতা দুইটি কাজ করিয়ে নিলেন | দুইটি কাজই ঠাকুর পরিবারের চিররীতি অনুসারে অনুশাসিত | এক – যাত্রার পূর্বে বাড়ির সকলকে নিয়ে দালানে বসিয়ে উপাসনা | দুই – রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে বাড়ির সকল গুরুজনদের প্রণাম | উপাসনা ও প্রণাম দুইটিই লক্ষ্যনীয় ও শিক্ষণীয় | শিশুর সংস্কার তৈরিতে এই দুটিরই যথেষ্ট মূল্যবান ভূমিকা আছে |
ছোটো রবির পোশাক কেমন হবে তা স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথই ঠিক করে দিয়েছিলেন | মাথার জন্য যে জরির কাজ করা টুপি তৈরি করা হয়েছিল সেটা পরার অনিচ্ছা সত্ত্বেও যথারীতি পরিচ্ছন্নতার ত্রুটি হবার আশঙ্কায় রবিকে পরতে হয়েছিল | গাড়িতে উঠেই পিতার নির্দেশ হল : “মাথায় পরো |” সুযোগ বুঝে রবীন্দ্রনাথ অনেকবার তা মস্তিষ্ক চ্যুত করলেও প্রতিবারই পিতার দৃষ্টি নিবন্ধহেতু টুপিটা স্বস্থানে তুলতে হয়েছিল |
রবীন্দ্রনাথ পিতৃদেব সম্পর্কে লিখছেন , “ছোটো হইতে বড়ো পর্যন্ত পিতৃদেবের সমস্ত কল্পনা এবং কাজ অত্যন্ত যথাযথ ছিল | তিনি মনের মধ্যে কোনো জিনিস ঝাপসা রাখিতে পারিতেন না এবং তাঁহার কাজেও যেমন তেমন করিয়া কিছু হইবার জো ছিল না | তাঁহার প্রতি অন্যের এবং অন্যের প্রতি তাঁহার সমস্ত কর্তব্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ছিল | আমাদের জাতিগত স্বভাবটা যথেষ্ট ঢিলাঢালা | অল্পস্বল্প এদিক- ওদিক হওয়াকে আমরা ধর্তব্যের মধ্যেই গণ্য করি না | সেইজন্য তাঁহার সঙ্গে ব্যবহারে আমাদের সকলকেই অত্যন্ত ভীত ও সর্তক থাকিতে হইত | উনিশ-বিশ হইলে হয়তো কিছু ক্ষতি বৃদ্ধি না হইতে পারে ; কিন্তু তাহাতে ব্যবস্থার যে লেশমাত্র নড়চড় ঘটে সেইখানে তিনি আঘাত পাইতেন | …….. কোনো ক্রিয়া কর্মে কোন্ জিনিসটা ঠিক কোথায় থাকিবে , কে কোথায় বসিবে , কাহার প্রতি কোন্ কাজের কতটুকু ভার থাকিবে , সমস্তই তিনি আগাগোড়া মনের মধ্যে ঠিক করিয়া লইতেন এবং কিছুতেই কোনো অংশে তাহার অন্যথা হইতে দিতেন না |” পিতার প্রতি পুত্রের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেবেন্দ্রনাথের ঋজু চরিত্রের একটা আভাস পাওয়া যায় | আভাসটা আরো দৃঢ় হয় এই অংশের পাঠকালে -“বহুকাল প্রবাসে থাকিয়া পিতা অল্প কয়েকদিনের জন্য কলিকাতায় আসিতেন , তখন তাঁহার প্রভাবে যেন সমস্ত বাড়ি ভরিয়া উঠিয়া গম্ গম্ করিতে থাকিত | দেখিতাম , গুরুজনেরা গায়ে জোব্বা পরিয়া , সংযত পরিচ্ছন্ন হইয়া , মুখে পান থাকিলে তাহা বাহিরে তাহা ফেলিয়া দিয়া তাঁহার কাছে যাইতেন | সকলেই সাবধান হইয়া চলিতেন | রন্ধনের পাছে কোনো ত্রুটি হয় , এইজন্য মা নিজে রান্না ঘরে গিয়া বসিয়া থাকিতেন | বৃদ্ধ কিনু হরকরা তাহার তকমাওয়ালা পাগড়ি ও শুভ্র চাপকান পরিয়া দ্বারে হাজির থাকিত | পাছে বারান্দায় গোমমাল , দৌড়াদৌড়ি করিয়া তাঁহার বিরাম ভঙ্গ করি , এজন্য পূর্বেই আমাদিগকে সর্তক করিয়া দেওয়া হইয়াছে | আমরা ধীরে ধীরে চলি , ধীরে ধীরে বলি , উঁকি মারিতে আমাদের সাহস হয় না |”
উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেবেন্দ্রনাথকে আমাদের মনে হতে পারে তিনি খুব কঠোর মানসিকতার মানুষ ছিলেন | কিন্তু এ’রূপ ধারণার সম্পূর্ণটাই সত্য নয় | রবীন্দ্রনাথের লেখাতেই এই যুক্তি খণ্ডিত হয় | “একদিকে আমার প্রচুর পরিমাণে স্বাধীনতা ছিল ; অন্যদিকে সমস্ত আচরণ অলঙ্ঘরূপে নির্দিষ্ট ছিল | যেখানে তিনি ছুটি দিতেন সেখানে তিনি কোনো কারণে কোনো বাধাই দিতেন না , যেখানে তিনি নিয়ম বাঁধিতেন সেখানে তিনি লেশমাত্র ছিদ্র রাখিতেন না |” এইটিই বোধহয় দেবেন্দ্রনাথের চরিত্রের সঠিক মূল্যায়ণ |
ছিদ্রবিহীন কঠোরতার যৎকিঞ্চিত পরিচয় আমরা পেলাম | এবার অবাধ স্বাধীনতার একটু পরিচয় নেব | “যদিও আমি নিতান্ত ছোটো ছিলাম কিন্তু পিতা কখনো আমাকে যথেচ্ছ বিহারে নিষেধ করিতেন না |” তিনি কখনো শিশু মনের অধ্যবসায়কে তাচ্ছিল্য করেননি |
বোলপুরে ঢিবিওয়ালা খাদগুলিকে খোয়াই বলে | “এখান হইতে জামার আঁচলে নানা প্রকারের পাথর সংগ্রহ করিয়া পিতার কাছে উপস্থিত করিতাম | তিনি আমার এই অধ্যবসায়কে তুচ্ছ বলিয়া একদিনও উপেক্ষা করেন নাই | তিনি উৎসাহ প্রকাশ করিয়া বলিতেন , “কী চমৎকার | এ সমস্ত তুমি কোথায় পাইলে !” আমি বলিতাম , “এমন আরো কত আছে ! কত হাজার হাজার ! আমি রোজ আনিয়া দিতে পারি |” তিনি বলিতেন , “সে হইলে তো জমা হয় | ওই পাথর দিয়া আমার এই পাহাড়টা তুমি সাজাইয়া দাও |”
এখানে পিতার স্নেহমিশ্রিত প্রশয়ের পূর্ণ সমর্থন দেখলাম | শুধু তাই নয় কখনো কখনো প্রশয়ের সঙ্গে পুরস্কারের সেতুবন্ধন রচিত হয়ে শিশুমনের অনাবিল আনন্দকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলত | “খোয়াইয়ের মধ্যে একজায়গায় মাটি চুঁইয়া একটা গর্তের মধ্যে জল জমা হইত | এই জলসঞ্চয় আপন বেষ্টন ছাপাইয়া ঝির্ ঝির্ করিয়া বালির মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইত | ……আমি পিতাকে গিয়া বলিতাম , “ভারি সুন্দর জলের ধারা দেখিয়া আসিয়াছি , সেখান হইতে আমাদের স্নানের ও পানের জল আনিলে বেশ হয় | ” তিনি আমার উৎসাহে যোগ দিয়া বলিতেন , “তাই তো , সে তো বেশ হইবে” এবং আবিষ্কারকর্তাকে পুরস্কৃত করিবার জন্য সেইখান জল আনাইবার ব্যবস্থা করিয়া দিলেন |”